কমল কুজুর
২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। জাতীয় চেতনা ও গৌরবের দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার স্মারক। এই দিন শুধু একটি উদ্যাপন নয়, বরং স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্য সংগ্রাম করা লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশীর আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধাস্মরণ। আমাদের স্বাধীনতার পথ ছিল সংগ্রাম ও সংঘাতে পরিপূর্ণ। এই দিনটি জাতির সহনশীলতা ও সুদৃঢ় চেতনার এক শক্তিশালী স্মারক হিসেবে আজও কাজ করে।
১
বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করেছিল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, যেখানে বাঙালিরা তাদের ভাষার স্বীকৃতির জন্য লড়াই করেছিল; তা জনগণের সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার দৃঢ় সংকল্প প্রদর্শন করে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করে। এটি একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে প্রমাণিত হয়। জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করা সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানালে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক প্রতিবাদ ও আইন অমান্য করে আন্দোলন শুরু হয়।
১৯৪৭: ভারত বিভাজন
১৯৫২: ভাষা আন্দোলন
১৯৬৬: ছয় দফা আন্দোলন
১৯৬৯: গণ অভ্যুত্থান
১৯৭০: সাধারণ নির্বাচন
৭ মার্চ, ১৯৭১: শেখ মুজিবের ঐতিহাসিক ভাষণ
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রাজনৈতিক পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায়, যখন শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, যা ছিল কার্যত বাংলাদেশের স্বাধীনতার ডাক। তিনি ঘোষণা করেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।” তিনি জনগণকে স্বাধীনতার সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হতে আহ্বান জানান, যা কার্যত দেশে অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা করে। এর জবাবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নৃশংস ও ঘৃণ্য শক্তি প্রয়োগ করে। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বুদ্ধিজীবী, ছাত্র ও আন্দোলনকারী বাঙালি জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে এক নৃশংস সামরিক অভিযান শুরু করে। এর জবাবে ২৬শে মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শীঘ্রই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলেও, এই ঘোষণাই নয় মাসব্যাপী এক মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করে। মূলত এই ঘোষণাটিই ছিল মুক্তিযুদ্ধের সূচনা লগ্নে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। এরপর ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ থেকে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন এবং দেশবাসীকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের আহ্বান জানান।
২
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। এর গুরুত্ব পূর্ণাঙ্গভাবে অনুধাবনের জন্য যে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এই জাতির জন্মকে অনিবার্য করে তুলেছিল তা বোঝা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে ‘বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত এই ভূখণ্ডটি পূর্বে ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান’—১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির মধ্য দিয়ে সৃষ্ট রাষ্ট্র পাকিস্তানের পূর্বাংশ। ভৌগোলিকভাবে ভারতের ভূখণ্ড দ্বারা এক হাজার মাইলেরও বেশি দূরত্বে বিচ্ছিন্ন হওয়া সত্ত্বেও, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান তাদের অভিন্ন মুসলিম পরিচয়ের সূত্রে একে অপরের সাথে যুক্ত ছিল। তবে এই ঐক্য শেষ পর্যন্ত কেবল একটি বাহ্যিক আবরণ হিসেবেই প্রমাণিত হয়েছে। শুরু থেকেই পূর্ব পাকিস্তান পদ্ধতিগত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের শিকার হতে থাকে। এই বৈষম্য বাঙালি জাতীয়তাবাদের ক্রমবর্ধমান অনুভূতিকে উস্কে দিয়েছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের অভিজাত শ্রেণির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সরকার পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে এবং যাবতীয় সম্পদ ও বিনিয়োগ পশ্চিম পাকিস্তানের দিকে সরিয়ে নেয়। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের কাছে অত্যন্ত প্রিয় ও সম্মানের বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে কোণঠাসা করে পশ্চিম পাকিস্তানের অভিজাত শ্রেণির ভাষা উর্দুকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এই সাংস্কৃতিক নিপীড়ন—যার সাথে যুক্ত হয়েছিল অর্থনৈতিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক বঞ্চনা তা জনগণের মনে অসন্তোষের বীজ বপন করে এবং বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের ক্রমবর্ধমান দাবিকে আরও জোরদার করে তোলে। পুঞ্জীভূত অসন্তোষ অবশেষে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার জন্য এক পূর্ণাঙ্গ সংগ্রামের রূপ নেয়। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানায়। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল বিজয় অর্জন করে এবং পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে। এই নির্বাচনী রায় ছিল বাঙালি জনগণের স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষার এক সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।
তবে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক জান্তা আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানায়। এর পরিবর্তে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ তারা বাঙালি জনগণের ওপর এক নৃশংস সামরিক দমন-পীড়ন শুরু করে। এর মাধ্যমেই সূচিত হয় এমন এক গণহত্যা যা লক্ষ লক্ষ নিরীহ বেসামরিক মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। এই নৃশংস দমন-পীড়নের জবাবে, শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার আহ্বানে অনুপ্রাণিত হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ এক বীরত্বপূর্ণ সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে। বাঙালি বেসামরিক নাগরিক, সৈনিক এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গঠিত গেরিলা বাহিনী—মুক্তি বাহিনী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এক অবিরাম অভিযান পরিচালনা করে। ভারতের গুরুত্বপূর্ণ সহায়তায় মুক্তি বাহিনী শেষ পর্যন্ত জয়লাভ করে এবং ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে। এই বিজয়ের মাধ্যমেই একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
৩
২৬শে মার্চ বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ছুটির দিন, জাতীয় চেতনা ও গৌরবের দিন। এই দিনটি বাংলাদেশে ‘স্বাধীনতা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়, যা এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ জাতীয় ছুটির দিন। এটি স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রতি জাতির সুদৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতীক। বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূলে রয়েছে পাকিস্তানি সরকার কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমানে বাংলাদেশ) বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রান্তিকীকরণ। এর প্রধান বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল উর্দুকে একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং নির্লজ্জভাবে বাংলা সংস্কৃতির দমন। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বাঙালি অধিকারের প্রধান কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে কথা বলে। এই ঘোষণা বাঙালি জনগোষ্ঠীকে উজ্জীবিত করেছিল, যার ফলস্বরূপ পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে নয় মাসব্যাপী এক দীর্ঘ সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু হয়। বাংলাদেশের মুক্তি বাহিনী ভারতের সমর্থনে বীরত্বের সাথে লড়াই করেছে। অগণিত বেসামরিক নাগরিকসহ বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণ অসীম কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে এই সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের বিজয় সমাপ্ত হয় এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়।
৪
সারা বাংলাদেশে বিপুল উৎসাহ ও দেশপ্রেমের সাথে স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন করা হয়। প্রতি বছর কুচকাওয়াজ, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য তুলে ধরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিনটি উদ্যাপন করা হয়। ৩১ তোপধ্বনির মাধ্যমে দিনটি শুরু হয়। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধের শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। সরকারি ও বেসরকারি ভবনগুলোর চূড়ায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। রাস্তাঘাট রঙিন ব্যানার ও ফেস্টুন দিয়ে সজ্জিত করা হয়। বাংলা শিল্প, সঙ্গীত ও সাহিত্য তুলে ধরতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সঙ্গীতানুষ্ঠান এবং প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। সংবাদপত্র, রেডিও ও টেলিভিশন চ্যানেল, অনলাইন পোর্টালগুলো এই দিনের ইতিহাস ও তাৎপর্য তুলে ধরে বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে। সংবাদপত্রগুলিতে স্বাধীনতা দিবসের বিশেষ সংখ্যা ছাপানো হয়। স্বাধীনতার জন্য করা আত্মত্যাগকে স্মরণ করতে মানুষ জাতীয় স্মৃতিসৌধ, বধ্যভূমি এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শন করে। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধফেরত যোদ্ধাদের তাঁদের অবদানের জন্য বিশেষভাবে সম্মানিত করা হয়। বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই দিবস সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বাধীনতা দিবস অর্থনীতি, শিক্ষা এবং সামাজিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি ও অর্জন উদ্যাপনের একটি উপলক্ষও হয়ে উঠেছে।
৫
বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভ এই জাতির ওপর এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। এটি বাঙালি জনগণকে আমাদের নিজস্ব সরকার প্রতিষ্ঠা, সংস্কৃতির প্রসার এবং নিজস্ব অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন সাধনের সুযোগ করে দিয়েছে। তবে এই যুদ্ধ দেশকে ব্যাপক দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি এবং অবকাঠামোগত ক্ষতিসহ বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখেও ফেলেছে। এই সমস্ত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। ২৬শে মার্চের চেতনা আজও বাংলাদেশীদের একটি উন্নততর ভবিষ্যতের জন্য সংগ্রাম করতে অনুপ্রাণিত করে চলেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আমাদের দেশ ও জনগণের জন্য এক গভীর তাৎপর্য বহন করে। এটি আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের জন্য দীর্ঘ ও কঠিন সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি। এটি আমাদেরকে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ করে দিয়েছে। এটি কয়েক দশকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণের অবসান ঘটিয়েছে এবং অগ্রগতি ও উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। অধিকন্তু, স্বাধীনতা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে জাতীয় গর্ব ও পরিচয়ের এক গভীর অনুভূতি জাগিয়ে তুলেছে। এটি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করতে এবং বিশ্ব মঞ্চে আমাদের অনন্য পরিচয় উদ্যাপন করার সুযোগ করে দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাংলাদেশের প্রজন্মকে একটি উন্নততর ভবিষ্যতের জন্য সংগ্রাম করতে অনুপ্রাণিত করে চলেছে। এটি আমাদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক। স্বাধীনতা দিবস দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গকারী শহিদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ ও সম্মান জানানোর দিন। এই দিনটি দেশপ্রেম, ঐক্য এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের মূল্যবোধকে আরও শক্তিশালী করে। স্বাধীনতা দিবস একটি সমৃদ্ধ ও ন্যায়পরায়ণ সমাজ গড়ার চলমান সংগ্রামের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। এটি বাংলাদেশের জনগণকে প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠতে এবং একটি উন্নত ভবিষ্যতের জন্য তাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে একযোগে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে। এটি গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের আদর্শকে আরও শক্তিশালী করে, যা ছিল মুক্তিযুদ্ধের পথনির্দেশক নীতি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা এই অঞ্চল এবং বিশ্বজুড়ে এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করেছিল। এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে বদলে দিয়েছে এবং একটি অধিকতর ভারসাম্যপূর্ণ ও স্থিতিশীল আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে তোলায় অবদান রেখেছে। এছাড়া, বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে লিপ্ত নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর কাছেও এটি এক অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করেছে।
৬
একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের গুরুত্বকেও বিশেষভাবে তুলে ধরেছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সংঘটিত নৃশংসতা বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় তুলেছিল এবং অরক্ষিত জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার অপরিহার্যতাকে জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। অধিকন্তু, স্বাধীনতার লক্ষ্যে পরিচালিত এই সফল সংগ্রামটি স্বৈরাচারী ও নিপীড়ক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধের অসীম শক্তিকে বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত করেছে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাপথটি ছিল নানা চ্যালেঞ্জ ও সাফল্যের এক মিশ্র উপাখ্যান। দারিদ্র্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাসহ অসংখ্য প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন—এমন নানা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। বর্তমানেও দেশটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে চলেছে এবং বিশ্বশান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নে নিরলসভাবে অবদান রেখে যাচ্ছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এদেশের জনগণের সাহস, সহনশীলতা এবং দৃঢ়সংকল্পের এক উজ্জ্বল নিদর্শন। এটি নিপীড়ন ও অবিচারের বিরুদ্ধে এক বিজয় এবং আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও মানবাধিকারের আদর্শের এক জয়গাথা। এর তাৎপর্য বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত; একটি অধিকতর ন্যায়ভিত্তিক ও সমতাপূর্ণ বিশ্ব গড়ার লক্ষ্যে সংগ্রামরত সকলের কাছেই এটি এক অফুরন্ত অনুপ্রেরণা। মুক্তিযুদ্ধের সেই গৌরবোজ্জ্বল উত্তরাধিকার আজও জাতির স্বকীয় সত্তাকে রূপদান করে চলেছে এবং এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথে জাতিকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
২৬শে মার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এটি আমাদের জন্য এক গভীর জাতীয় গর্ব ও স্মরণের দিন। এটি স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অর্জনের জন্য বছরের পর বছর ধরে চলা সংগ্রাম, ত্যাগ এবং অবিচল সংকল্পের চূড়ান্ত পরিণতিকে প্রতিনিধিত্ব করে। আমাদের সেই ঐক্য ও মূল্যবোধগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যার উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সমৃদ্ধ, সমতাভিত্তিক ও উন্নততর ভবিষ্যৎ গঠনে অনুপ্রাণিত করে। স্বাধীনতার চেতনা আজও সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে অনুরণিত হচ্ছে, যা এর পরিচয়কে একটি স্বাধীন ও সার্বিক রূপদান করছে এবং এর অগ্রগতির পথকে নির্দেশ করছে। এই দিনটি জাতির কষ্টার্জিত স্বাধীনতাকে স্মরণ করে এবং এর জন্য সংগ্রামকারীদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানায়।
কবি ও শিক্ষক






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান