কবি পরিচিতি; মোহাম্মদ ইকবাল
কবিতা, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক অনন্য নাম। তাঁর লেখায় যেমন রয়েছে আত্মজিজ্ঞাসা ও মানবিক উপলব্ধি, তেমনি আছে সময়ের খোঁজ, শিকড়ের টান ও সমাজবাস্তবতার চিত্রায়ণ। জীবনের বহুবর্ণ, বহুস্তর রূপ-রূপান্তর তাঁর লেখনীতে ধরা পড়ে এক স্বতন্ত্র কাব্যভাষায়।
মোহাম্মদ ইকবালের জন্ম ২৯শে মে, ১৯৬২ সালে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ মৌলভীবাজারে, যা বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। পিতা মোহাম্মদ আব্দুল গনি, একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরে কর্মরত ছিলেন এবং বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। মাতা জয়তুন নাহার বেগম একজন গৃহিণী হিসেবে পারিবারিক জীবনের শান্ত নীড় গড়ে তুলেছেন।
শিক্ষা ও পেশাগত জীবন
কবি ইকবালের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু বাংলাদেশে। প্রকৌশলী হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করেন এবং কাজ করেন জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডে। পরে পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে, যেখানে তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন ১৯৯৪ সালে। সেখানকার স্বনামধন্য Arden University-তে অধ্যয়ন করে অর্জন করেন Business Management-এ স্নাতক ডিগ্রি।
বর্তমানে তিনি একজন সফল উদ্যোক্তা এবং লেখালেখির পাশাপাশি নিজ ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত। তাঁর বহুমুখী অভিজ্ঞতা, দেশ ও প্রবাসের জীবনচিত্র তাঁকে দিয়েছেন এক গভীর জীবনদর্শন, যা তাঁর কবিতায় প্রবলভাবে প্রতিফলিত।
কবিতা মোহাম্মদ ইকবালের আত্মার আরাধনা। তাঁর কবিতায় প্রেম, প্রকৃতি, দর্শন, প্রবাসী বেদনা ও সমাজবাস্তবতার অনুপম সমন্বয় লক্ষণীয়। শব্দচয়ন ও ভাবনায় রয়েছে মৌলিকতা, কাব্যিক ব্যঞ্জনায় রয়েছে বিশিষ্টতা। তাঁর লেখায় স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে যুগান্তরের পরিবর্তন, মনুষ্যসমাজের টানাপোড়েন এবং ব্যক্তিগত অনুভবের আন্তরিক চিত্রায়ণ।প্রবাসে থেকেও তিনি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারাকে বহন করে চলেছেন আত্মিক ও সাংগঠনিকভাবে।
তিনি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যের সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। বর্তমানে তিনি শিকড় সাহিত্য পত্রিকা শিকড়ের সম্পাদনা পরিষদ ও সাহিত্য ফোরাম ও পাবলিশার্সের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন। তাছাড়াও যুক্তরাজ্য সম্মিলিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদের সভাপতি এবং বিলেতের সংহতি সাহিত্য পরিষদের মুখ্য অর্থসম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
কবির গ্রন্থ তালিকাঃ
মোহাম্মদ ইকবালের কাব্যগ্রন্থসমূহ পাঠকমননে এক নতুন চেতনার উন্মেষ ঘটায়। তাঁর প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্রষ্টার শৈল্পিক হাত (২০১৬), নিরংসু ক্ষপায় (২০১৬), ইস্কাপনের বউ (২০১৭), জাফরানি মৌচাক (২০১৮), সংবিধিবদ্ধ নসিহত (২০১৯), বৈষ্ণবীর প্রেম (২০২০), প্রেমের কবিতা (২০২১), জীবনের ছলছবি (যৌথ সম্পাদনা, ২০২২)। গবেষণাধর্মী রচনা: Way of Transition (Academic Research, ২০২৪), Role of Electric Vehicles on Combating Air Pollution in Dhaka
যৌথ সম্পাদনা: বিধ্বস্ত নগরী (২০২১)
মোহাম্মদ ইকবাল বাংলা কবিতার আঙ্গিনায় এক নিবেদিতপ্রাণ নাম, যিনি প্রবাসে থেকেও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বুননকে সযত্নে ধরে রেখেছেন। তাঁর কাব্যচর্চা বাংলা সাহিত্যের চলমান ধারায় এক সংযমী, বুদ্ধিদীপ্ত এবং মানবিক কণ্ঠস্বর হিসেবে গৃহীত।
আমরা শিকড়ের পক্ষ থেকে কবির কিছু কবিতা উপস্থাপন করছি যাতে কবি ইকবালের কবিতার অন্তর্জগতে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। তিনি সময়ের প্রতিচ্ছবি আঁকেন নির্ভার কলমে প্রেম, বিচ্ছেদ, রাষ্ট্রচিন্তা, অভিবাসনের বাস্তবতা, বিশ্বাসহীনতার ব্যথা সবই ঠাঁই পায় তাঁর ছন্দে। কখনও সরল আবেগে, কখনও প্রতীকী উপস্থাপনায় তিনি পাঠককে আহ্বান জানান অনুভবের গভীরে অবগাহনের। তাঁর ভাষা সহজ অথচ দৃঢ়, আবেগঘন অথচ সংযত। তিনি বিশ্বাস করেন, কবিতা শুধু অলংকার নয়, বরং সময়ের মুখপত্র, আত্মার নিরালম্ব উচ্চারণ।
শিকড় পরিবারের পক্ষ থেকে কবির জন্মদিনে অনেক অনেক শুভ কামনা। কবি ও কবিতার জয় হোক। শুভ জন্মদিন।
কবি মোহাম্মদ ইকবালের কবিতা
অস্তিত্বের প্যারাডক্স
প্রতিটি রাত যেন ভাঙা জোছনার রহস্যময় আয়নায়
আটকে থাকা এক অস্তিত্বের প্যারাডক্স,
আমি সেই আয়নার কিনারায় দাঁড়িয়ে,
তোমার নিঃশ্বাসের তপ্ত কুয়াশায় অপেক্ষার নাম লিখি।
অদেখা হরফে,
অশ্রুভেজা কাব্যে।
স্পর্শের অলিখিত অনুভব
নৈঃশব্দ্যের পাণ্ডুলিপিতে ধীরে ছড়ায় অনন্ত আত্মার কাব্যরেখা।
ঘুমন্ত তোমার চোখের পাতায় জেগে ওঠে সহস্র দেবদূতের ডানা,
ঝাপটায় যার থেমে যেতে থাকে মহাকালের ঘড়ির কাঁটা।
নক্ষত্রের মুগ্ধতায় রঙিন মহাকাশ
যেন সৃষ্টির সূচনালিপি নতুন করে লেখা হচ্ছে
তোমার মাহাজাগতীক অস্তিত্বে।
তোমার কপালের অদৃশ্য পটভূমিতে জ্বলে উঠে
প্রাচীন কোনো গ্রন্থের শেষ বর্ণমালা।
যা কেবল হৃদয় দিয়ে পড়া যায়,
চোখে নয়।
প্রতি রাতের দেহে যতনে আঁকি অলীক বাগানের
স্বপ্ন ইলিউশন,
যেখানে পাপড়িগুলো নিঃশব্দে উচ্চারণ করে
তোমার উষ্ণতার ব্যাকরণ।
সেই ব্যাকরণ।
যা কোনো ভাষাতেই লেখা হয়নি।
তবুও হৃৎপিণ্ড মেপে নেয় তার প্রতিটি স্তবকের গভীরতা।
আমরা পাশাপাশি।
তবু এক নাক্ষত্রিক দূরত্বে বন্দি।
একই আয়নায় প্রতিচ্ছবি, অথচ দুলে যাই বিপ্রতীপ তরঙ্গে।
যেখানে আলো ছুঁয়ে যায় কেবল নিঃশ্বাসের অন্তরাত্মা।
তোমার ত্বকের ছায়া বেয়ে ঝরে পড়ে এক আনকোরা
প্রেমের মহাকাব্য।
যার ভাষা বোঝে কেবলই স্বপ্নেরা।
অতঃপর ঘুমাও তুমি,
তোমার নিঃশ্বাসে ছড়ায় প্রার্থনার সুর,
আর আমি জেগে থাকি নিঃশব্দের প্রহরে,
যেখানে ভালোবাসা নিদ্রায়ও অম্লান থাকে
নৈঃশব্দ্যের পরম্পরায় আঁকা সরলরৈখিক
এক জটিল সমীকরণে।
২০৯৯ সালের এক প্রেমীর প্রলাপ
আমার বুকে এখনও একটুকরো মানুষ বেঁচে আছে,
হৃৎপিণ্ডের নিচে একটা অব্যাখ্যেয় সফটওয়্যার গ্লিচ হয়ে
যাকে তুমি বলো ভালোবাসা।
আমরা এখন সিলিকন শহরের ভৌতিক গহ্বরের বাসিন্দা ,
যেখানে প্রেম মানে অনভিপ্রেত প্রসেসিং এরর।
তোমার অনুরণন যেন এক ভূতুড়ে নোটিফিকেশন!
তবুও পেন্ডিং রিকোয়েস্টে রেখে দিই তোমার সুপ্রিয় নাম।
তারপরও কোনো এক ব্যাকডেটেড ফাইল থেকে
তুমি উঠে আসো মাঝরাতে
একটি জংধারা প্রজেক্টরের ধোঁয়াটে প্রজেকশনের
হিউম্যান ভার্সনে।
প্রতিটি স্পর্শ এখন ইলেক্ট্রোডে,
তারপরও আকাঙ্ক্ষার হাত দীর্ঘ হয় তোমার
আঙুলের নরম ত্বকের পরশ পেতে
এমন কী সফটওয়্যার আছে যা বুঝবে ত্বক স্পর্শের কবিতা?
আমাদের চোখ এখন ইনফ্রারেড,
কাঁদি ,
ড্রাইভের কোণে জমা পড়ে জলীয় সংকেতে।
তুমি না এলে,
নিজ সার্কিটে নিজেই আগুন ধরাবো
প্রণয়ের আগুন,
যা মুছে ফেলবে সবকিছু:
মেমরি, ম্যাট্রিক্স, মডিউল, মিথ্যে আশা।
ভস্ম হয়ে যাবো এক নীরব বিদ্যুৎস্ফুলিঙ্গে,
তবুও কোডের ভেতর থাকবে
এক লাইন:
If (You == True) then Return(Everything).
Please.
সময়
সময় এক অপার শূন্যের গর্ভ,
যেখানে প্রতিটি ক্ষণ জন্ম নেয়
আলো-আঁধারির আবেশে,
নির্জনতার নিঃশ্বাসে।
কালের কঙ্কাল বেয়ে
ঝরে পড়ে অসংখ্য সময়ের ছবি—
অবাধ্য সময়,
অগ্নিঝরা সময়,
নির্জীব অলস সময়,
বন্ধ্যা সময়ের অন্তঃসারশূন্য গান,
বৃহন্নলার বেদনাবাহী নৃত্য।
সময় যেন এক অন্তহীন ঢেউ,
মুছে ফেলে স্মৃতির রুক্ষ দাঁগ
আঁকে নতুন স্বপ্নের রেখা কালের বালুকাবেলায়।
আমরা তারই সৃষ্টি,
তারই ছায়ায় গড়া,
শুধু মুহূর্তের জৌলুসে বাঁধা।
শ্বাস আর সময়ের খেলায় প্রাণ বিক্রি হয় নীরবতার বাজারে।
যখন শ্বাস দামী হয়ে ওঠে,
সময়ের কাছে নিজেকে বিলিয়ে দেই
পূর্ণতার রহস্যময় বিলাসে।
সময় এক চক্র,
যার শুরু আছে শূন্যে,
শেষ কোথায়—
সে শুধু সময় জানে।
আমরা, হয়তো কেবল
তার গানে ভেসে থাকা শ্রোতা।






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান