স্মৃতির বাক্স…
এই জীবন সায়াহ্নে বসে স্মৃতির বাক্স হাতড়াতে গিয়ে দেখি প্রায় সবই মলিন হয়ে গেছে,নাহয় মুছে গেছে। তাই স্মৃতি হাতড়াতে বা পিছনে হাঁটতে কষ্ট হয়। অ্যাতো ঝড় তুফ়ান পেরিয়ে এসেছি বলার নয়। তবুও ঝলমলে শরৎ কাল এলে,ভালো লাগে,মনটা কেমন উৎসব গন্ধ মুখী হয়ে ওঠে,আবার ভয়ও হয়। যখন স্ত্রী বলে ‘ বুঝেছো,ভাদ্র মাস শেষ হতে চলল,সামনের মাসেই তো পুজো,মনে আছে তো? ‘
বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। ছেলে মেয়ে ,স্ত্রীর নূতন জামা কাপড় চাই। বারো মেসে খাবার বাদ দিয়ে একটু মুখ পাল্টানোর ব্যবস্থা করতে হবে। নাড়ু,মুড়কি ইত্যাদি সব। বাড়িটাকে ভালো করে দেখলে মন খারাপ করে,বর্ষার জলে রঙ উঠে গেছে,শ্যাওলাময় ঘরটাকে একটু চকচকে করে তোলা দরকার।
দরকার তো অনেক কিছুই,কিন্তু আসল বস্তু টাকা কোথায়?জীবনের পথে হাঁটতে হাঁটতে বুঝেছি টাকাই হলো একমাত্র অস্ত্র,যা দিয়ে সব লড়াই লড়া যায়। জীবনের লড়াই লড়তে লড়তে এখন ভীষণ ক্লান্ত….বেশিরভাগ স্মৃতি ধুয়ে মুছে গেলেও দু একটা ছবি তো উঁকি মারেই। ঠেলে সরিয়ে দেবো বললেও সম্ভব হয়ে ওঠে না।
ওই যে শরৎ কাল। নানা উৎসবের ছবি,সুগন্ধ! মুখে বলি ‘সব ঠিক হয়ে যাবে,কিন্তু ভেতরটা ভয়ে দুরুদুরু করে ওঠে। কারণ এখন আমি কারো স্বামী,কারো বাবা।
আমার স্ত্রী বলে ‘ মা আসছেন,বছরে তো একবার। ঘাবড়ে যেও না,আমার কিছু লাগবে না। শুধু ছেলে মেয়েদের মুখের দিকে তাকাতে ভয় হয় ‘।
কয়েক যুগ আগে বেশ ছিলাম,তখন আমি ঘরের ছেলে,দায় দায়িত্ব হীন,হৈ চৈ করে বেড়ানো একটা ছোট ছেলে। কতো আর বয়স হবে, সবে সাত আট বছর। ঠাকুমা,মায়ের চোখের মণি। ভাদ্রের তীব্র রোদও গায়ে লাগেনি। বাড়ির সামনেই দুর্গা মন্ডপে প্রতিমা তৈরি হচ্ছে। সারাদিন আনন্দ আর হৈ চৈ। নির্ভেজাল সুখ। ঠাকুমা আমাকে বলতেন ‘পুজো আসছে,রোদে জলে শরীর খারাপ করে ফেলিস না। জ্বর জ্বালা হলে তো মুশকিল….’
এই সব সাত পাঁচ ভাবার বয়েস ছিল না। মা এক মুখ আনন্দ নিয়ে বাবাকে বলতেন ‘ এই তো এসে গেল বিশ্বকর্মা পুজো,তারপরই মহালয়া। পুজো লেগে গেল। দর্জিকে বলে দিও ‘ ছেলেপুলেগুলোর জামার মাপ নিয়ে যেতে। মহালয়ার আগের দিন দিতে বোলো।
মহালয়াটা যে কি সেরকম ধারণা ছিল না। জানতাম রেডিওতে মা দুর্গার জন্য গান হয়। চন্ডীপাঠ হয়। ভোরে উঠতে হয়। ভক্তি ভরে রেডিওর সামনে বসে শুনতে হয়।
আমাদের বাড়িতে তখন রেডিও ছিল না। পাড়াতেও সবার ছিল না। একমাত্র আমাদের পাশের বাড়ির অমল কাকাদের একটা বড় রেডিও ছিল। মা বলতেন ‘ ভোরে চান সেরে,চা মুড়ি খেয়ে মহালয়া শুনতে যাবো।’ যেতামও। অমল কাকা বাড়ির বৈঠক খানার মেঝেতে শতরঞ্জি বিছিয়ে দিতেন। অনেকেই এসে হাজির হতেন। কাকিমা চার ছ’টা ধূপকাঠি একটা ধূপদানীতে রেখে রেডিওর সামনে বসে পড়তেন। আমি মায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলতাম ‘ মা,গানটা কখন হবে?’ মা বলতেন, হবে রে বোস,চুপ করে বোস,স্থির হয়ে বোস…..
না, এখন আর স্থির হয়ে বসে থাকার মতো দিন নেই। ছুট আর ছুট। সময়ের গতিতে গণেশ পুজো,বিশ্বকর্মা পুজো,তারপরই মহালয়া আসে,চলেও যায়। আমি সাংসারিক লড়াইয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। ডি জে,ঢাক ঢোলের শব্দে আতঙ্কিত হয়ে থাকি…..






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান