কবি আতিকা হাসান

আলোচক: মোহাম্মদ ইকবাল
ভূমিকা;
আতিকা হাসানের কাব্যগ্রন্থ “আমি” তারুণ্যের দীপ্তিতে দীপ্ত, জীবনবোধের সূক্ষ্মতা ধারণকারী এবং আধুনিক বাংলা কবিতার এক সার্থক সংযোজন। কবিতাগুলোতে গভীর জীবনবোধ, ব্যক্তিক এবং সামাজিক অনুভূতির সংমিশ্রণ রয়েছে, যা পাঠকদের আবেগে আলোড়িত করে। কবির শব্দচয়ন, উপমা এবং ভাবনার গভীরতা তার কবিতাগুলোকে সাধারণ মাত্রা থেকে উচ্চতর শিল্পমানের স্তরে নিয়ে গেছে। এই গ্রন্থের ৫৭টি কবিতার মধ্যে নির্বাচিত কয়েকটি কবিতার আলোকে আমরা তার কাব্যচিন্তা ও শৈলী পর্যালোচনা করব।
কবিতার গঠনশৈলী ও শিল্পমান;
আতিকা হাসানের কবিতাগুলোতে গদ্য ও পদ্যের সংমিশ্রণে এক স্বতন্ত্র ধারা গড়ে উঠেছে। তার কবিতার চিত্রকল্প অত্যন্ত শক্তিশালী এবং পাঠকের মনে গভীর রেখাপাত করে। উদাহরণস্বরূপ, কবিতা “প্রিয়দর্শিনী”-তে কবি যে ধরনের চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন তা অনন্য—
“তোমার ঠোঁটের ডুবন্ত তিলে
মুমূর্ষু ডুবরীর অস্তিত্ব অন্বেষণ,”
এখানে প্রেমের এক সূক্ষ্ম অথচ গভীর ব্যঞ্জনা রয়েছে। কবিতার ছন্দময়তা এবং অলংকার প্রয়োগ এটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
কাব্য দর্শন ও বিষয় বৈচিত্র্য;
আতিকা হাসানের কবিতায় জীবন, সময়, অস্তিত্বের প্রশ্ন, প্রেম, বিরহ, স্বপ্ন, স্বাধীনতা, পরাবাস্তববাদ এবং সামাজিক বাস্তবতার এক গভীর অনুরণন রয়েছে। “আমি” কবিতায় আত্মপরিচয়ের এক দার্শনিক অনুসন্ধান ফুটে উঠেছে—
“কালের আলেয়ায়- তুমি যখন বললে, কে তুমি?
বললাম, ‘আমি! ধরার গাঁয়ে এক অনাহুত মানুষ!’”
এখানে কবি নিজের অস্তিত্বের এক অনন্ত অনুসন্ধানের চিত্র এঁকেছেন, যা দার্শনিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
“স্বাধীনতা” কবিতায় কবি স্বাধীনতার প্রকৃত সংজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন—
“হয়তো স্বাধীনতা মানেই বেশি বেশি;
স্বাধীনতা মানেই বেহিসাবি…”
এটি স্বাধীনতার অতিরঞ্জন ও বাস্তবতার মধ্যে যে ফারাক তা গভীরভাবে চিন্তা করতে বাধ্য করে।
ভাষা ও উপমার ব্যবহার;
কবিতাগুলোতে কবির ভাষা অত্যন্ত রসময়, গভীর এবং শক্তিশালী। তিনি প্রতিটি শব্দকে সুচিন্তিতভাবে ব্যবহার করেছেন। “প্রতীক্ষা” কবিতায় দেখা যায়—
“তাইতো, বিনাবাক্যে সিক্ত হয় জোনাকিমন
অশ্রুবৃন্তে পুনশ্চ কুয়াশা ঘোর!”
এখানে কবি অত্যন্ত চিত্রময় ভাষায় প্রতীক্ষার অনুভূতি ফুটিয়ে তুলেছেন। একইভাবে, “ভীষণ অহেতুক…” কবিতায় দার্শনিকতা ও বিমূর্ত চিন্তার সমন্বয় রয়েছে—
“সৃষ্টি সমীকরণের সমাধান খুঁজতে
টান ধরেছে আয়ুর সুতোয়!”
এতে জীবন এবং অস্তিত্বের অনিশ্চয়তার এক গভীর ভাব ফুটে উঠেছে।
পরাবাস্তববাদী উপমা ও উত্তরাধুনিকতা;
আতিকা হাসানের কবিতায় উত্তরাধুনিকতার ছোঁয়া সুস্পষ্ট। তিনি বাস্তবতা ও কল্পনার মধ্যে এক সংযোগ তৈরি করেন, যা পাঠককে নতুন ভাবনায় নিয়ে যায়। “দেউলিয়াত্ব” কবিতায় তিনি অনুভূতির এক নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছেন—
“অজস্র রঙিন প্রজাপতি উড়ে উড়ে
তর্জমা করল দেউলিয়া ঋণ!”
এটি একটি পরাবাস্তববাদী উপমা যা প্রেমের উত্থান-পতনকে প্রতীকীভাবে প্রকাশ করেছে।
উপসংহার;
আতিকা হাসানের কাব্যভাষা, শব্দচয়ন এবং ভাবনার গভীরতা তার কবিতাগুলোকে সাধারণ প্রেম, বিরহ, কিংবা বাস্তবতার গণ্ডি ছাড়িয়ে এক উচ্চতর স্তরে নিয়ে যায়। তার কাব্যগুণ ও শৈলী বাংলা কবিতার আধুনিক ধারায় গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। “আমি” কাব্যগ্রন্থটি শুধু পাঠকদের হৃদয়ে দাগ কাটবে না, বরং বাংলা সাহিত্যে এক শক্তিশালী অবদান রাখবে।






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান