
– নজমুল হেলাল
বাংলা ছড়া সাহিত্যে একটি আলোকিত নাম ড. ধনঞ্জয় সাহা। জন্ম ১৯৫৭ সালে এবং বেড়ে ওঠেন কুমিল্লা জেলার মোহনপুর গ্রামে। কবি ছোটবেলা থেকেই মেঘনা নদীর পাড়ে বড় হয়েছেন। নদীর পাশের সেই নিঃশব্দ প্রকৃতি, সূর্যাস্ত আর ভোরের নরম আলো তাঁর মনকে ছুঁয়ে যেত প্রতিদিন। পাখিদের কলরব, কুয়াশায় ঢাকা সকাল, আর নৌকার ধীরে ভেসে চলা দৃশ্য তাঁর শৈশবের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। এই প্রকৃতির ছোঁয়া থেকেই তাঁর মধ্যে গড়েওঠে এক গভীর ভাবনা ও অনুভবের জগৎ। মেঘনার তীরবর্তী সেই নির্জন পরিবেশ তাঁর চিন্তা ও কল্পনায় ঢেলে দিয়েছিল শব্দ, ছন্দ, আর সৌন্দর্যের এক অনুপম ভাষা। পরে সেই সব অনুভিতিই নানা রূপে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর কবিতায় ও লেখায়। প্রকৃতির সঙ্গে গড়েওঠা এই সম্পর্কই কবিকে করেছেন সহজ, সংবেদনশীল ও গভীর দৃষ্টিসম্পন্ন একজন কাব্যের মানুষ।
কবির ছড়া লেখার সূচনা ঘটে শৈশবেই, প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময়। ছড়ার সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক দীর্ঘ দিনের, সেই ছোটবেলার স্কুলঘরের বেঞ্চ থেকে আজ অবধি ছড়াই যেন তাঁর জীবনচর্চার একটি মৌল উপাদান। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ, ভারত ও আমেরিকা থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর চৌদ্দটি ছড়া ও কবিতার বই, যেগুলোর অধিকাংশই শিশুদের জন্য রচিত। এদের মধ্যে দুটি ইংরেজি ভাষায় লেখা, যা তাঁর ছড়া রচনার আন্তর্জাতিক বিস্তারের প্রমাণ।
ড. ধনঞ্জয় সাহার ছড়ার একটি মৌল বৈশিষ্ট্য হলো—এগুলো বিষয়ভিত্তিক এবং আপাত সরলতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে যুক্তি, তথ্য ও সমাজচেতনা। তাঁর ছড়ায় যেমন থাকে নৈতিকতা গঠনের প্রয়াস, তেমনি থাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, দেশজ সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষণ, স্বাধীনতা ও মানবতাবোধের নান্দনিক কাব্যিক প্রকাশ। সবকিছু তিনি তুলে ধরেন প্রাঞ্জল ও সহজ ভাষায়, যা শিশুমনের কাছে হয়ে ওঠে হৃদয়গ্রাহী। ২০২৫ সালের অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত তাঁর সর্বশেষ বই ‘সোনামণিদের ছড়া: দাঁতের যত্ন ও স্বাস্থ্য’ এই ধারারই একটি চমৎকার উদাহরণ। বইটির একটি ছড়ায় বলা হয়েছে:
“সব না মেনে ভুল করেছি
কেমনে এখন বাঁচি
হাত ধুইনি মাস্ক পরিনি
হচ্ছে কাশি-হাঁচি।”
এই চারটি পঙক্তিতে যেমন ভাষার স্বচ্ছতা রয়েছে, তেমনি রয়েছে স্বাস্থ্য সচেতনতার মর্মস্পর্শী বার্তা। শিশুদের উদ্দেশ্যে রচিত অধিকাংশ বইয়ের নামেই ‘সোনামণিদের ছড়া’ সিরিজ যুক্ত করে তিনি একজন দায়িত্বশীল লেখকের আন্তরিকতা ও ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন।
ড. সাহা ছড়ায় কেবল কাব্য বা বার্তা নয়, বরং চরিত্রও নির্মাণ করেছেন। তাঁর সৃষ্টি করা ‘টাবু’ নামের দার্শনিক-নীতিবাদী হাতি চরিত্রটি শিশুদের জগতে যুক্তির আলো ফেলেছে। ২০২৪ সালের বইমেলায় প্রকাশিত ‘টাবু’ বইটিতে এই চরিত্রটি আরও বিস্তৃতভাবে উঠে আসে। টাবু ছাড়াও রিমকি, ঝুমকি ও চুমকি চরিত্রগুলো এনে দিয়েছেন বিষয়বৈচিত্র্য এবং কল্পনাশক্তির খেলা। ‘টাবুর শাস্তি’ ছড়ায় দেখা যায়:
“টাবু রাগে বাবুর বাগে
দলে কলাগাছ
জেলের ছেলে দিঘির জলে
কলে ধরে মাছ।”
এছাড়াও ‘টাবুর ভাবনা’ ছড়ায় আছে শিশুমনের চিন্তার বিচিত্র ধারা:
“চিন্তা অনেক মনের ভেতর
ঝরছে মাথার ঘাম
ঝুমকি হেসে দিল এনে
চারটি পাকা আম।”
এইসব ছড়ায় শিশুদের মনের বিক্ষিপ্ত ভাবনা, প্রশ্ন ও কল্পনার অপূর্ব প্রতিফলন ঘটে। কিন্তু শুধু শিশু নয়, বড়দের মনকেও ছুঁয়ে যাওয়ার মতো ছড়া রচনা করেছেন ড. সাহা। যেমন, তাঁর ছড়াগ্রন্থ ‘অঙ্ক’-এ ‘শুভরাত্রি’ ছড়ায় পাই এক গভীর আবেগ ও আত্মিক সম্পর্কের রূপায়ণ:
“তুমি আমার দিনের সূর্য
রাতের কোমল চাঁদ
তুমি আমার বুকের সাহস
মাথার উপর ছাদ।”
প্রত্যেকটি বইয়ের শেষে ‘শুভরাত্রি’ শিরোনামে একটি ছড়া রাখার বিষয়টি আজ তাঁর লেখার একটি স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। এই ছড়াগুলোতে ‘গুড নাইট’ শব্দের ব্যবহারও লক্ষ্যণীয়—বাংলা শব্দের সঙ্গে ইংরেজি ভাবানুবাদ যুক্ত করে তিনি শিশুদেরকে দ্বিভাষিক শিক্ষার ভুবনে আলতোভাবে প্রবেশ করিয়ে দেন।
তাঁর ‘জীবজন্তু’ বইটি পড়লে দেখা যায়, ছড়ার মাধ্যমে ৩০টিরও বেশি প্রাণীর পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। যেমন একটি ছড়ায় লেখা:
“বোয়াল মাছের পেটে শেয়াল
আজব কথা নয়
এখন বুঝি নামতে জলে
কেন করে ভয়!”
এই ধরনের ছড়াগুলো একদিকে যেমন রসের সৃষ্টি করে, অন্যদিকে বাচ্চাদের কল্পনার জগতে এনে দেয় বাস্তবতার ছোঁয়া। প্রাচীন ইংরেজি সাহিত্যের ‘ননসেন্স রাইম’-এর সঙ্গে তুলনা করলেও ড. সাহার ছড়াগুলো কেবল সুর নয়, বরং অর্থও বহন করে। এ কারণেই তাঁর ছড়া সাহিত্যের মূল্য সময়ের সঙ্গে আরও বেশি করে বেড়ে উঠেছে।
তাঁর বইগুলোতে প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণে শিল্পমান বজায় রেখে কাজ করেছেন কলকাতার সুদীপ চক্রবর্তী এবং বাংলাদেশের মোঃ মহিউদ্দিন চৌধুরী (মোহন) ও আলমগীর জুয়েল। রঙের ব্যবহার, অলংকরণ ও চিত্রকলার সংযোজনে বইগুলো পাঠকের চোখেও আনন্দ দেয়।
বাংলা ছড়া সাহিত্যের ইতিহাসে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, যোগীন্দ্রনাথ সরকার, সুকুমার রায়, এমনকি চর্যাপদের লেখকদের স্থান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক তেমনি আধুনিক সময়ে ছড়ার বিষয়বস্তু ও দায়িত্ববোধের বিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যাঁরা ছড়া সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন, ড. ধনঞ্জয় সাহা তাঁদের অন্যতম।
শিক্ষাজীবনে তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যান। রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স এবং যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সারে থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি নিউইয়র্কের আলবার্ট আইনস্টাইন কলেজ অব মেডিসিন-এ রিসার্চ প্রফেসর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। প্রবাসে থেকেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চায় তাঁর অঙ্গীকার অব্যাহত রয়েছে। দেশ-বিদেশের পত্রপত্রিকায় তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয়, যা বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও মাতৃভূমির প্রতি তাঁর নিঃশর্ত ভালোবাসারই প্রতিচ্ছবি।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ড. ধনঞ্জয় সাহা কেবল একজন ছড়াকার নন—তিনি বাংলা ছড়া সাহিত্যের ধারায় এক নিরবচ্ছিন্ন সাধনার নাম। তাঁর ছড়ায় যেমন থাকে শব্দের খেলা, তেমনি থাকে হৃদয়ের গভীর আবেগ ও বোধের ছোঁয়া। তিনি আমাদের দেখিয়ে দেন—ছড়াও হতে পারে শিক্ষার বাহক, মূল্যবোধের পাথেয়, আর বিনোদনের সঙ্গেই চিন্তার উন্মেষ ঘটানোর শক্তিশালী মাধ্যম।
পাঠকের জন্য কবির কিছু ছড়া ও কবিতা সংযোজিত হলো
ছড়া
হাঁসের ছানা
ক্ষুধা পেলে পাখনা মেলে
দেখে আকাশ নীলে
ঝরে ব্যথা চোখের জলে
নদী, নালা, ঝিলে।
মাছের চোখে দেখে জীবন
অপলক তার দৃষ্টি
টাপুর টুপুর নূপুর তালে
পুকুর জলে বৃষ্টি।
শেওলাগুলো কেওড়া তলায়
মাথা গুঁজে ভিড়ে
হাঁসের ছানা গুটায় ডানা
মাকে খোঁজে তীরে।
হাঁসা আসে হাঁসী আসে
নিয়ে খানা-পিনা
আদর পেয়ে নাচে তারা
তিন-ধিনা-তিন ধিনা।
চালতা ফুল
বোলতা বলে চালতা খাবে
উঠলো উঁচু ডালে
বোলতাও খায় চুকো চালতা
শুনেছো কোন কালে?
সাদা ফুলের মিষ্টি গন্ধে
বোলতা দিশেহারা
ফুলের বাহার দেখে ঝরে
বৃষ্টি মুষলধারা।
ফুলের সুবাস মিষ্টি তবু
ফলটা কেন টক?
মাথা নেড়ে ধূসর মাকড়
হাঁটে যে মকমক।
বেঙের ডাক
নদে এলো বান
বর্ষা দেবীর গান
ভিজে সবুজ পাতা
আমার হাতে ছাতা
ছাতার উপর বেঙ
ঢেং ঢেঙা ঢেং ঢেং।
বেঙের ডাকে বৃষ্টি
এ যে অনাসৃষ্টি!
সত্যি
শিউলি গাছে ফুল ফুটেছে
পড়ছে ঝরে তলে
টুনটুনিটা ঠুনঠুনিয়ে
সত্যি কথা বলে।
ভোরের রোদের নরম আঁচড়
জুড়িয়ে দেয় প্রাণ
গ্রামের বাঁকা মেঠো পথে
বৈরাগী গায় গান।
ফুলের গন্ধ ছড়ায় যেমন,
মহৎ কর্ম ভালো;
সত্যি কথা, সঠিক বন্ধু
জীবন করে আলো।
কবিতা
প্রেম ভালোবাসা
তুমি বলো প্রেম, তটিনী তরঙ্গী
একে বেঁকে পসারে পাহাড় উৎরাই
বিগলিত কলকল কৃষকের নিচ্ছিদ্র আলে
এপার ওপার উপচে উজান ভাটি
দিবা-নিশি, রাত-দিন
সাগরে মিশেই অস্তিত্ববিহীন।
আমি ভাবি ভালোবাসা পিঙ্গল পাহাড়,
বৃষ্টি ঝড়ে রৌদ্র ছায়ায় দুরন্ত
তু্মি অমোঘ পাহাড়, আমি বৃষ্টি ঝড়ে ক্লান্ত
দুর্যোগে আশ্রয় তোমারই গহ্বরে
তুমি মেঘ আমি কখনো পাহাড়
হোক না গুহাটি যতোই আঁধার।
ভালো থেকো
তীর্থ ছিলো আমার মনে ছবির মতো মেলা
চোখের সাথে মনের মিলন
হৃদয় বানে বাক্য বাঁধন কবির হোলি খেলা।
চাইনি আমি খাট পালঙ্ক মোতি সোনার তাগা
ঠাণ্ডা বাতাস নাই বা ছিলো, দিতে পারতে
তালের পাখা, টিন চেয়ারে একটু বসার জা’গা।
ঘিয়ের প্রদীপ লাল গালিচার ছিলো না প্রত্যাশা
বেলি ফুলের মালা চাইনি
পারতে দিতে বাগান পোড়া হলুদ গাদা
মুক্ত মনের এক লহমা একটু হাসির ছিটকে ভালোবাসা।
দিলাম পাড়ি হাজার খাড়ি ছন্ন ছাড়া আশায়-আশায়
জঠর টানে অন্ধ আমি ইচ্ছে ছিলো বলবো সাজে
সুজন পাড়ে ভিড়ের মাঝে আমার মায়ের মিষ্ট ভাষায়
বলে কবি চলে এলে ডাকল কে যে পিছে আবার
বসতে হবে সবুজ ঘাসে লাল গালিচায়
খেতে হবে পাটি পেতে সোনার পাতে ব্রীক লেনের খাবার।
জনে-বসনে পাটাতনে রইলো মনে শুভ্র আশা
লেখার মাঝে লুকিয়ে রাখি সাদা বেলির কঙ্ক মালা
ভাষা তুমি থেকো সুখে – তোমার জন্য রেখে গেলাম
ভোরের বাতাস হলুদ গাঁদার গন্ধে-সতেজ বরনডালা।
হারিয়ে যাওয়া
যেমনি পাখায় পুকুর জলে
বেয়ে ওঠে হাঁসের ছানা
দূরের হাওয়া দাঁড় টেনে যায়
নীলের মাঝে সলমা সাদা
উদক যেমন ধীর সাগরে
হাওয়ায় দুলে আছড়ে পড়ে কার্ফা লয়ে
সাগর পারে বালির সাথে সন্ধি করে
লুকায় বুকে স্নিগ্ধ স্নেহে শঙ্খ চিলে
নগ্ন পায়ে শেওলা মাখা পুকুর পাড়ে
শামুক হাঁটে আলতো পায়ে।
সূর্য বেলা দিনের শেষে লালের আভা
যেমনি ছড়ায় ঢেউয়ের চূড়ায় নদীর জলে
তেমনি তুমি হৃদয় তলে আবির মেখে
একটু হাসির ঝিলিক তুলে যাও তলিয়ে
আমার বুকের উষ্ণ হাওয়ায়
চোখের তারায় ওই সুদূরে।
যেখান থেকে সাদা মেঘের পালকগুলো
আঁকে চোখে স্বপ্নগুলো মেঘের পাখায়
পাহাড়গুলো ভেসে বেড়ায়
যেমন ভাসে মেঘের তুলো
ছন্দে আমার ভাবনাগুলো গন্ধে-ভরা শিউলি তলে
শয্যা পাতে ঝরা ফুলের ঝিক প্রলেপে
শীতের শিশির চোখের পলে
যেমনি শালিক সেই দুপুরে শামুক কুড়ায়
আমার চোখের আন পুকুরে।
তেমনি তুমি স্নিগ্ধ চোখে,
দখিন হাওয়ায় খোলা চুলে
বিলি কেটে দাড়াও পাশে মনের ভুলে
আলতো ছোঁয়ায় আমি ভুলি
সং সাগরে মেঘের তারায় রঙের তুলি
ধুত সাগরের সব ব্যবধান এমনি চুকে
অলস পায়ে একটু দূরে আকাশ গানের মেঘলা সুরে
ভালোবাসায় ঋদ্ধ আমি যাই হারিয়ে তোমার বুকে






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান