ইতিহাসের ঋণ, প্রশ্নবিদ্ধ বর্তমান

বাংলাদেশ। একটি নাম, যার প্রতিটি অক্ষরে মিশে আছে রক্ত, বেদনা ও অদম্য আকাঙ্ক্ষা। একটি পতাকা উড়েছে বলেই আমরা স্বাধীন নই; আমরা স্বাধীন কারণ সেই পতাকার নিচে অসংখ্য অচেনা-অজানা মানুষ নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ তাই কেবল একটি সামরিক বিজয়ের ইতিহাস নয়; এটি ন্যায়, মর্যাদা ও আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠা।

কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর দাঁড়িয়ে আমাদের বিবেককে নাড়া দেয় এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন—আমরা কি সেই ইতিহাসের প্রতি যথার্থ দায় পালন করছি?

গত দেড় বছরের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক ধরনের অদৃশ্য স্রোত লক্ষ করা যাচ্ছে। কিছু রাজনৈতিক শক্তির বক্তব্য, অবস্থান ও আচরণে এমন এক প্রবণতা স্পষ্ট, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সংঘাত তৈরি করে। জামাতে ইসলাম ও এনসিপি, এই দুই ধারার সমীকরণ অনেকের কাছে কেবল রাজনৈতিক জোট নয়; বরং ইতিহাসের ব্যাখ্যা পুনর্লিখনের এক প্রচেষ্টা হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা পাকিস্তানি বাহিনীর সহায়তায় এদেশের মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, তাদের ভূমিকা ইতিহাসে স্পষ্ট। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই ইতিহাসকে অস্বীকার, আড়াল কিংবা বিকৃত করার প্রবণতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। কখনও তা বক্তৃতায়, কখনও সামাজিক মাধ্যমে, আবার কখনও নীরব প্রশ্রয়ে প্রকাশ পাচ্ছে। ইতিহাসকে যখন সুবিধামতো ব্যাখ্যা করা হয়, তখন তা কেবল রাজনীতির বিষয় থাকে না, তা হয়ে ওঠে নৈতিকতার প্রশ্ন।

পাকিস্তান—বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অমোচনীয় বেদনার নাম। ২৫ মার্চের গণহত্যা, অপারেশন সার্চলাইট, অগণিত মানুষের মৃত্যু, নারীর সম্ভ্রমহানি, এসব কেবল অতীত নয়; এগুলো আমাদের জাতীয় চেতনার অংশ। তবুও আজ পর্যন্ত পাকিস্তান রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে সেই অপরাধের জন্য ক্ষমা চায়নি। বরং নানা সময়ে তাদের অবস্থান এই অপরাধকে খাটো করার ইঙ্গিত দেয়।

এই বাস্তবতায় যখন দেশের ভেতরে কিছু গোষ্ঠী পাকিস্তানের প্রতি নরম মনোভাব দেখায় বা ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর ইঙ্গিত দেয়, তখন তা নিছক কূটনীতি নয়, এটি একটি প্রতীকী অবস্থান। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাসকে ভুলে গেলে ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

ইতিহাস কেবল তথ্যের সমষ্টি নয়; এটি স্মৃতি, অনুভব ও মূল্যবোধের ধারক। যে জাতি তার ইতিহাসকে সম্মান করে না, সে জাতি নিজের পরিচয় হারানোর ঝুঁকিতে থাকে। তাই ইতিহাসকে বিকৃত করা মানে কেবল অতীতকে অস্বীকার করা নয়; এটি ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করা।

এই প্রেক্ষাপটে সাহিত্য এক অনন্য আশ্রয়। সাহিত্য আমাদের সেই সময়ের কান্না শোনায়, সেই রক্তের গন্ধ অনুভব করায়, সেই স্বপ্নের দীপ্তি দেখায়। একটি কবিতা বা গল্প কখনও কখনও ইতিহাসের চেয়েও গভীরভাবে সত্যকে স্পর্শ করে। তাই যখন বাস্তবতা ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, সাহিত্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, আমাদের শিকড় কোথায়।

তবে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি হলো; ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতা। আজ এমন কিছু কণ্ঠ শোনা যায়, যারা জাতির জনকের ত্যাগকে অস্বীকার করে, স্বাধীনতার স্থপতিদের অবমূল্যায়ন করে, এমনকি তাদের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করে। এটি কেবল ব্যক্তির প্রতি আঘাত নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ওপর সরাসরি আঘাত।

এখানে কোনো দলীয় রাজনীতির প্রশ্ন নয়, এটি ইতিহাসের প্রশ্ন। সেই ইতিহাস, যা নির্মিত হয়েছে জাতীয় নেতাদের প্রজ্ঞা, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ এবং সাধারণ মানুষের অগণিত ত্যাগের ওপর। সেই ইতিহাসের অংশ আজকের প্রধানমন্ত্রীর জনক ও বিএনপি-র স্থপতি মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, যিনি স্বাধীনতার ঘোষণা এবং যুদ্ধকালীন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত। সেই ইতিহাসের অংশ বুদ্ধিজীবীরা, যাদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল জাতিকে মেধাশূন্য করার জন্য। সেই ইতিহাসের অংশ সেই অসংখ্য নারী, যারা সম্ভ্রম হারিয়েও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের সম্মিলিত লজ্জা ও গৌরবের প্রতীক হয়ে।

এই সবকিছুকে অস্বীকার করা মানে মানবিকতাকে অস্বীকার করা। এই ইতিহাসকে খাটো করা মানে নিজেদের অস্তিত্বকেই ছোট করা। স্বাধীনতা কেবল অর্জনের বিষয় নয়; এটি রক্ষা করার দায়িত্বও বটে, প্রতিনিয়ত, প্রতিটি প্রজন্মের মাধ্যমে।

এই মুক্তিযুদ্ধে আমাদের জাতীয় জীবনে একটি ঐক্যবদ্ধ শক্তির উত্থান ঘটেছিল—একটি পরাশক্তির মতো সম্মিলিত চেতনা, যেখানে নিষিদ্ধ ঘোষিত জামাতে ইসলাম ছাড়া বাংলাদেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দলের অবদান একই লক্ষ্যে, একই অবস্থানে ছিল। সেই ঐক্যই আমাদের বিজয়ের ভিত গড়ে দেয়। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় আমরা দেখছি ভিন্ন চিত্র। ড. ইউনুসের মতো নেতৃত্বের অধীনে গঠিত সরকার এবং এনসিপির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, বিশেষত যখন সেই অতীতে বিতর্কিত ও বাজেয়াপ্ত শক্তিকে পুনরায় মূলধারায় নিয়ে আসার প্রচেষ্টা দেখা যায়। অনেকের আশঙ্কা, এই ধরনের পদক্ষেপ দেশের ইতিহাস, চেতনা এবং সার্বভৌম স্বার্থের পরিপন্থী একটি নতুন নীলনকশার ইঙ্গিত বহন করে।

গণতন্ত্রে মতভেদ থাকবে, থাকা উচিত। কিন্তু মতভেদ কখনোই ইতিহাসের মৌলিক সত্যকে অস্বীকার করার লাইসেন্স হতে পারে না। কারণ ইতিহাসের সত্য যখন আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তখন সমাজের নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো দলের সম্পত্তি নয়; এটি পুরো জাতির অর্জন। তাই এই ইতিহাসকে সম্মান করা, সংরক্ষণ করা এবং আগামী প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরা, এটি আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুবই সরল, কিন্তু গভীর; আমরা কেমন বাংলাদেশ চাই? এমন একটি দেশ, যেখানে সত্যকে সম্মান করা হয়, যেখানে ইতিহাস বিকৃত হয় না, যেখানে ত্যাগের মূল্য দেওয়া হয়? নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে সুবিধার জন্য ইতিহাস বদলে ফেলা যায়?

ইতিহাসের ঋণ কখনও শোধ হয় না; এটি কেবল প্রজন্মান্তরে বহমান থাকে। সেই ঋণ শোধের একমাত্র পথ, সত্যকে ধারণ করা, ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করা এবং স্বাধীনতার চেতনাকে জীবিত রাখা।

এই পথ সহজ নয়। কিন্তু এই পথই একমাত্র পথ।

শিকড়ের পক্ষ থেকে স্বাধীনতা দিবসে সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগী সকল শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র সম্মান।

ফারুক আহমেদ রনি
সম্পাদক




Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Trending