কবি আসাদ মান্নানের প্রতি শিকড়ের বিশেষ নিবেদন
কিছু মানুষকে সময়ের ক্যালেন্ডারে মাপা যায় না। তাঁদের উপস্থিতি কোনো নির্দিষ্ট দিন, ক্ষণ কিংবা দশকের সীমানায় আবদ্ধ নয়; তাঁরা সময়ের দীর্ঘ স্রোতে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন এক অনিবার্য পথচিহ্ন। তাঁরা নির্মাণ করেন শিল্প ও সাহিত্যের নিজস্ব নান্দনিক পরিসর, তাঁদের সৃষ্টির আলো অনুসরণ করে এগিয়ে আসে অগণিত শিল্পীসত্তা; আর একদিন তাঁরাই সময়ের সীমা অতিক্রম করে হয়ে ওঠেন কিংবদন্তি। কবি আসাদ মান্নান তেমনই এক স্বতন্ত্র ও দীপ্তিমান কবিসত্তা।
বাংলা কবিতার সত্তরের দশকের অন্যতম স্বতন্ত্র কবিকণ্ঠ তিনি। তাঁর কবিতায় স্বদেশ ও ইতিহাস, প্রেম ও বিরহ, মানুষের অন্তর্গত বেদনা, সময়ের অভিঘাত এবং অস্তিত্বের গভীর অন্বেষণ এক নিজস্ব কাব্যভাষায় রূপ পেয়েছে। তাঁর কবিতা কখনো বহমান নদীর মতো, কখনো ইতিহাসের অন্ধকারে জ্বলে থাকা একাকী প্রদীপ, কখনো মানুষের নিঃসঙ্গ হৃদয়ের পাশে নীরবে রেখে দেওয়া এক উষ্ণ হাত। শব্দের ভেতর দিয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন এমন এক কাব্যভুবন, যেখানে ব্যক্তির অনুভব এসে মিশেছে বৃহত্তর মানবজীবনের চিরন্তন অভিজ্ঞতায়।
শিকড়ের সঙ্গে কবি আসাদ মান্নানের সম্পর্কও তেমনি দীর্ঘ, গভীর ও আত্মিক। শিকড়ের জন্মলগ্ন থেকেই তিনি শিকড় পরিবারের একজন আপনজন, একজন সহযাত্রী। সময় বদলেছে, সাহিত্যচর্চার মাধ্যম বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু এই সম্পর্কের ভিতটি রয়ে গেছে একই জায়গায়। শিকড়ের পাতায় তাঁর কবিতা যেমন এসেছে, তেমনি শিকড়ের দীর্ঘ পথচলার স্মৃতিতেও তিনি হয়ে আছেন এক অবিচ্ছেদ্য নাম।
আজ প্রিয় কবি অসুস্থ। বেশ কিছুদিন ধরে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকদের নিবিড় পরিচর্যায় তিনি ধীরে ধীরে সুস্থতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন; তবে সম্পূর্ণ আরোগ্যের জন্য তাঁকে আরও কিছুদিন চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে। এই সংবাদে আমরা উদ্বিগ্ন, কিন্তু তাঁর সাম্প্রতিক কবিতাগুলো আমাদের সেই উদ্বেগের ভেতরেও এক আশ্চর্য আলো দেখায়।কারণ, হাসপাতালের বেডে শুয়েও কবির কলম থেমে নেই।
বরং মনে হয়, হাসপাতালের সাদা চাদর, মনিটরের বিপ-বিপ শব্দ, স্যালাইনের ফোঁটা, দীর্ঘ রাত এবং জানালার ওপাশের পৃথিবী, সবকিছুই তাঁর কবিতার নতুন উপাদান হয়ে উঠেছে। তাঁর ‘হাসপাতালের বেডে শুয়ে’ কবিতায় মৃত্যু এসে দাঁড়ায় সাদা কোট ও প্রেসক্রিপশন হাতে। কিন্তু কবি তাকে ভয় দিয়ে নয়, এক অদ্ভুত প্রত্যয়ের সঙ্গে মুখোমুখি করেন;
“আমি তো সারা জীবন শব্দের সাথে কুস্তি করেছি,
তোমার সাথে আরেকটা রাউন্ড হোক।”
এ যেন অসুস্থ শরীরের ভেতর থেকেও কবিসত্তার এক অমোঘ ঘোষণা। আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা;
“তাই আমাকে ছাড়তেই হবে, আমাকে ফিরতেই হবে।”
এই ‘ফিরে আসা’ শুধু হাসপাতালের বিছানা থেকে জীবনের দিকে ফিরে আসা নয়; এটি কবিতার কাছে, মানুষের কাছে, প্রিয়জনের কাছে এবং নিজের সৃষ্টিশীল সত্তার কাছে ফিরে আসারও এক গভীর আকাঙ্ক্ষা।
‘আমি জেগে আছি’ কবিতায় সেই আকাঙ্ক্ষা আরও ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে। জানালার ওপাশে প্রতিদিন বসে থাকা একটি কাক, টেবিলে পড়ে থাকা অর্ধেক লেখা চিঠি, অদৃশ্য মায়ের দোয়া, বন্ধুদের উদ্বিগ্ন অপেক্ষা—সব মিলিয়ে মৃত্যু এখানে কোনো বিমূর্ত দর্শন নয়; সে কবির খুব কাছের একটি উপস্থিতি। তবু কবি তাকে প্রত্যাখ্যান করেন ভালোবাসার শক্তিতে;
“এতগুলো ভালোবাসা ফেলে কীভাবে যাই?”
তারপর আসে সেই দীপ্ত উচ্চারণ;
“না, মৃত্যু, এবার তোমার দেরি হবে।”
এই কবিতাগুলোয় মৃত্যুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র কোনো স্লোগান নয়, ভালোবাসা, অসমাপ্ত চিঠি, আরেকটি সকাল দেখার আকাঙ্ক্ষা এবং কবিতা।
আবার ‘হাসপাতালে শুয়ে লেখা কবিতার কষ্ট’-এ কবির দৃষ্টি আরও অন্তর্মুখী। ড্রিপের ফোঁটা, চার দেয়াল, পুরোনো মানুষের ছবি, মনিটরের শব্দ, সবকিছু মিলিয়ে শরীর যেন এক বন্দিত্বের ভেতর। কিন্তু কবি খুব সহজ একটি উপলব্ধিতে পৌঁছান;
“বন্দি শুধু শরীর না
অপেক্ষাও বন্দি”
এই কয়েকটি শব্দেই হাসপাতালের অভিজ্ঞতা ব্যক্তিগত সীমা ছাড়িয়ে এক সার্বজনীন মানবিক অনুভূতিতে পরিণত হয়।
অন্যদিকে ‘হাসপাতালে ভোরের আলো’ কবিতায় হাসপাতালের ঘর হঠাৎ রূপ নেয় বৃহত্তর এক অন্ধকারের প্রতীকে। ভোর এখানে শুধু সূর্যের উদয় নয়; ভোর মানে সত্য, মুক্তি, আশা এবং মানুষের অন্তর্গত আলো। কবির উপলব্ধি;
“ভোর মানে সূর্য ওঠা না,
ভোর মানে অন্ধকারের ভিতর
নিজের চোখ দুটোকে জ্বালিয়ে রাখা।”
এই কবিতার শেষ পঙ্ক্তি যেন তাঁর বর্তমান জীবনযাত্রারই এক প্রতীক;
“আমার তালুতে / এক ফোঁটা আলো এখনো নেভেনি।”
আসাদ মান্নানের হাসপাতালের কবিতাগুলো শুধু ব্যক্তিগত অসুস্থতার দিনলিপি নয়। সেখানে তাঁর বৃহত্তর কবিসত্তাও সমানভাবে সক্রিয়। ‘প্রতিবিম্ব অন্ধকার’, ‘স্বর্গের নদীর ভিতরে’ কিংবা ‘হাসপাতালের বেডে ১৫ই আগস্ট’—এসব কবিতায় ব্যক্তিগত শরীর ক্রমে মিশে যায় সমাজ, ইতিহাস, স্বদেশ ও মানুষের সম্মিলিত যন্ত্রণার সঙ্গে। কোথাও মিথ্যার পাহাড়, কোথাও অন্ধকারে ঘুমিয়ে থাকা সূর্য, কোথাও যমুনার জল, কোথাও গোরস্থান থেকে উঠে আসা আলোর ধ্বনি—এইসব পরাবাস্তব ও প্রতীকী চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে কবি বাস্তবতার গভীরে পৌঁছাতে চান।
‘শূন্যতার গুহা ও হরিণী জোছনা’ কিংবা ‘বৃষ্টি ও বালিকা’-তে আবার আমরা দেখি অন্য এক আসাদ মান্নানকে—স্মৃতি, হারানো মানুষ, প্রেম, বিরহ ও কল্পনার এক রহস্যময় ভূগর্ভে প্রবেশ করা কবিকে। সেখানে বাস্তবের হাসপাতাল যেন মিলিয়ে যায়; জেগে ওঠে এক পরাবাস্তব জগৎ, যেখানে “কিছু মানুষকে হারালেই তারা মিথ হয়ে বাঁচে।”
এভাবেই হাসপাতালের শয্যা তাঁর কবিতায় কখনো মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানোর জায়গা, কখনো স্মৃতির জানালা, কখনো স্বদেশের ক্ষত দেখার আয়না, কখনো প্রেমের কাছে ফিরে যাওয়ার পথ, আবার কখনো অন্ধকারের ভেতর নিজের আলোটুকু জ্বালিয়ে রাখার নির্জন সাধনা।
শিকড়ের পাঠকদের জন্য এই সময়ের লেখা তাঁর কিছু কবিতা আমরা প্রকাশ করছি। এগুলো পড়তে গিয়ে আমরা শুধু একজন অসুস্থ কবির লেখা পড়ব না; আমরা দেখব—একজন কবি কীভাবে অসুস্থতার মধ্যেও জীবনকে আঁকড়ে ধরেন, কীভাবে মৃত্যুর চোখে চোখ রেখে শব্দের কাছে ফিরে যান, কীভাবে অন্ধকারের মধ্যেও ভোরের সম্ভাবনাকে বাঁচিয়ে রাখেন।
প্রিয় কবি আসাদ মান্নান, হাসপাতালের এই দীর্ঘ রাত একদিন শেষ হবে। জানালার ওপাশে আবার সকাল হবে। আপনার অসমাপ্ত চিঠি শেষ হবে, টেবিলে আবার কবিতার খাতা খুলবে, আর শিকড়ের পাতায় ফিরে আসবে আপনার নতুন কবিতা। আমরা সেই প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায়।
আপনার কলমের আলো যেন নিভে না যায়। আপনার শরীর ফিরে পাক তার পূর্ণ শক্তি। আর আপনি ফিরে আসুন; কবিতার কাছে, পাঠকের কাছে, শিকড়ের কাছে, আমাদের কাছে।
আপনার দ্রুত ও পূর্ণ আরোগ্যের জন্য শিকড় পরিবারের পক্ষ থেকে রইল গভীর প্রার্থনা, ভালোবাসা ও আন্তরিক শুভকামনা।
ফারুক আহমেদ রনি
সম্পাদক, শিকড়
হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে কবি আসাদ মান্নান লিখেছেন অসাধারণ কিছু কবিতা। আমরা শিকড়ের পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করছি তাঁর অন্যতম কিছু কিবতা।
একটা পুরনো চশমা
একটা পুরনো চশমা পড়ে আছে টেবিলে,
কাঁচে ধুলো নেই, আছে সময়ের দাগ।
কেউ ছুঁয়ে দেখে না, তবু সবাই জানে –
ওটা কেবল চশমা নয়, একটা দৃষ্টি।
মোটা ফ্রেমের ভেতর দিয়ে তিনি দেখেছিলেন
মানচিত্রহীন একটা দেশের মানচিত্র,
যেখানে ধানক্ষেতের নাম স্বাধীনতা হবে,
যেখানে কৃষকের ঘামে লেখা থাকবে সংবিধান।
চশমাটা খুলে রাখলেই কি দৃষ্টি ফুরায়?
না।
ওই কাঁচে এখনো আটকে আছে ৭ই মার্চের রোদ,
টুঙ্গিপাড়ার কাদামাটি, ধানমন্ডি ৩২ এর বারান্দা,
আর একটা জাতির চোখে চোখ রাখার সাহস।
আজ আমরা নতুন চশমা পরি, নতুন লেন্স,
তবু ঝাপসা লাগে যখন ভুলে যাই –
কে আমাদের দেখতে শিখিয়েছিল।
ওই চশমাটা তুলে চোখে দাও একবার,
দেখবে, পৃথিবীটা এখনো অত বড় নয়,
যত বড় একটা মানুষের স্বপ্ন হতে পারে।
হাসপাতালের বেডে শুয়ে
মৃত্যুকে আমি ঘৃণা করি না, কিন্তু মানিও না,
তুমি এসেছো সাদা কোট পরে, প্রেসক্রিপশন হাতে,
আমি তো সারা জীবন শব্দের সাথে কুস্তি করেছি,
তোমার সাথে আরেকটা রাউন্ড হোক।
এই বেড আমার মঞ্চ নয়, আমার মঞ্চ রাস্তা,
এই মনিটরের বিপ আমার ছন্দ নয়,
আমার কবিতা ছন্দ ভাসে বাংলার নদীর জলে,
নির্যাতিতের মিছিলে,, বৃষ্টি ও পূর্ণিমায়,
মানুষের ভিড়ে, দস্যুতার বিরুদ্ধে
আমার প্রতিটি শব্দ উদ্যত কিরিচ।
তাই আমাকে ছাড়তেই হবে, আমাকে ফিরতেই হবে।
আমি জেগে আছি
জানালার ওপাশে একটা কাক এসে বসে রোজ,
আমি ওকে কথা দিয়েছি, আমি ফিরবো,
আমার টেবিলে একটা অর্ধেক লেখা চিঠি পড়ে আছে,
ওটাকে শেষ করতে হলেও আমাকে বাঁচতে হবে।
মা রোজ অদৃশ্যে থেকে একটা আয়াত পড়ে ফুঁ দেয় কপালে,
বন্ধুরা লুকিয়ে দেখছে করিডোরে পড়ে আছে একটা কফিন,
কফিনের কোনো পাখা নেই,তবু সে উড়ছে।
এ কফিন আমাকে নেবে না:
এতগুলো ভালোবাসা ফেলে কীভাবে যাই?
না, মৃত্যু, এবার তোমার দেরি হবে।
আমি আরেকটা সকাল দেখবো, আরেক কাপা চা খাবো,
আরেকবার বলবো— ভালো আছি।
খুব ছোট, কিন্তু ধারালো
শুয়ে আছি,
তবু কলম ছাড়িনি।
শরীর হারছে,
তবু লাইন হারছে না।
মৃত্যু বলছে — ঘুমাও,
আমি বলছি — আরেকটা শব্দ লিখি।
যতক্ষণ লিখছি,
ততক্ষণ আমি… আমি জেগে
আমি লিখতে লিখতে ঘুমিয়ে পড়বো।
হাসপাতালের বেডে ১৫ই আগস্ট
আজ আমি হাসপাতালের সাদা চাদরে,
আর বাইরে পুরো বাংলাদেশটাই একটা সাদা চাদরে ঢাকা—
শোকের, জ্বরের, নীরবতার।
আমার হাতে স্যালাইনের নল,
আর মানচিত্রের হাতে ৩২ নম্বরের ক্ষত —
দুটো দিয়েই একই রক্ত, একই কষ্ট ঝরে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা।
মনিটরের বিপ শব্দটা মনে হচ্ছে,
সেই ১৯৭৫-এর ভোরের গুলির শব্দের প্রতিধ্বনি,
আমার বুকের ব্যথাটা আর জাতির বুকের ব্যথাটা
আজ একই ইসিজি লাইনে কাঁপছে।
নার্স এসে জিজ্ঞেস করে— “কেমন লাগছে?”
আমি বলতে পারি না, এই অসুখটা আমার একার নয়,
এই জ্বরটা এই জাতির,
যে জাতি তার পিতাকে হারানোর পর থেকে
আর কখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি।
পিতা! তুমি কি দেখছো?
তোমার খুনের দিনে আমরা সবাই একটু একটু করে অসুস্থ হয়ে পড়ি,
তোমার রক্তে ভেজা বাংলার ব্যান্ডেজটা
আজও খুলে দেখার সাহস হয়নি আমাদের।
আমি সেরে উঠবো,
এদেশটাও একদিন সেরে উঠবে—
যেদিন এই শোক শুধু কালো ব্যাজ হবে না,
হবে শপথ।
হাসপাতালে ভোরের আলো
আজও ভোর হলো না।
সকালকে তালা দিয়ে রাখা আছে কয়েদখানায়।
চাবিটা ঝুলছে একটা মিথ্যার গলায়।
আমি জানালায় কান পাতি—
বাইরে নদীর শব্দ নাই,
আছে শুধু জুতার শব্দ।
কে যেন আলো মেপে মেপে বিক্রি করছে জঙ্গলে।
দাম: একটা নিঃশ্বাস।
হে সূর্য,
তুমি কি আজও ডিউটিতে যাওনি?
নাকি তোমাকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে
“অযথা আলো ছড়ানোর” অপরাধে?
এই কয়েদখানায় দেয়ালের রং ধূসর না,
দেয়ালের রং হলো আমাদের স্থগিত রাখা স্বপ্ন।
আমি হাত দেই, রং উঠে আসে আঙুলে।
আঙুল দিয়ে দেয়ালে লিখি:
“এখানে একদিন ভোর ছিল।”
প্রহরী এসে বলে — “চুপ”
আমি বলি — “চুপ করলেই তো তোমরা জিতে যাও।”
সে হাসে। তার হাসিতে কোনো দাঁত নাই।
দাঁতগুলো সে বন্ধক রেখেছে অন্ধকারের কাছে।
আমার পাশের সেলে কে যেন কাঁদে না।
সে শুধু পানি খায়।
এক ঢোক, দুই ঢোক।
প্রতিটা ঢোকে সে একটা করে নদী গিলে ফেলে।
বলে— “পেটের ভিতর নদী রাখলে
কয়েদখানাও একদিন ডুবে যাবে।”
আমি পকেট হাতড়াই।
একটা পাপড়ি পাই।
কাল “স্বর্গের নদী” থেকে চুরি করে আনা।
পাপড়িটা জিভে রাখি।
স্বাদটা বৃষ্টির পরের মাটির মতো।
বুঝি, মাটি এখনো মরে নাই।
মাটি থাকলে বীজও থাকবে।
বীজ থাকলে ভোরও আসবে।
হে প্রহরী, শোনো—
তুমি দরজা বন্ধ করেছো ঠিকই,
কিন্তু সময়ের তালা ভাঙার চাবি
তোমার কাছে নাই।
ওটা আছে সেই শিশুর কাছে
যে আজও রাস্তায় ফুল কুড়ায়।
আজ ভোর হলো না।
কালও নাও হতে পারে।
কিন্তু আমি রাত জেগে বসে থাকবো।
কারণ কয়েদখানায় বসে থাকা মানুষটাই জানে—
ভোর মানে সূর্য ওঠা না,
ভোর মানে অন্ধকারের ভিতর
নিজের চোখ দুটোকে জ্বালিয়ে রাখা।
আর আমি জ্বালিয়ে রেখেছি।
দেখো, আমার তালুতে
এক ফোঁটা আলো এখনো নেভেনি।
হাসপাতালে শুয়ে লেখা কবিতার কষ্ট
সাদা চাদরে মোড়া একটা শরীর
ঘড়ির কাঁটা গোনে ড্রিপের ফোঁটা
জানালার বাইরে আকাশ আছে
কিন্তু আমার জন্য বরাদ্দ চার দেয়াল আর একটা নম্বর।
নার্স আসে, হাসে, চলে যায়
সময় আসে, বসে, চলে যায়
আমি শুয়ে থাকি
মোবাইলের আলোয় পুরনো মানুষদের ছবি দেখি।
এখানে কেউ কাঁদে না জোরে
শুধু মনিটরের বিপ বিপ শব্দে
মুক্তি মাপা হয়
একটা ভালো রিপোর্টের দূরত্বে।
বাইরে বৃষ্টি হলে বোঝা যায়
বন্দি শুধু শরীর না
অপেক্ষাও বন্দি
ভালো হওয়ার
শূন্যতার গুহা ও হরিণী জোছনা
তাকে খুঁজতে গিয়ে ঠিকানা হারিয়ে ফেলেছি;
ঠিকানার পর থেকে হারালাম ভাষা–
ভাষা থেকে হারালাম নিজের ছায়াটা।
শহর ফুরিয়ে গেলে পেলাম একটা জঙ্গলের দেখা
নিবিড় জঙ্গল;
এখানে সময় ডালপালা মেলে ঝুলে থাকে।
পাতায় পাতায় লেখা আছে
আমাদের ফেলে আসা দিনগুলো রাতগুলো ।
পা ফেললেই নড়েচড়ে ওঠে অতীতের পোকা।
পোকামাকড়ের আনাগোনা দেখতে দেখতে
আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলে গেল সময়ের মোম।
কোথাও দেখি না তাকে,শুধু পাচ্ছি
শুন্যতার ঘ্রাণ।
না জুঁই, না বৃষ্টি ।
পুরনো চিঠির ভাঁজে লেগে থাকা কালির গন্ধেই
দৃষ্টির সীমানা থেকে স্মৃতির কুয়াশা সরে গেল।
সামনে অনন্ত গুহা। গুহার ভিতর আলো নেই,
আছে শূন্যতার অদৃশ্য দেয়াল।
দেয়ালে দেয়ালে জমে আছে নিঃশ্বাসের নিষিদ্ধ লবণ।
মেঝে শুয়ে আছে বিস্মৃত ঘড়ির ছায়া:
কাঁটা নেই। শুধু টিকটিক শব্দের ফসিল।
গুহার স্থবির কেন্দ্রে একটা হরিণী;
কিন্তু হরিণী না।
সেই জোছনা দিয়ে বোনা একটা শরীর।
শিং এর ডগায় ঝুলছে গলে যাওয়া নক্ষত্র।
পিঠের উপর চাঁদ হাঁটছে নিঃশব্দে।
তার চোখে মুছে যাওয়া আমার নামের আদ্যাক্ষর।
তার পাশে বসে আছে সুন্দরী ভেনাস;
সে সমুদ্র থেকে নয়, উঠে আসে কাচ ভাঙা আয়নার টুকরা থেকে।
তার চুলে আটকে আছে রাতের পালক।
তার ঠোঁটে কোনো কথা নেই;
আছে শুধু মৌ মৌ গল্পের সুগন্ধি ধোঁয়া।
তারা দু’জনেই মুখোমুখি বসে আমার না-পাওয়া গল্প নিয়ে আলাপ করছে।
আমার হাসি টেবিলের উপর কাচের বয়ামে রাখা।
আমার প্রতিশ্রুতি দলা পাকানো কাগজ হয়ে মেঝেতে।
আমি ডাকলাম।
শব্দ গুহার দেয়ালে লেগে পাথর হয়ে গেল।
হরিণী জোছনা ঘাড় ঘোরালো।
তার নিঃশ্বাসে বাতাসের রং বদলালো।
সে বললো না কিছু।
শুধু বুঝিয়ে দিলো:
কিছু মানুষকে খুঁজে পেলে গল্প ফুরিয়ে যায়।
কিছু মানুষকে হারালেই তারা মিথ হয়ে বাঁচে।
আমি জঙ্গল থেকে বের হলাম না।
বসে রইলাম গুহার মুখে।
আর শুনতে থাকলাম
শূন্যতার ভিতর দুই নারীর ফিসফাস
আর বাতাসে উড়ে আসা
আমার হারিয়ে যাওয়ার সুসংবাদ।
বৃষ্টি ও বালিকা
আজ শ্রাবণের শুরু।
আকাশটা নিচে নেমে এসে ছাদে টোকা দিচ্ছে।
বৃষ্টি বলছে, “ওঠো। আমি তোমার জামার বোতাম খুলে দেবো।
তোমার বুকের ধুলো ধুয়ে দেবো।”
আর একটা বালিকা
ভিজে যাওয়া ওড়না দিয়ে জানালায় ছবি আঁকছে।
তার আঙুলের ডগায় জমে থাকা পানি
আমার নামের অক্ষর হয়ে গড়িয়ে পড়ছে।
সে বলছে, “ওঠো। আমি তোমাকে ভাসিয়ে নেবো।
রাস্তা নেই। নদী হয়ে গেছি আমরা দুজন।”
আমি জানি।
আমি টের পাই।
ছাদের টিনে বৃষ্টির পায়ের শব্দ।
জানালার কাচে বালিকার নিঃশ্বাসের কুয়াশা।
কিন্তু আমি ক্লান্ত।
এতদিন খুঁজতে খুঁজতে
জঙ্গল, গুহা, গুদাম ঘুরে
শরীরে আর জাগার মতো হাড় নেই।
তাই চোখ বন্ধ করেই বলি,
“তোমরা ভাসাও।
আমি ভাসতে ভাসতেই ঘুমাবো।
তোমাদের স্রোতে আমার স্বপ্ন নৌকা হয়ে থাক।”
বৃষ্টি আমার চুলে হাত বুলায়।
বালিকা আমার কপালে ঠোঁট ছোঁয়ায়।
আমি ঘুমের ভিতর হাসি।
কারণ প্রেমও কখনো কখনো
ঘুমন্ত মানুষকেই বেশি যত্ন করে।
আর বিরহ?
সে জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে।
ভিজতে ভিজতে।
আর ভাবে,
“আজ শ্রাবণের প্রথম দিন।
ও জাগলো না।
কিন্তু ওকে না জাগিয়েই
আমরা দুজন ওকে ভালোবাসলাম।”
প্রতিবিম্ব অন্ধকার
চারিদিকে মিথ্যা আর মিথ্যা,
জমতে জমতে তৈরি হচ্ছে মিথ্যার পাহাড়;
সে-পাহাড়ে জন্ম নিচ্ছে নরকের কীট।
এসব কীটের প্রজননে পাহাড়ের পাদদেশে
শিয়াল শকুন বসে বসে শলাপরামর্শ করে
কী করে পাহাড় কেটে তৈরি করা যায় নরকের সিঁড়ি।
সিঁড়ি বাইতে বাইতে একসময় সিঁড়িই ফুরিয়ে যায়, পাহাড় ফুরায় না।
মিথ্যাগুলো উড়ে উড়ে বারবার ঘুরে আসে প্রতিদ্বন্দ্বী সত্যের চূড়ায়।
উপাসনালয় জুড়ে নেমে আসে হিংস্র অন্ধকার;
এই অন্ধকারে ডুব দিয়ে ঘুমিয়ে রয়েছে সূর্য,
ঘুমম্ত সূর্যের গায়ে থাকে রাতের স্বপ্নের ছাই,
যে দেশে মানুষ অন্ধ সেই দেশে যদি সূর্য ওঠে
এমন কী আর আনন্দের ধ্বনি উঠবে অন্ধকারে!
পাড়ায় বা মহল্লায় মৃতের কবরে মোমবাতি
না জ্বালিয়ে ওরা কারা গুজবের আগুন জ্বালায়?
আমি কবি; এক মৃত সমুদ্রের স্বপ্ন দেখতে দেখতে
অতি লোভে তাঁতি হয়ে বসে আছি মিথ্যার পাহাড়ে;
সেই পাহাড়ের গা বেয়ে নামছে না জল, নামছে সময়,
নামছে না-বলা নামের কাফন,
এ পাহাড় থেকে আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে সত্যের মন্দিরে
এমন নির্মল পুরোহিত অগ্নিপাড়ি দিতে গিয়ে ডুবে মরে যমুনার জলে,
কিন্তু যমুনা ডোবে না, যমুনা ফিরে আসে,
সে পুরোহিতের জামার ভিজে অংশ নিংড়ে নিংড়ে
এক ফোঁটা এক ফোঁটা করে গড়ে তোলে স্বর্গের নদী,
আর সেই নদীর জলে ধুয়ে যায় মিথ্যার পাহাড়,
ধুয়ে যায় কীট, শিয়াল, শকুন, নরকের সিঁড়ি,
ধুয়ে গিয়ে পাহাড়ের জায়গায় পড়ে থাকে শুধু একটা আয়না,
আর আয়নায় আমি দেখি —
অন্ধ দেশের সূর্যটা আসলে ঘুমায়নি,
সে চোখ বুজে প্রার্থনা করছিল,
আর প্রার্থনা শেষ হতেই
গোরস্থান থেকে প্রথম উঠে আসে আলোর ধ্বনি।
“স্বর্গের নদীর ভিতরে”
পরাবাস্তব কবিতা – খসড়া ২
যমুনা নিংড়ে নিংড়ে যে নদী গড়লো,
সে নদীর নাম কেউ রাখেনি,
তাই নদী নিজেই নিজের নাম হয়ে বইতে লাগলো,
আর নদীর জলে ভেসে এলো সেই নির্মল পুরোহিত,
সে ডোবেনি, সে শুধু অগ্নিপাড়ি দিতে গিয়ে
নিজের গায়ের সব আগুন ধুয়ে ফেলেছিল,
এখন তার গায়ে জল, আর জলের গায়ে আলো,
আর আলোর গায়ে অসংখ্য ঠোঁট —
যারা যুগের পর যুগ মিথ্যা উচ্চারণ করে ক্লান্ত।
নদীর দুই পাড়ে মন্দির না,
নদীর দুই পাড়েই মন্দির,
কারণ এখানে পাথর নেই, আছে শ্বাস,
ইট নেই, আছে চোখের পানি দিয়ে গড়া দেয়াল,
আর দেয়ালের গায়ে লেখা নেই,
আছে কেবল ফিসফিস —
“এখানে যে আসে সে-ই পুরোহিত,
এখানে যে কাঁদে সে-ই প্রার্থনা।”
আমি কবি, মৃত সমুদ্রের স্বপ্ন ফেলে
এই নদীতে পা ডোবালাম,
পা ডোবাতেই দেখি নদীর তলায়
শুয়ে আছে সেই মিথ্যার পাহাড়ের হাড়,
আর হাড়ের ফাঁকে ফাঁকে গজিয়েছে
নীলপদ্ম, যার পাপড়িতে পাপড়িতে
লেখা আছে একেকটা সত্যের প্রথম বর্ণ,
আমি একটা পাপড়ি তুলে জিভে রাখলাম,
তেতো না, মিষ্টি না,
স্বাদটা হলো বৃষ্টির পরের মাটির মতো।
আকাশ থেকে তখন নেমে আসছিল
প্রতিদ্বন্দ্বী গীর্জার চূড়ায় আটকে থাকা মিথ্যাগুলো,
কিন্তু নদী ছুঁতেই তারা গলে গিয়ে
হয়ে গেল মাছ, আর মাছগুলো
সাঁতার কেটে কেটে লিখছিল জলের উপর
একটা নতুন উপাসনার বই,
যার প্রথম লাইন—
“সূর্য ওঠেনি, সূর্যকে তোলা হয়েছে।”
গোরস্থান থেকে ধ্বনি উঠলো বটে,
কিন্তু সে ধ্বনি কান্নার না,
সে ধ্বনি হলো পায়ের নূপুরের,
মৃতরা উঠে এসে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে
নদীকে বললো—
“আমাদের গল্পগুলো একটু ধুয়ে দে,
আমরা আবার মানুষ হয়ে ফিরবো।”
আর নদী?
নদী কিছু বললো না,
শুধু বইতে লাগলো,
কারণ স্বর্গের একটাই কাজ—
বওয়া।
বইতে বইতে সব ময়লা
সমুদ্রে না,
সোজা আলোয় ফেলা।





Leave a Reply