আতিকা হাসান

সাইবেরিয়ার তুন্দ্রা অঞ্চল থেকে প্রায় চারহাজার পথ পাড়ি দিয়ে এক ঝাঁক বুনো সারসদের সঙ্গে কিছুক্ষণ আগে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়া হাওরে পৌঁছালো পিনুজ সারস দম্পতি। পথিমধ্যে সাইবেরিয়ার উড়াল পর্বত থেকে আসা এক ঝাঁক পিনাটেইল, তিব্বত উপত্যকা থেকে এক ঝাঁক বালিহাঁস, হিমালয়ের পাদদেশ থেকে আসা আরো একঝাঁক সারস এবং ভারতের লাদাখ অঞ্চল থেকে এক ঝাঁক চুকার তাদের সাথে মিলিত হয়েছিলো। 

দীর্ঘদিন ওড়ার ফলে তারা সকলেই বিধ্বস্ত ও ক্লান্ত। পথে পথে যদিও কিছু খাবার সংগ্রহ করে তারা খেয়েছে, কিছুটা বিশ্রামও নিয়েছে তবুও ক্লান্তি তাদের পুরো দেহ জুড়ে। প্রতিবছরই এশিয়া, ইউরোপ, রাশিয়া, হিমালয়ের পাদদেশ, তিব্বত, মঙ্গোলিয়া এবং পৃথিবীর আরো অনেক দেশ থেকে এই হাওরে অক্টোবর শেষ থেকে নভেম্বর মাঝামাঝি পর্যন্ত বিভিন্ন পরিযায়ী পাখি এসে পৌঁছায় এবং শীত শেষ হলে মার্চ-এপ্রিলের মধ্যে আবার নিজ নিজ দেশে ফিরে যায়। যাবার সময় তাদের প্রত্যেকের সাথেই এদেশে জন্মগ্রহণ করা কমপক্ষে এক জোড়া বাচ্চাকাচ্চা থাকে। 

পরিযায়ী পাখিগুলো হাওরে নেমে নিজ নিজ বাসা তৈরির জন্য জায়গা খুঁজতে থাকে। হাওরের আশেপাশে প্রচুর গাছপালা।

 পিনুজ দম্পতি কদম গাছে স্বল্পকালীন আবাসের জন্য কিছু শুকনো লতাপাতা জোগাড় করতে লেগে যায়। 
সন্ধ্যার আগেই একটি মোটামুটি বাসযোগ্য বাসা তৈরি করে কিছুক্ষণ গড়িয়ে নেয় তারা। বিশ্রামের পর সন্ধ্যার আগে আগে শিকারে বের হয় দু’জন। 
এই সময় বিশাল হাওরের পানি বেশ কমে যায়। কচি পাতা,শামুক, ঝিনুক সহ নানা প্রকার ছোট মাছ এদের প্রিয় খাবার। খাবারের খোঁজে বের হয়ে তারা হাওরের কাদার ভেতর থেকে শামুক খেয়ে সন্ধ্যার আগেই বাসায় ফিরে আসে। 
সকালে খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যায় দু’জনের। চারিদিকে তখনও অন্ধকার। ভোরের আলো ভালোমতো ফোটেনি। 
বউ বলল,’আচ্ছা পিনু! গতবারও তো আমরা এই হাওরেই এসেছিলাম, তাই না?’
‘হুম, তাই !’
‘তবে,গতবার আমাদের বাসাটা ওই পাড়ের শিমুল গাছে ছিল।’
‘হ্যাঁ বউ! তাই ছিল।’ 
‘আমাদের চারটা সন্তান হয়েছিল তার একটা খাটাশ ও একটিকে বেজি ধরে নিয়ে গিয়েছিল। আর দুটোকে আমরা কত চোখে চোখে রেখেই না বড় করলাম! তারপর তারা উড়তে শিখলো। উড়তে শেখার পর…’ বলতে বলতে বউয়ের চোখ জলে ভরে যায়।
‘থাক বউ, ওগুলো আর মনে করিস না। নিশ্চয়ই আমাদের লালন পালনে সমস্যা ছিল। আমরাই হয়তো তাদের যথার্থ শিক্ষা দিতে পারি নাই।’ 
‘তা হয়তো ঠিক, তবুও সন্তান তো! কোথায় আছে, কেমন আছে, কিছুইতো জানিনা। ওদেরও কি একবার বাবা-মার কথা মনে পড়ে না?’
‘কি জানি বউ ! হয়তো মনে পড়ে, হয়তো মনে পড়ে না। হয়তো পথ ভুলে গেছে!’

‘এটাও কি সম্ভব স্বামী! আমরা কি কখনো পথ ভুলি?’
‘ তাও ঠিক। তবুও তো আমরা সঠিক কিছুই জানিনা বউ। কত কিছুই তো হতে পারে। তবে গত কয়েক মাস আগে একজন বলেছিল ওদেরকে নাকি তিব্বত অঞ্চলে দেখা গেছে। হয়তো ওরা ওখানে বাস গড়েছে।’
‘হয়তো তাই।’
‘এদেশে আসার সময় তাইতো দ্বিতীয় সারসের ঝাঁক যখন হিমালয়ের কাছ থেকে আমাদের সাথে মিলিত হলো তখন আমি পই পই করে খুঁজেছি আমার সন্তানদের। যদি ওই ঝাঁকের মধ্যে আমার সোনামণিরা থাকে। কিন্তু…’ বলে, চোখ মোছে পিনুজ নিজেই।  
স্বামীকে চোখ মুছতে দেখে সারস বউয়েরও চোখটাও জলে ভরে যায়। সে আরেকটু কাছে আসে স্বামীর। 
বলে,’ হিমালয়ের ওই সারসের ঝাঁক দেখে আমারও বুকের ভেতরটা চিনচিন করে উঠেছিলো। আমিও ঝাঁকের আগাগোড়া নজর করে দেখেছি আমার সোনাময়নারা আছে কিনা। কিন্তু তাদের কাউকে না দেখে কলিজাটা জ্বলে-পুড়ে গেছে আমার। তোমাকে বুঝতে দিইনি।’

চলে গেছে বেশ কিছুসময়। দুটো অবুঝ পাখি আরো নিবিড় ভাবে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁয়ে, বুক ভরা দুঃখ নিয়ে। 
কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর পিনুজ বলল, ‘শোন বউ! মন খারাপ করিস না। এবার আমাদের যে বাচ্চাগুলো আসবে আমরা তাদের অনেক ভালোমতো শিক্ষাদীক্ষা দিয়ে বড় করব। যাতে তারা কখনো বাবা-মাকে ছেড়ে না যায়, তাদেরকে ভুলে না যায়।’

একথা শুনে সারস বউ ছলছল চোখে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। বউয়ের এমন করে তাকানো দেখে সারসের মনটা নরম হয়ে গেল। সে বউকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘তোর শরীর অনেকটা ভারী হয়ে গেছে বউ। হয়তো কয়েকদিনের মধ্যেই ডিম পাড়ার সময় হবে। তাই খাবার খোঁজে তোকে বেশি বের হতে হবে না। তুই বাসায় বসে বিশ্রাম করবি। আমি তোর জন্য খাবার সংগ্রহ করে নিয়ে আসবো। এমনিতেই এতটা দিন ওড়ার ফলে তোকে অনেক ক্লান্ত ও দুর্বল মনে হচ্ছে।’
‘তাই বলে সারা দিনরাত বাসায় বসে থাকতে ভালো লাগবে না আমার। আর এবারের প্রকৃতিটাও মনে হচ্ছে গতবারের চেয়ে আরো সুন্দর হয়েছে। এত সুন্দর নৈসর্গিক চিত্র বাসায় বসে থাকলে দেখবো কী করে!’

‘তাহলে একটা কাজ করি, সকালে আমরা দুজনেই খাবারের খোঁজে একসাথে বের হব। সকালের ও দুপুরের খাবার খেয়ে হাওরে রোদ থাকা পর্যন্ত রোদ পোহাব। রোদ চলে গেলে তুই বাসায় চলে আসিস, আমি বিকালের ও রাতের খাবার খেয়ে তোর জন্য নিয়ে আসবো।’  
সারস বউ কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসায় স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল নিষ্পলক। 
ভোরের আকাশে লাল সূর্য দেখার সাথে সাথে সারস দম্পতি পুরো হাওরের দক্ষিণ দিকে যেখানে সামান্য পানিতে লম্বা ঘাস, শ্যাওলা রয়েছে সেখানে এসে দাঁড়ালো। পানি এত স্বচ্ছ যে, হাঁটু পানির নিচে কি আছে তাও দেখা যায়। কিছুক্ষণ তারা এদিক ওদিক তাকিয়ে সকল কিছু পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করল। তারা দেখল যে,তাদের আগেই শত শত সারস, বনমোরগ ও অন্যান্য পরিযায়ী পাখিরা হাওরের চারদিকে বিচরণ করছে। এত ভোরেই পানিতে সাঁতার কাটছে অসংখ্য বুনোহাঁস। যেন নানা দেশের পরিযায়ী পাখিদের মিলনমেলায় পরিণত হয়ে গেছে পুরো হাওর ও তার আশপাশ । 

আসার সময় এক বুনোহাঁস দম্পতির সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল সারস দম্পতির। তারা দুজনও হাওরের মাঝখানে মজার সুখে সাঁতার কাটছে। 
সারসদের দেখে একবার ডাকল তারা, ‘এই বন্ধুরা, এসো সাঁতার কাটি।’
হাঁস বন্ধুদের কথা শুনে পিনুজ বলল,’ এখন না বন্ধু! ওর শরীরটা ভালো নেই, একটু রোদ উঠুক তারপর সাতাঁর কাটবো।’ 
‘ঠিক আছে বন্ধু। কোথায় বাসা বেঁধেছ?’

‘ওই কদম গাছটার মাঝ ডালে।’
ওহ,ঠিক আছে বন্ধু! দেখা হবে।’, বলে তারা উভয়ের সাঁতার কাটতে কাটতে হাওরের মাঝখানে চলে যায়। 
একটু পরেই রোদ উঠলো ঝলমলিয়ে। 
সারস দম্পতি সারাদিনে কয়েকটা ডানকিনা মাছ, কচিপাতা ও কয়েকটি শামুক খেয়ে বিকালে দুজনেই একসাথে বাসায় প্রবেশ করলো। 
সাধারণত তারা রাতের খাবার বিকালে খায়। আজও তারা রাতের খাবার বিকালেই খেয়ে নিয়েছে। 
সারস দম্পতি টাঙ্গুয়া হাওড়ে এসেছে আজ প্রায় ১৫ দিন। দুই দিন ধরে বউয়ের পেট ব্যথা বলে প্রায় বাসায়ই বেশিরভাগ সময় কাটায়। সকালের দিকে তারা দুজনেই একসাথে বের হয়। হাওরের পানিতে কিছুক্ষণ সকলের সাথে সাঁতার কেটে গোসল সারে তারা। সাথে সাথে খাবারের দিকেও চলে অনুসন্ধান। ছোট মাছ গুলো পেলেই তারা সাথে সাথে মুখে পুরে নেয়। কিছুক্ষণ হাওরের পাড়ে রোদ পোহায়। 
সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে পাখি আর পাখি। নানা জাতের, দেশি বিদেশি পাখিদের মিলন মেলা, অভয়ারণ্য। কেউ কেউ হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পারি দিয়ে অন্যদেশে, অন্য ভূমিতে এসেছে খাবারে খোঁজে, প্রজননের তাগিদে। নির্বিঘ্ন ও নিশ্চিন্তে বেঁচে থাকার জন্য তারা ভুলে গেছে পথের শ্রম, শারীরিক কষ্ট। যেন তাদের ডানায় লেগেছিলো রোদের গন্ধ। উড়ার নেশা। 

 সেই তুমুল নেশায় অতিক্রম করেছে দীর্ঘপথ। অস্থায়ী বাস গড়েছে বিশ্বাসে, নিঃশব্দ-নীরবতায়। বিশাল হাওর জুড়ে চাষ করেছে সুখের প্রান্তিক মদিরতা।
সকলের সাথে সাঁতার কেটে কিছু খাবার খেয়ে বউ চলে আসে দুপুরের পরপর। আর স্বামী সন্ধ্যা হওয়ার আগ পর্যন্ত নিজে খাবার খেয়ে, বউয়ের জন্য কিছু খাবার নিয়ে বাসায় ফেরে। 

আজও প্রতিদিনের মতো পিনুজ বাসায় ফিরে দেখে বউয়ের মুখটা বেশ খুশি খুশি। মনে হলো সে কি যেন একটা ঢেকে বসে আছে। 
পিনুজ বউ কে বলল, ‘কী হয়েছে বউ ? আজ যে তোকে খুব খুশি খুশি লাগছে!’
বউ কিছু না বলে একটু সরে গেল বামদিকে। 
সারস দেখল সদ্য পারা একটি সাদা ধবধবে ডিম। 
সে দৌড়ে যেয়ে ঠোঁট দিয়ে ডিমটাকে আদর করলো। বউকেও বাম ডানা দিয়ে জড়িয়ে ধরল। 
বউ বলল,’ তুমি খুশি হয়েছো?’

আমি অনেক খুশি বউ, তবে গতবারের মতো যেন না হয়। গতবার তো ডিমগুলোকে কত সতর্ক থেকে পাহারা দিয়েছিলাম। ফলে চারটা বাচ্চাই হয়েছিলো আমাদের। কিন্তু সেই চারটা বাচ্চার একটা খাটাশ ও একটা বেজি ধরে নিয়ে গিয়েছিলো। এবার যাতে সেটা না হয়। বলে বউকে বলল, ‘আজ আমরা দুজনেই ডিম টাকে ঢেকে রাখি। আগামীকাল আরো মজবুত করে বাসা তৈরি করব, আর দু’জনেই পালাক্রমে পাহারায় থাকবো।’
পরের দিন ভোরে বাসাটাকে আরো মজবুত করার জন্য পিনুজ একাই উড়ে উড়ে কিছু খড় ধান গাছের গোড়া থেকে সংগ্রহ করল। সাথে কিছু শুকনো লতাপাতা এনে বাসায় জড়ো করে রাখল। হাওর থেকে কয়েকটা শামুক ও ছোট মাছ এনে বউকে খাইয়ে দিল। সন্ধ্যার আগে আগেই তাদের বাসাটা আগের চেয়ে আরো বেশি মজবুত করে তৈরি করল সারস দম্পতি। 
প্রতি একদিন পর পর প্রায় চারটা ডিম পারলো সারস বউ। এই আট দিনে তারা কখনোই ডিম রেখে একসাথে বাসার বাইরে যায়নি। সকালের দিকে বউ বাইরে গেলেও সারস সবগুলো ডিম আগলে ডানার নিচে ভরে বসে থাকে। আর চারদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখে চিল, শকুন, কাক বা অন্যান্য শিকারি পশু পাখিদের।
এত সতর্কতার পরেও পরের দিন ভোরে প্রায় পেটের নিচ থেকেই একটা ডিম ছো মেরে চিল নিয়ে উড়াল দেয়। প্রায় সারাদিন ডিমের শোকে না খেয়ে থাকে সারস দম্পতি। 

যাই হোক মোট তিনটা ডিম নিয়ে মা পাখিটা ওম দিতে থাকে। ত্রিশ দিন নিরবিচ্ছিন্ন ওম দেয়ার পর একটা ডিমে হঠাৎ নড়াচাড়া বোঝা যায়। চোখে মুখে আনন্দের ঝিলিক বয়ে যায় মা-বাবা দুজনেরই। 
ঠিক তেত্রিশ দিনের মধ্যে তিনটা ডিম থেকেই সাদা ও ধূসর সারস শিশুর জন্ম হয়। আর এই পুরো সময় জুড়ে নিজের এবং বউয়ের জন্য খাবার সংগ্রহ করেছে বাবা সারস। 
বাচ্চাদের দেখে মা-বাবার আনন্দের সীমা থাকে না। দুটো মেয়ে এবং একটা ছেলে। পরিবারের সকলের জন্য খাবার সংগ্রহ করতে বাবা সারসের এখন অতিরিক্ত ছোটাছুটি করতে হচ্ছে। বাচ্চাদের জন্য খুব ছোট ছোট কেঁচো, শামুক এবং বউয়ের জন্য কখনো মাছ, কখনো ছোট ব্যাঙ নিয়ে আসে পিনুজ। 

পাঁচ দিন পর মা সারস স্বামীকে বলল, ‘এই কয়দিন তুমি খুব কষ্ট করেছ। আগামীকাল ভোর থেকে দুজনেই পালাক্রমে বাচ্চাদের খাবার সংগ্রহ করবো আর আমরা হাওর থেকে খেয়ে আসবো।’
‘না বউ আর দুটো দিন যাক, বাচ্চারা আরেকটু ঝরঝরা হোক। ‘
‘তাহলে তাই হোক! আর দুটো দিন পরেই না হয় বের হব। আমিও বাসায় থেকে থেকে কেমন হাঁপিয়ে উঠেছি। বাইরে গেলে আমারও ভালো লাগবে আর তোমারও একটু পরিশ্রম কমবে। ‘
‘কিন্তু বউ আমি বড় চিন্তায় আছি।’
‘চিন্তায় আছ মানে! কিসের চিন্তা?’
‘গতকাল দেখলাম ওই কদম গাছটায় একটা চিল বসে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমাদের বাসার দিকে তাকিয়ে আছে।’
‘বল কী ? এটা তো তাহলে খুবই চিন্তার বিষয় !’
‘খুবই চিন্তার বিষয় বউ। এজন্যই তো ঐদিন তোকে বললাম বাচ্চাদের নিয়ে বেশি কথা বলার, হাসাহাসি করার দরকার নেই। যাতে আশেপাশের বনবিড়াল, শিয়াল, বেজি, চিল … এরা জানতে না পারে আমাদের ঘরে তিনটা বাচ্চা আছে। ‘
‘আমি তো খুবই সাবধান হয়ে থাকি। সারাক্ষণ বাচ্চাদের ডানার নিচে লুকিয়ে রাখি। ওদের সাথে কথা বলি ফিসফিসিয়ে, তবুও!’

‘আরো সাবধান ও সচেতন হতে হবে বউ।’
স্বামীর কথা শুনে সারস বউয়ের ছোট্ট বুকটা তিরতির করে কাঁপতে লাগলো। বাচ্চাদের আরও বেশি নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ডানার নিচে ভরে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকাতে লাগল এদিক ওদিক। 

পরের দিন ভোরে মা সারস স্বামীকে বাচ্চাদের বুঝিয়ে দিয়ে খাদ্যের খোঁজে হাওরের দিকে উড়াল দিল। সে ভাবল খাবার খেয়ে কতক্ষণ সাঁতার কেটে গোসলটাও সেরে নেবে। কতদিন গোসল করে না বলে মাথাটা ঘুরছিলো। আবার কতদিন সাঁতারও কাটে না …তারপর বাচ্চাদের জন্য খাবার নিয়ে ঘরে ফিরবে। 
যাবার সময় কদম গাছের ডালে একবার তাকায় মা পাখিটা। ঐদিক তাকিয়ে তার রক্ত হিম হয়ে যায়। দুটো চিল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাদের বাসার দিকে তাকিয়ে আছে। ওটা দেখে মা সারস কি করবে বুঝতে পারে না। একবার ভাবে হাওরে যাবে না। আবার চিন্তা করল সে যাবে আর আসবে। সাঁতার কাটার দরকার নেই। কোনোমতে গোসলটা সেরে কিছু খাবার নিয়ে এক্ষুণি চলে আসবে। 

হাওরে নামার সাথে সাথে দেখা হয় বুনোহাঁস দম্পতির সাথে। বাবা সারসের কাছে শুনেছে বাচ্চা ফোটার কথা। তাদের সাথে কথা বলতে বলতে বেশ দেরি হয়ে যায়। 
বাসায় বাচ্চাদের ডানার নিচে ভরে বাবা সারস তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কদম গাছের চিল দুটোর দিকে। আর মনে মনে ভাবছে ওরা যদি হামলা করে তবে তাদের ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলবে, যাতে গতবারের মতো না হয়। এবার নিজের জীবন দিয়ে হলেও বাচ্চাদের রক্ষা করবে সে। 
এমন সময় মা সরস কিছু খাবার নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে বাসায় প্রবেশ করে। প্রথমে বাচ্চাদের খাইয়ে দেয়। তারপর পথের কথা, কদম গাছের চিলদের কথা বলে স্বামীর নিকট। 
বউ বলে,’ আমার খুব ভয় করছে স্বামী!’
বাবা সারসের নিজেরও কেমন যেন ভয় ভয় করছে। তবুও বউকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বলল, ‘ভয়ের কিছু নেই বউ! আমরা আরো সতর্ক থাকবো, দেখিস কিছু হবে না।’
‘তবে আমাদের বাচ্চাদের উপর সবার নজর পড়েছে এটা বুঝতে পারছি।’
‘তাতো পড়বেই বউ! কার ঘরে এমন সুন্দর তিনটা বাচ্চা আছে, বল? কারো নেই তো!
সন্ধ্যা থেকেই সারস বাবা-মা দুজনেই ছানাদের বুকের নিচে রেখে জেগে রইল। গভীর রাতে মাত্র চোখে একটু তন্দ্রার মতো এসেছে, এমন সময় একটা খসখস ধস্তাধস্তির শব্দ শুনে ঘুম ভেঙ্গে যায় মা-বাবা দুজনেরই।

একটা বিরাটাকার সাপ একটা ছানা মুখে পুরে হিসহিস শব্দ করতে করতে চলে যাচ্ছে। ওটা দেখে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে ওঠে মা পাখিটা। তার কলিজার ধন।… বুকফাটা আর্তনাদে জেগে যায় আশপাশের গাছপালা, পশু পাখি ও রাতের অন্ধকার। একটু পর সম্বিত ফিরে পায় দুজনেই। তাদের আরো দুটো ছানাদের বাইরে দেখে। সাথে সাথে বাচ্চাদের ধরে বুকের নিচে লুকিয়ে ফেলে বউয়ের মুখ চেপে ধরে পিনুজ। যাতে তাদের চিৎকার আর কেউ না শোনে। 
ভোরের সূর্য ওঠার আগেই দুটো সন্তানকে আগলে ধরে, হাওরের অন্যপাশে ঘন পাতাযুক্ত একটি বাবলা গাছে স্থানান্তরিত হয়ে যায় তারা। 
হাওরের এদিকটা খোলামেলা। গাছপালা অনেক কম। কাজেই জীবজন্তুও অনেক কম। 
সারাদিনে কঠোর পরিশ্রমের করে দিন শেষে চারজনের বাসের উপযোগী একটা বাসা তৈরি করে ফেলে সারস দম্পতি। 

এখন বাচ্চাদের আরো দেখেশুনে রাখে তারা। একজন বাইরে গেলে আরেকজন পাখা দিয়ে ঢেকে রাখে বাচ্চাদের। মাঝে মাঝেই অপর বাচ্চাটার জন্য হৃদয় পুড়ে যায়। তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে দু’ফোঁটা অশ্রুজলে ভরে ওঠে উভয়ের চোখ। 
অনেক সতর্কতায় পর চলে যায় দুই দুটো মাস। এই দুই মাসে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে দুই বাচ্চাকে বড় করেছে সারস বাবা-মা। নিজেরা খেয়ে না খেয়ে বাচ্চা দুটোর মুখে খাবার তুলে দিয়েছে প্রতিবেলা। এই কয়দিনে তাদের উড়তেও শেখায়। আজ সকালেই ছেলে মেয়ে দুটোই এ গাছ থেকে ওই গাছে উড়ে গিয়েছে। দুপুরের দিকে বাবা-মা দুজনের সাথে তারা হাওরে গিয়ে নিজে নিজে খাবার কুড়িয়ে খেয়েছে। সাঁতার কেটেছে অনেকক্ষণ।  
বাচ্চাদের এমন করে উড়তে দেখে, সাঁতার কাটতে দেখে, সারস দম্পতির গর্বে , ভালোবাসায় বুক ভরে যায়। মনে পড়ে হারানো সন্তানের কথাও। 

কেটে যায় আরো কিছুদিন। সারস দম্পতির ঘরে যেন খুশির সীমা নেই।  এরমধ্যে একদিন বুনোহাঁসার সঙ্গে দেখা। 
সে বলল ,’জানো তো ঢাকা থেকে নাকি এক পাখি শিকারীর দল গতকাল হাওরে এসে পৌঁছেছে। ”বল কী ! জানি না তো!’
‘জানবে কী করে তোমরা দু’জন তো বাচ্চাদের নিয়েই সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকো। বাইরে তো বের হও না বললেই চলে। ‘
‘তুমি তো জানো বন্ধু! গত বছর দুটো বাচ্চাকে হারিয়ে, এ বছরও একটা বাচ্চাকে হারিয়ে মনটা খুব দুর্বল হয়ে গেছে !’
‘তা ওরা তো দেখলাম এখন বেশ বড় হয়েছে! নিজে নিজেই সব কাজ করতে পারে। এবার ওদের নিজেদের মতো ছেড়ে দাও। নিজেদের মতই বাঁচতে শিখুক। ‘
‘ছেড়েই তো দেবো বন্ধু! তবে এদেশে নয়। নিজ দেশে যেয়ে ওদের জীবন গড়ে দেব। তখন নিজেদের মতো থাকবে ওরা। বিদেশ বিভূঁইয়ে কোথায় যাবে, কোথায় থাকবে, তার ঠিক নেই। পরে না নিজের শিকড় ভুলে যায়। ‘
‘সেটাও ঠিক কথা বন্ধু। তুমি যা ভেবেছো সেটা খুবই কাজের কথা। তবে তোমার বাসাটা তো বেশ ফাঁকা জায়গায় একটু সাবধানে থেকো। ‘

‘ফাঁকা জায়গায় বাসা, এটা আসলেও চিন্তার বিষয় বন্ধু। তবে নিজেদের জন্য অত ভাবি না। বাচ্চা দু’টোর জন্য যত চিন্তা। এখনো তো দুনিয়াদারির কিছুই বোঝে না। কখন যে কোন বিপদে পড়ে, সেই চিন্তায় ঘুম আসে না আমাদের। ‘
‘তবুও নিজেদের প্রতি ও খেয়াল রেখো বন্ধু। এখনকার শিকারীদের যে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, যত বুদ্ধিমান হই না কেন কখন যে ধরা পড়বো বুঝতে পারবো না।’

পশ্চিম আকাশে সূর্য ডোবা দেখে বন্ধুকে বিদায় জানিয়ে বাসায় ফিরে পিনুজ। রাতে বাচ্চাদের ডেকে বাবা সারস শিকারীদের কথা বলল। পই পই করে সতর্ক করে দিল বউ, বাচ্চাদের। বারবার নির্দেশ দিলো কি করতে হবে, কিভাবে নিজেকে রক্ষা করতে হবে। 

বউকে বলল, ‘আগামীকাল খুব ভোরে জনমানুষ ওঠার আগেই আমরা দু’জন হাওরে যেয়ে নিজেদের খাবার খেয়ে বাচ্চাদের জন্য খাবার নিয়ে আসব, সারাদিন যাতে আর বাসার বাহিরে যেতে না হয়। কয়েকটা দিন সতর্ক থাকলেই এ যাত্রা শিকারীর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। কয়েকদিন পর তো আমরা নিজের দেশে চলেই যাব। আর যদি দুপুরের দিকে পরিস্থিতি ভালো থাকে তবে না হয় বাচ্চারা একবার হাওর ঘুরে আসবে। 
পরেরদিন ভোরে অন্ধকার থাকতে থাকতে বাচ্চাদের ঘুমে রেখে বাইরে বেরিয়ে গেল সারস দম্পতি। চারিদিকে সতর্কতার দৃষ্টি রেখে যেইনা হাওরের মাটিতে পা রেখেছে, অমনি শিকারীর জালে আটকে গেছে তাদের পা। হাওরের দক্ষিণ দিকে হাওরের পুরো পাড় জুড়ে সূক্ষ্ম জাল পেতে সারারাত বসে ছিলো শিকারী। আর সেই জালের ফাঁদে অসংখ্য সারস, বুনোহাঁস, খঞ্জনা,পনিটেইলসহ নানা জাতের পরিযায়ী পাখি আটকা পড়েছে। পুরো হাওর জুড়ে পরিযায়ী পাখিদের চিৎকার-চেঁচামেচি, ডানা ঝাপটানোর শব্দে আশপাশের সকল পশুপাখিদের ঘুম ভেঙে যায়। 

ঘুম ভেঙ্গে যায় নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা সারস বাচ্চাদেরও। প্রথমে তারা কিছুই বুঝতে পারে না। চোখ মেলে প্রথমে বাবা-মাকে খুঁজতে থাকে। আসে পাশে মা-বাবাকে না দেখে মনে পড়ে গত রাতের কথা। অবুঝ দুটো পাখি এর আগে কখনো এমন দেখেনি। তারা দুজন এখন কি করবে কিছুই 
বুঝে উঠতে পারে না। ভয়ে ভাইবোন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে মা মা বলে কাঁদতে থাকে। 
এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে বুনোহাঁস আসে তাদের ঘরে। কান্না জড়িত কন্ঠে বলে,’ বাবারা, শোন! তোমাদের বাবা-মা শিকারীদের জলে আটকা পড়েছে। শিকারীরা সাথে সাথে তাদের খাঁচায় ভরে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা করেছে। 
তবে শোনো, আমরা যারা বাইরের দেশ থেকে এদেশে এসেছি তারা যত শীঘ্র নিজ দেশে ফেরত যাব, তোমরা দু’জনও আমাদের সাথে যাবে।’
‘কিন্তু কাকু, বাবা-মা ফেরত এসে যদি আমাদের না দেখে, তো…’
‘দুটো অবুঝ বাচ্চার এমন কথা শুনে বুনোহাঁস এগিয়ে এসে দুজনকে জড়িয়ে ধরে বলে,’ বাবারে! যারা এদের হাতে একবার ধরা পড়ে তারা আর কখনো ফিরে আসে না। তোমাদের বাবা-মাও আর কোনদিন ফিরে আসবেনা।’ বলে, চোখ মোছে বুনোহাঁস। 
‘তবুও যদি আসে কাকু!’ বলে বোনটা কান্না করে দিল। 

বুনোহাঁস তখন সারস বোনের মাথায় হাত রেখে বলল, ‘তোমার বাবা-মায়ের বন্ধু আমরা। একদিন তোমার বাবা-মাকে কথা দিয়েছিলাম তোমাদের যেকোনো বিপদে পাশে থাকবো। এই মুহূর্তে এর চেয়ে বড় বিপদ আর নেই। যারা এখনো ধরা পড়েনি তারা অতি শীঘ্রই অন্য আরেক শিকারীদের হাতে ধরা পড়বে। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিজ নিজ দেশে চলে যাওয়া। আর সে মতোই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সবাই। 
তবুও, তোমরা যেহেতু দেখতে চাচ্ছো সেহেতু শুধু তোমাদের কথা ভেবে আজ বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করবো আমরা। যদি বিকেল পর্যন্ত তারা ফিরে না আসে তাহলে সন্ধ্যার আগে আগে সবাই রওনা করব।’

“দীর্ঘ পথ হাঁটতে হাঁটতে অতিক্রম করা হয় 
বহু ঋতুচক্র, বসন্ত বাগান
তবুও কেউ কেউ খুঁজে পায় না ঘাটের ঠিকানা 
সুখের খেয়াতরী,
তাই, সব রঙ-রূপ-ছন্দের শিকড় উপড়ে 
মগজে স্মৃতি গন্ধ নিয়ে 

ফিরে যায় আবার,
ফিরে যায় আবারー
স্বজনের আলোহীন গুপ্তগহ্বরে।”

পরের বছর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে দুই সারস ভাইবোন এক পরিযায়ী ঝাঁকের সাথে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়া হাওরে আবার এসেছে। এই হাওরে দুদিন থেকে তারা চলে যাবে নিঝুম দ্বীপে। ভাইবোন দেখছিল বাবলা গাছের ডালে এখনো একটি পরিত্যক্ত বাসা। বাসার কিছু খড়,শুকনো লতাপাতা বাতাসে উড়ছে… 
দুই ভাইবোন সেই বাসাটার ভেতর উদাস হয়ে বসে রইলো কিছুক্ষণ। নানা দিকে বাবা-মা সহ তাদের কত স্মৃতি। গাছের প্রতিটি পাতায় পাতায়, ডালে ডালে খেলাধূলা করার , ওড়ার স্মৃতি চিহ্ন। এদিক ওদিক তাকিয়ে তাদের কলিজার ভিতর জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। মনে পড়ে মায়ের কথা, বাবার কথা…
বোন বলল, ‘আচ্ছা ভাইয়া! আমরা কী আর কখনো বাবা মাকে দেখতে পাবো না?
তারা কী আর কখনো আমাদের কাছে আসবেন না ? 
‘কি জানি বোন!’ বলে, বোনের দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে রইলো। 
ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বোন আবার বলে, ‘কিন্তু আমার যে মায়ের জন্য অনেক কষ্ট হয় ভাইয়া। 
মনে হয় মায়ের বুকের ওমটা এখনো আমার শরীরে লেগে আছে।’

বোনের কথা শুনে ভাইটার চোখ জলে ভরে যায়। বোনের নজর থেকে সে মাথাটাকে ঘুরিয়ে রাখে অন্যদিকে। যাতে বোন তার চোখের জল দেখতে না পায়। এদেশ থেকে চলে যাওয়ার পর প্রায় প্রতিদিনই তারও বাবা মায়ের কথা মনে পড়েছে। তাদের জন্য বুকটা ভেঙে চৌচির হয়ে গেছে। যা কখনোই বোনকে বুঝতে দেয়নি। কিন্তু অবুঝ বোনটা যখন বাবা-মায়ের কথা জিজ্ঞেস করে তখন ভাইটা নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনা, ধরে রাখতে পারেনা চোখের জল। 
মানুষের নির্মমতার কথা অবুঝ বোনটা কিছুতেই বুঝতে চায় না। বুঝতে চায়না শিকারীর জালে আটকা পড়া কেউই আর কখনো ফিরে আসেনা। তাদের বাবা-মাও আর কখনো ফিরে আসবে না। স্বার্থপর লোভী মানুষের হাত থেকে কোনো পরিযায়ী পাখিই আর ফিরে আসে না। 
নিজেকে সামলে আরো কাছে আসে ভাইটি। বাম ডানা দিয়ে বোনের মাথাটা বুকে জড়িয়ে উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকে অজানায়…


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Trending