দিলু নাসের

পূর্ব লন্ডনের একটি প্রাচীন বৃক্ষঘেরা জায়গায় আমি আর কবি বন্ধু মাশুক ইবনে আনিস প্রায় প্রতিদিনই কিছু সময় কাটাই। জায়গাটিকে ঠিক পার্ক বলা যায় না। এখানে রয়েছে বেশ কিছু পুরোনো সমাধি, আর তাদের চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য বিশালাকৃতির প্রাচীন বৃক্ষ। কাছেই আরও সুন্দর, পরিচ্ছন্ন, আলোয় ঝলমলে কয়েকটি পার্ক আছে। কিন্তু কেন যেন এই জায়গাটিই আমাদের বেশি টানে। কারণ, এখানে বসলে মনে হয়, আমরা একই সঙ্গে জীবন এবং মৃত্যুর সুবাস পাচ্ছি।
মৃত মানুষের নীরব সমাধি, আর তার পাশেই শতবর্ষী বৃক্ষের প্রাণময় সবুজ, দুটি বিপরীত জগত যেন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। ঋতু বদলায়, পাতা ঝরে, নতুন পাতা আসে, পাখি আসে, আবার উড়ে যায়। শুধু পুরোনো গাছগুলো দাঁড়িয়ে থাকে। তারা যেন সময়ের নীরব সাক্ষী।

সেদিনও আমরা বসেছিলাম একটি বিশাল মেপল গাছের নিচে। গাছটির কাণ্ড এতটাই মোটা যে, আমরা দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সেটিকে জড়িয়ে ধরলেও অর্ধেকের বেশি ঘেরাও করতে পারব না। গাছের বাকলজুড়ে বয়সের অসংখ্য চিহ্ন,ফাটল, ক্ষত, গিঁট। মনে হয়, গাছটি তার শরীরের ওপর বহু বছরের ইতিহাস লিখে রেখেছে।
শুকনো পাতার ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে যাচ্ছিল। পাতাগুলো মৃদু শব্দে কাঁপছিল। শোনা যাচ্ছিল পাখিদের কিচিরমিচির।
আমরা কিছুক্ষণ চুপ করে গাছটির দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
হটাৎ আমার মনে পড়ে গেল কবি শামসুর রাহমানের সেই পঙ্‌ক্তিগুলো-
“বৃক্ষের নিকটে গিয়ে বলি; দয়াবান বৃক্ষ তুমি একটি কবিতা দিতে পারো?
বৃক্ষ বলে- আমার বাকল ফুঁড়ে আমার মজ্জায় যদি মিশে যেতে পারো…”
আমি বললাম, কবিতা বুঝতে হলে তাহলে বাকল পেরিয়ে মজ্জায় পৌঁছাতে হবে?
কবিতার এই কয়েকটি লাইন যেন সেই মুহূর্তে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গাছটির সঙ্গেই কথা বলতে শুরু করল।

বৃক্ষের বাকল ভেদ করে তার মজ্জায় পৌঁছানো, এ কি শুধু বৃক্ষকে বোঝার কথা? নাকি কবিতাকেও বুঝতে হলে তার বাইরের শব্দের আবরণ ভেদ করে তার গভীরতম অনুভূতির কাছে পৌঁছাতে হয়?
মাশুক বলল-শুধু গাছের নয়, মানুষেরও।
কথাটা সেদিন আমাদের নিয়ে গেল অনেক দূরে, কবিতার শুরুতে, কবিতার ইতিহাসে, কবিতার ছন্দে, তার বিবর্তনে, এমনকি কবিতা আসলে কী? এই চিরন্তন প্রশ্নে।
মাশুক হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
-আচ্ছা, কবিতা আসলে কী?
আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম,
-তুমি কবি হয়ে আমাকে এই প্রশ্ন করছ?
সে হেসে বলল, -কবি বলেই তো করছি। কবিতা লিখি বলে কবিতা কী, সেটা জানি, এমন অহংকার আমার নেই।
আমি বললাম,
-তাহলে আমারও একটা প্রশ্ন আছে। কবিতা কি শুধু ছন্দ, মিল আর সুন্দর শব্দের সমষ্টি?
মাশুক মাথা নাড়ল। -না। কবিতা হয়তো এমনভাবে দেখা, যেভাবে অন্যরা দেখে না। একই চাঁদ সবাই দেখে, কিন্তু কবি চাঁদের আলোয় নিজের ভেতরের কোনো অন্ধকার দেখতে পারে। একই বৃষ্টি সবাই দেখে, কিন্তু কবি সেই বৃষ্টির শব্দে কোনো হারিয়ে যাওয়া মানুষের পদধ্বনি শুনতে পারে।
আমি বললাম,- তাহলে কবিতা শুধু শব্দে নয়, দৃষ্টিতেও?
মাশুক বললো – দৃষ্টিতে, অনুভবে, স্মৃতিতে, কল্পনায়,এমনকি নীরবতার মধ্যেও।
আমরা দুজনই দীর্ঘ দিন ধরে কবিতা লেখার চেষ্টা করি। তবে আমাদের কবিতার পথ এক নয়। আমি বেশির ভাগ সময় ছন্দ, মাত্রা, মিল ও সুরের ভেতর দিয়ে কবিতা লিখতে ভালোবাসি। আর মাশুক আধুনিক গদ্যকবিতা লেখে। তার কবিতায় প্রচলিত ছন্দ বা অন্ত্যমিল না থাকলেও বাক্যের গতি, বিরতি, শব্দের পুনরাবৃত্তি এবং নীরবতার মধ্যে এক ধরনের নিজস্ব ছন্দ থাকে।
আমি মাঝে মাঝে তাকে বলি,- তোর কবিতায় ছন্দ কোথায়?
সে বলে,- তোর কবিতায় ছন্দ আছে, আমার কবিতায় ছন্দ হাঁটে।
আমি হেসে বলি,-এই কথাটাই একটা কবিতা!
শেষ পর্যন্ত আমরা দুজনেই বুঝি,পথ আলাদা হতে পারে, কিন্তু কবিতার গন্তব্য হয়তো একই জায়গায়। মানুষের অনুভূতির গভীরে।
আমি তাকে বলি-কবিতা কি লেখার আগেই ছিল?
মাশুক বলল,-আমার মনে হয়, কবিতা মানুষ লেখার আগেই পৃথিবীতে ছিল।
আমি বললাম,-কীভাবে?
সে বললো-মানুষ যখন প্রথম আনন্দে চিৎকার করেছিল, প্রথম প্রিয়জনকে হারিয়ে কেঁদেছিল, প্রথম প্রেমে পড়েছিল, প্রথম আকাশের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হয়েছিল-সেই মুহূর্তগুলোতেই তো কবিতার জন্ম। লিখিত ভাষা আসার অনেক আগেই মানুষ গান গাইত। শোকের সময় বিলাপ করত, শিকারে যাওয়ার আগে দলবদ্ধ সুর তুলত, উৎসবে গান গাইত। প্রকৃতির শব্দ, হৃদস্পন্দন, হাঁটার ছন্দ-সবকিছুই মানুষের ভাষার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল।

আমি বলি-তাহলে পৃথিবীর প্রথম কবি কে?
-আমরা জানি না।মাশুক মৃদু হেসে বলল,
-বেচারা! পৃথিবীর প্রথম কবিতা লিখেও কোনো ক্রেডিট পেল না।
আমি বললাম,-হয়তো সে কবিতার জন্য নাম চায়ওনি।
হয়তো কবিতা তখনও ছিল আত্মপ্রকাশের সবচেয়ে স্বাভাবিক উপায়,নাম, খ্যাতি কিংবা প্রকাশনার জন্য নয়, শুধু নিজের ভেতরের কথাটুকু বাইরে আনার জন্য।
তার পর লেখার আবিষ্কারের সঙ্গে কবিতা পেল স্থায়ী শরীর। মেসোপটেমিয়ার মাটির ফলকে মানুষের প্রাচীন সাহিত্য ও কাব্যের নিদর্শন পাওয়া যায়। গিলগামেশের মহাকাব্য পৃথিবীর প্রাচীনতম সংরক্ষিত সাহিত্যকর্মগুলোর অন্যতম।
প্রাচীন মিশরের ধর্মীয় স্তোত্র, গ্রিক মহাকাব্য, হোমারের ইলিয়াড ও অডিসি, ভারতীয় উপমহাদেশের বেদীয় স্তোত্র, রামায়ণ ও মহাভারত-সবখানেই মানুষ তার অভিজ্ঞতা, বিশ্বাস, যুদ্ধ, প্রেম, নৈতিকতা এবং অস্তিত্বের প্রশ্নকে ভাষায় ধরে রাখতে চেয়েছে। অর্থাৎ কবিতা শুধু সৌন্দর্যের জন্য জন্ম নেয়নি। মানুষের জীবনকে সংরক্ষণ করার প্রয়োজন থেকেও কবিতার জন্ম। ইতিহাসের অনেক ঘটনা গদ্যে লেখা হওয়ার আগেই মানুষের মুখে মুখে ছন্দে, গানে ও কবিতায় বেঁচে ছিল।

ধর্মীয় বাণী, স্তোত্র, প্রার্থনা ও আবৃত্তির মধ্যে পুনরাবৃত্তি, ধ্বনির সৌন্দর্য, বাক্যের ভারসাম্য এবং উচ্চারণের বিশেষ গতি মানুষের মনে গভীর প্রভাব সৃষ্টি করে।
প্রাচীন পৃথিবীর নানা ধর্মীয় ঐতিহ্যেও আমরা দেখি-মানুষ বিশ্বাসের কথা ছন্দে, সুরে ও পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে মনে রাখত এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দিত।
হয়তো এর পেছনেও মানুষের মনের একটি সহজাত প্রবণতা কাজ করে,ছন্দ মনে থাকে।
ছন্দ কেন মানুষকে দোলা দেয়? আমি মাশুককে বললাম,-আমরা ছন্দে এত আকৃষ্ট হই কেন?
সে বলল,-কারণ মানুষ নিজেই একটা ছন্দের প্রাণী।
হৃদস্পন্দন আছে, শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি আছে, হাঁটার তাল আছে। দিন আসে, রাত আসে। জোয়ার আসে, ভাটা যায়। ঋতু ঘুরে ফিরে আসে।
এমনকি এই গাছটির পাতার শব্দেও ছন্দ আছে।
আমরা দুজন কিছুক্ষণ চুপ করে শুকনো পাতার শব্দ শুনলাম।
মাশুক বলল,-শোনো, বাতাসও কবিতা লিখছে।
আমি বল্লাম সে কোন ছন্দে লিখছে?
মাশুক বললো-যে ছন্দ আমরা এখনও আবিষ্কার করতে পারিনি।
ছন্দ শুধু কবিতার অলংকার নয়। ছন্দ মানুষের শরীর ও স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাই ছন্দোবদ্ধ কবিতা সহজে মুখস্থ হয়, গান হয়ে মানুষের মুখে মুখে ফেরে, প্রজন্ম পেরিয়ে টিকে থাকে।
কিন্তু কবিতার ইতিহাস এক জায়গায় থেমে থাকেনি।

সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবন বদলেছে, বদলেছে তার ভাষাও। কবিতাও সেই পরিবর্তনের বাইরে থাকেনি।
একসময় নির্দিষ্ট মাত্রা, অক্ষর, পয়ার, ত্রিপদী, অন্ত্যমিল-এসব ছিল কবিতার শক্ত কাঠামো। কিন্তু আধুনিক কবিরা অনুভব করলেন, মানুষের নতুন অভিজ্ঞতাকে সবসময় পুরোনো কাঠামোর মধ্যে বন্দী করা যায় না।
সেখান থেকেই মুক্তছন্দের বিস্তার।
মুক্তছন্দ মানে ছন্দহীনতা নয়। বরং নির্দিষ্ট ছন্দের বাঁধন থেকে মুক্তি। সেখানে বাক্যের গতি, শব্দের পুনরাবৃত্তি, বিরতি, উচ্চারণ, নীরবতা, পঙ্‌ক্তির দৈর্ঘ্য-সব মিলিয়ে তৈরি হয় অন্যরকম একটি অন্তর্লয়।
আমি মাশুককে বললাম,-তাহলে তোমার গদ্যকবিতাতেও ছন্দ আছে?
সে বলল,-অবশ্যই। শুধু তোমার ছন্দটা বাইরে থেকে শোনা যায়, আমারটা ভেতর থেকে।
আমি বললাম,-এটা কবিতার যুক্তি, নাকি নিজের কবিতাকে বাঁচানোর চেষ্টা?
সে হেসে বলল,-দুটোই!
আমরাও হেসে উঠলাম।

বিকেলের আলো ক্রমশ নরম হয়ে আসছিল। বিশাল মেপল গাছটির পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের শেষ আলো মাটিতে ছায়া-আলোর নকশা আঁকছিল। পাশে পুরোনো সমাধিগুলো নিঃশব্দে পড়ে আছে, আর মাথার ওপর গাছের পাতাগুলো বাতাসে মৃদু শব্দে কেঁপে উঠছে। জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে বসে আমাদের মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন নিজেই কোনো এক অনন্ত কবিতা লিখে চলেছে।
কিন্তু কবিতার সৌন্দর্য আসলে কোথায়?
শুধু সুন্দর শব্দে? ছন্দে? উপমা-রূপকে? নাকি এমন কোনো অনুভূতিতে, যা একটি কবিতা পড়ার পর অনেকক্ষণ আমাদের ভেতরে থেকে যায়?
আমি এসব ভাবছিলাম। মাশুকও যেন একই চিন্তার ভেতর ছিল। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর সে হঠাৎ আমার দিকে তাকাকিয়ে বললো-
তুমি বেশির ভাগ কবিতা ছন্দে লিখলেও আমি জানি, জীবনে তুমি অসংখ্য গদ্যকবিতা পড়েছ। আধুনিক কবিতা সম্পর্কেও তোমার যথেষ্ট পড়াশোনা আছে। তাছাড়া তুমি একজন স্বনামধন্য আবৃত্তিকার, তোমার কণ্ঠে বাংলা সাহিত্যের অনেক বিখ্যাত কবিতা প্রাণ পেয়েছে। তাই তোমাকেই জিজ্ঞেস করি- কবিতায় নন্দনতত্ত্ব বলতে তুমি কী বোঝ?
আমি একটু হেসে বললাম,
-প্রশ্নটা কঠিন। তবে আমার কাছে নন্দনতত্ত্ব মানে শুধু সুন্দর শব্দ বা সুন্দর দৃশ্য নয়। কবিতার সৌন্দর্য তৈরি হয় শব্দ, ছন্দ, চিত্রকল্প, কল্পনা আর অনুভূতির এক গভীর সমন্বয়ে।
মাশুক বলল,
-তাহলে সৌন্দর্য কি সবসময় সুন্দর বা আনন্দের হতে হবে?
আমি বললাম,
-না। কবিতার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হয়তো এখানেই। বিষাদ, বিরহ, একাকিত্ব, ক্ষয়, এমনকি মৃত্যুর মধ্যেও কবি এক ধরনের গভীর সৌন্দর্য আবিষ্কার করতে পারেন। একটি বৃষ্টি তখন শুধু বৃষ্টি থাকে না, হয়ে উঠতে পারে স্মৃতি, অপেক্ষা কিংবা হারিয়ে যাওয়া কারও প্রতীক।
মাশুক ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বললো
-অর্থাৎ কবিতার সৌন্দর্য শুধু চোখে দেখা যায় না?
আমি বললাম – না। অনেক সময় তা হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়। শব্দের মধ্যে যেমন সৌন্দর্য থাকে, তেমনি শব্দের ফাঁকের নীরবতার মধ্যেও থাকে। ছন্দে যেমন থাকে, ছন্দ ভাঙার মধ্যেও থাকে। আলোতে যেমন থাকে, অন্ধকারেও থাকে।
মাশুক এবার সামনে থাকা পুরোনো সমাধিগুলোর দিকে তাকিয়ে বললো
-তাহলে মৃত্যুর মধ্যেও সৌন্দর্য থাকতে পারে?
আমি মৃদু হেসে বললাম,
-কবির চোখে জীবন আর মৃত্যু আলাদা নয়। মৃত্যু আমাদের জীবনের ক্ষণস্থায়িত্বকে আরও তীব্র করে তোলে। আর সেই অনুভূতি যখন কবিতায় রূপ নেয়, তখন বেদনার মধ্যেও জন্ম নেয় এক ধরনের নান্দনিক সত্য।
মাশুক এবার মাথার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মেপল গাছটির দিকে তাকিয়ে বলল,
-তাহলে এই গাছটাও একটা কবিতা?
আমি বললাম,
-হয়তো। তার সবুজ পাতায় যেমন কবিতা আছে, তেমনি তার ফেটে যাওয়া বাকল, পুরোনো ক্ষত আর শুকনো পাতাতেও আছে। শুধু আমাদের এখনও তার ভাষা শেখা হয়নি।
বাতাসে মেপল পাতাগুলো আবার নড়ে উঠল।
মনে হলো, গাছটি যেন আমাদের কথার মাঝখানে নিজের নীরব ভাষায় কিছু একটা বলে গেল।
আলাপ হলো আধুনিক কবিতা্ ও বদলে যাওয়া পৃথিবীর ভাষা নিয়ে।
শিল্পবিপ্লব, নগরায়ণ, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, বিশ্বযুদ্ধ, রাজনৈতিক পরিবর্তন,সবকিছু মানুষের জীবনকে পাল্টে দিল। গ্রাম থেকে মানুষ শহরে এল। যন্ত্র মানুষের জীবন সহজ করল, কিন্তু তার ভেতরের নিঃসঙ্গতা সবসময় কমাতে পারল না।আধুনিক কবিতায় তাই দেখা দিল একাকিত্ব, উদ্বেগ, বিচ্ছিন্নতা, অস্তিত্বের সংকট, যুদ্ধের ভয়, শহুরে জীবনের ক্লান্তি।
মাশুক বলল,-প্রযুক্তি মানুষকে বদলায়, কিন্তু মানুষের একাকিত্বকে শেষ করতে পারেনি।
আমি বললাম,-বরং কখনো কখনো একাকিত্বকে আরও দৃশ্যমান করেছে।
হাজার মানুষের মধ্যে থেকেও একজন মানুষ নিজের ভেতরে একা হয়ে যেতে পারে। আধুনিক কবিতা সেই একাকিত্বের ভাষা হয়ে উঠেছে।
উত্তর-আধুনিকতা এরপর কবিতাকে আরও একধাপ বদলাল।
উত্তর-আধুনিক কবিতা প্রচলিত সীমারেখাকে আরও প্রশ্ন করল। কবিতায় ঢুকে পড়ল বিজ্ঞাপন, সংবাদ, সিনেমা, রাজনীতি, জনপ্রিয় সংস্কৃতি, কথ্য ভাষা, ব্যঙ্গ, ভাঙা বাক্য, নানা ধরনের উদ্ধৃতি ও দৈনন্দিন জীবনের অতি সাধারণ উপাদান।
কবিতা আর শুধু “উচ্চ” বিষয় নিয়ে কথা বলবে-এমন ধারণাও ভেঙে গেল।
রাস্তার পোস্টার, টেলিভিশনের সংবাদ, মোবাইলের স্ক্রিন, বাজারের কথাবার্তা-সবকিছুই কবিতার উপাদান হতে পারে।
কারণ কবিতা শেষ পর্যন্ত জীবনের বাইরে কোনো আলাদা জগৎ নয়। কবিতা জীবনেরই আরেকটি ভাষা, এবং আজ কবিতা শুধু বইয়ের পাতায় নেই। কবিতা আছে ফেসবুকের পোস্টে, ব্লগে, অনলাইন পত্রিকায়, ইউটিউবের আবৃত্তিতে, মঞ্চে, এমনকি মানুষের মোবাইল ফোনের ছোট্ট স্ক্রিনেও।
একজন তরুণ হয়তো রাতের নিঃসঙ্গতায় চার লাইনের একটি কবিতা লিখে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে সেই কবিতা পৃথিবীর অন্য প্রান্তে থাকা কেউ পড়ছে। কবিতার ভৌগোলিক সীমানা যেন অনেকটাই ভেঙে গেছে।
মাশুক বলল,
-এখন তো সবাই কবি!
আমি হেসে বললাম,-তোর কথায় কিন্তু বেশ একটু বিদ্রূপ আছে!
সে বলল,-না, বিদ্রূপ নয়। আজ সবাই লিখতে পারে। কিন্তু সবাই কবি কি না-সেটাই তো প্রশ্ন।
কথাটা আমাকে জীবনানন্দ দাশের সেই বিখ্যাত উক্তিটির কথা মনে করিয়ে দিল-
“সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি।”
মাশুক বললো-কবিতা লেখার সুযোগ এখন সবার হাতে। কিন্তু কবি হয়ে ওঠা শুধু কিছু পঙ্‌ক্তি লিখে ফেলার বিষয় নয়। কবির প্রয়োজন আলাদা এক দৃষ্টি, কল্পনা, অনুভব, অভিজ্ঞতা এবং পৃথিবীকে অন্যভাবে দেখার ক্ষমতা।
একজন কবি সাধারণ দৃশ্যের মধ্যে অসাধারণ কিছু আবিষ্কার করেন। যে বৃষ্টিকে সবাই শুধু বৃষ্টি হিসেবে দেখে, কবি সেখানে হয়তো শৈশবের স্মৃতি দেখতে পান। যে সন্ধ্যাকে সবাই দিনের শেষ বলে মনে করে, কবি সেখানে দেখতে পান বিদায়ের রং। তাই আজকের পৃথিবীতে কবিতা লেখার মানুষ বেড়েছে,এটা আনন্দের। কিন্তু কবিতা হয়ে ওঠার রহস্য এখনও আগের মতোই দুর্লভ।
মাশুক গাছটির দিকে তাকিয়ে বলল,-হয়তো কবিতা লেখার চেয়ে কবিতাকে দেখতে পারাটাই কঠিন।
আমি বললাম,-আর কবি সেই মানুষ, যে দেখতে পাওয়ার পর চুপ করে থাকতে পারে না।
বললাম- আচ্ছা মানুষ কেন কবিতা লেখে?
মাশুক বলল-
এই প্রশ্নের কোনো একক উত্তর নেই। কেউ প্রেমে পড়ে কবিতা লেখে। কেউ বিচ্ছেদে। কেউ আনন্দে। কেউ শোকে। কেউ প্রতিবাদে। কেউ নিজের একাকিত্বকে ভাষা দিতে। কেউ পৃথিবীকে ভালোবেসে। কেউ পৃথিবীর অন্যায় দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে।কেউ হারানো মানুষকে ফিরে পেতে কবিতা লেখে। কেউ নিজের অস্তিত্বকে প্রমাণ করতে। আবার কেউ কোনো কারণ ছাড়াই কবিতা লেখে,শুধু তার ভেতরে কিছু শব্দ জন্ম নেয় বলে। হয়তো কবিতা লেখা মানে নিজের ভেতরের অতিরিক্ত অনুভূতিকে একটি শরীর দেওয়া। একটি অনুভূতি যখন এতটাই গভীর হয়ে ওঠে যে সাধারণ ভাষা তাকে ধারণ করতে পারে না, তখন কবিতার প্রয়োজন হয়।
আমি বললাম,-তাহলে কবিতা কি মানুষের অসম্পূর্ণতার ভাষা?
মাশুক বলল,-হয়তো। মানুষ যা পুরোপুরি বলতে পারে না, কবিতা কখনো কখনো সেটাই বলে।
এই জায়গাটিতে এসে হঠাৎ আমার খুব প্রিয় বন্ধু, প্রয়াত কবি দেলোয়ার হোসেন মঞ্জুর একটি কথা মনে পড়ে গেল। মঞ্জু প্রায়ই বলত-
“জীবিত থাকতে কবিতা লেখা হয় না, কবিতা লেখা হয় মৃত্যুর পরে।”
কথাটি শুনলে প্রথমে একটু ধাঁধার মতো মনে হয়।
জীবিত থাকতে কবি কবিতা লেখেন,এটাই তো স্বাভাবিক। তাহলে মৃত্যুর পরে কবিতা লেখা হয় কীভাবে? মঞ্জু আসলে হয়তো অন্য একটি গভীর সত্যের দিকে ইঙ্গিত করত।
একজন কবি জীবিত থাকতে কবিতা লেখেন ঠিকই। কিন্তু তার কবিতার প্রকৃত যাত্রা অনেক সময় শুরু হয় কবির মৃত্যুর পর। কবি চলে যান, কিন্তু তার শব্দ থেকে যায়। তার কণ্ঠ থেমে যায়, কিন্তু কবিতার কণ্ঠ থামে না।
জীবিত অবস্থায় কবি তার কবিতার পাশে থাকেন। মৃত্যুর পর কবিতাকে একাই পৃথিবীর পথে হাঁটতে হয়।
তখন কবিতা আর শুধু কবির থাকে না। পাঠকের হয়ে যায়, সময়ের হয়ে যায়, কখনো কখনো ইতিহাসেরও হয়ে যায়। আমি মাশুককে মঞ্জুর কথাটি বললাম। সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,-তাহলে কি কবি আসলে মৃত্যুর পরেই নিজের কবিতার প্রকৃত পাঠক খুঁজে পান?
আমি বললাম,-হয়তো। জীবিত অবস্থায় কবি কবিতাকে জন্ম দেন। মৃত্যুর পর কবিতাই কবিকে নতুন করে জন্ম দেয়।
মাশুক আর কিছু বলল না।
আমরাও কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইলাম।
আমাদের সামনে সেই বিশাল মেপল গাছটি দাঁড়িয়ে ছিল।
তার কাণ্ডের অসংখ্য ফাটল, পুরোনো ক্ষত, শ্যাওলা আর গিঁটের মধ্যে কত ঋতুর ইতিহাস জমে আছে! কত মানুষ এসেছে, বসেছে, কথা বলেছে, চলে গেছে। কত মৃত্যু সে দেখেছে। কত ভালোবাসা, কত বিচ্ছেদ, কত অপেক্ষা,তার ছায়ার নিচ দিয়ে চলে গেছে।
অথচ গাছটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে।নীরবে তার নিজের কবিতা লিখে চলেছে।
সন্ধ্যা তখন ধীরে ধীরে নেমে আসছে। পুরোনো সমাধিগুলোর ওপর ছায়া আরও গাঢ় হয়ে এসেছে। মেপল গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে শেষ আলোটুকু মাটিতে এসে পড়ছে।
আমরা দুজন এতোক্ষন কবিতা নিয়ে কথা বললাম,কবিতার জন্ম, ইতিহাস, ছন্দ, ধর্মীয় বাণীর ধ্বনি, মুক্তছন্দ, কবিতায় নান্দনিকতা, আধুনিকতা, উত্তর-আধুনিকতা, আজকের ডিজিটাল কবিতা, কবি হওয়ার অর্থ এবং মৃত্যুর পরে কবিতার জীবন নিয়ে।
অথচ কবিতাটা বোধহয় আমাদের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল।সেই বিশাল বৃক্ষের শরীরে।তার পুরোনো বাকলে।শুকনো পাতার মর্মর শব্দে।পুরোনো সমাধির স্তব্ধতায়,আর আমাদের দুজনের কথার মাঝখানে জমে থাকা সেই দীর্ঘ নীরবতায়।
হয়তো কবিতা আগে থেকেই পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকে। কবি শুধু তাকে খুঁজে নেয়। কেউ তাকে ছন্দে ধরে।কেউ গদ্যে।কেউ গানে।কেউ ছবিতে।কেউ শুধু একটি দীর্ঘশ্বাসে।আর কোনো কোনো কবিতা লেখা হয় কাগজে নয়,মানুষের স্মৃতিতে।
দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু হয়তো সেই কারণেই বলেছিল-
“জীবিত থাকতে কবিতা লেখা হয় না, কবিতা লেখা হয় মৃত্যুর পরে।”
কবি চলে যান।কবিতা থেকে যায়।
সময়ের সঙ্গে তার অর্থ বদলায়, পাঠ বদলায়, পাঠক বদলায়,কিন্তু কোনো সত্যিকারের কবিতা একদিন না একদিন আবার কারও হৃদয়ে গিয়ে আশ্রয় নেয়।
হয়তো সেই জন্যই কবিতার মৃত্যু নেই।
আমরা বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়ালাম।মাশুক গাছটির দিকে শেষবার তাকিয়ে বলল,
-গাছটা আজ আমাদের অনেক কিছু শিখিয়ে দিল।
আমি বললাম কী?
সে বলল,-বাকল পেরিয়ে মজ্জায় যেতে না পারলে কোনো কবিতাই পুরোপুরি লেখা হয় না।
আমি গাছটির দিকে তাকালাম।
মনে হলো, শামসুর রাহমানের সেই বৃক্ষও যেন নীরবে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
তার বিশাল শরীরের ভেতর দিয়ে শত বছরের রস ওপরে উঠছে। শিকড় মাটির গভীরে, আর ডালপালা আকাশের দিকে।

মানুষও কি এমন নয়?
একদিকে তার শিকড় স্মৃতিতে, অন্যদিকে তার আকাঙ্ক্ষা আকাশের দিকে।
আর মাঝখানে একটি হৃদয়। সেখানেই হয়তো কবিতার জন্ম।সেখানেই তার বসবাস।কারণ কবিতা শেষ পর্যন্ত শুধু শব্দের শিল্প নয়, কবিতা হলো মানুষের অন্তরের মজ্জায় পৌঁছানোর চেষ্টা।


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Trending

Discover more from শিকড়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading