[আকাশবাণী কলকাতার সদ্য অবসর প্রাপ্ত ঘোষক]

মহালয়া একটি তিথি

এই তো সেদিনের কথা। পাশের বাড়ির মুখুজ্যেবাবু জানলা থেকে মুখ বাড়িয়ে জানতে চাইলেন “হ্যাঁগো, তোমাদের ওই রেডিওতে মহালয়া অনুষ্ঠানটা মোবাইল ফোনে শোনা যাবে?”

আমি তাঁকে আশ্বস্ত ক’রে বল্লাম “এনড্রয়েড ফোনে অ্যাপ ডাউনলোড করলেই শুনতে পাবেন। তবে মহালয়া তো একটা তিথি। সেই প্রভাতে কলকাতা বেতার থেকে প্রচারিত কালজয়ী অনুষ্ঠানটির নাম ‘মহিষাসুরমর্দিনী’।”

মুখুজ্জেবাবুর চট্ জলদি উত্তর “ওই হল গিয়ে…”

হেন কালে মুখুজ্জে গিন্নীর তীক্ষ্ণ স্বর ভেসেএল “এই যে শুনছো…… গ্যাসের আঁচ টা কমিয়ে দাও শিগ্গিরী…”। তৎক্ষণাৎ জানলা থেকে উধাও মুখুজ্জেবাবু। বুঝলাম অনেকের মতো মুখুজ্জেবাবুরও কিছু যায় আসে না, অনুষ্ঠানের শিরোনাম নিয়ে। কিন্তু কালজয়ী এই সৃষ্টির নেপথ্যে স্রষ্টাদের যে ভাবনার গভীরতা,পরিশ্রম, অধ্যবসায়, নিষ্ঠা, সৃজনশীলতার শক্ত ভিতটুকু আজও মানুষের কাছে দুর্গোৎসবের আবহ নির্মানের বোধনের সুর ব’য়ে আনে, সেইদিকে একবারও ফিরে তাকানোর আগ্রহ অধিকাংশ শ্রোতার মনে আছে কি? প্রশ্ন কি জাগেনা মনে কেন আজো এই অনুষ্ঠানটির কোন বিকল্প নেই?চলুন আমরা একবার উঁকিমারি সৃষ্টি লগ্নের কলকাতা বেতার দপ্তরে। ডালহৌসি স্কোয়ারের ১নং গারস্টিন প্লেসে। ১৯২৭ সালের ২৬শে আগষ্ট এই বাড়ি থেকে ভারত বর্ষের দ্বিতীয় বেতার কেন্দ্র হিসাবে কলকাতা বেতারের পথ চলা শুরু। এই বেতার কেন্দ্রে সূচনা লগ্নে মুষ্টিমেয় কয়েকজন বাঙালি প্রোগ্রাম চালান। প্রোগ্রাম ডিরেক্টর নৃপেন্দ্রনাথ মজুমদার। রাইচাঁদ বড়াল ও বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র তাঁর সহকারী। ইতিপূর্বে যোগ দিয়েছেন বাণীকুমার। তার কিছু পরে নিয়ে আসা হয় প্রেমাঙ্কুর আতর্থীকে। সকলে যাঁকে “বুড়ো দা”বলে ডাকতেন।সেই সময়ে প্রতি দুপুরে হতো বিরাট আড্ডা।সাহিত্য, সঙ্গীত, অভিনয়, গান এই সব বিষয়ে আড্ডা চলত। এই আড্ডায় আরো যোগ দিতেন হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট, গল্পদাদা যোগেশ বসু, সংগীত ব্যক্তিত্ব রাইচাঁদ বড়াল, নলিনীকান্ত সরকার, রাজেন সেন, গায়ক হরিশচন্দ্র বালি প্রমুখ।একদিন এই আড্ডায় শ্রোতাদের ধাক্কা দেওয়ার(আকর্ষণ করার) উপায় হিসাবে একটি অনুষ্ঠানের কথা ভাবা হ’ল। বড়-বড় গাইয়ে-বাজিয়েদের নিয়ে জলসা। এই প্রস্তাবের সমর্থনে জন্ম হল বিচিত্র অনুষ্ঠান।রচনা-পরিচালনার ভার ন্যাস্ত হ’লো বাণীকুমারের উপর। সেই সূত্রে শ্রী শ্রীমার্কন্ডেয়- চন্ডীর বিষয় বস্তুর ওপর ভিত্তি ক’রে”বসন্তেশ্বরী”নামে একটি চম্পু রচনা করেন বাণীকুমার। ১৩৩৮ বঙ্গাব্দে।ওই বছর চৈত্রের শুক্লা অষ্টমী প্রভাতে অনুষ্ঠানটি সম্প্রচারিত হয় এবং শ্রোতৃ মহলে বিপুল উন্মাদনা সৃষ্টি করে। এই অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত গানে সুর সংযোগ করেন সঙ্গীতপন্ডিত হরিশচন্দ্র বালী ও কিছু গানে পঙ্কজকুমার মল্লিক। সঙ্গীত পরিচালনায় ছিলেন রাইচাঁদ বড়াল।বাণীকুমার লিখেছেন,”জনচিত্তে বসন্তেশ্বরী-র অশেষ আবেদন সৃষ্টি হওয়াতে শারদীয়া পূজা উপলক্ষে ষষ্ঠীর ঊষাকালে শ্রী শ্রী চন্ডী বর্ণিত মহাদেবীর লীলা অবলম্বনে রূপিত একটি অভিনব সঙ্গীত বহুল অনুষ্ঠান প্রয়োগের সংকল্প গৃহীত হয়।আমি সংস্কৃত রূপকের অন্তর্গত’বীথী(বাoratorio) নাট্য-রচনাশৈলী অনুসরণে নবভাবেমহিষাসুরমর্দিনী প্রণয়ন করি, ১৩৩৯ বঙ্গাব্দে।” ১৯৩২ সালে ষষ্ঠীর প্রত্যুষে (১৩৩৯ সালে আশ্বিনের দেবীপক্ষে) তা প্রচারিত হ’লে জনসাধারণের কাছ থেকে অভিনন্দনের পর অভিনন্দন আসতে থাকে। এই সময় থেকে কখনো ষষ্ঠীর প্রত্যুষে আবার কোন বছর মহালয়ার প্রত্যুষে প্রচারিত হ’তে থাকে এই অনুষ্ঠান। অবশেষে ১৯৫৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে কলকাতা বেতারের সম্প্রচার শুরু হয় ইডেন গার্ডেন্সে নবনির্মিত “আকাশবাণী ভবন” থেকে। ১৯৬২সাল পর্যন্ত এই অনুষ্ঠানটি স্টুডিও থেকে সরাসরি প্রচার করা হ’লেও ১৯৬৩ থেকে স্টুডিওতে মহালয়ার আগে রেকর্ডিং ক’রে অনুষ্ঠান প্রচার শুরু হয়। ১৯৭২ পর্যন্ত বার চারেক ওই অনুষ্ঠান রেকর্ডিং করা হ’য়েছিল সম্প্রচারের আগে। ১৯৭৬ এ দেবীং দুর্গতিহারিণীম্ প্রচারিত হয়,যে অনুষ্ঠানটি বর্তমানে প্রচারিত হয় ষষ্ঠীর প্রত্যুষে। ১৯৭৭ থেকে আবারও প্রচারিত হ’তে থাকে সঙ্গীতবীথী “মহিষাসুর মর্দিনী”। এতো গেল স্টুডিওর বাইরে থেকে, স্মৃতিচারণার পংক্তি বেয়ে সেদিনের আকাশবাণী ভবনে উঁকি দেওয়া।

আকাশবাণী ভবনে প্রবেশ ক’রে,সংগ্রহশালা থেকে গৃহীত এই মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠানের রেকর্ডিং প্রচারের সঙ্গে যুক্ত হলাম ১৯৯৩ সাল থেকে। তখনো আকাশবাণী কলকাতায় ঘোষক পদে আছেন স্বনামধন্যরা।ঘোষণার দায়িত্ব আরো অনেক বছর পার ক’রে ন্যস্ত হ’লেও মহালয়ার প্রত্যুষে প্রচারিত এই অনুষ্ঠানের কয়েক দিন আগে থেকে যে প্রস্তুতি,তার আঁচ পোহাতাম। ক্রমে সেই সময় হাজির হল যখন ডিউটি চার্টে নাম উঠতে থাকল Announceron duty হিসাবে। আগে spool এ ধরা থাকতো অনুষ্ঠান।সাত ইঞ্চির তিনটে স্কুলে তিরিশ মিনিট করে মোট দেড় ঘন্টার অনুষ্ঠান। আগে-পরে বিজ্ঞাপন।তাও স্পুল থেকে। বাজান হ’তো টেপ-ডেক থেকে।পরে যথাক্রমে আসে সিডি (এক ঘন্টা সময় সীমার)। দুটি সিডি তে থাকত অনুষ্ঠান। সঙ্গে বিজ্ঞাপন। এখন সবটাই কম্পিউটারে আপলোড করা থাকে নির্দিষ্ট সফ্টওয়ারে। অনুষ্ঠান বিভাগ থেকে পাঠান হয় আগাম ঘোষণা-যাতে জানানো হয় অনুষ্ঠানের দিন,তারিখ,কোন কোন প্রচারতরঙ্গে শোনা যাবে, কখন শুরু হবে প্রভৃতি। অনুষ্ঠানের কয়েকদিন আগে থেকে বেতারের বিভিন্ন প্রচার তরঙ্গে শোনা যায় এই ঘোষণা। অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধানের তত্ত্বাবধানে সঙ্গীতবিভাগের আধিকারীক ও কর্মীরা সংগ্রহশালাথেকে সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটিকে নিয়ে শুনে, প্রয়োজনে সম্পাদনা ক’রে প্রচারের জন্য প্রস্তুত করেন। ঘোষণা পত্র লেখা হয়(চিরাচরিত বয়ানে)। বিজ্ঞাপন বিভাগ, সংগৃহীত বিজ্ঞাপনগুলিকে যথাযথ পরিমার্জন ক’রে আপলোড করেন। প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া থাকে কমার্শিয়াল শীটে। আগের দিনে অনুষ্ঠান পরিচিতিতে যাতে মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠানের ঘোষণা নির্ভুল ভাবে শ্রোতাদের জানানো হয়, সেইদিকে থাকে বিশেষ নজর। মহালয়ার আগের দিন যথাসময়ে সমস্ত অনুষ্ঠানের উপকরণ, কার পরে কী প্রচার হবে তার লিখিত ক্রম (মেইন কিউ শীট) পাঠান হয় ডিউটিরুমে। রাত থেকে চলে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে দফায়-দফায় সব মিলিয়ে নেওয়ার কাজ। ডিউটি অফিসারেরা কন্ট্রোল রুমের এঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কখন কোন চ্যানেল যুক্ত হবে বা বিযুক্ত হবে (বেতারের ভাষায় Link, De Link) সেই বিষয়ে পরামর্শ ক’রে দায়িত্বরত ঘোষক কে জানিয়ে দেন।ঘোষক বার-বার ক’রে সময়-ধ’রে সবটা অভ্যাসক’রে নেন, যাতে সময়ের কোন বিচ্যুতি না ঘটে।বিশেষ অধিবেশনের সূচনা, বন্দেমাতরম,মঙ্গলধ্বনি, যে সমস্ত কেন্দ্র থেকে রীলে হবে তাদের পরিচিতিসহ বিজ্ঞাপন এবং ঠিক ভোর চারটের সময় ঘোষণা: “বিশেষ প্রভাতী অনুষ্ঠান:সঙ্গীতবীথি ‘মহিষাসুরমর্দিনী’।রচনা-বাণীকুমার, সঙ্গীত পরিচালনা-পঙ্কজ কুমার মল্লিক। গ্রন্থনা ও স্তোত্রপাঠ: বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। আজ দেবীপক্ষের প্রাক্- প্রত্যুষে জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতা মহাশক্তির শুভ আগমনবার্তা আকাশে-বাতাসে বিঘোষিত। মহাদেবীর পুণ্যস্তবমন্ত্রে মানবলোকে জাগরিত হোক ভূমানন্দের অপূর্বপ্রেরণা। আজ শারদ গগনে দেবী ঊষা ঘোষণা ক’রছেন মহাশক্তির শুভ আবির্ভাব ক্ষণ।”এরই সঙ্গে সঙ্গে শঙ্খধ্বনি বেজে উঠবে। পুরোকাজটাই কর্তব্যরত ঘোষককেই করতে হয়। যেন তাঁর নিপুনতাই যথার্থ ভাবে মানব মনে ভূমানন্দের অপূর্ব প্রেরণাকে যথাযথ ভাবে জাগরণের ভূমি নির্মাণ করে। এই মহান, কালজয়ী সৃষ্টিকে যতবার পরিবেশনের সুযোগ পেয়েছি, ততবার রোমাঞ্চিত হ’য়েছি। এমন জনচিত্তজয়ী সৃষ্টির কারিগরদের কাছে প্রণত হ’য়েছি। যতদিন বাঁচব ততদিন যেন এই শ্রবণ সুখ থেকে বঞ্চিত না হই।


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Trending