মধুমিতা দত্ত
ক
আকাশজোড়া লালিমায় রঙিন হয়ে উঠেছে নিঃস্তব্ধ সন্ধ্যার সায়াহ্ন। ঢেউয়ের গর্জন মনে করিয়ে দেয়—সবকিছু আসে আর চলে যায়, কিন্তু সুর থেকে যায় চিরকাল। সমুদ্র সৈকতের বিস্তৃত বালুচরে দাঁড়িয়ে আছেন দু’জন প্রৌঢ়, প্রৌঢ়া-অরুণেশবাবু ও অরুণাদেবী।
দিগন্ত বিস্তৃত নীল জলরাশির বুকে ঢেউয়ের অগণিত নৃত্য-কত প্রাণবন্ত! অরুণাদেবী মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন সেইদিকে। নীল তরঙ্গগুলো যেন তাঁর মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা আনন্দ আর অশ্রুর প্রতিচ্ছবি। অরুণাদেবীর চোখে মৃদু বিস্ময়-এই সমুদ্রও কি তাঁর মতো অনেক না-বলা গল্প বুকে লুকিয়ে রেখেছে?
ডুবন্ত সূর্য আর সাগরের ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অরুণাদেবীর মন ফিরে যায় পঞ্চাশ বছর আগের ফেলে আসা দিনগুলোতে-যেখানে জীবনের আলো আর আঁধার মিশে হয়েছিল একাকার; যেখানে হারানোর বেদনা থাকলেও কোথাও এক অবিনশ্বর ভালোবাসার প্রতিধ্বনি যেন বয়ে চলেছে হৃদয়ের মর্মমূলে।
খ
অষ্টাদশী তরুণী অরুণা ছিল যেন এক অদৃশ্য আলো-কলেজ চত্বরে পা রাখলেই তার উপস্থিতি অনুভব করত সকলে। মেধা, সৌন্দর্য, আচরণ ও আত্মবিশ্বাসের মেলবন্ধনে সে ছিল সবার প্রিয় পাত্রী। অনেকেই অরুণার প্রতি এক নিঃশব্দ টান অনুভব করতো, কিন্তু তার হৃদয়ের দুয়ার খোলা ছিল কেবল একজনেরই জন্য-তার শৈশবসাথী, সৌগত। স্কুল জীবনের প্রথম দিন থেকেই পাশাপাশি বেড়ে ওঠা এই দুই তরুণ-তরুণীর বন্ধন ছিল নিঃশব্দ, কিন্তু গভীর। সৌগতের বাড়ি যদিও কিছুটা দূরে ছিল, তবু নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াত, পড়াশোনার সঙ্গ-সবকিছু মিলিয়ে তাদের সম্পর্কের ভিত গড়ে উঠেছিল।
শৈশবে মাকে হারানোর পর অরুণার একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছিলেন তার বাবা, নিখিলেশবাবু। সরকারি চাকরিজীবী নিখিলেশবাবু একাই মেয়েকে মানুষ করেছেন নিখুঁত যত্ন ও শাসনের সমন্বয়ে।বাবার স্বপ্ন ছিল-অরুণাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। অরুণার মনেও জেগে উঠেছিল একই দৃঢ় সংকল্প, এবং তার অদম্য একনিষ্ঠতা ক্রমাগত তাকে প্রতিটি ধাপে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। বাবা ও সৌগত – এই দুজনের বন্ধনই ছিল অরুণার জীবনের প্রাণশক্তি।
অন্যদিকে সৌগত ছিল সহজ-সরল স্বভাবের। পড়াশোনায় মধ্যম হলেও তার ভেতরে ছিল এক অনাড়ম্বর স্বচ্ছতা, যা তাকে আপন করে নিত সকলের কাছে। বাবার সরকারি চাকরি, মায়ের দক্ষ, স্নেহময় হাতে সংসার চালনা-সব মিলিয়ে তাদের পরিবার ছিল শান্ত অথচ দৃঢ়ভিত্তি সম্পন্ন।
অরুণা আর সৌগত-একজন প্রতিভায় উজ্জ্বল, অন্যজন সহজ-সাধারণ অথচ আন্তরিক। তবু তাদের জীবনের রেখা যেন শুরু থেকেই সমান্তরাল হয়ে এগিয়ে চলছিল।সৌগত সবসময় অরুণার ছায়াসঙ্গী হয়েই থাকতো।এক নিঃশব্দ ভালোবাসার বন্ধনে দুটি আত্মা জড়িয়ে পড়েছিল।
অরুণার সৌগতের বাড়িতে আসা যেন জীবনের স্বাভাবিক ছন্দের অংশ হয়ে গিয়েছিল। তার মা, নীলিমা দেবী, অরুণাকে খুব স্নেহ করতেন। অরুণার মাতৃহীন জীবনে নীলিমা দেবী যেন অদৃশ্যভাবে মায়ের আসনটুকু পূর্ণ করে তুলেছিলেন ।
অরুণা যখনই সৌগতের বাড়িতে যেত, নীলিমাদেবীর চোখে মুখে ফুটে উঠতো এক উজ্জ্বল আনন্দ। “আরে, অরুণা এসেছো?”-সেই ডাকের ভেতর ছিলো আপনজনের টান। যদিও অরুণা ও সৌগত মুখে কিছুই বলেনি, কিন্তু নিজের ছেলের সঙ্গে অরুণার মনের যে গোপন বাঁধন তৈরি হয়েছে, নীলিমাদেবী অন্তর থেকেই সেটা অনুভব করেছিলেন। অরুণার ভেতরের দৃঢ়তা, আলো ও আত্মবিশ্বাস দেখে তিনি মুগ্ধ হয়ে যেতেন।মনে মনে ভাবতেন-“এই মেয়েটিই যদি একদিন আমার সংসারের আলো হয়, তবে খুব সুন্দরভাবে ভরে উঠবে আমাদের পরিবার।“ সেজন্য নীলিমাদেবীর আচরণে ছিলো এক প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়, নিঃশব্দে মেনে নেওয়া এক সম্ভাবনাময় সম্পর্ক। অরুণা টের পেত সেই টান, আর অদ্ভুত এক প্রশান্তি নেমে আসতো তার অন্তরে। মনে হতো, পৃথিবীর কোলাহল থেকে দূরে, এখানে আছে এক নিশ্চিন্ত আশ্রয়, যেখানে তাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় নিঃশর্তভাবে।
অরুণার বাবা নিখিলেশবাবু ছিলেন নীরব অথচ সূক্ষ্ম দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষ। মেয়ের সুখ-দুঃখ, স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা সবকিছুই ছিল তাঁর জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। তাই মেয়ের মনের আঙিনায় কার ছাপ পড়েছে তা তিনি সহজেই আঁচ করতে পেরেছিলেন । একসময় এ নিয়ে মেয়েকে প্রশ্ন করেছিলেন , কিন্তু অরুণা মুখে কিছু না বললেও , তার চোখের গভীরে যে অব্যক্ত স্বীকারোক্তি লুকিয়ে ছিল—তা দেখেই সব প্রশ্নের উত্তর তিনি পেয়ে গিয়েছিলেন।সৌগতকে তিনি ছোটবেলা থেকেই চিনতেন। সাধারণ পরিবার হলেও তার ভেতরে ছিল একরকম সততা আর শুদ্ধতা, যা আজকাল সহজে চোখে পড়ে না। পরিবারটিও খুব ভালো।তাই যখন বুঝলেন, অরুণার হৃদয়ে সৌগতের জন্য বিশেষ স্থান তৈরি হয়েছে, তখন তাঁর অন্তর তৃপ্তিতে ভরে উঠল। মনে মনে ভাবলেন-“যদি এদের পথ এক হয়, তবে মেয়েটা সত্যিই সুখে থাকবে।”
দিনগুলো যেন রঙিন পাখির মতো ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছিল। দু’জনার বন্ধুত্ব, একসাথে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত-সবকিছুর মাঝেই লুকিয়ে ছিল এক অদৃশ্য সুরের মায়া। গ্র্যাজুয়েশনে অরুণা সাফ্যলের সঙ্গে উত্তীর্ণ হলো, আর সৌগতও পূর্বের থেকে অনেকটাই ভালো ফল করে উত্তীর্ণ হলো। পরবর্তীতে দুজনেই ভর্তি হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে, জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করার আশায়।
গ
কিন্তু মানুষের মন বড়োই বিচিত্র। তাই অরুণার অজান্তেই যে নির্মম কালো মেঘ তার জীবনে ঘনিয়ে আসছিলো তা সে টেরই পেলো না।বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ অরুণার সাফল্যকে সহজভাবে নিতে পারলো না। তাদের অন্তর্লীন ঈর্ষা ধীরে ধীরে রূপ নিলো কটু কটাক্ষে। ঠাট্টা-তামাশার ছলে বারবার সৌগতকে বলতে লাগলো-“হয়ে গেলো রে সৌগত! তোর বউ হবে অফিসার, আর তুই শুধু তার কেয়ারটেকার হয়েই থাকবি ।”
প্রথম প্রথম সৌগত হাসির ছলে এড়িয়ে গেলেও, ধীরে ধীরে সেই কথাগুলো কাঁটার মতো বিঁধতে শুরু করলো তার মনে। শুরু হলো মানসিক অন্তর্দ্বন্দ্বের টানাপোড়েন । ধীরে ধীরে তার মনে জন্ম নেয় হীনমন্যতা, সংশয় ও সামাজিক ভয়ের জটিল মিশ্রণ। অরুণার সাফল্য সৌগতের চোখে নিজের অক্ষমতার প্রতিচ্ছবি হয়ে ধরা দিলো। তাই ওর সামনে পড়লেই সৌগত যেন এক অজানা সংকোচে নিজেকে আড়াল করতে চাইত।বাহানার আড়ালে লুকিয়ে রাখত নিজের অস্থিরতা।
অরুণা প্রথমে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতো-যে ছেলেটি একদিন ছায়ার মতো তার পাশে ছিলো, আজ কেন তাকে এড়িয়ে চলে? তার হৃদয়ে জমতে লাগলো অভিমান, অজস্র প্রশ্ন। এই কি তবে সেই ভালোবাসা, যা এতদিন ধরে তার অন্তরে সযত্নে লালিত হচ্ছিলো?
দিনের পর দিন নীরবতার পর্দা ঘন হতে থাকলো। অরুণার হাসি ফিকে হয়ে এলো, আর সৌগতের চোখে জমলো যন্ত্রণা, অবিশ্বাস ও অক্ষমতার লজ্জা । তবুও কেউ কিছু বললো না-শব্দেরা যেন পথ হারালো তাদের দু’জনার মাঝেই।
কিন্তু সৌগতের বাড়িতে গেলে নীলিমাদেবীকে দেখে কিছু বুঝতে পারতো না অরুণা। তাই তার মনে নানা প্রশ্ন উঠতো,”কেন সৌগত তাকে এড়িয়ে চলে, কেনই বা এই অকারণ দূরত্ব? মা যদি এতখানি আপন করে নিতে পারেন, তবে সৌগতের চোখে আজকাল শুধু অনিশ্চয়তার মেঘ কেন?” অদ্ভুত এক নিঃসঙ্গতা ঘিরে ধরে অরুণাকে। বাবাকে বা নীলিমাদেবীকে সাহস করে কিছু বলতে পারে না, মনে হয়, বললেই হয়তো ভেঙে যাবে এই নির্মল পরিবেশ। নিজের ভেতরেই গোপন করে রাখে সমস্ত কষ্ট-একটা অদৃশ্য গহ্বরের মতো, যেখানে জমা হতে থাকে প্রশ্ন, অপূর্ণতা আর ব্যথা।
অবশেষে একদিন অরুণা সৌগতকে রাস্তায় পেয়ে পথ আটকে দাঁড়ালো। বললো,”আজ তোমাকে বলতেই হবে কেন আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছ?” সৌগত কিছুক্ষণ নীরবে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বিদ্রুপের হাসি দিয়ে বললো,”ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করা মেয়ে এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সাধারণ ছাত্রের সাথে কথা বললে লোকে মন্দ বলবে তো!” বলেই অরুণাকে পাস্ কাটিয়ে হনহন করে চলে গেলো । অরুণা বিস্মিত ও দুচোখ ভরা জল নিয়ে সৌগতের যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইলো ।
অরুণার জীবনের পরবর্তী দিনগুলো হঠাৎ যেন এক অদৃশ্য মোড়ে এসে থেমে গিয়েছিল। সেই দিন রাস্তায় সৌগতের কটুকথা, বিদ্রূপের হাসি-সবকিছুই ওর মনে এক গভীর ক্ষত তৈরী করে দিয়েছিলো। কিন্তু সে দুর্বল হয়নি। হৃদয়ের কষ্টটুকু চাপা দিয়ে আরও একাগ্র হয়ে মন দিয়েছে পড়াশোনায়। যদিও সৌগত যখন ঘরে থাকত না, মধ্যে মধ্যে সে তার বাড়িতে যেতো। নীলিমাদেবী অরুণার সাথে সেই স্নেহময় ব্যবহারই করতেন । তাঁর মিষ্টি হাসি, মমতায় ভরা ব্যবহার অরুণাকে ভুলিয়ে দিত জীবনের অনেক কষ্ট।তবে যখনই সৌগতের বাড়ি থেকে অরুণা বেরিয়ে আসত, আকাশের দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতর একটা হাহাকার জেগে উঠত-যেন কোথাও একটা অপূর্ণ স্বপ্ন আজও অদৃশ্য হয়ে বেঁচে আছে।
সময় এগিয়ে গেল। অরুণা মাস্টার্সের পড়াশোনা শেষ করল সাফল্যের সঙ্গে। তারপর নতুন এক পথ বেছে নিল-ব্যাঙ্কিং সার্ভিস। দীর্ঘ পরিশ্রম আর অবিচল নিষ্ঠা তাকে পৌঁছে দিল অফিসারের আসনে।
কিন্তু তখনও অরুণা সৌগতের জন্য এক অদৃশ্য টান অনুভব করত। যতই কঠোর হয়ে ওঠার চেষ্টা করুক, মনটা চুপিসারে সৌগতের খোঁজ রাখত। সে শুনেছিল-মাস্টার্সের পর সৌগত নাকি একটি নামী মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছে।অনেকদিন সৌগতদের বাড়িতেও যায় নি সে-অবশ্য কেউ খবরও করে নি | কেউ তাকে ডাকতে আসবে এই আকাঙ্খা মনের গোপন কোণে কেন যে লুকিয়ে ছিল তা সে জানে না |
এভাবেই কেটে যাচ্ছিল দিনগুলো। অফিসের ব্যস্ততা, ফাইলের স্তূপ, সহকর্মীদের ভিড়-সবকিছুর মাঝেই অরুণা নিজেকে ব্যস্ত রাখত, কিন্তু অন্তরের গভীরে প্রতি মুহূর্তে এক চাপা সুর বাজতেই থাকত।
একদিন বিকেলে, অফিস থেকে ফেরার পথে হঠাৎই সেই সুর যেন ছিন্ন হয়ে গেল। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল এক দৃশ্যে। প্রথমে যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না-জলভরা চোখের পর্দায় দৃষ্টি বারবার ঝাপসা হয়ে আসছিল।
সামনের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আছে সৌগত-তার ঠোঁটে অনাবিল হাসি। পাশে এক সুন্দরী তরুণী, যার হাত সৌগত শক্ত করে ধরে আছে। হাসতে হাসতে দু’জন এগিয়ে গেল কালো রঙের একটি এম্বাসাডার গাড়ির দিকে এবং তাতে উঠে বসলো। মুহূর্তের মধ্যে এক ঝলক হেডলাইট জ্বেলে গাড়িটা দূরে মিলিয়ে গেল শহরের কোলাহলে।
অরুণা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ফুটপাথের ধারে। বুকের ভেতরটা যেন কেউ হঠাৎ মুঠি করে চেপে ধরেছে। মনে হল, যতটুকু শক্ত করে নিজেকে গড়ে তুলেছিল, সব যেন ভেঙে পড়ল সেই এক মুহূর্তের দৃশ্যে। তবু কারও কাছে কিছু প্রকাশ করল না সে-চোখের কোণে ঝরে পড়া জলটুকু দ্রুত মুছে নিয়ে আবার নীরবে হাঁটা শুরু করল, যেন এই শহরের জনসমুদ্রেই তার অশ্রুর হাহাকার লুকিয়ে রাখতে চায়।
পরদিন অরুণা সেই অস্থিরতার ভার বহন করে অনেকদিন পর সৌগতের বাড়িতে গেলো। কিন্তু নির্মলাদেবী তাকে দেখে সেই পূর্বের মতো হাসিমুখে এগিয়ে এলেন না। শুধু বললেন, “বসো”। অরুণা কষ্ট ও বিস্ময় নিয়ে নীলিমাদেবীর দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে সব খুলে বলল তাঁকে-গ্র্যাজুয়েশনের পর থেকে সৌগতের আচরণ, তার নতুন সম্পর্ক; সমস্ত অপ্রকাশিত কষ্ট।
নির্মলাদেবী নির্লিপ্ত মুখে অরুণার কথা শুনে শান্ত স্বরে বললেন, “অরুণা, মেয়েটি বর্ণা-ওর বসের মেয়ে। ওদের বিয়ে হলে সৌগত আমেরিকায় প্রতিষ্ঠা পাবে। এমন সুযোগ এমনি এমনি তো কেউ দেয় না।” তারপর হালকা হেসে বললেন, “আমি একটু বেরুবো, কিছু কেনাকাটা আছে। পরে সময় করে এস, কেমন?”
নির্মলাদেবীর কথা শুনে অরুণা কোনো উত্তর দিতে পারল না।যে মহিলার কাছে সে পেয়েছিলো মাতৃস্নেহ, সেই মানুষটির মুখে আজ যেন অপরিচিত এক শীতলতা। বুকের ভেতর অব্যক্ত হাহাকার নিয়ে সে চুপচাপ বাইরে বেরিয়ে এলো। নীল আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে চোখের জল মুছে অরুণা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল-যতই কষ্ট আসুক, নিজের জীবন সে গড়বে নিজের যোগ্যতায়।
বাড়িতে ফিরে এসে অরুণা বাবার কাছে সব খুলে বলল- সৌগত ও তার মায়ের আচরণ, তার নতুন জীবন, সবকিছু। কথা শেষ করে সে দৃঢ় স্বরে বলল, “বাবা, আমাকে আরও প্রতিষ্ঠিত হতে হবে, তারপরই আমার যোগ্য সঙ্গী খুঁজে নেবো।” নিখিলেশবাবু অরুণার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “তাই হোক, মা। তোমার ওপর আমার বিশ্বাস আছে।”
ঘ
শুরু হলো অরুণার অধ্যাবসায়। দিনরাত এক করে, স্বপ্ন আর লক্ষ্যকে আঁকড়ে ধরে সে এগিয়ে চললো। ব্যর্থতার গাঢ় ছায়া, হতাশার ঝড়-সব অতিক্রম করে, অবশেষে সেই দিন এলো। ব্যাঙ্কের শীর্ষে, Chief ব্যাঙ্কের Managing Director (MD) হিসেবে নিযুক্ত হল অরুণা।
অফিস কক্ষের শীতল বাতাসে বসে যখন সে নিজের সাফল্যের চিহ্নগুলো অনুভব করছিল, তখন নিখিলেশবাবু তার কাছে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। চোখে আনন্দের জল, মুখে গর্বের হাসি-বললেন, “আমার মেয়ের সাফল্যে আমি আজ জয়ী। এতদিন তোকে বলিনি, আজ আমি তোকে পরিচয় করিয়ে দেব আমার নির্বাচিত এক প্রতিষ্ঠিত ছেলের সাথে। তোরা আগে কথা বল, তারপর আমি বিয়ের তারিখ ঠিক করবো।”
পরিচয় হলো বিদেশি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির চিফ ইঞ্জিনিয়ার অরুণেশ বসুর সাথে| অরুণার মনের অনেক দ্বিধা ও শঙ্কার মধ্যে দিয়ে চার হাত এক হলো ।
বিয়ের পারম্পরিক প্রথা অনুসারে অন্নবস্ত্রের দিন, অরুণেশ বসু অরুণার হাতে অন্নবস্ত্র তুলে দিলেন। চারপাশে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবাই হাসিমুখে বলে উঠল, “প্রথা অনুসারে বলো, আজ থেকে আমি তোমার সারাজীবনের ভাত-কাপড়ের দায়িত্ব নিলাম।”
অরুণেশবাবু মৃদু হেসে, অরুণার হাতে ভাত-কাপড়ের থালা তুলে দিয়ে ধীর ও দৃঢ় স্বরে বললেন, “অরুণা স্বাবলম্বী। নিজের ভাত-কাপড় নিজেই জোগাড় করতে পারবে, আমার দায়িত্ব নেওয়ার প্রয়োজন নেই। আমি শুধু সারাজীবন তাকে ভালো রাখার চেষ্টা করব, সুখে দুঃখে তার পাশে থাকার চেষ্টা করব। আজকের দিনে-এই হোক আমার প্রতিশ্রুতি।”
অরুণা ধীরে ধীরে চোখ তুলে, পূর্ণ বিশ্বাস ও আন্তরিকতায় জীবনসাথীর দিকে তাকালো।তার চোখে তখন শুধু ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের দীপ্তি-মনে হল, তার জীবনসঙ্গীর সাথে শুধু ভালোবাসার বন্ধন নয়, এক স্বতন্ত্র আত্মার সঙ্গে অন্য এক স্বতন্ত্র আত্মার মিলন ঘটেছে।
ঙ
সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে তটে, সূর্য ডুবে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। অরুণেশবাবু ও অরুণাদেবী পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন, বাতাসে তাদের চুল উড়ছে হালকা ভঙ্গিতে। বিবাহিত জীবনের দীর্ঘ যাত্রাপথে পারস্পরিক বিশ্বাস, ভালোবাসা ও প্রতিশ্রুতির বন্ধনে আবদ্ধ থেকে আজ তাঁরা তৃপ্ত ও শান্ত। আজ এই দিগন্ত বিস্তৃত অসীম নীল জলরাশির সান্নিধ্যে দাঁড়িয়ে আছে ভালোবাসায় পূর্ণ দুটি হৃদয়,যেখানে বয়সের হিসাব মলিনতায় হারিয়ে যায়, কিন্তু অনুভূতির পবিত্রতা চিরসবুজ ও অমলিন থাকে। সমুদ্রের গর্জন যেন ফিসফিস করে বলে যায় -“যা হারিয়েছো তুমি সবই তো ফিরে এসেছে অরুণা, ঢেউয়ের মতো… শুধু রূপ পাল্টে।”






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান