প্রবাস জীবনের ব্যস্ততার ভিড়ে থেকেও যখন আমরা নিজেদের ভাষা, সাহিত্য আর সংস্কৃতির শেকড় খুঁজে ফিরি, তখন বাংলাদেশ বইমেলার মতো আয়োজন আমাদের কাছে হয়ে ওঠে প্রাণের উৎসব। আজ থেকে শুরু হলো দুদিনব্যাপি ১৪ ও ১৫ সেপ্টেম্বর পূর্ব লন্ডনের ব্রেডি আর্টস সেন্টারে বহুল প্রতীক্ষিত বাংলাদেশ বইমেলা ২০২৫। আয়োজন করছে সম্মিলিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ যুক্তরাজ্য । একটি সংগঠন, যা প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই প্রবাসী বাঙালির সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হয়ে আছে।
সম্মিলিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ যুক্তরাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১০ সালে। তখন বিলেতের একঝাঁক কবি, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব একত্র হয়ে সিদ্ধান্ত নেন, প্রবাসে থেকেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা জিইয়ে রাখতে হবে, পরবর্তী প্রজন্মকে শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখতে হবে। সেই সূচনালগ্নে যাঁরা পথিকৃৎ হিসেবে এগিয়ে এসেছিলেন তাঁদের অনেকের মধ্যে ছিলেন শামীম আজাদ, আতাউর রহমান মিলাদ, ইসহাক কাজল, গোলাম মুস্তাফা, গোলাম কবির, দিলু নাসের, মাশুক ইবনে আনিস, ফারুক আহমেদ রনি, শামীম শাহান, মিল্টন রহমান, ইকবাল হোসেন বুলবুল, আবু মকসুদ, কাজল রশিদ, ফারুক আহমেদ, চায়না চৌধুরী, দেলওয়ার হোসেন মঞ্জু এবং মজিবুল হক মনি প্রমুখ। তাঁদের স্বপ্ন, শ্রম ও নিষ্ঠার মধ্য দিয়েই পরিষদের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
প্রথম থেকেই এই বইমেলা পরিচিতি পায় বাংলা একাডেমি বইমেলা হিসেবে। বাংলাদেশের বাংলা একাডেমির প্রকাশনা সংস্থা নিয়মিত তাদের নতুন গ্রন্থ নিয়ে উপস্থিত থাকে লন্ডনের মেলায়, পাশাপাশি বাংলা একাডেমির পরিচালকগণও বিভিন্ন সময় অতিথি হয়ে এসেছেন এই আয়োজনে। বইমেলার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে লন্ডনের অন্যান্য সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও। তারা প্রত্যেকে নিজেদের উদ্যোগে অংশগ্রহণ করে মেলাকে রঙিন করে তোলে। এর ফলে বইমেলা হয়ে ওঠে শুধু বই কেনাবেচার স্থান নয়, বরং সাহিত্য, সংস্কৃতি ও প্রবাসী জীবনের এক বৃহৎ উৎসব।
যদিও সংগঠনের দীর্ঘ পথচলায় মতানৈক্যের কারণে কিছু সময়ের জন্য বিভাজন ঘটেছিল, তবে ধীরে ধীরে সেই ভাঙন মুছে গিয়ে পরিষদ আবারও বিলেতের সর্বস্তরের মানুষকে সমন্বিত করে একত্রে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরাও ধীরে ধীরে আবার সম্পৃক্ত হয়েছেন, ফলে আজ এটি আরও শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশ বইমেলা শুধু পাঠক আর লেখকের মিলনমেলা নয়; এটি গড়ে উঠেছে প্রবাসী জীবনের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা আর নতুন প্রজন্মকে ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত রাখার একটি অনন্য উদ্যোগ হিসেবে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের নামকরা প্রকাশনী এখানে স্টল সাজায়, নতুন বই প্রকাশিত হয়, লেখকের সঙ্গে পাঠকের সরাসরি আলাপ হয়। মুক্তমঞ্চে চলে কবিতা পাঠ, সাহিত্য আলোচনা, সংগীত, নৃত্য ও নাটক। এভাবেই বইমেলা হয়ে ওঠে প্রবাসী পরিবারের জন্য এক মিলনমঞ্চ, যেখানে সবাই খুঁজে পান নিজের শেকড়ের টান।
এ মেলার আরেকটি বিশেষ দিক হলো প্রতি বছর গুণী কবি, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সম্মাননা প্রদান। ইতিমধ্যে সম্মানিত হয়েছেন কবি শামীম আজাদ, প্রয়াত ইসহাক কাজল, সালেহা চৌধুরী, আতাউর রহমান মিলাদ সহ অনেকেই। এই সম্মাননা কেবল একজন মানুষকে আলাদা করে দেখা নয়, বরং পুরো প্রবাসী সমাজকে অনুপ্রাণিত করার প্রতীক। তারই ধারাবাহিকতায় গত বছর সাহিত্যে সম্মাননা পদক পেয়েছেন কবি ফারুক আহমেদ রনি, আর এবারে পাচ্ছেন কবি ও ছড়াকার দিলু নাসের। ছড়া ও কবিতা রচনায় তাঁর দীর্ঘদিনের অবদানকে স্বীকৃতি দিতে আয়োজকরা এবার তাঁকেই নির্বাচিত করেছেন।
বাংলাদেশ বইমেলা ২০২৫ তাই শুধুই একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, এটি প্রবাসী জীবনের গর্ব, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক। ১৪ ও ১৫ সেপ্টেম্বর যখন ব্রেডি আর্টস সেন্টার মুখরিত হবে বই, পাঠক, লেখক আর সংস্কৃতির পদচারণায়, তখন আবারও প্রমাণিত হবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের টান ভৌগোলিক সীমানা মানে না। প্রবাসেও তা অটুট, প্রাণবন্ত এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়ে চলেছে।






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান