তমিজ উদ্‌দীন লোদী: কবি ও কবিতার প্রতীক

কবিতা হলো এক শৈল্পিক দ্যুতি, যেখানে অনুভূতি, চিন্তা এবং সমাজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এক সাথে প্রাণবন্ত হয়। এটি হৃদয়ের নীরব স্পন্দন, যেখানে আবেগ শব্দের রূপে ফোটে, আর চিন্তারা বিস্তৃত অনন্তের খোঁজ পায়। কবিতার প্রতিটি ছন্দ, প্রতিটি রূপক, প্রতিটি ব্যঞ্জনা পাঠকের দৃষ্টি নতুন দিশায় ঘুরিয়ে নিয়ে যায়। কবিতা শক্তি দেয়- নীরব প্রতিবাদ, ভালোবাসার উষ্ণতা, এবং মানবিক সংবেদনকে উজ্জীবিত করার। এটি কেবল কাগজে লেখা নয়, বরং মানুষের অন্তর ও মননে দীপ্তির সন্ধান সৃষ্টি করে। সত্যিকারের কবিতা পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে, অনুভব করতে শেখায়, আর জীবন ও সমাজকে নতুন দৃষ্টিকোণ । যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন:
“কবিতা হলো মানুষের অন্তরের অমোঘ সত্যের প্রকাশ।

কবি তমিজ উদ্‌দীন লোদী বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যিনি কেবল শব্দের খেলায় নয়, মানব জীবনের সমস্ত আবেগ, বেদন, আশা এবং সামাজিক সচেতনতার প্রতিফলন নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁর কবিতার ভাষা কেবল কথার আবরণ নয়; এটি অনুভূতির প্রতিচ্ছবি, যেখানে সুখ ও বেদনা মিলেমিশে একটি অভিজ্ঞতার সেতু গড়ে তোলে। সমাজের অন্তরঙ্গ বাস্তবতা, অবচেতন মানবিক আবেগ, সবই কবিতার ভেতর আলো পায়। তাঁর কবিতা পাঠকের হৃদয়কে সরাসরি স্পর্শ করে। প্রবাসী জীবন, মানবিক মূল্যবোধ, সমাজের অসঙ্গতি এবং প্রকৃতির অনুপ্রেরণা, এসবই তাঁর কবিতার মূল কাব্যিক প্রয়াস।

তমিজ উদ্‌দীন লোদী জন্মগ্রহণ করেন ১ জানুয়ারি ১৯৫৯, সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলার মাথিউরা গ্রামে। গ্রামীণ পরিবেশ, নদী, আকাশ, মাঠ এবং বৃক্ষ, এসবই তাঁর কাব্যিক চোখকে শৈশব থেকেই প্রশিক্ষণ দিয়েছে। মাটির গন্ধ, বৃষ্টির ছন্দ, গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন জীবন, এসবই তাঁর হৃদয়ে কবিতার বীজ রোপণ করে। তিনি লিখেন;
““শিশুর হাতের মাটির খেলার গান
এলোমেলো বৃষ্টির সঙ্গে মিশে যায়,
হৃদয়ের আকাশে সূক্ষ্ম নীল রঙ হয়ে ওঠে।”

এই লাইনগুলোতে দেখা যায়, ছোটবেলার অনুভূতি তাঁর কবিতার অমূল্য পাথেয় হয়ে গেছে। প্রতিটি শব্দে প্রকৃতি, স্মৃতি এবং মানুষের অভ্যন্তরীণ অনুভূতির মিলন স্পষ্ট। পেশায় প্রকৌশলী হলেও কবিতা তাঁর জীবনের অভ্যন্তরীণ চেতনার প্রকাশ।

আশির দশক ছিল বাংলাদেশি কবিতার ইতিহাসে এক অনন্য আলোকচ্ছটা, যেখানে কাব্য কেবলমাত্র শিল্পকলার অনুশীলন হয়ে থাকেনি, বরং রাজপথের গর্জন, প্রতিরোধের আগুন ও স্বপ্নময় ভবিষ্যতের দ্যুতি হয়ে উঠেছিল। এ সময়ের কবিরা অন্ধকারাচ্ছন্ন শাসনের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তুলেছিলেন কবিতার ভাষায়, যেখানে শব্দরাশি রূপ নিয়েছিল সংগ্রামের স্লোগানে, ছন্দে ছন্দে ধ্বনিত হয়েছিল মানুষের মুক্তির দাবি। এই উত্তাল সময়ে আবির্ভূত হন কবি তমিজ উদ্‌দীন লোদী। তিনি কবিতার মর্মকে শুধু নন্দনের সৌন্দর্যে আবদ্ধ রাখেননি, বরং তাকে যুক্ত করেছেন সময়ের দুঃখ, প্রতিবাদ ও সম্ভাবনার দীপ্তিতে। তাঁর কবিতায় আমরা পাই যন্ত্রণাক্লিষ্ট মানুষের কণ্ঠস্বর, বঞ্চিতের হাহাকার, আবার পাই স্বপ্নের সবুজ শস্যক্ষেত, যা মুক্ত আকাশে উড়তে চায়। আশির দশকের কাব্যভূমি ছিল যেন এক উর্বর মাটি, যেখানে তমিজ উদ্‌দীন লোদীর মতো কবিরা রোপণ করেছিলেন প্রতিরোধ ও সৃজনের বীজ। তাঁর কাব্য হয়ে ওঠে শুধু ব্যক্তিগত অনুভবের আখ্যান নয়, বরং সামষ্টিক চেতনার উচ্চারণ। তাই আশির দশক আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, কবিতা কখনো কেবল কাগজের বুকে সীমাবদ্ধ থাকে না, সে রাজপথে ঝংকার তোলে, মানুষের অন্তরে আলো জ্বালে, আর ইতিহাসের অন্ধকার ভেদ করে সৃষ্টি করে এক নতুন ভোর।

গত দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে কবি তমিজ উদ্‌দীন লোদী যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী জীবন অতিবাহিত করছেন। প্রবাসের এই দীর্ঘ সময় তাঁর কবিতাকে দিয়েছে নতুন মাত্রা, দিয়েছে অন্তর্দৃষ্টির ভিন্ন দিগন্ত। তাঁর কবিতায় প্রবাস জীবনের নিঃসঙ্গতা ও আত্মসংলাপ একদিকে যেমন স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তেমনি ধ্বনিত হয় প্রেমের নিবিড় সুর, সমাজের অসঙ্গতির প্রতি ক্ষুরধার প্রতিবাদ, আর মানবিক বেদনার গভীর উপলব্ধি।
জীবনের বহুমুখী অভিজ্ঞতা থেকে তিনি নির্মাণ করেছেন স্বকীয় কাব্যভাষা, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় অনুভূতির এক অনন্য সম্মিলন। তাঁর কবিতায় সময়ের অন্তরঙ্গ রূপ যেমন ধরা পড়ে, তেমনি উন্মোচিত হয় জীবনের ছায়াময় দিক ও সমাজের অন্ধকার বাস্তবতা। এই দ্বৈত স্রোতের ভেতর দিয়েই তাঁর কবিতা পেয়েছে অভিনব এক কাব্যিক আকর্ষণ, যেখানে বিষাদ মিলেমিশে যায় আশার আলোয়, প্রতিবাদ রূপ নেয় নন্দনের সৃজনে। ফলে তাঁর কাব্য শুধু পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করে না, বরং মানব-অস্তিত্বের গভীরে প্রশ্ন তোলে, আলোড়ন জাগায়।

কবির কবিতায় সময়ের ঘনিষ্ঠ চিত্র, তিনি কেবল জীবন নয়, তার ছায়াময় দিক এবং সমাজের অসঙ্গতি ফুটিয়ে তোলেন। তাঁর কবিতায় রয়েছে অভিনব এক কাব্যিক আকর্ষণ। যেমন;
“রাত দৌড়াচ্ছে দিনের পেছনে আর দিনের পেছনে রাত
বৃক্ষের মতো জীবন চৌচির হচ্ছে, যেন করাত
কেটে নিচ্ছে সমস্ত সুষমা
আমরা প্রতীক্ষায় আছি কখন কাটবে এই অমা।

এই লাইনগুলোতে জীবন, সময় এবং মানুষের অস্তিত্বের চিরন্তন দ্বন্দ্ব ফুটে ওঠে।

প্রবাসী জীবনের একাকিত্ব ও দূরত্বের বেদনা তিনি কবিতায যেভাবে চিত্রায়িত করেছেন সেগুলোর মধ্যে যদি এই পংক্তিটি পড়ি তাহলে বুঝতে পারবো কবির ভেতরের গভীর কাব্যবোধের অপরিমেয় নন্দনত্ত্ব, যেমন;
“হাডসন স্ট্রিটের রাত
একাকী পায়ের শব্দে ভরে ওঠে শহরের নিঃশ্বাস,
দূরপ্রবাসী চোখে চেয়ে থাকে
হারানো মাটির স্মৃতি।”

এইসব কবিতা শুধু শিল্পকর্ম নয়; তা সমাজ সচেতনতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং অভিজ্ঞতার অন্তর্দৃষ্টি জাগিয়ে দেয়। তাঁর কবিতায় প্রেম ও প্রকৃতির সংমিশ্রণ যা একত্রিত হয়ে জীবনের সৌন্দর্যকে উদ্ভাসিত করে। এই সংমিশ্রণ পাঠককে আবেগ ও কল্পনার এক অনন্য ভুবনে নিয়ে যায়।
নানা রঙের প্যারাশূট কবিতার একটি অংশে তিনি লিখেছেন;
বাতাসে ভেসে আসে শিশিরের গন্ধ,
পাখির ডাক মিলেমিশে যায় হৃদয়ের গোপন খুশির সাথে,
আমরা বসে আছি নদীর ধারে,
রঙের প্যারাশূটের মতো উড়ছে আমাদের স্বপ্ন।”

চিত্রকল্প এবং শব্দের সূক্ষ্মতা মিলিত হয়ে তাঁর কবিতাকে স্বাতন্ত্র্য প্রদান করেছে। তাঁর কবিতার ভাষা সারল্য বলে তা পাঠক মনে সরাসরি গভীরভাবে স্পর্শ করতে সক্ষম হয়।
তিনি সম্প্রতি লন্ডনে বেড়াতে এসে টেমসের পারে বসে লিখেন টাওয়ার ব্রীজ নিয়ে:
এটি নদী নয়, এটি ‘নদী’র একটি ধারণা,
ইট-লোহা-কংক্রিটের ভাষায় লেখা এক জিজ্ঞাসা।
টাওয়ার ব্রিজ , এক গাণিতিক সমীকরণ,
যার অঙ্গে জড়িয়ে আছে অস্তিত্বের অবসাদ।

এই কয়েকটি পংক্তি আধুনিক কাব্য-প্রতীকের এক অভিনব প্রয়োগ। এখানে ‘নদী’ আর নদী নয়, বরং প্রকৃতি ও স্মৃতির এক বিমূর্ত ধারণা, যা নগর সভ্যতার ইট-লোহা-কংক্রিটে বন্দি হয়ে পড়েছে। কংক্রিটের ভাষা হয়ে উঠেছে প্রশ্নের, কিংবা অস্তিত্বের নিঃসঙ্গ জিজ্ঞাসার বাহন। কবি তাঁর কাব্যবলয়ে নির্মাণ করেছে অসাধারণ কবিতা, যেখানে কল্পচিত্র এবং দৃশ্যমান চিত্রে তুলে ধরেছেন প্রকৃতি ও নগরায়ণের দ্বন্দ্ব । টাওয়ার ব্রিজ দাঁড়িয়েছে যান্ত্রিক সভ্যতার প্রতীকী দেয়াল হয়ে। তাকে গাণিতিক সমীকরণের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যা কাঠামোর দৃঢ়তায় মানুষকে বিস্মিত করলেও, তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে যান্ত্রিকতার ক্লান্তি ও জীবনের অবসাদ।

কবি তাঁর একটি কবিতায় প্রতিশ্রুতি ভাঙা নিয়ে স্বজন, রাজনীতি্ এবং সময়কে দায়ি করে বলেন;
“সকালে আসবে বলেছিলে তারপর বিকেল ,
সন্ধ্যা তুমি বললে খুব ব্যস্ত , ব্যস্ততা কাটলেই…
আমি জানি আমরা মানুষ থেকে ক্রমশ রোবট হচ্ছি
প্রতিশ্রুতির বিপরীতে হাঁটছি পথ
যেন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি ভাঙবো বলেই
কোনো কোনো দেশের রাজনীতি বিষয়ক নেতাদের মতো”
এই কবিতায় কবির অনুভূতি মূলত বিচ্ছিন্নতা, হতাশা ও অসহায়তার মিশ্রণ।
তিনি চাঁদকে ও প্রিয়জনকে সমান্তরাল দেখিয়েছেন, যারা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, কিন্তু পূর্ণ হচ্ছে না।
কবির চোখে মানুষ ক্রমশ যান্ত্রিক, রোবটের মতো হয়ে যাচ্ছে।
প্রতিশ্রুতির ভাঙা, বাস্তবের ব্যস্ততা ও সমাজের প্রতারণা, রাজনীতিকদের প্রতিশ্রুতি সবকিছুরই প্রতিফলন দেখা যায়। যা সময়ের অমোঘ গতিবেগকে তিনি গভীরভাবে চিত্রিত করেছেন।

কবি তমিজ উদ্‌দীন লোদী্র আধুনিক বাংলা সাহিত্যে প্রতীকবাদী ব্যঞ্জনা, মানবিক দৃষ্টি, দূরদর্শী কল্পচিত্র এবং হৃদয়নিবিড় বাকভঙ্গির জন্য স্বাতন্ত্র্যপূর্ণ। তিনি জীবনের সুখ–দুঃখ, প্রবাসের শূন্যতা, সমাজের অসঙ্গতি এবং মানুষের অন্তর্দৃষ্টির দিকে পাঠককে টেনে নেন। তিনি কেবল একজন কবি নন; তিনি বাল্যকাল থেকে গড়েওঠা অনুভূতি, সমাজের অসঙ্গতি এবং মানুষের অন্তর্দৃষ্টির এক প্রক্ষিপ্ত রূপ। তাঁর কবিতা শব্দের সরোদ-উঠোনে সচকিত, হৃদয়ের গভীরতার বেদনার প্রকাশ এবং মানুষের প্রতি গভীর সহমর্মিতার আয়না।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বসবাসরত কবি প্রবাসী বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে সক্রিয়। তিনি বিভিন্ন বাংলা পত্রিকা ও সাহিত্য সংকলনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন, যেখানে প্রবাসী জীবনের অভিজ্ঞতা, তাঁর কাজ প্রবাসী সমাজে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাহিত্যিক অনুপ্রেরণা প্রদান করেছে। তমিজ উদ্‌দীন লোদী বাংলা সাহিত্যের এক বিশ্বস্ত জায়গজুড়ে আছেন। তাঁর কবিতা কেবল শিল্পকর্ম নয়; তা জীবন, প্রবাস, সমাজ সচেতনতা এবং মানবিক মূল্যবোধের এক শক্তিশালী প্রতীক। প্রতিটি লাইন, প্রতিটি চিত্র, প্রতিটি শব্দ পাঠককে মানব জীবনের গভীরতার অনুভূতি দেয়। তাঁর কবিতা বাংলা সাহিত্যের অম্লান অংশ হিসেবে চিরকাল উজ্জ্বল থাকবে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে কাজ করবে।

তমিজ উদ্‌দীন লোদী্র প্রকাশিত গ্রন্থসমূহের মধ্য অন্যতম : কবিতা: কখনো নিঃসঙ্গ নই (১৯৮৫), এক কণা সাহসী আগুন (১৯৯২), নানা রঙের প্যারাসুট (১৯৯৭), চাঁদভস্ম (২০০৪), আমাদের কোনো পাতেরো ছিল না (২০১২)
গল্প: হ্রেষাধ্বনির বাঁকবদল (২০০৩), নিরুদ্দিষ্টের জলাবর্ত (২০০৫), হাডসন স্ট্রিটের সুন্দরী এবং (২০০১)
অনুবাদ: শতাব্দীর সেরা আমেরিকার নির্বাচিত গল্প (২০০৩)।


কবি তমিজ উদ্‌দীন লোদী্র কবিতা

টেমস, জল ও টাওয়ার ব্রিজ

এটি নদী নয়, এটি ‘নদী’র একটি ধারণা,
ইট-লোহা-কংক্রিটের ভাষায় লেখা এক জিজ্ঞাসা।
টাওয়ার ব্রিজ , এক গাণিতিক সমীকরণ,
যার অঙ্গে জড়িয়ে আছে অস্তিত্বের অবসাদ।
এই জলে প্রতিফলিত হয় না চাঁদ,
প্রতিফলিত হয় চাঁদ–এর এক ডিজিটাল ছায়া,
আর তার মুখ, যা
একটি ফিল্টার–চোখে–দেখা–না–যাওয়া–রূপকথা।
লাল বাসগুলো পিক্সেলের মতো ভেসে যায়,
পথচারীদের পায়ের শব্দ এমপি৩ ফরম্যাটে সেভ হয়ে থাকে।
ব্রিজের পাতে পাতে জমে থাকে
কম্পিউটার–জেনারেটেড–কুয়াশার বিভ্রম ।
আলোকসজ্জায় ভেসে যায় জল
কখনো দু’ভাগ হয়ে যাওয়া টাওয়ার ব্রিজ জলযানে কাঁপে
অভূতপূর্ব সৌন্দর্যে ভেসে যায় টেমস , দু’পারের বিভা


প্রাচীন শহরের ছায়া

ফুটপাথে জমা হয় আলোর রেশ,
টেমসে ভাসে ইতিহাসের গন্ধ—
রাজতন্ত্রের ছায়ায় আধুনিকতা,
চার্চের ঘণ্টায় মিশে যায় ব্লুজের ছন্দ।
আন্ডারগ্রাউন্ডে ক্লান্ত পায়ের শব্দ,
লাল বাসগুলো সময়ের স্পর্শে জরাজীর্ণ,
বিগ বেনের কাঁটায় আটকে আছে
কত অচেনা মুখের অস্থির চিহ্ন।
রিচমন্ড পার্কে পড়ে থাকে শরৎ,
পাবের গ্লাসে জমে রাতের অবসাদ,
লন্ডন চোখ বুজলে দেখে—
নিজেকে একা, অথচ অগণিতের মাঝে সমাধিস্থ।


মানুষ যখন শান্তির অনুগামী

মানুষ যখন শান্তির অনুগামী
তখনো তুমি আঁধারেই আছো , খিস্তিতে আছো
টেনে আনছো রক্তপাত
বিচরণ করছ বুনো বনাঞ্চলে
চর্চায় আনছো গোখরো সাপ, হায়েনার অট্টহাসি
তোমার চর্চায় নেই হরিণ কি জিরাফ কিংবা জেব্রার শোভনতা
নিয়ত তোমাকে তাড়া করে কালো বানর কিংবা বাঁদুড়ের অভিশাপ
তুমি হা করলেই বেরিয়ে আসে বিষাক্ত নিঃশ্বাস
যেন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিবে চারপাশ ।


নিউইয়র্কে গ্রীষ্মকাল

কে যেন সংগোপনে খুলে দিয়ে গেছে হাইড্রান্ট
গল গল নেমে যাচ্ছে জল অবিরাম
কালো-শাদা-শ্যামলা কি পীতাভ ছেলেরা মেয়েরা
নেমেছে রাস্তায়
খেলাচ্ছলে এ ওর হাত কি শরীর ছুঁয়ে দিচ্ছে ।
বিশুষ্ক শাখা থেকে বেরিয়ে এসেছে কুঁড়ি
খুব দ্রুত ভরপুর হয়ে উঠবে সবুজ
রোদ্দুরে উষ্ণতা ছড়াবে আবারো ।
খুলে যাবে যা কিছু আচ্ছাদিত সব
খুলে যাবে হাওয়ার সিম্ফনি
জড়তা জাঢ্য ঝেড়ে
পাখি হবে,পাখসাটে উড়ে যাবে তারা
উষ্ণতা উষ্ণতা ছড়াবে ঠাণ্ডা হাওয়া থেকে ।
হাইড্রান্ট খুলে গেছে যাক
ছেলেরা মেয়েরা নামবে উড়ন্ত রাস্তায় ।


প্রতিশ্রুতি

আমার জানালায় একটি চাঁদ গড়াগড়ি খায়
ভাঙাচোরা মুখ তার, খানিকটা ম্লান
মাঝে মাঝে আসবে বলেও আসে না
যেমন তুমি
সকালে আসবে বলেছিলে
তারপর বিকেল , সন্ধ্যা
তুমি বললে খুব ব্যস্ত , ব্যস্ততা কাটলেই…
আমি জানি আমরা মানুষ থেকে ক্রমশ রোবট হচ্ছি
প্রতিশ্রুতির বিপরীতে হাঁটছি পথ
যেন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি ভাঙবো বলেই
কোনো কোনো দেশের রাজনীতি বিষয়ক নেতাদের মতো !


রেলিংবিহীন কড়িকাঠ

তুমি খুব পরিকল্পিত উপেক্ষার অনাদরে ভরে তুললে চারপাশ।
অথচ আমি দার্শনিকতাঋদ্ধ অনস্তিত্বের মাঝখানে খুঁজে ফিরছি
অস্তিত্বের অবয়ব।

জীবন যেন রেলিংবিহীন কড়িকাঠ। তবু কেন মনে হয় তুষার শীতল
ট্রাউট মাছের স্রোতস্বিনী বয়ে যাচ্ছে হৈ হৈ করে। চোখের পাতা কাঁপছে।
ঠোঁটে বাঙ্ময় হয়ে উঠছে এক অজানা শিস। ভেঙেচুরে আলোকিত রাস্তায়
লাফিয়ে নামছে বেড়ালের মতো জীবন আর অন্ধকারের ভেতর চুম্বন।

পরমাণুও ভাঙছে। ভাঙতে ভাঙতে কোথায় যে যাচ্ছে তারা! জীবনের কিংবা
মৃত্যুরও অধিক কোনো বোধে।কোনো কাঁচে।
কিংবা টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়া এঁটেল মাটির মধ্যে
সেঁটে থাকা জীবাশ্মের ভেতরে ছলকে ওঠা
স্বপ্নাণুতে! কিংবা সময়হীনতার ভেতরে- কে জানে।

তবু গড়িয়ে নামছে জল। উড়ন্ত সীগালগুলো অনন্ত নীলে।
নক্ষত্র থেকে নক্ষত্র অবধি পরিব্যাপ্ত বিকিরণগুলি
অনন্ত সিম্ফনির মতো নেমে আসছে দৈনন্দিনতায়
প্রাত্যহিকে।তবে কি পৃথিবী পরিণত হবে সরাইখানায়-
আনন্দে অথবা স্তব্ধতায়।
ঠাহরের বাইরে যতই লাফাক ঘোড়াগুলি।
কিংবা উঠে যাক শূন্যের উপর।
উষ্ণতা তবু পাশ ফেরে শুবে- জীবনের জ্বলজ্বলে শার্সি ভালোবেসে।
জীবন যেন একটি জ্বলন্ত চূলো- অন্ধকার ভেদ করে
চুল্লীর স্তূপ থেকে উঠে আসা একখণ্ড জ্বলন্ত কাঠ।



শাদা ও সংক্রামক

চক্ষুষ্মানেরাও কালো পর্দার আড়ালে সরে গিয়ে দেখছিল
মানুষের বিবর্তিত হাত, পা ও জননেন্দ্রিয়
ঈপ্সা ও ঈর্ষার কোলাহল।

ভবিতব্যের রহস্য থেকে উত্থিত ধোঁয়াশা কেটে যাবার পর
যারা প্রজ্ঞা ও নৃতত্ত্বের কাছে আশ্রয় নিয়েছিল
তারাই আমাদের বলেছিল- এটাই ধুলোহীন পথ।

আমরা কার্বনগ্যাসের ধোঁয়া সরিয়ে যখন বেরিয়ে এলাম
তখনই দেখতে পেলাম শুধু চক্ষুষ্মানই নয়
অন্ধরাও দাঁড়িয়েছে ধূসর জলে
এ যেন সারামাগোর অন্ধত্বের মতো শাদা এবং সংক্রাম।

পাঁকের ভেতর আটকে আছে পা
কিছুই দৃশ্যমান নয়-শাদা কি কালো অন্ধত্বের
রাশ ক্রমশ বিস্তারিত-আমাদের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে ক্রমাগ্রসরমান।
আমাদের দৃশ্যমানতা
অদেখা সেলুলয়েডের ছবির মতো
প্রায়ান্ধ কি অন্ধ চোখের থেকে শুধু সরে সরে যায়।


কবিরা পিউরিটান হলে

কবিরা পিউরিটান হলে চন্দ্র থেকে খসে পড়বে

কাঁকড় ও পাথরের কণা বিস্ত্বত বাগানে ছোপ ছোপ সবুজ থেকে
উড়বে শুঁয়োপোকা নীল জল ঘোলা হবে
হাঙরেরা খুব চুপচাপ উঠে আসবে ডাঙায় ।

কবিরা রাজসিক হলে কাগজের শুভ্রতা ঘুচে আর উঠে আসবেনা
কোনো প্রান্তিক চাষির বয়ান
করডাইটের গন্ধ-ভেজা যুদ্ধের দিন
খুব পানসে হয়ে উঠবে ভাজা ভাজা মাঠ-খরাপোড়া ফাটলের ভাঁপ।

কবিরা নির্লিপ্ত হলে বিমূর্ত হয়ে উঠবে কবন্ধ-লাশ
আর বর্জ্য ঘেরা নদীর ব্যর্থতা, চারিয়ে-ওঠা লোভ আর মাৎস্যন্যায়ের খোলামেলা দিন।
খুব নীরবে বসন্ত যাবে-
ভীষণ ভীষণ ব্যর্থ হবে ভালোবাসা, ‘ফুল ফোটবার’ দিন।



জুডাসেরা জানে না
(মৃত্যুহীন প্রাণ কবি বেঞ্জামিন মলোয়সীকে স্মরণে রেখে]

জুডাস জানেনি। জুডাস জানে না।
তারা জানবে না কোনোদিন- মৃত্যুও অমরতা এনে দেয় বোধের অধিক
যীশুরা অকুতোভয়, চিরকাল যূপকাষ্ঠে দাঁড়িয়েছে হেসে।

পুঁজির পাঁজর ঘেঁষে জুডাসেরা চিরকাল নতজানু হয়
বাণিজ্য বাণিজ্য খেলে –
মানবতা পায়ে দলে বার বার স্ফ্রিংসের শিয়রে দাঁড়ায়।

জুডাস দেখেনি
জুডাসেরা দেখবে না কখনো
কীভাবে নতুন যীশুরা মৃত্যুকে ভালোবেসে অমরতা পায়।
যীশুর মতোই মৃত্যুকে তুড়ি মেরে
একাধিক মলোয়সি গলদেশে দড়ি পড়ে নেয়।

ফ্যাসিষ্ট টিকেনি কখনো
টিকেনি বোথাও কালো মানুষের দেশে
পৃথিবীতে মলোয়সি ম্যান্ডেলারা আসে-কালোহীন শাদাহীন
মানবতা, দেশ ভালোবেসে।


বাঘ দেখার প্রতীক্ষায়

সূর্যাস্ত পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করতে চাইলাম।
ইতোমধ্যেই আমরা পদছাপ ও কিছু উচ্ছিষ্টের সন্ধান পেয়েছি
লোমের ইতিহাস তো আমাদের জানাই ছিল তবু আমরা কিছু লোমও আবিষ্কার করে ফেলেছি- এখন শুধু গন্ধের অপেক্ষা।

আমরা জ্যোৎস্নাকে ফেলে এসেছি সার সার কাঁটা গুল্মের ভেতর
তক্ষকের ডাককেও পরোয়া করিনি
আমদের অতিক্রম করে গেছে এক ঝাঁক মায়া হরিণ
ভীত, সন্ত্রস্ত
আমরা পা ফেলছি সতর্ক ও নৈঃশব্দের ভেতর।

আমরা সর্বোচ্চ ঔৎসুক্যে চোখ সেঁটে রাখছি
ক্রমশ ধৈর্য্য পলকা হয়ে আসছে
তবু আমরা ঊর্ধ্বাকাশ থেকে বোয়িং নামার মতো কৌতূহলে
দম বন্ধ করে আছি।

অথচ আমাদের প্রতীক্ষাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে
যারা পাশ কাটিয়ে চলে গেল
তারা বুড়ো-ধাড়ি কয়েকটি শৃগাল ব্যতীত আর কিছুই নয়।


প্রিয় শিল্পীকে

যে কটি তুলির টানে তুমি ক্যানভাস ছুঁয়ে ছিলে
তাই দেখো বিমূর্ত-
জলরং কিংবা এক্রিলিকে তুমি আমার আমিকে যদি আঁকো
তবে কি ঠিক ঠিক আমাকেই বোঝা যাবে?

আমার ভেতরে যে ক্রোধ যে ঈর্ষা যে প্রতিশোধপরায়ণতা
যুগপৎ আলো ও অন্ধকারের খেলা
তোমার তুলির ভাষায় ঠিক ঠিক বাঙ্ময় হবে?
শূন্যতার অদ্ভূত আদলে ভরে আছে যে হৃদয়
সে হৃদয় উঠে আসবে তোমার তুলিতে?

যে দগ্ধতা যে আঁচ এসে ঝলসে দিয়েছিল আমার বোধ ও বিস্ময়
যে করুণ আর্তনাদ আমাকে বিদ্ধ করেছিল
বিপন্ন আমার বুক থেকে বেরিয়ে এসেছিল একটি দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস
তা কি তুমি তুলে আনতে পারবে তোমার যে কোনো মাধ্যমে।

আমার হাত ফসকে বেরিয়ে গেছে অধিকারবোধ
বিধ্বস্ত যুদ্ধের শেষে একমাত্র সম্ভল যে স্বপ্ন
সেই স্বপ্নটুকু তুমি একবারও ফিরিয়ে আনতে পারো তোমার তুলিতে!

আমার ভেতরে একটি স্বাপ্নিক ঘোড়া দৌড়য় অবিরাম
তার হ্রেষাধ্বনিতে আমার রক্তে যে প্রবাহ নামে
সেই প্রবাহ একটিবারের জন্য নামুক
আমার স্ব্প্ন কি বোধে- জলরঙে অথবা এক্রিলিকে।


অরণ্য ও মৃত্তিকার গন্ধে সে আপ্লুত

অরণ্যের শ্বাস নেয় সে—
মাটির গন্ধে জড়ায় রোমাঞ্চ,
অথবা হয়তো শুধুই এক ভ্রম:
প্রকৃতি নামক মিউজিয়ামের ডিওডোরান্ট
কাঠের শরীরে প্লাস্টিকের শিরা,
পাতার ছায়ায় লেড-র আলো—
কোন বন? কোন মাটি?
ফেসবুকের প্রোফাইল পিকের মতো সবুজ।
গন্ধটা আসলে কোথায়?
শহরের ফুটপাথে বিক্রি হয়
“ওড অফ আর্থ” নামের পারফিউম—
বোতলে বন্দি আদিমতা।
সে কি তবে গন্ধ পায়, নাকি
গন্ধের আইডিয়া-তে ডুবে থাকে?
অরণ্য উইকিপিডিয়া অ্যাটিকেল , নস্টালজিয়া ফিল্টার।
মাটি ইন্সটাগ্রামের সয়েলপর্ণ ।
হয়তো সে শুঁকছে না,
শুধু পড়ছে গন্ধের ইমোজি—
কিংবা আপ্লুত হওয়ার ফর্মুলা


আমাদের কোনো প্লাতেরো ছিলনা

আমাদের কোনো প্লাতেরো ছিলনা
সমস্ত অনুযোগ আমি প্রুস্তের মতো প্লাতেরোর হাতে তুলে দিয়েছি। প্লাতেরো আমার-একান্ত নিজস্ব প্লাতেরো। যে অদৃশ্য ঘোড়াটি আমার বোধি ও ঈপ্সার ভেতর লাফিয়ে চলেছে তাকেও আমি মুঠোবন্দী পাথরের মতো বেদীতে দিয়েছি। তুমি তার পরমাণু চিহ্নিত করবে তো করো।

টানেলের অন্ধকার শেষ হলে যে এসে দাঁড়াবে সার্চলাইট হাতে সে কোনো নাবিক নয়। সে কোনো প্লাতেরো কিংবা দেবদূতও নয়। প্রান্তিক চাষির মতো সে এক প্রলেতারিয়েত- বুক খোলা অবারিত মাঠ।
আমি জানি হাপরের ওপারে যে গনগনে নেহাইয়ে স্ফুলিঙ্গ ঝরেছে।
ইস্পাতকঠিণ কোনো প্রত্যয়ই শুধু তা জলে দিতে পারে। যে জল অন্তর্জলি যাত্রার মতো ধেয়ে চলে লগি ঠেলে ঠেলে।

যে দিন শয্যাশায়ী মুমূর্ষুর মতো ধুঁকে ধুঁকে ক্লেদের সুরভি নেমেছিল নিরন্নের ঘরে।উত্থানের বিপরীতে যে কর্কশ অন্ধকার হাঁটু গেড়ে, কখনোবা মুখোমুখি বসেছিল এক চিলতে রোদে- তাকেও স্বাগত জানাতে আমরা জড় হয়েছিলাম থিকথিকে কাদা ও লহুতে।

জানি এসবই বিভ্রম। কস্মিনকালেও আমাদের কোনো প্লাতেরো ছিলনা।


বিষণ্ণ চিরকুট

আপাত সত্যের কুহকী বার্তায় জেরবার হচ্ছে রাত।
সোমরবসে ভেসে যাচ্ছে সোনাটা। মীড়ে মীড়ে দরবারি কানাড়া।
বুঁদ হয়ে আছে সব। খুব সন্তর্পণে এগোচ্ছে সার্কাসের ক্লাউন।
আর হাততালিতে ফেটে পড়ছে অনুষঙ্গ,দর্শকের করতল।

ভেস যাচ্ছে বলিরেখাজীর্ণ চোপসানো গাল। বৃদ্ধের স্মিত মুখ।
ভেসে যাচ্ছে অবদমিত চিৎকার। অনুশাসন-ভাঙা জটিল উষ্ণ শিস।
বেপথু বেঁচে থাকার বিষণ্ণ চিরকুট।
ভেসে যাচ্ছে আহার-বস্ত্র-বাসস্থান-যৌনতা-বিবিধ অনুভূতি।
বিস্তারিত ডানার মতো বিস্তৃত হচ্ছে ধূমল কুয়াশা-
ভেতরে মিশে আছে ঝকঝকে ব্লেড। ব্লেডের তীক্ষ্ণতা।

ফেটে পড়বার অপেক্ষায় মেঘ
পেঁজা তুলোর মতো উড়ন্ত ফেঁসো আর ঝড়ের পূর্বাভাস।
বাতাসে ধুলোর গন্ধ!বাতাসে রক্তের গন্ধ!
কিছু একটা দানা বেঁধে উঠছে এধারে-ওধারে।
বিচিত্র ক্লাউন,’জাদুলন্ঠন নিয়ে হেঁটে চলেছেন।
যদিও বিস্তৃত হচ্ছে ধুলোর গন্ধ,সোঁদা কোনো রক্তের গন্ধ!


প্রতিবিম্বিত রামধনু খেলা

‘সোনার হরিণ চাই’ এই মিথে দৌড়চ্ছে সকাল। দুপুর, সন্ধ্যারাত।
রোদে পুড়ে যাচ্ছে মনোটনাস বোধি
ক্ষরণের সমাধিতে বসে রোদনের অশ্রুতে ভেসে যাচ্ছে সমূহ অর্জন।
এ যেন জ্বলজ্বলে সলিলে প্রতিবিম্বিত রামধনু খেলা।

উঠোনে চৌকাঠে লেগে আছে ঝলসে যাওয়া চাঁদের রেণু
অবসৃত পৃথিবীর রক্তাক্ত দীর্ঘ কালো জিভ।
লকলকে সাপের মতো পরিকীর্ণ নানা ধর্মের ফ্যানাটিক
ডুগডুগি আর ঘু্ঙুর বাজিয়ে সরবে রাখছে পা তামাভ্র মাটিতে।

‘সোনার হরিণ চাই’ এই মিথ রোবোটিক হয়ে
বিষধর ময়ালের মতো ধেয়ে যাচ্ছে সারি সারি স্বপ্নের দিকে।
অনুভূতি, প্রেম ও ভালোবাসার দিকে
কাঁঠালিচাঁপার গন্ধ আর সমস্ত সৌরভের দিকে।


বৃষ্টির মতো সুন্দর এসে দাঁড়িয়েছে দোরগোড়ায়

বৃষ্টির মতো সুন্দর এসে দাঁড়িয়েছে দোরগোড়ায়
একটি পাটকিলে সূতো কি ঘুড়ি খানিকটা কাত হয়ে উড়ছে আকাশে
আর অনেক ক’টি ফড়িং এসে জড় হয়েছে আমাদের উন্মুক্ত উঠোনে।

বুকের ভেতরে একটি শুভ্র পাখি কেবলি ডানা ঝাপটায়
শৈশবের সবুজ ঘাস তার শিশির-সমেত লাফিয়ে ওঠে
বিশাল কচু পাতা থেকে গড়িয়ে নামে জল
বৃষ্টি পতনের শব্দে বাঙ্ময় হয়ে ওঠে টিন-ঘেরা চাল আর
অনেকগুলো নৈঃশব্দ্য!

তবু কেন খুব তুচ্ছ কারণেই হৃদয় থেকে এমন রক্তক্ষরণ
যাবতীয় জাড্য এসে জড় হয় অনাহুত আগন্তুক হয়ে
দীর্ঘ জীবনের রপ্ত করা সমস্ত ভদ্রতা ও পরিশীলনের গালে চপেটাঘাত করে
কারা খুব সেডিষ্ট আনন্দে মেতে ওঠে এখানে ওখানে।
কারা খুব অনায়াসে ছিঁড়ে ফেলে পাখিদের নীল ডানা, খয়েরী সকল পালক।

একমাত্র আরাধনা ছিল সুন্দরের
তবু অমার্যিত কিছু বরাহ এসে কলুষিত করে যায় আমাদের তকতকে নিকোনো উঠোন।
চাঁদে কলঙ্ক ঢেলে ওরা খুব উন্মত্ত, হেসে হেসে খুন হয়ে যায়।


হিপনোটিজম

আমাকে শেখাচ্ছ তুমি হিপনোটিজম
অথচ লটবহরসহ সেঁধিয়ে যাচ্ছি অনন্ত গহ্বরে
অন্তর্গত অপভাষগুলো,ঈর্ষা ও ভর্ৎসনাগুলো দৌড়চ্ছে অবিরাম
স্নায়বিক দুর্বলতাগুলো সেধে আসছে পিছু পিছু।

আমি জানি হিপনোটিজম ছাড়া আর কোনো অস্ত্র নেই
মরচে-লাগা সকল অস্ত্রে স্থবিরতা,ধূলো
সন্তর্পণে পা ফেলছে ভয়,ইতিহাস কাহিণী হয়ে ঘুরছে ইথারে
কী এক অজানা স্রোত-বাতাসের স্রোত বয়ে যায় আমাদের

আরামে ও অবগাহনে।
বিশ্বায়নের রাজপথগুলো দীর্ঘ-দীর্ঘতর
যা আমি খোঁড়াতে খোঁড়াতে পার হই-ঘষটে ঘষটে পার হবার কসরত করি
তোমার অনুমোদন পাবার জন্য হা-পিত্যেশ করতে করতে অবসন্ন হই
শুধু আমি চাই-খুব ভালো করে চাই হিপনোটিজম।

আমি জানি সবকিছু পাথর নয়
পাথর ও আকরিকের বাইরে একটি বিশাল বোধের আকাশ আছে
সেখানে কিছু অভীপ্সা দৌড়চ্ছে কতকাল
কিছু প্রতীক্ষা ছায়া দিঘিতে খুব শ্রান্ত হয়ে আছে আর
মৃত্যুভয়হীন কিছু আকাঙ্ক্ষা বুড়োসুড়ো গাছ হয়ে আছে।
তুমি আমাকে খুব দ্রুত শিখিয়ে দাও
বাষ্প ও উত্তাপের বাইরে আমি খুব স্নিগ্ধ, স্নিগ্ধ কাটাতে চাই।


অন্তরঙ্গ মননের বিভা

একটি ভাস্বর দিন নীরবে উত্তীর্ণ করে
জীবন্মৃত অতনু দেহের ঘোর
অপার শুশ্রূষায় উষ্ণ হয়ে ওঠে মৃতপ্রায় কোষের পরমাণু
অন্তরঙ্গ মননের বিভা।

দ্বিধার বিপরীতে একটি অমোঘ যাত্রা
তুলে আনে শূন্যের ভেতর থেকে অর্জনের
একেকটি মন্ত্রমুগ্ধ দিন।

আমাদের ভয়ার্ত,শ্বাপদসংকুল-গলাকাটা সময়
উজ্জল আলোর দীপ হয়ে জ্বলে উঠেছিল
আকাশের যকৃতের লালটুকু জুড়ে;
আমাদের ফেনায়িত ভাতের মতো সুখে
হামাগুড়ি দিয়ে এসে নেমেছিল নীলচে সবুজ মার্বেল।
একটি দ্বিধাহীন পতাকা উড়েছিল ত্রিশ লক্ষ বুক ফুঁড়ে ফুঁড়ে।


সবকিছু যদি শুধুই বিমূর্ত হয়ে যেতে পারতো

সবকিছু যদি শুধুই বিমূর্ত হয়ে যেতে পারতো, শুধুই বিমূর্ত!
চারদিকে এতো প্রগলভ-চারদিকে এতো নখ
কালো রম্বসের অন্ধকার- কম্পিত কাদামাটি
গাঢ় পীতাভ আস্তরণ।

কালো ঈগলেরা জেনে গেছে ভাগাড়ের খোঁজ
‘জাগছে নখ, দাঁতের শব্দ, শ্বাস।’ মৃত প্রবল উচ্ছ্বাস।
ফাঁকা স্মৃতি, ধর্মোন্মাদ, কুঁজো সব, খামাকা উদ্ভাস
মিশে যায় কাদায় মাটিতে। মানুষেরা বরকন্দাজ!

নিষিদ্ধ শিকড়ের কথা। জেগে ওঠে কনভয়, রাজার প্রাসাদ।
সুড়ঙ্গে সেঁধিয়ে যাচ্ছে কাকাতুয়া, ছুটে আসছে ঝাঁকে ঝাঁকে খাটাশেরা।
হাওয়া এসে নাড়িয়ে দিচ্ছে কাঁটাগুল্মগুলি
আর সার সার জার নিস্তব্ধ, কাচের।

খুব সরীসৃপ সরীসৃপ দিন
ঘষটে ঘষটে যায়- স্যাঁতসেঁতে শ্বাপদসঙ্কুল
অসূয়ায়,হিংসায় কিংবা প্রতিহিংসায়;
ঘোরতর ঘিনঘিনে রটানো অপবাদে।
সবকিছু যদি বিমূর্ত হয়ে যেতে পারতো,শুধুই বিমূর্ত!


ফারুক আহমেদ রনি
সম্পাদক


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Trending