
লালসবুজের আলো
দিনের আলোর মতোই মা বললেন,
“ফিরিস সন্ধ্যার আগে,
সময়টা ভয়ঙ্কর — যেনো বাতাসেরও প্রাণ নেই।”
তাড়া থাকা সত্ত্বেও সন্ধ্যা ছুঁয়ে গেল হাটে।
হাতে তখনও টুকরো টুকরো আলো;
তড়িঘড়ি বাড়ি ফেরার পথে,
নদীজলে কাঁপছিল চাঁদের রূপালী বিভা।
চাঁদ — যেনো অনন্ত কোনো পাথরের ছায়া,
তার নিচে ভেসে যাচ্ছে
মানুষের ছিন্নভিন্ন দেহ।
নদীর বাঁকে আটকে থাকা লাশ,
তাকে ছিঁড়ে খাচ্ছে কটি বেওয়ারিশ কুকুর।
দেখি,
মৃত শরীরের স্মৃতিরাও কুকুরের খাদ্য হয়ে গেছে।
নদী আমার কাছে এখন
শুধু এক নৈঃশব্দ্য —
যেখানে রক্তের ধারা শব্দহীন।
বাবার সাথীরা এসেছিলেন সেদিন গভীর রাতে,
বলেছিলেন, “যেতে হবে ,যুদ্ধ শেষে ফেরা হবে কাঙ্ক্ষিত বিজয়ে।”
হাটের এক কোণে সেই পরিচিত চাহনি,
ইঙ্গিতে বলেছিল,
“যা, সময়ের আগে ফেরা শিখে নে।”
অথচ সময়ই আসছে ফুরিয়ে
নদীপাড়ে পোড়ামাটি বারুদের গন্ধ
স্মৃতির বাড়িগুলো আর নেই।
মন্দির, ভস্মীভূত লোকালয়, জ্যোৎস্নায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা
প্রিন্সিপ্যাল স্যারের চিরচেনা অবয়ব—
সব পুড়ে ছাই।
ঘরে ফিরেই শুরু হলো এক সর্বগ্রাসী অন্ধকার,
যুদ্ধে মিশে গেল শ্বাস,
আকাশ ভেঙে পড়ছে,
মাটি যেন পালিয়ে যাচ্ছে পায়ের নিচ থেকে।
বাঙ্কারের ঠাণ্ডা দেয়াল
মা, ভাই-বোনের সাথে কাঁপছি—
অপেক্ষা করি যেনো ঘুমন্ত বাংলাদেশ
তন্দ্রা কাটিয়ে ওঠে।
তবু একসময় নীরবতা সুনসান নীরবতা
ফজরের প্রথম আজানে
জেগে উঠল অদ্ভুত এক আশ্বাস।
তখন দূর থেকে ভেসে আসা
শব্দের ঢেউ —
স্বাধীন হয়ে গিয়েছে দেশ।
মা তাকালেন আকাশের দিকে,
তারপরে আমাকে বললেন,
“যা, এই লালসবুজটুকু নিয়ে যা।
এইটুকু আলো হয়তো আকাশ ছুঁতে পারবে।”
আমি গেলাম।
গায়ের মসজিদে।
মসজিদের উঁচু মিনার গায়ের সবচেয়ে উঁচু জায়গা
তুলে দিলাম পতাকাটি সেখানেই
তারপর?
লালসবুজ বাতাসে নাচলো,
আমি তাকিয়ে রইলাম—
আমাদের হাড় আর রক্তের গল্প
পৃথিবী শুনবে কিনা, জানি না।
তবু মনে হলো—
আলো ছড়িয়ে পড়েছে।






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান