স্কুটারের মূল্য জীবনের অবমূল্যায়ন
এবার আপনাদের সামনে আমার লেখা কবিতা ‘শ্রীলেখা’ নিয়ে হাজির হয়েছি। এই কবিতাটি এক নারীর জীবনের গল্প, যেখানে তার সামাজিক কাঠামো, ব্যক্তি-স্বাধীনতা এবং আত্মমর্যাদার সন্ধান প্রতিফলিত হয়েছে। আমি চেষ্টা করেছি, এই কবিতার মাধ্যমে এমন এক বাস্তবতাকে তুলে ধরতে, যা আমাদের সমাজে খুবই প্রচলিত, অথচ অনেক সময় আমরা তা নিয়ে ভাবি না। প্রতিটি স্তবকের মাধ্যমে নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ এবং চাহিদার সংঘাতগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। কবিতার পেছনের ভাবনাটি এমন ছিল যে, এটি পাঠকের হৃদয়ে এক গভীর অনুরণন সৃষ্টি করবে। শ্রীলেখার গল্প একদিকে যেমন সমাজের বাস্তবতাকে তুলে ধরে, তেমনি তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা অপ্রতিরোধ্য মানসিক শক্তিকেও সামনে নিয়ে আসে।
কবিতার প্রথমেই আমরা শ্রীলেখাকে দেখতে পাই:
“শ্রীলেখা উনচল্লিশেও অবিবাহিত
দুবার বিবাহের সম্ভাবনা জেগেছিল।”
এই লাইন দুটি শ্রীলেখার জীবনকে চিহ্নিত করে সমাজের চোখে, যেখানে নারীর জীবনের একটি বড় পরিচয় তার বিয়ে হওয়া বা না হওয়া দিয়ে বিচার করা হয়। এটি যেন এমন এক অদৃশ্য নিয়ম, যা সমাজের মানদণ্ডে প্রতিটি নারীর জীবনের মান নির্ধারণ করে। বয়স এবং বিবাহিত না থাকার বিষয়টি যেন একটি বোঝা, যা শ্রীলেখার মতো নারীদের সারা জীবন বয়ে নিয়ে যেতে হয়। এই লাইনগুলি একদিকে যেমন শ্রীলেখার ব্যক্তিগত লড়াইয়ের সূচনা নির্দেশ করে, তেমনি আমাদের সমাজের গভীরতর অসঙ্গতিগুলোকেও তুলে ধরে। সমাজের এই দৃষ্টিভঙ্গি অনেক নারীর জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহে বাঁধা সৃষ্টি করে।
প্রথম বিয়ের প্রস্তাবে দেখা যায়, শ্রীলেখার বাবা-মা ছেলের পছন্দে খুশি হয়েছিলেন:
“ছেলের পছন্দ হওয়ায়
শ্রীলেখার বাবা-মা হাফ-ছেড়ে বেঁচে ছিল,
শ্রীলেখার পছন্দ নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি।”
এখানে আমি আমাদের সমাজের সেই বাস্তবতাকে তুলে ধরতে চেয়েছি, যেখানে মেয়ের নিজের মতামত কিংবা পছন্দ তুচ্ছ হয়ে যায়। বাবা-মায়েরা নিজেদের সামাজিক অবস্থান রক্ষা করতে গিয়ে মেয়ের পছন্দের ওপর গুরুত্ব দেন না। বিয়ে যেন এক সামাজিক রীতি, যেখানে ছেলের পরিবারের মতামতই শেষ কথা। নারীর ইচ্ছাকে উপেক্ষা করা কেবল এক পরিবারের নয়, পুরো সমাজের মানসিকতার প্রতিফলন। এটি একটি সাধারণ দৃশ্য, কিন্তু এর গভীর প্রভাব নারীর জীবনে সুদূরপ্রসারী। এমন পরিস্থিতি তার মানসিক স্বস্তি এবং আত্মসম্মানবোধেও আঘাত হানে।
এরপর, প্রথম বিয়ের প্রস্তাব ভেঙে যাওয়ার কারণ এক অদ্ভুত চাহিদা:
“বরপক্ষের তেমন কোন আবদার ছিল না
শুধুমাত্র একটা স্কুটার।”
এখানে একটি নির্মম বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। একটি স্কুটারের মতো সামান্য চাহিদাও একটি সম্পর্কের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। এই লাইনগুলির মাধ্যমে আমি চেয়েছি সমাজে প্রচলিত যৌতুক প্রথার অসংবেদনশীলতাকে তুলে ধরতে। যৌতুকের কারণে কত নারীর জীবন থেমে যায়, তা আমরা প্রায়শই উপেক্ষা করি। এটি কেবল অর্থনৈতিক বৈষম্যকেই নির্দেশ করে না, বরং নারীর প্রতি সমাজের স্বার্থপর মনোভাবকেও প্রকাশ করে। একটি স্কুটারের অভাব একটি সম্ভাবনাময় সম্পর্কের ইতি ঘটায়, যা আমাদের সমাজের লোভী মানসিকতার প্রতীক।
দ্বিতীয়বারের বিয়ের প্রস্তাবে শ্রীলেখার দক্ষতা এবং যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও, পাত্র মত পাল্টে ফেলে:
“বিয়ের সব কথা পাকা,
স্কুটারের বায়না নেই শুধু ঘরের কাজকাম
জানা হলেই ছেলের চলবে।
…আরেকটু কম বয়সী সুশ্রী পাত্রী পেয়ে গেছে।”
এই অংশে আমি নারীকে নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি—তাকে বয়স এবং সৌন্দর্যের গণ্ডিতে আবদ্ধ করার বিষয়টি ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছি। এখানে স্পষ্ট, যোগ্যতা বা দক্ষতা দিয়ে সমাজে নারীর মূল্য নির্ধারণ হয় না। বরং তার বয়স ও বাহ্যিক সৌন্দর্যই যেন শেষ কথা। পাত্রের এমন মনোভাব নারীর ব্যক্তিত্বকে উপেক্ষা করে এবং তাকে কেবল এক উপস্থাপিত বস্তুর রূপে পরিণত করে। এই বৈষম্যমূলক মানসিকতা আমাদের সমাজে নারী-পুরুষের সম্পর্কের ভিত্তিকে দুর্বল করে তোলে।
শ্রীলেখা এরপর নিজের জীবনে নতুন পথ খুঁজে নেয়:
“মাটি দিয়ে বানানো পুতুল
মানুষের শোকেসের শোভাবর্ধন করতে লাগল।”
এই লাইনগুলিতে আমি শ্রীলেখার সৃষ্টিশীলতা এবং আত্মপ্রত্যয়কে তুলে ধরেছি। শ্রীলেখা বুঝতে পারে, তার জীবনের নিয়ন্ত্রণ তার নিজের হাতে। সমাজ তাকে যা দেয়নি, তা সে নিজের চেষ্টায় তৈরি করে নেয়। এটি কেবল আর্থিক স্বাবলম্বিতার উদাহরণ নয়, বরং নিজের সৃষ্টিশীলতার মধ্যে আনন্দ খুঁজে পাওয়ার প্রতীক। এই অংশটি আমাদের সমাজে নারীর লড়াই এবং তার সম্ভাবনার গভীরতাকে ফুটিয়ে তোলে।
শেষে আমরা শ্রীলেখার সাফল্য দেখতে পাই:
“উনচল্লিশের শ্রীলেখা আজ একজন সফল নারী
কয়েক ডজন স্কুটার তার উঠানে হাঁটু গেড়ে থাকে।”
এই লাইনগুলিতে শ্রীলেখার জীবনের দ্বন্দ্ব এবং তার অপ্রতিরোধ্য মানসিক শক্তি প্রতিফলিত হয়েছে। যে শ্রীলেখা একসময় বিয়ে ভেঙে যাওয়ার বেদনায় ক্লান্ত ছিল, সে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করে। আজ সে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী, সমাজের চোখে একজন সফল উদ্যোক্তা। তার সাফল্য তার নিজের শ্রমের ফসল। এটি প্রমাণ করে যে, নারীর সাফল্য বা অস্তিত্ব কোনো পুরুষ বা বিবাহের ওপর নির্ভরশীল নয়। শ্রীলেখার উঠানে দাঁড়িয়ে থাকা স্কুটারগুলো এক সময়ের সেই প্রত্যাখ্যানের ব্যঙ্গাত্মক জবাব।
তবে, সাফল্যের পরও শ্রীলেখার ভেতরে এক গভীর শূন্যতা রয়ে যায়।
“আয়নায় নিজেকে পরখ করে, পুরনো শ্রীলেখাকে খুঁজে;
একটা স্কুটারের অভাবে যার বিয়ে হয়নি।”
এই অংশটি তার জীবনের আরেকটি দিককে তুলে ধরে—অতীতের আঘাত ও স্মৃতির গভীর ছাপ। শ্রীলেখা বারবার তার অতীতে ফিরে যায়, যেখানে সে ছিল সমাজের চোখে মূল্যহীন, শুধু একটি স্কুটারের কারণে। আজ সে যত সফলই হোক না কেন, তার ভেতরে কোথাও এক ক্ষত বয়ে বেড়ায়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পুরনো শ্রীলেখাকে খুঁজে পাওয়া যেন তার নিজের সঙ্গে এক নীরব কথোপকথন। এই লাইনগুলির মাধ্যমে আমি দেখাতে চেয়েছি যে সাফল্য অনেক কিছু পূরণ করতে পারে, কিন্তু অতীতের দাগ মুছে দেওয়া সবসময় সম্ভব হয় না।
এখানে আমি নারীর গভীর মানসিক জটিলতা এবং তার জীবনের বিভিন্ন স্তরে অনুভূতির সংঘাতকে তুলে ধরতে চেয়েছি। শ্রীলেখার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোর জন্য শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন এক সমষ্টিগত সচেতনতা। শ্রীলেখার এই প্রতীকী বিজয় যেন আমাদের প্রত্যেককে নারীর প্রতি সমাজের দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করায়।
শ্রীলেখা
শ্রীলেখা উনচল্লিশেও অবিবাহিত
দুবার বিবাহের সম্ভাবনা জেগেছিল
একবার তেইশে; ছেলের পছন্দ হওয়ায়
শ্রীলেখার বাবা-মা হাফ-ছেড়ে বেঁচে ছিল,
শ্রীলেখার পছন্দ নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি;
শেষ পর্যন্ত হলো না। কোন বড় ব্যাপারে
বিয়ে ভাঙ্গেনি; খুবই মামুলি ব্যাপার।
বরপক্ষের তেমন কোন আবদার ছিল না
শুধুমাত্র একটা স্কুটার। কৃষি কর্মকর্তা ছেলে
মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে হয়, মাঝে মাঝে
এখানে সেখানে যেতে হয়; একটা স্কুটার
হলে ব্যাপক সুবিধা। মেয়ে অসুন্দর
ব্যাপার না, স্কুটার এই কমতি পুষিয়ে দেবে।
মেয়ের রূপের মত বাবাও বর্ণহীন;
অর্থাৎ দরিদ্র, স্কুটারের টাকা জোগাড় করা
সম্ভব না। স্কুটার বিহীন কন্যায় বরের পোষাবে
না; বিয়ে হলো না। পরেরবার একত্রিশে,
বিপত্নীক বর; পানের বরজ আছে
আয়-রোজগার মন্দ না। বিয়ের সব কথা পাকা,
স্কুটারের বায়না নেই শুধু ঘরের কাজকাম
জানা হলেই ছেলের চলবে। শ্রীলেখা কাজেকামে দক্ষ,
ঘরের সমস্ত কাজ এক হাতেই সেরে ফেলতে পারে।
এ বিয়েও শেষ পর্যন্ত বিয়েতে গড়াল না। বিপত্নীক
মত বদলে ফেলল। কারণ অনুসন্ধানে দেখা গেল
আরেকটু কম বয়সী সুশ্রী পাত্রী পেয়ে গেছে।
বিয়ের সম্ভাবনা মিটে যাওয়ার শ্রীলেখা ঘরের
কাজের অতিরিক্ত অন্য আজে মনোযোগ দিতে
চেষ্টা করল, মাটি দিয়ে বানানো পুতুল
মানুষের শোকেসের শোভাবর্ধন করতে লাগল।
বছর খানেকের মধ্যে স্কুটারের টাকা জমা
করে ফেলল। স্নো পাউডার অন্যান্য প্রসাধনী
ব্যবহারের ফলে শ্রীলেখার শ্রীহীন রূপে শ্রী ফিরতে
শুরু করল। পাঁচ বছরের মধ্যে আপাত শ্রীহীন শ্রীলেখা
আকর্ষণীয় নারী হিসাবে রূপান্তরিত হল।
ততদিনে বয়স এবং অভিজ্ঞতায় শ্রীলেখা
বুঝতে পারল বিয়েই নারীর জীবনের লক্ষ্য নয়।
উনচল্লিশের শ্রীলেখা আজ একজন সফল নারী
কয়েক ডজন স্কুটার তার উঠানে হাটু গেড়ে থাকে,
অসংখ্য সুদর্শন তরুণ আজ তার পাণিপ্রার্থী।
কাজ শেষে প্রতিদিন শ্রীলেখা ঘরে ফিরে, ঘষে ঘষে
মুখ থেকে ফাউন্ডেশন তুলে। আয়নায় নিজেকে
পরখ করে, পুরনো শ্রীলেখাকে খুঁজে;
একটা স্কুটারের অভাবে যার বিয়ে হয়






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান