“এসো হে বৈশাখ, এসো এসো…”
এই আহ্বান শুধু ঋতুর প্রতি নয়, এ এক অন্তরের দিগন্তভেদী ডাক নতুনের প্রতি, জীবনের প্রতি, ভালোবাসার প্রতি।
বাংলা নববর্ষ, আমাদের সংস্কৃতির সেই প্রানবন্ত উৎসব, যার প্রতিটি মুহূর্তে জেগে ওঠে শিকড়ের ঘ্রাণ, মাটির উষ্ণতা আর হাজার বছরের ঐতিহ্য।জন্মভূমি থেকে প্রবাস পর্যন্ত, নদী-বাঁকে বাঁশবাগানের ছায়া থেকে মেট্রোপলিটন বিল্ডিংয়ের কাচঘেরা জানালা পর্যন্ত, বাংলা নববর্ষ বয়ে আনে এক অভিন্ন আবেগ, এক অভ্যন্তরীণ আলোকবর্তিকা।
ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে উৎসবের ছন্দে বাংলা সনের উৎপত্তির ইতিহাস মিশ্র; সৌর ও চন্দ্রপঞ্জির সমন্বয়ে মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে কৃষিপ্রধান সমাজে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে চালু হয় “ফসলি সন” যা কালক্রমে রূপ নেয় আমাদের “বাংলা বর্ষপঞ্জি”তে। কিন্তু এটি কেবল সময় গণনার একক নয়, এটি সময়কে উপলব্ধির ভাষা।
পহেলা বৈশাখে আমরা যেভাবে পুরনো ক্লান্তিকে ঝেড়ে ফেলে নতুন আলোর দিকে মুখ তুলে ধরি, তা একান্তই বাঙালির আপন ঐতিহ্য।
বাংলাদেশের আকাশে পহেলা বৈশাখ মানেই নতুন সূর্যের আগমনে ঘুম ভাঙে রঙের। ঢাকার রমনা বটমূলে ছায়ানটের সংগীতানুষ্ঠান যেন নগরের প্রাণপ্রবাহে সংগীতের ছন্দ ছড়িয়ে দেয়। “এসো হে বৈশাখ” গানে বাঙালি জাতি একযোগে গেয়ে ওঠে নতুন জীবনের প্রার্থনা।
এরপর শোভাযাত্রা, মঙ্গল শোভাযাত্রা, যার রঙ, শিল্প, মুখোশ, লোকচিত্র যেন এক বিস্ময়কর কল্পনার জগৎ। ইউনেস্কো কর্তৃক “Intangible Cultural Heritage” হিসেবে স্বীকৃত এই আয়োজন কেবলই দৃষ্টিনন্দন নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক দ্রোহ, মানবিক চেতনার জয়গান।
পান্তা-ইলিশ, হালখাতা, আলপনা, বৈশাখী মেল, বাংলাদেশের শহর থেকে গ্রাম, প্রতিটি প্রান্তরে নববর্ষ হয়ে ওঠে এক সামাজিক উৎসব, যার ছায়ায় মিলিত হয় ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, বয়স নির্বিশেষে সকল মানুষ।
ভারতেও বৈশাখ মানে শিল্প, সাহিত্য ও আত্মার উন্মোচন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসামসহ বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলগুলিতে নববর্ষ উদযাপন এক নিজস্ব সৌন্দর্য নিয়ে হাজির হয়। “পয়লা বৈশাখ” কলকাতায় মানেই নতুন পোশাক, রাস্তাজুড়ে বর্ণময় উৎসব, নাট্যদল, কবিতা পাঠ, সংগীতানুষ্ঠান, আর শিল্পীদের প্রাণময় উপস্থিতি।
বিশ্বভারতীর শান্তিনিকেতনে বসন্ত ও বৈশাখে গানের ধ্বনি মিশে যায় কুড়ি গ্রামে। কণ্ঠে কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান “নববর্ষের দিনটিকে, করি হৃদয়ে বরণ…”।
কলকাতার কিশোর থেকে প্রবীণ, সবাই এইদিনে একটু যেন ফিরে যান মাটির কাছাকাছি। ক্যানভাসে আঁকা হয় বৈশাখী আলপনা, পাড়ায় হয় বৈশাখী নাটক, গ্রামে হয় হাট-বাজারঘেরা মেলা।
প্রবাসে পহেলা বৈশাখ মানে দূরদেশের বুকেও শিকড়ের স্পন্দন, দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে থেকেও প্রবাসী বাঙালির মন বাংলা নববর্ষের আগমনে ঠিকই খেলে ওঠে।
যেমন, যুক্তরাজ্যে লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসের প্রাণকেন্দ্রে বসে “বৈশাখী মেলা” যেটি ইউরোপের বৃহত্তম বাংলা উৎসব। টেমস নদীর হাওয়ায় মুখোশ আর আলপনার বাহার, লোকসংগীতের সুরে কিশোরী নৃত্য, আর স্টলগুলোতে মিষ্টি-পিঠা-পণ্যের বাহার যেন একটি ক্ষুদ্র বাংলাদেশ। নতুন প্রজন্ম, যারা হয়তো বাংলায় কথা বলেও না সাবলীলভাবে, তারাও এই মেলার মধ্য দিয়ে শিখে নেয় শিকড়ের ভাষা।
তেমনি মধ্যপ্রাচ্য- সৌদি আরব, কাতার, ওমান, আরব আমিরাত, এইসব দেশে লাখো প্রবাসী বাঙালিরা গৃহবন্দী পরিবেশের মধ্যেও সংগঠিত করেন বৈশাখী অনুষ্ঠান। কর্মস্থলের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সন্ধ্যার ফাঁকে ফাঁকে হয় গানের আসর, হয় নৃত্য-নাটক, আর খাবারের টেবিলে থাকে মা-হাতে বানানো পিঠার স্বাদ।
একই ধারাবাহিকতায় আমেরিকা ও কানাডায় এই প্রাণের মিলনমেলার যুগান্তরি উতসব। নিউ ইয়র্ক, টরন্টো, অটোয়ার মতো শহরগুলোতে বাংলা স্কুল, কালচারাল অর্গানাইজেশন আয়োজন করে বৈশাখী উৎসব। খোলা মাঠে হয় শোভাযাত্রা, অডিটোরিয়ামে হয় বাংলা নাটক, গানের অনুষ্ঠান। পাঞ্জাবি-পায়জামা, শাড়ি-ফুলের গন্ধে ভরে ওঠে শহরের হিমেল বাতাস।
অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের অন্যান্য অংশেও এমন জাগরণের মেলবন্ধন আমরা দেখতে পাই। যেমন; সিডনি, মেলবোর্ন, হ্যানোভার, বার্লিন, প্যারিস প্রতিটি শহরেই রয়েছে প্রবাসী বাঙালিদের প্রাণচাঞ্চল্য। নববর্ষ এখানে শুধু মিলনমেলা নয়, একটি সাংস্কৃতিক দাবির মতো। “আমরা বাঙালি, আমাদের উৎসবও আছে”এই পরিচয় তারা তুলে ধরেন ভালোবাসা দিয়ে।
এখানে একটা বিষয় লক্ষনীয় যে বাংলাদেশ ও ভারতের পহেলা বৈশাখের তারিখে পার্থক্যের একটা কারণ রয়েছে যারজন্য দুই দেশে আলাদা আলাদা ভাবে দুটি দিনে পালিত হয়।
তার মুল কারন বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষ ১৪ এপ্রিল আর ভারতে (বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে) ১৫ এপ্রিল পালিত হয় এর পেছনে রয়েছে পঞ্জিকা ব্যবস্থার ভিন্নতা।
বাংলাদেশ সরকার ১৯৬৬ সালে বাংলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে একটি ‘সংস্কারকৃত সৌরপঞ্জিকা’ চালু করে। এই নিয়ম অনুযায়ী:
বৈশাখ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত ৩১ দিন করে, আশ্বিন থেকে চৈত্র পর্যন্ত ৩০ দিন করে ধরা হয়, আর লিপ ইয়ারে ফাল্গুন হয় ৩১ দিনের।
ফলে, বাংলাদেশে প্রতিবছর নির্দিষ্টভাবে ১৪ এপ্রিল নববর্ষ পালিত হয়।
অন্যদিকে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এখনো পুরনো বাংলা পঞ্জিকা অনুসরণ করা হয়, যা চন্দ্র-সূর্যের গতির ওপর ভিত্তি করে। এতে বাংলা বছরের প্রথম দিন প্রতিবছর এক বা দুই দিনের হেরফেরে পড়ে এবং বেশিরভাগ সময় তা ১৫ এপ্রিল হয়।
এই পার্থক্যই বাংলা নববর্ষের তারিখে ভিন্নতার মূল কারণ।
বাংলা নববর্ষ একটি চেতনার উত্তরণ।
বাংলা নববর্ষ কেবল একটি দিন নয়, এ এক নবজাগরণের স্পন্দন। পুরাতনের ছায়া ঝেড়ে ফেলে নতুন স্বপ্নে বিশ্বাস রাখার উৎসব। এই উৎসব ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে এক মানবরূপী বর্ণালী। এটি কৃষকের কণ্ঠে ধান কাটার গান, কবির খাতায় নবজীবনের পংক্তি, শিশুর হাতে রঙিন বেলুন, আর বৃদ্ধের চোখে ছেলেবেলার হারিয়ে যাওয়া মাঠ।
বাংলা নববর্ষ আমাদের শিকড়, আমাদের আত্মপরিচয়। একদিন বিশ্বনাগরিক হলেও, হৃদয়ের অন্তরালে বাংলা বৈশাখ ঠিকই বাতাস দেয়। এই বৈশাখ আমাদের বলে- নতুন কর, নতুন করো জীবন, পবিত্র করো মন।
“আয় নতুন বছর, জীবন দাও মধুর,
আঁধারে আলোর গান গাই,
প্রাণে প্রাণে বৈশাখ লহরী বাজাই!”
শিকড়ের পক্ষ থেকে আমাদের সকল কবি, সাহিত্যিক ও বিশ্বের সর্বস্তরের বাংভাষীদের জন্য অপুরন্ত শুভেচ্ছা। শুভ নববর্ষ।
ফারুক আহমেদ রনি
সম্পাদক, শিকড়






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান