আমার শরৎ : আমার মহালয়া
আমার গাঁয়ের পাশ দিয়ে নদী বয়নি কখনও। বালুচর জুড়ে ঢেউ তোলেনি কাশের ঢল। তিনদিক ঘিরে শাল-পিয়াল-কেঁদ-ভুড়ের বন। একদিকে ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া ধানক্ষেত। তাতে গাঢ় সবুজের দোলা। আলে আলে দু-চার ঝাড় কাশ। তাতে বৃষ্টিধৌত রোদের চিকনাই। মাথার উপর নীল আকাশ। পুয়ানি বাছুরের মতো সাদা মেঘের চাঞ্চলতা– এই তো ছিল আমার গাঁ।
জল থৈ-থৈ বর্ষা শেষ। খালবিল ছেচে বালতিভরা চুনো আর জিয়ল মাছ ঘরে আনত আমার কৈশোর। কখনও ধানঝাড়ের গোড়া হাতড়িয়ে মেঠো কাঁখড়ি। আমড়ার টক অথবা সরষের ঝাল। আহা, তা দিয়েই একথালা ভাত নিমেষে শেষ। আবার জন্মাষ্টমী, রাধা অষ্টমী কিংবা দুর্গা অষ্টমীতে শাল-পিয়ালের বন থেকে আড়া (নির্দিষ্ট জায়গা) খুঁজে তুলে আনা ছাতু। পুঁইশাক, ঝিঙ্গা কিংবা পোরুল দিয়ে ঝোল।
এই তো ছিল আমাদের গেরস্থালি। আমার শৈশব থেকে কৈশোর। কৈশোর থেকে যৌবনের দুয়ার। না, আমার গাঁয়ে দুর্গাপূজা ছিল না। দশহাতের দেবীমূর্তি ঘিরে চল ছিল না নতুন জামাকাপড় কেনা বা পরা বা দেখানোর প্রতিযোগিতা। তবু আগমণী ছিল। হিমভেজা বাতাসে ভাসত মাটির দেওয়াল লেপা, খড়ির ছঁচ দিয়ে তাতে রং চড়ানো, গিরি রঙে লতাপাতা আঁকার সোঁদা ঘ্রাণ। ম-ম করত গুড় ভিয়েনের গন্ধ। চনা টানার ছাঁই ছাঁই শব্দও ভেসে আসত পড়শি বাতাসের হাত ধরে। তার স্বাদ নাকে নিতে নিতে কুলি বেয়ে আমরা গরু খুলে চলে যেতাম জঙ্গলে। আমাদের দলের সর্দার ছিল তোপুয়া লোহার। তাদের পাড়ার কোনো মেয়েকে মাথায় ঘাসের বোঝা নিয়ে চলে যেতে দেখে গাইত পাল্লার গান,
ওহো ঘাসবুজাতে বুলুনী(ঘুরে বেড়ানো মেয়ে)
দলা দিল
মাইরি দলা দিল
ওই কাঁকাল দুলুনি লো
দোলা দিল…
মেয়েটি রাগ দেখাত না। ঘাসের ভার সামলে এগিয়ে যেতে দুলকি চালে। সঙ্গে কাটান দিত পাল্লার,
ওলো ভেক দেখে আমি যাই মরে
ছঁড়া আমার
মাইরি ছঁড়া আমার
ম’লো কাঁকালে লো
ছঁড়া আমার…
তাতেই খিলখিলিয়ে উঠত শারদ হাওয়ার চাঞ্চল্য।
এমনিই তো ছিল আমার কিশোরবেলার আগমনি। নতুন কিছু নয়। আলাদা কিছু নয়। যাপনের জেরে এগিয়ে চলা দৈনন্দিনতা। তবু তাতে ছন্দ ছিল। সুর ছিল। ছিল উমার বাপের ঘরে ফেরার স্বপ্ন-আহ্লাদ। বাড়াবনের কোল ঘেঁষে ছিল খয়ের ডোবা। তাতে খিলখিলিয়ে হাসত শাপলা-শালুক। পানকৌড়ি ডুব দিত টোবাং করে। তোপুয়া হড়বড়িয়ে নেমে যেত জলে। টপাটপ তুলে নিত কিছু শালুক। পানকৌড়ির জলে ভেসে ওঠার আগেই উঠে আসত ডাঙ্গায়। আমার হাতে ধরিয়ে দিত হেলেবাড়ি (পাচন)। দৌড়ে যেত ঘাসবতীদের কাছে। বাড়িয়ে দিত হাতে ধরা শালুকের গোছা। থমকে দাঁড়াত মেয়েটি। নিতও তা। তোপুয়া সলাজ হাসি নিয়ে হেলত-দুলত। হঠাৎ মেয়েটি তোপুয়ার বুকে ছুঁড়ে দিত শালুকগুচ্ছ। প্রশ্রয় মাখানো আহ্লাদে বলত, “ধুর খালভরা! বের্যা!”
তারপরই কোমরে ফিরিয়ে আনত দুলকি চাল। তোপায় সেদিকে তাকিয়ে হাত বোলাত নিজের বুকে। হাসতাম আমি। গরুরা ঢুকে যেত বাড়াবনে। আমাদের মনে চেপে বসত আগমনির ভার।
দিন ঢলে আকাশজুড়ে পুয়ানি বাছুরের গায়ে যখন লাগত সিঁদুরে ছোপ তখন ফিরতাম ঘর মুখে। তোপুয়া অধরতলায় চেপে ধরত আড়বাঁশি। সুরে ঝরে পড়ত গোষ্ঠ ফিরানের ব্যাকুলতা,
“দেখ রে ভাই বলরাম বেলা কত আছে
আর বেলা নাই রে ভাই, দণ্ড দুই-তিন আছে…”
গরুপাল গোয়ালে বেঁধে ফিরে আসতাম ঘরে। তোপুয়ার মতো গতান্যা (বাৎসরিক চুক্তিবদ্ধ স্থায়ী) বাগলরাও ফিরে যেত লোহার পাড়ায়। সন্ধ্যা ঢলে নামত রাত। দেহজুড়ে ক্লান্তি। কিন্তু ঘুম বসত না চোখজুড়ে। ভোর হবে। ঘরে ঘরে বেজে উঠবে শাঁখ। তারপর… যদি না জাগতে পারি! যদি পেরিয়ে যায় সময়!
এই করতে করতেই কখন যে লেগে যেত চোখ, বুঝতেই পারতাম না। স্বপ্ন কি দেখতাম! আজ আর মনে নেই। তবে একসময় ঝপ করে খুলে যেত দুই চোখ, যখন কানে যেত,
“আশ্বিনের শারদ প্রাতে বেজে উঠেছে আলোক মঞ্জীর;
ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা;
প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী
জগন্মাতার আগমন বার্তা।”
তড়াক করে বসতাম। পাশের ঘর থেকে ভেসে আসত বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ভরাট কণ্ঠ। মুগ্ধবিস্ময়ে শুনতাম সবটুকু। সঙ্গে চোখের সামনে ভেসে উঠত দেবী দুর্গার রণরঙ্গিনী মূর্তি। বীর মহিষাসুরের আর্ত পিপাসা। হ্যাঁ, শুনতে শুনতে আমার কেন জানি না, বার বার মনে হত, মহিষাসুরের আস্ফালনের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক-আর্তি। এক পিপাসা। কিন্তু কী তা, সেটুকু বুঝতাম না। বরং মনের মধ্যে জেগে রইত চণ্ডীপাঠ শেষের ওই আড়বাঁশির কান্না। তার সঙ্গে মিশে যেত শঙ্খধ্বনির বিজয় কারুণ্য।






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান