দিলু নাসের
পবিত্র বাইতুল্লাহ তাওয়াফ শুরু করেছিলাম মাগরিবের কিছু পরে। আমার সপ্তম তাওয়াফ শেষ করার সাথে সাথেই মাইকে ভেসে উঠলো এশার নামাজের আজান। আজানের ধ্বনি কানে আসতেই যেন মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল চারপাশের দৃশ্য, কিছুক্ষণ আগেও যেখানে অগণিত মানুষের ঢল, তাওয়াফের নিরন্তর ঘূর্ণন, আর পবিত্র কাবার স্পর্শ পাওয়ার আকুলতা,সেই স্থান হঠাৎই অন্যরকম ব্যস্ততায় ভরে উঠলো।
আজানের সাথে সাথেই শুরু হয়ে গেল নামাজের জন্য কে কোথায় দাঁড়াবে এ নিয়ে এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা। সবাই দ্রুত নিজেদের জায়গা করে নিতে চাইছে, কেউ সামনে একেবারে কাবার দরজায় যেতে চাইছে, কেউ কাতারে ঠিকভাবে দাঁড়াতে ব্যস্ত। কয়েক মুহূর্ত আগের তাওয়াফের স্রোত যেন হঠাৎই কাতারে পরিণত হলো।
তাওয়াফ বন্ধ করে সবাই নামাজের লাইনে দাঁড়িয়ে গেলেন। আমিও যেখানে ছিলাম, সেখানেই পাশের দু’জনের হাত ধরে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম, ভিড়ের জন্য সামনে দেখতে পারছিলাম না। মানুষের ভিড় আর ধাক্কাধাক্কির মধ্যে ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, প্রথমে বুঝতেই পারিনি। কিন্তু সবাই লাইনে দাঁড়ানো শেষ হতেই, ধীরে ধীরে পরিবেশ শান্ত হয়ে এলো, চারপাশ কিছুটা স্থির হলো। চোখ তুলে তাকাতেই দেখি-আমি কাবার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে, পবিত্র পাথর হজরে আসওয়াদের একেবারেই সামনে দাঁড়িয়ে আছি! আমার সামনে পবিত্র কালো পাথর!
এই পাথর কাবা শরিফের সেই কোণে স্থাপিত, যেখান থেকে তাওয়াফ শুরু এবং শেষ হয়।
হজরে আসওয়াদ আমার থেকে মাত্র দুই-তিন হাত দূরে। যে স্থানে পৌঁছানোর জন্য মানুষ অগণিত চেষ্টা করে, সেই স্থান এখন নির্জন, শান্ত,আর আমি তার ঠিক সামনে আছি, দেখে আমি বিস্মিত!
যতবার আমার সৌভাগ্য হয়েছে পবিত্র কাবা তাওয়াফ করার, ততবারই এখানে আসা হাজিদের মধ্যে এই পবিত্র পাথর ছোঁয়ার আকুলতা গভীরভাবে দেখেছি। মানুষের চোখে এক ধরনের ব্যাকুলতা শুধু একবার স্পর্শ করার, একবার চুম্বন করার অদম্য ইচ্ছে সবার। হজরে আসওয়াদের সামনে দাঁড়ানো একজন মুমিনের জন্য এটি শুধু একটি দৃশ্য নয়, বরং এক গভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা, মনে হয় যেন জান্নাতের সঙ্গে সরাসরি সংযোগের এক অনুভূতি।এটি মুসলমানদের ঈমান, ঐক্য, ইতিহাস ও আত্মিকতার প্রতীক।
আমার জীবনেও দুইবার সেই পাথরে চুম্বন করার সৌভাগ্য হয়েছে বহু বছর আগে,প্রথম ২০০৪ সালে এক দুপুরের রোদে, ভিড়ের ভেতর দিয়ে কষ্ট করে পৌঁছে আমি চুম্বন করতে পেরেছিলাম এই পাথরে। পরে ২০০৬ সালের রমজানে আবারও এক অদম্য তৃষ্ণায় চুম্বন করেছি এই কালো পাথর। তাই এখন আর চেষ্টা করি না-মনে হয়, আল্লাহ যেটুকু দান করেছেন, সেটুকুই তাঁর অসীম অনুগ্রহ।
ইসলামি বর্ণনা অনুযায়ী, হজরে আসওয়াদ জান্নাত থেকে পৃথিবীতে আগত একটি পবিত্র পাথর। হযরত ইবরাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাইল (আ.) যখন আল্লাহর ঘর নির্মাণ করছিলেন, তখন এই পাথরটিকে এই কোণেই স্থাপন করা হয়। বলা হয়ে থাকে, শুরুতে এটি ছিল দুধের মতো সাদা, কিন্তু মানুষের পাপের স্পর্শে ধীরে ধীরে কালো হয়ে যায়। প্রাক-ইসলামি যুগেও এই পাথর সম্মানিত ছিল, আর ৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে নবী মুহাম্মদ (সা.) নিজ হাতে এটি কাবার দেয়ালে পুনঃস্থাপন করেন,একটি বিরোধ মিটিয়ে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে।
ভাঙা ও প্রতিস্থাপন: বিভিন্ন ঘটনায়, যেমন আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.)-এর সময় বা কারমাতিয়ানদের আক্রমণের সময় পাথরটি কয়েক টুকরো হয়ে যায়। ৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে কারমাতিয়ানরা এটি চুরি করে নিয়ে যায় এবং দীর্ঘ প্রায় ২২-২৩ বছর পর এটি আবার কাবায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এর পর থেকে এভাবেই আছে।
আমি এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়েছিলাম, যেখান থেকে আমার চোখ বারবার চলে যাচ্ছিল সেই কালো পাথরের দিকে। এখন এখানে কোনো ভিড় নেই, কোনো ধাক্কাধাক্কি নেই,শুধু আমি আর সেই পাথর। জান্নাতের সেই পাথরকে এত কাছ থেকে দেখে আমার প্রাণ ভরে উঠলো এক অদ্ভুত আনন্দে।
পবিত্র কাবা ঘরের দরজার সামনে নামাজ পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে একাধিকবার -কিন্তু আজ, এই প্রথম, আমি নামাজ পড়তে যাচ্ছি হজরে আসওয়াদের সামনে দাঁড়িয়ে।চোখ ভিজে এলো অজান্তেই। হাত তুললাম ধীরে ধীরে, দূর থেকেই ইশারা করলাম। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে এলো। নামাজ শুরুর আগে লোকজন ব্যস্ত হয়েছে পড়েছেন হাতের মোবাইল নিয়ে, কেউ এই স্মরণীয় মুহূর্ত ভিডিও করছেন কেউ তুলছেন সেলফি। আমি ও লোভ সামলাতে পারলামনা ক্যামেরা জুম করে জান্নাতি পাথরের ছবি তুললাম। পাশে থাকা একজন হাজরে আসওয়াদের সাথে আমার ছবি তুলে দিলেন।
একসময় নামাজ শুরু হলো,
সেজদায় গিয়েও মনটা স্থির হচ্ছিল না। বারবার মনে হচ্ছিল, আমি যেন এক অলৌকিক উপস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে আছি। রুকু, সেজদা-প্রতিটি অবস্থায় হৃদয় কেঁপে উঠছিল অজানা এক আবেগে। নামাজের মধ্যেও চোখ ভিজে যাচ্ছিল।
সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করার সাথে সাথেই যেন আবার বদলে গেল দৃশ্য। মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়লো হজরে আসওয়াদের দিকে-পাথর চুম্বনের আশায়, স্পর্শ করার আকাঙ্ক্ষায়। মুহূর্তেই সেই নির্জনতা ভেঙে গেল, ফিরে এলো আগের সেই ব্যস্ততা, সেই আকুলতা।
আর আমি… আমি তখনও দাঁড়িয়ে ছিলাম সেখানে, স্থির হয়ে। মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তটা এখানেই থেমে থাকুক কিন্তু মানুষের স্রোত আমাকে মুহূর্তেই সরিয়ে দিলো। আমিও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা না করে মোকামে ইব্রাহিমের সামনে দু’রাকাত নামাজ পড়ে সাফা – মারওয়ার দিকে পা বাড়ালাম।
হয়তো জীবনের অনেক কিছুই ভুলে যাবো, কিন্তু এই রাত, এই অবস্থান, এই অনুভূতি-হজরে আসওয়াদের সামনে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার এই মুহূর্ত,আমার হৃদয়ে চিরদিন জীবন্ত হয়ে থাকবে।
দিলু নাসের এর ঈদের কবিতা
রোজার শেষে নীল আকাশে
উঠলো ঈদের চাঁন
আনন্দ উচ্ছ্বাসে হাসে
মুমিন মুসলমান।
মাগফেরাতের মাসের শেষে
বিশ্বে দেশে দেশে
বাঁকা চাঁদের ফুটলো হাসি
সুনীল আকাশে
কৃতজ্ঞতা জানাই তোমায়
রহিমু রহমান।
তুমি যে মহান প্রভু
তুমি যে মহান।
পড়বো নামাজ ঈদগাহে আজ
সব ভেদাভেদ ভুলি
ধনী গরীব দীন ভিখারি
করবো কুলাকুলি
সাম্য প্রীতি ভালোবাসার
ছড়াবো আজ ঘ্রাণ
ঈদের চাঁদে আলোকিত
হোক আমাদের প্রাণ।
কৃতজ্ঞতা জানাই তোমায়
রহিমু রহমান।
তুমি যে মহান প্রভু
তুমি যে মহান।






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান