বাজলো তোমার আলোর বেণু
মহালয়ার ভোর মানেই প্রকৃতির বুকে এক অনন্য আবেশ, এক অন্যরকম আলো-আঁধারের খেলা। শরতের আকাশ তখন কাশফুলের মতো সাদা, তবে ভোরের শিশিরে ভেজা হাওয়ায় মিশে থাকে এক অদ্ভুত পবিত্রতা। পূব আকাশে ধীরে ধীরে সূর্যের লাল আভা ফুটে ওঠে, যেন অশ্রুসিক্ত চোখে আনন্দের প্রথম ঝিলিক। চারদিক নিস্তব্ধ, শুধু দূরে কোথাও শিউলি গাছের নিচে পড়ে থাকা ফুলের গন্ধ মাটির সঙ্গে মিশে ভেসে আসে, মনে করিয়ে দেয় পিতৃপক্ষের অবসানে দেবীপক্ষের সূচনা—হিন্দু বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিক আহ্বান।
পাখিদের ডানার মৃদু ঝাপটানি, কুয়াশার মায়াজালে আড়াল হওয়া গাছপালা আর আলোকস্নাত ভোর—সব মিলিয়ে মহালয়া যেন এক গোপন সেতু, যেখানে মহাবিশ্ব জাগে দেবীর আগমনী তানে।ভোরের বাতাসে শঙ্খের ধ্বনি, রেডিওতে বাজতে থাকা চণ্ডীপাঠ—সব মিলিয়ে শরতের এই ভোর শুধু প্রকৃতির নয়, বাঙালির হৃদয়েরও নবজাগরণের সময়।
এ এক অপার্থিব ভোর। আলো আর অন্ধকারের সীমারেখায় হাওয়া যেন থমকে দাঁড়ায়, ফুলেরা গোপন উল্লাসে কেঁপে ওঠে, নদী তার ঢেউয়ে ছড়িয়ে দেয় মৃদু সুর-মুহূর্তটি যেন সমগ্র সৃষ্টির নিঃশব্দ প্রার্থনা|আকাশ আর পাতাল যেন এক মুহূর্তে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে— “মা আসছেন।”
ভোরের আলো ফোটার আগেই নদীর ঘাটে ভিড় জমতে শুরু করে। ঘুমন্ত শহর যেন ধীরে ধীরে জেগে ওঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের প্রতীকী কণ্ঠে।কারও কাছে এই দিন ধর্মীয় অনুভূতির; কারও কাছে স্মৃতির জোয়ার। আবার কারও কাছে এটি ভোরের রোমাঞ্চকর বর্ণনা, মন্ত্রমুগ্ধ করা গান—যা শৈশব থেকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। প্রতিটি মন্ত্রোচ্চারণ, প্রতিটি গানের কম্পন যেন নিদ্রামগ্ন মানুষকে ধীরে ধীরে জাগিয়ে তোলে। সমৃদ্ধ বাংলা ও সংস্কৃত ছন্দে বোনা এই সুরের জাল আমাদের চারপাশে এক মোহময় পরিবেশ সৃষ্টি করে। মহাকাব্যিক যুদ্ধের গর্জন, তার কারণ ও উপাখ্যান, কখনো সূক্ষ্ম কখনো প্রখর—সব গানই মিশে যায় এক অবর্ণনীয় জাদুতে।
আমরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেই সুরময়তায় আত্মসমর্পণ করি, আর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি কালজয়ী ত্রয়ী—বাণীকুমার, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র ও পঙ্কজ কুমার মল্লিককে। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য শিল্পী ও সঙ্গীতজ্ঞদের অবদান এই ভোরকে করে তোলে অনন্য, যা আজও আমাদের হৃদয় ভরিয়ে তোলে আনন্দে ও ভক্তিতে।
বহু বছর আগে, মহালয়ার সকাল মানেই ছিল রেডিওর সামনে পারিবারিক সমাবেশ। যেন নিয়মে বাঁধা, সবাইকে একত্রিত হতে হতো একটি রেডিও সেটের চারপাশে। কেউ আধোঘুমে, কেউ ধীরে ধীরে ভোরের আলোয় হাঁটতে হাঁটতে—কিন্তু সবার কানে পৌঁছে যেত একই কণ্ঠস্বর, একই গল্প, যা আমাদেরকে নিয়ে যেত এক দূর, অলৌকিক জগতে।
শ্রোতাদের মধ্যে কেউ কেউ অপেক্ষা করতেন তাদের প্রিয় গানগুলির জন্য। “বাজলো তোমার আলোর বেণু”, “জাগো তুমি জাগো”, কিংবা “ওগো আমার আগমনী”—এইসব সুর যেন শৈশবের স্মৃতির দরজা খুলে দিত। প্রতিটি গান হয়ে উঠত নস্টালজিয়ার আলো-আঁধারি পথচলা, যেখানে আমরা আবার ফিরে পেতাম আমাদের বেড়ে ওঠার দিনগুলোকে।
তারই সাথে চণ্ডীপাঠ—সেই অনন্য, বিস্ময়কর স্বরধ্বনি—প্রতিবারই বুনত এক জাদুময় আবহ। মনে হতো, মন্ত্রের প্রতিটি উচ্চারণ শুধু শোনার জন্য নয়, বরং হৃদয়ের গভীরে ছুঁয়ে দেওয়ার জন্য উচ্চারিত হতো । মহালয়ার সকাল তাই কেবল একটি দিন নয়, বরং বাঙালির চিরন্তন আবেগের সুরময় প্রতিধ্বনি।
আমার জীবনেও সেই চিরকালীন সুর -ছন্দের প্রভাব পড়েছিল|সেই কবে জীবনের প্রভাত বেলায় -যখন থেকে বুদ্ধির বিকাশ বা অল্প বোঝার ক্ষমতা হয়েছিল, তখন থেকে বছরের একটি বিশেষ দিনে ভোরের আঁধার ফিকে হতে না হতেই রেডিওর শব্দ কানে ভেসে আসত—
“যা দেবী সর্বভূতেষু…”
ঘুমচোখে যেন বুকের ভেতর হুহু করে কেঁপে উঠতো এক উত্তেজনায় । যদিও ছোটবেলা থেকেই ভোরের আলো ফুটে উঠার সাথে সাথেই ঘুম থেকে উঠে যেতে হতো , কিন্তু বছরের এই একটি দিন মনে হতো, আকাশটা আজ অন্যরকম। আগের রাত থেকেই মানসিক উদ্দীপনা – ভোর রাতে মহালয়া। আমাদের আবাসনের সামনেই বিস্তৃত সুবিশাল মাঠ ছিল। সেই সময় এখনকার মতো ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ ছিল না তাই মহালয়ার ভোর রাতে খুব কুয়াশা পড়তো। সামনে বিস্তৃত মাঠ থাকার জন্য কুয়াশাটা আরো গাঢ় হতো। তাই জানালাটা অল্প ফাঁক করে সেই আধো অন্ধকারের পানে তাকিয়ে থাকতাম। মনে যেন এক অপার্থিব অনুভব হতো – চারপাশ তখনও অর্ধেক ঘুমের দেশে, আর চলছে সেই অসাধারণ কণ্ঠের চণ্ডীপাঠ।
উঠোনে শিউলির সাদা-কমলা মখমল, মাটিকে ঢেকে দিত;কাকভোরে ঝরতে থাকা ফুল কুড়িয়ে আনতে দৌড়ে চলে যেতাম উঠোনে। সেই শিশিরভেজা শিউলি ফুলের গন্ধ আজও বহন করে আনে শৈশবের ফেলে আসা দিনের স্নিগ্ধতা। মনে হয়, ওই ফুলগুলোই যেন দেবীর পদধ্বনির প্রথম চিহ্ন। ভোরের আলো একটু ফুটে উঠতেই এক দৌড়ে চলে যেতাম আবাসনের সামনে যেখানে প্রতিমা গড়া হতো।সেখানে দাঁড়িয়ে দেখতে পেতাম মৃন্ময়ী মায়ের চক্ষুদান। কি যে ভালো লাগা ছিল!
ধীরে ধীরে শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে কলেজ জীবনেও সেই একই ভালোলাগার অনুভব হতো – যদিও ছিল না সেই ধুসুর কুয়াশা ভরা বিস্তৃত মাঠ , পরিবেশ , মায় আবহাওয়াও। ইতিমধ্যে পাল্টে গেছে অনেক কিছু – বিজ্ঞানের দৌলতে এসেছে দূরদর্শন। আকাশবাণীতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠ আস্তে আস্তে ‘ফেড ইন’। এলো কলকাতা দূরদর্শনের মহালয়ার অনুষ্ঠান। তাই আকাশবাণীর অমর সৃষ্টি ‘মহিষাসুরমর্দ্দিনী’—র সুর ও বাণী শেষ হতেই টেলিভিশনের পর্দা ভরে ওঠে চেনা আলোয়। ফুটে ওঠে পুরাণ-বর্ণিত সেই চিরনতুন কাহিনি। প্রতি বছর হয়তো নতুন প্রযোজনা সম্ভব হয়ে ওঠে না; তবু দেবী, মানবী অবয়বে প্রহরণ ধারণ করে আবির্ভূতা হন পর্দায়। প্রতি বছর তাঁর নাম বদলায়, বদলায় স্ক্রিপ্ট, বদলায় কুশীলব,বদলে যান মা দুগ্গাও। দেবীপুরাণের গহীন থেকে তুলে আনা গল্পের প্রশাখা বদলে যায়।এদিকে ভোরের আলোয় জলধারায় অঞ্জলি ভরে তর্পণ শুরু হয়ে যায়।আর ছোট পর্দায় ক্রমশ প্রকাশিত হন দেবী;শোনা যায় অনন্ত মন্ত্রোচ্চারণ—
“ত্বং স্বাহা… ত্বং স্বধা…” মহালয়ার আবাহনে ছড়িয়ে পড়ে আশ্বিনের পবিত্র আভা, বিশ্বজুড়ে।
বেলা বাড়লে শরতের রোদ একটু চড়া হলেই পাড়ার দোকানে আলোচ্য বিষয় — এ বারের দুর্গা কি গত বারের দুর্গাকে ছাপিয়ে গেলো ? এদিকে হেঁশেলে একটু ‘বিশেষ’ রান্নার জোগাড় করতে করতে ঘরেই শুরু হলো আলোচনা — “এ বারের দুগ্গার চোখগুলো দেখেছো ? বাবাঃ কি ভাবে তাকালো ?” অপরদিকে থেকে উত্তর আসে, “যা-ই বলো , গেল বারের নাচটা আরও জমেছিল…।”
আজও যখন মহালয়া আসে, আমি ভোরে জেগে উঠি । ফেলে আসা দিনের মতোই ঘর ঝাঁট দেই, জলের ছিটে দিয়ে ধুপ ধুনা জ্বালিয়ে বর্তমান সময়ের “ব্লুটুথ” দিয়ে ঠিক ভোর চারটেয় মহালয়া চালিয়ে দেই। গমগম করে উঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠ – “আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোক-মঞ্জীর; ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা…”। মনের অতলান্ত থেকে উঠে আসে প্রিয়জনের স্মৃতি , বুক ভরে উঠে সুখ -দুঃখের মিলিত সুরে। দূর থেকে ভেসে আসে সেই পুরনো চণ্ডীপাঠ, যদিও রেডিওর জায়গা নিয়েছে মোবাইলের স্ক্রিন। শিউলির গন্ধ, সকালের আবছা কুয়াশা, আর ভেতরের শিশুটির অস্থিরতা—সব মিলিয়ে মনে হয়, মহালয়া আসলে শুধু দেবীর আগমনী নয়, বরং নিজের শৈশবকে ফিরে পাওয়ার গোপন চাবিকাঠি।






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান