শুভ জন্মদিন
প্রিয় কবি- আসাদ মান্নান
কবি আসাদ মান্নান জন্ম ৩ নভেম্বর ১৯৫৭ সালে চট্রগ্রামের সন্দ্বীপে। সত্তর দশকের প্রথম সারির অন্যতম শক্তিশালী কবি। তৎকালীন সাহিত্য আন্দোলনে নিজস্ব কাব্য শৈলী এবং স্বতন্ত্র কাব্যধারার মাধ্যমে উপস্থিত হন এবং তিনি বাংলা সাহিত্যে বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেছেন।
তাঁর কাব্যবুননে নিজস্ব ধরণ কৌশল বা রীতি তাঁর স্বকীয় প্রক্রিয়াকে প্রাধান্য দিয়ে আসছেন। বাংলা কবিতায় তাঁর নিজস্ব বলয় সৃষ্টির বিষয়টা নি:সন্ধেহে একটি মেরুকরণ বলা যেতে পারে। বাংলাদেশের রাজনীতি এবং সামাজিক আন্দোলনের তাঁর কবিতা অগ্রণী ভুমিকা পালন করে আসছে। তাঁর কবিতা কেবল সৌন্দর্য সৃষ্টি করে না; তা চিন্তা, প্রতিবাদ, মানবিকতা এবং সামাজিক দায়িত্বও জাগ্রত করে। ৭০-এর দশকের সেই প্রজন্মের কবিদের, যারা কঠিন বাস্তবের সঙ্গে স্বপ্নের সীমাহীন দিগন্তকে একত্রিত করেছেন, তাদের মধ্যে আসাদ মান্নানের অবদান অনন্য।
কবি আসাদ মান্নানের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ২২ এবং উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে: সুন্দর দক্ষিণে থাকে, হে অন্ধ জলের রাজা ‘ মরুভূমি স্বপ্ন দ্যাখে জল’, সৈয়দ বংশের ফুল, ভালোবাসা আগুনের নদী, প্রেমের কবিতা, শ্রেষ্ঠ কবিতা, নির্বাচিত কবিতা, ‘স্বনির্বাচিত কবিতা, অদৃশ্য জল্লাদ, কুয়াশা উপেক্ষা করে বসে আছে আশা, জলের সানাই, যে পারে পার নেই সে- পারে ফিরবে নদী, হাওরের পাখি ও অন্যান্য, ভালোবাসা আগুনের নদী ইত্যাদি।
কবি ১৯৮১ সালে সংবাদ কর্মী হিসেবে দৈনিক গণকণ্ঠ ও সাপ্তাহিক সমাজ পত্রিকায় খণ্ডকালীন সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে স্কুল ও কলেজে শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন ১৯৮৪ -৮৫ পর্যন্ত। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেন। ২০১৪ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত বাংলাদেশ টেলিভিশনে মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছন। বিটিভির মহাপরিচালক ছাড়াও তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দায়িত্ব পালন করেন, যেমন, রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার, সরকারের সচিব হিসেবে বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য এবং ২৪ জুন ২০১৮ থেকে ২ নভেম্বর ২০২২ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের ( পিএসসি) সদস্য হিসেবে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে অবসরে এবং লেখালেখি নিয়েই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি হিসাবে আসাদ মান্নান তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য বহু পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য: ১৯৭৬ ও ১৯৭৭ সালে পরপর দু’বার শ্রেষ্ঠ তরুণ কবি হিসেবে বাংলাদেশ পরিষদ সাহিত্য পুরস্কার, ২০০৭ সালে জীবনানন্দ দাশ পুরস্কার, ২০১২ সালে কবিকুঞ্জ পদক, ২০২১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং আরও অন্যান্য স্বীকৃতি কবিতার প্রভাব ও জনপ্রিয়তা।
তিনি রাজনীতি, সামাজিক আন্দোলন এবং মানুষের বাস্তব জীবনের বিষয়গুলিকে তাঁর কবিতায় প্রাধান্য দিয়েছেন। তার কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে সমাজের অসাম্য, ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন, এবং মানুষের অনুভূতির জটিলতা। তাঁর কবিতায় অতীন্দ্রিয়–চিত্রকল্প এবং গভীরে থাকা আধুনিকতাবোধ, অতীন্দ্রিয়তা, মনস্তাত্ত্বিক ইমেজারি এবং ভাষার স্বকীয় সৌন্দর্য।
আমি কবি আসাদ মান্নানের কিছু কবিতা শেয়ার করছি। পাশাপাশি চেষ্টা করবো কবিতাগুলো নিয়ে আমার অনুভুতি প্রকাশ করতে। পাঠকের কাছে তাঁর কবিতায় আধুনিক, উত্তরাধুনিক বা সমকালীন ধ্যানধারার প্রভাব কতটা শক্তিশালী আমরা জানার চেষ্টা করবো।
আমি যখন প্রথম আসাদ মান্নানের কবিতা হাতে নিই, তখন মনে হয়েছে আমি শব্দ পড়ছি না বরং কেউ আমাকে এক অন্তর্দৃষ্টির পথে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তাঁর কবিতা কেবল বাইরের বাস্তবের প্রতিচ্ছবি নয়; এটি মানবচেতনার এক অন্তর্দৃষ্টি, যেখানে প্রেম, মৃত্যু, স্বপ্ন, দেশ, সবই সমান্তরাল বাস্তবতায় মিলেমিশে থাকে। এটি শুধু পাঠ নয়; এটি অন্তরযাত্রার এক স্বীকৃত অভিজ্ঞতা, যেখানে আমি পাঠক হিসেবে নিজেকে আবিষ্কার করি।
আসাদ মান্নানের ভাষা আমাকে প্রথমে স্তম্ভিত করেছিল। শব্দ এখানে কেবল বাহন নয়; শব্দ নিজেই প্রাণ। কখনও শিশির হয়ে ভেতরের চেতনার সঙ্গে মিশে যায়, কখনও আগুন হয়ে অন্ধকারে বিস্তার লাভ করে। তাঁর কবিতার প্রতিটি শব্দ নিজস্ব জীবন্ত চেতনা ধারণ করে। বাস্তব এবং অবাস্তবের সীমা মিলেমিশে এক অবিন্যস্ত জগৎ তৈরি করে।
“যদি ভালোবাসা পাই
আমি আর কোথাও যাব না;
এখানে দাঁড়িয়ে থেকে আমি যাব,
সবখানে যাব, সবখানে…”
এই কয়েকটি লাইন শুধু ভালোবাসার প্রতীক নয়; এটি চেতনার মুক্তি। ভালোবাসা এখানে কোনো সম্পর্কের সীমাবদ্ধতা নয়; এটি এক অন্তর্ভুক্ত অভিজ্ঞতা। ভালোবাসার মাধ্যমে “আমি” অসীমে বিস্তৃত হয়, স্থান, সময় এবং মৃত–জীবিত সব বাধা অতিক্রম করে। পাঠকের জন্য এটি এক আত্ম-উন্মোচন।
আসাদ মান্নানের কবিতায় দেশ কখনও ভূগোল নয়। এটি মানুষের আত্মার এক অন্তঃলোক। দেশ কখনও মায়ের শরীর, কখনও প্রেমিকার ভেতরের অনুভূতি, আবার কখনও লাশের মিছিল। দেশকে তিনি মানবচেতনার ব্যথার প্রতীক হিসেবে দেখান। আমরা যখন তাঁর কবিতা পড়ি, তখন দেশ একটি চেতনার ভূগোল হয়, যেখানে জাতি, ধর্ম বা রাষ্ট্রের সীমা নেই।
“এখানে দাঁড়িয়ে থেকে এই সীমাবদ্ধ দেশ ছেড়ে
আমি চলে যাব অন্য দেশে, অন্য এক বাংলাদেশে
যার কোনো সীমা ও সীমান্ত নেই
যেখানে থাকে না কোনো জাতীয় পতাকা,
জাতীয় সঙ্গীত আর রাজদণ্ড।”
এটি রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নয়; বরং অন্তর্দৃষ্টি, মানুষের আত্মা, স্বপ্ন ও মানবিকতার সীমাহীন প্রসার। পাঠক হিসাবে আমি বারবার প্রশ্ন করি আমি কি সত্যিই স্বাধীন? আমার ভেতরের দেশ কোথায়? এই ভাবনা আমাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজের অস্তিত্বের দিকে টেনে নিয়ে যায়।
আসাদ মান্নানের কবিতায় অবাস্তববাদী চিত্রকল্প অসাধারণ। “পাহাড় কাটার পর” কবিতায় তিনি লিখেছেন: “পাহাড় কাটার পর ভেঙে যায় দুঃখের নীলিমা।” এই চিত্রে তিনি শুধু প্রকৃতির দৃশ্য বর্ণনা করেননি; বরং এটি মানুষের মানসিক ক্ষয় এবং আত্মার ব্যথার প্রতীক। মরুভূমির স্বপ্নময় জল, নদীর ঢেউ সবই মানুষের অন্তর্নিহিত মানসিক ভূদৃশ্য। প্রকৃতি তাঁর কবিতায় বাহ্যিক নয়; বরং মানবচেতনার অন্তর্নিহিত বাস্তবতা।
“মানুষ তোমার নামে” কবিতায় তিনি লিখেছেন:
“না, আমি মৃত্যুর আগে ইঁদুরের চোখের ভেতরে
জীবন্ত ধানের ক্ষেতে না-বাঁচার ছাড়ব না আশা;
চাষার লাঙল হয়ে খুব ভোরে দক্ষিণের চরে
মাটিতে হৃদয় খুঁড়ে ঢেলে দিতে স্বপ্ন ভালোবাসা”
এই লাইনগুলো মানব অস্তিত্বের সংগ্রামকে দেখায়। এটি কেবল দুঃখ নয়; বরং আশা, জীবনদর্শন, নৈতিক দায়, সবকিছুর এক সংমিশ্রণ। পাঠক হিসেবে আমি অনুভব করি, কবিতা আমাকে আমার আত্মার ভেতরে টেনে নিয়ে যায়।
আধ্যাত্মিক ভ্রমণ স্পষ্ট। এটি ধর্মীয় নয়; বরং অন্তর্দৃষ্টি এবং অস্তিত্বের সীমা পরীক্ষা। প্রতিটি কবিতার বাঁকে পাঠককে তার নিজের অন্তর্দৃষ্টি, স্বাধীনতা এবং আত্মার সীমা দেখতে হয়। মৃত্যু, ক্ষয়, নিঃশ্বাসহীনতা, সবই কবিতার অংশ। তবে এটি শুধুমাত্র বেদনাজনক নয়; বরং আলোর জন্ম দেয়। যেমন “জবাব দেবে না কেউ” কবিতায় দেখা যায়:
“আজ হরিণীর মাংস খেয়ে মানুষ গিয়েছে বনে
বাঘ কিংবা বাঘিনী শিকারে; মনে জাগে অদ্ভুত বাসনা
বাঘিনীর স্তন কেটে যদি খুঁজে পাওয়া যায়
মানুষের রক্তচিহ্ন; হায়!
এতটা নৃশংস কেন আজ মানব প্রজাতি!”
এই লাইনগুলো মানুষের নৈতিক অব্যবস্থা এবং সভ্যতার সীমা চিহ্নিত করে। কবি শুধু দেখান না; তিনি আমাকে সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করান, আমরা কি সত্যিই মানুষ?
মান্নানের কবিতায় ভালোবাসা কেবল রোমান্টিক নয়; এটি আধ্যাত্মিক এবং নৈতিক। “যদি ভালোবাসা পাই” কবিতায় তিনি লিখেছেন:
“আমি হতে পারি সব ক্ষুধার্ত শিশুর মাতৃদুগ্ধ
আমি হতে পারি সব গৃহহীন মানুষের গৃহ
আমি হতে পারি সব স্নেহহীন মানুষের স্নেহ”
মানবতা ও প্রেমের স্বরূপ শুধুমাত্র অনুভূতি নয়; এটি কার্যকর দায়িত্ব এবং আত্মার বিস্তৃতি। কবি এখানে পাঠককে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন, নিজের জীবনকে এই প্রেম, দায়িত্ব এবং মানবিকতার মধ্যে সমাহিত করতে।
মান্নানের প্রতীকভাষা শক্তিশালী। পাহাড়, নদী, শিশুরা, লাশ, সবই মানুষের অন্তর্গত মানসিক এবং আধ্যাত্মিক চিত্র। কবি প্রতীক ব্যবহার করে মৃত্যু, প্রেম, দেশ এবং স্বাধীনতার দর্শন আমাদের সামনে এনে রাখেন।
সুররিয়াল চিত্রকল্পে এগুলো বাস্তব এবং অবাস্তবের সীমা মিলেমিশে প্রবাহিত হয়। কবি প্রকৃতির মাধ্যমে মানবচেতনার স্তরকে দর্শনীয় করে তোলেন।
আমি পাঠক হিসেবে বারবার অনুভব করি প্রতিটি লাইন আমাকে আমার অন্তঃলোকের দিকে টেনে নিয়ে যায়। কবিতার প্রত্যেকটি ছায়া, শব্দ এবং চিহ্ন আমাকে নিজের অস্তিত্বের গভীরে নিয়ে যায়। পাঠকের জন্য মান্নানের কবিতা মানে নিজেকে খুঁজে পাওয়া, নিজের সীমা পরীক্ষা করা এবং মানবিক মুক্তি উপলব্ধি করা। তিনি লিখেন;
“কবিতাকে খুঁজতে গিয়ে বার বার কেন খুঁজে পাই
একটা অদৃশ্য মুখ, যেন টাটকা পূর্ণিমার চাঁদ।”
এই অদৃশ্য মুখটি শুধুমাত্র কবির নয়; এটি আমার নিজস্ব প্রতিচ্ছবি। এখানে পাঠককে তার নিজের অস্তিত্ব এবং আত্মার রহস্য আবিষ্কারের সুযোগ দেওয়া হয়।
আসাদ মান্নানের কবিতা কেবল পড়ার জন্য নয়; এটি মানবচেতনার আধ্যাত্মিক ভ্রমণ। প্রতিটি লাইন পাঠককে তার নিজের অন্তর্দৃষ্টি, সীমা এবং অস্তিত্বের মুখোমুখি দাঁড় করায়। দেশ, ভালোবাসা, মৃত্যু, স্বপ্ন, সবই প্রতীক। ভাষা কেবল উচ্চারণ নয়; এটি চেতনার এক জীবন্ত সেতু।
তাঁর কবিতা শেখায়- কবিতা মানে নিজের আত্মার ভিতর দিয়ে যাত্রা করা, নিজের অস্তিত্বকে চেনা, এবং সীমাহীন মানবিকতার দিকে বিস্তৃত হওয়া।
এটি একাধারে আধ্যাত্মিক, দার্শনিক, সমাজ-নৈতিক এবং সৃজনধর্মী যাত্রা। আসাদ মান্নানের কবিতা তাই শুধু সাহিত্য নয়; এটি মানব অস্তিত্বের আধ্যাত্মিক জার্নি, যেখানে প্রতিটি পাঠক নিজেকে খুঁজে পায়, নিজের সীমা ও স্বাধীনতা উপলব্ধি করে, এবং নতুন দৃষ্টিতে জীবনকে উপলব্ধি করতে শেখে।
“’স্বদেশী কুত্তার পিঠে বিদেশি শকুন ”(১৯৭৭)
স্বদেশী কুত্তার পিঠে বিদেশী শকুন
বেশ্যার ছেলের হাতে ইতিহাস খুন
আগুন লেগেছে তাই যমুনার জলে
আগে আগে হনুমান রাম পিছে চলে
সীতাকে হরণ করে রাক্ষস রাবণ
টুঙ্গিপাড়ায় হবে বঙ্গভবন।”
কবিতাটি বাংলাদেশে রাজনৈতিক অবস্থা ও সমাজের অন্যায়ের প্রতিবাদ। বিদেশী শাসক এবং স্থানীয় সহযোগীর মাধ্যমে তিনি দমন ও নিপীড়নের চিত্র ফুটিয়েছেন। রূপক ও পৌরাণিক চরিত্র হিসাবে রাবণ, সীতা, হনুমান- এই চরিত্রগুলি ইতিহাস ও পৌরাণিক কাহিনীর সঙ্গে বাস্তব রাজনৈতিক অবস্থা সংযুক্ত করে।
তরুণ বয়সে এই কবিতা প্রকাশ পেয়ে কবিকে সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং সমাজ সচেতন পাঠকের মনে গভীর প্রভাব রেখেছে।
“আমার হৃদয় ভেঙে গেলে নদী বয়ে যাবে
আগুন জ্বলে ওঠে মনের তলে
ভালোবাসা শুধু প্রেম নয়, এটি প্রতিরোধের ঢেউ।”
মানবিক ও নৈতিক প্রভাব হিসাবে ভালোবাসাকে শুধুমাত্র রোমান্টিক আবেগ হিসেবে দেখানো হয়নি; তা মানবিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতীক। প্রকৃতি ও অনুভূতির সংমিশ্রণ সেখানে নদী ও আগুনের রূপক ব্যবহার অনুভূতির তীব্রতা প্রকাশ করে। সামাজিক ব্যাখ্যা যখন করতে যাবো আমরা দেখতে পাই- প্রেম ও প্রতিরোধ একসাথে চলে; মানুষ যতদূরই নিপীড়িত হোক, ভালোবাসার শক্তি তাকে সচেতন ও প্রতিরোধী করে।
“দক্ষিণের বাতাসে মিশে আছে গাছের গন্ধ
আর মানুষের স্বপ্নের ছায়া
প্রত্যেক পাতা যেন বলছে; যুদ্ধও,
শান্তিও একসাথে আসে।”
প্রকৃতি ও সমাজের মিলন: বাতাস, গাছ এবং পাতার রূপক ব্যবহার করে সমাজ ও মানুষের আবেগ একত্রিত করা হয়েছে। পাঠক অনুভব করে যে, শান্তি ও সংঘাত একসাথে মানব জীবনের অংশ। ভাষার সৌন্দর্য বলতে সহজ ছন্দে গভীর অর্থ নিহিত; এটি কবির স্বকীয় শৈলী ও শক্তি প্রতিফলিত করে।
এবং আমরা আরেকটি কবিতার পক্তি যদি পড়ি তাহলে সহজেই তাঁর কাব্যময় চিত্র কল্পশিল্পকে কিভাবে উপস্থাপন করছেন দেখতে পাবো;
“আমি সেই পথে চলি যেখানে আলো কম
নদী জানে আমার বেদনা, পাথর জানে আমার ক্ষুধা
কিন্তু শেষের দিকে আছে সূর্য
যেটা সব অন্ধকারকে ভেঙে দিয়ে পথ দেখায়।”
অন্ধকার, নদী, পাথর- এগুলো জীবনের কষ্ট ও সংগ্রামের প্রতীক। সামাজিক প্রতীক হিসাবে যাত্রা কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি দেশের জনগণ এবং সামাজিক সংগ্রামের প্রতীক। কবির আশা ও ধৈর্য পাঠককে অনুপ্রাণিত করে।
“পুরনো বংশের গল্পে ভরা মাঠ
প্রতিটি ফুল যেন ইতিহাসের সাক্ষী
আমরা ভুলে যাই, কিন্তু তারা মনে রাখে
প্রতিটি পদক্ষেপের দায়িত্ব বয়ে চলে আমাদের সাথে।”
পুরনো বংশের ফুল রূপক হিসেবে ব্যবহার করে অতীতের স্মৃতি ও সামাজিক দায়িত্ব স্মরণ করানো হয়েছে। প্রতিটি পদক্ষেপের ফলাফলের দায় আমাদের নেয়া উচিত। সামাজিক প্রভাব বলতে কবিতাটি পাঠককে সচেতন করে যে, অতীতকে ভুলে যাওয়া সমাজ ও জাতির জন্য বিপদজনক। দৈনন্দিন বাস্তবকে ইতিহাস, পৌরাণিক চরিত্র বা প্রকৃতির রূপকের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। রাজনীতি, মানবাধিকার, ন্যায় ও দায়িত্ব, সবই কবিতায় অন্তর্ভুক্ত। ভাষা ও ছন্দে শব্দের সূক্ষ্ম ব্যবহার এবং ছন্দের মাধুর্য পাঠকের মনে গভীর প্রভাব ফেলে।
দৈনন্দিন বাস্তবকে ইতিহাস, পৌরাণিক চরিত্র বা প্রকৃতির রূপকের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। সামাজিক সচেতনতা: রাজনীতি, মানবাধিকার, ন্যায় ও দায়িত্ব, সবই কবিতায় অন্তর্ভুক্ত। ভাষা ও ছন্দে শব্দের সূক্ষ্ম ব্যবহার এবং ছন্দের মাধুর্য পাঠকের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। মানবিক দিক দিয়ে ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, নৈতিক দায়িত্ব, সবই কাব্যের কেন্দ্রে।
কবি আসাদ মান্নান বাংলা সাহিত্যে এক অনবদ্য নাম। তাঁর কবিতা কেবল রূপসী সৌন্দর্য সৃষ্টি করে না; তা চিন্তা, প্রতিবাদ, মানবিক দায়বোধ এবং সমাজের নীরব ব্যথাকে শব্দের আলোতে উদ্ভাসিত করে।
তিনি নিজেকে বলেন; “আমি শব্দের সামান্য দাস, ইচ্ছে হলে টুকিটাকি লিখি।” কিন্তু সেই ‘টুকিটাকি’ শব্দগুলোই আজও আমাদের হৃদয় স্পর্শ করে, বঞ্চিতদের কণ্ঠ শোনায়, যুদ্ধের নিঃশব্দ চিৎকার তুলে আনে, প্রেমের নীরব উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে দেয়।
তাঁর প্রতিটি লাইন যেন প্রবাহমান নদীর মতো প্রবাহিত হয়, পাঠকের আত্মার অচেতন স্তরে ঢুকে যায় ।
মানবতার প্রতি তাঁর অমোঘ ভালোবাসা, দেশের প্রতি অসীম দায়বোধ, প্রেমের গভীর অনুভূতি, সবই কবিতার প্রতিটি আঙিনায় ফুটে ওঠে। দেশ তাঁর কবিতায় কেবল ভূগোল নয়; তা চেতনার এক অন্তর্লোক, যেখানে স্বাধীনতা, ভালোবাসা, মানবিক দায়বোধ এবং স্বপ্ন একাকার হয়ে যায়।
যদিও আমি এখানে সীমিত পরিসরে তাঁর কিছু কবিতা নিয়ে আলোচনা করেছি, তবে ভবিষ্যতে আমি আশা করি আসাদ মান্নানের পুরো কাব্যজীবন, প্রতীকী চিত্রকল্প, আধ্যাত্মিক ভ্রমণ, সুররিয়াল উপাদান এবং ভাষাতত্ত্বসহ ছন্দের ব্যবহার বিশদভাবে উপস্থাপন করতে পারব।
এটি কেবল কবিতার সৌন্দর্যই নয়; মানবচেতনার অন্তর্দৃষ্টি, সমাজ ও ইতিহাসের সঙ্গে কবির সংযোগও পাঠককে উপলব্ধি করাবে।
আজ, কবির জন্মদিনে, আমরা কেবল অভিনন্দন জানাই না; শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই, আমাদের চিন্তা, অনুভূতি এবং স্বপ্নের মধ্যে প্রবেশ করার জন্য। শুভ জন্মদিন, প্রিয় কবি। আপনার কণ্ঠ, ভাবনা, এবং প্রতিটি শব্দ বাংলা সাহিত্যের অমর আলোকরশ্মি, যা শিকড় পরিবারের পথপ্রদর্শক, আমাদের চেতনার অনন্য প্রকাশ, আমাদের হৃদয়ে চিরন্তন প্রেরণা।
ফারুক আহমেদ রনি
সম্পাদক, শিকড়
কবি আসাদ মান্নান- এর কবিতা
…………………………………………..
বিজয়ের অবিনাশী জয়ধ্বনি
যদি ভালোবাসা পাই
আমি আর কোথাও যাব না;
এখানে দাঁড়িয়ে থেকে আমি যাব– সবখানে যাব, সবখানে…
হালকা পাতলা স্বপ্ন-টপ্ন, টুকিটাকি সুখ-দুঃখ-প্রেম
দোয়েল রাতের শিষ, রাতজাগা হরিয়াল পূর্ণিমার চাঁদ
জ্যোৎস্নারশৃঙ্খল পায়ে শুয়ে থাকা নদীর ওলান
গভীর আঠালো ঘুমে আচ্ছন্ন স্বদেশ,
যে-দেশে মানুষ অন্ধ হয়ে থাকতে চায়,
ভালোবাসেকীট হয়ে বেঁচে থাকতে–সংকোচ করে না;
মধ্যরাতে এইখানে– এই ঘাসবনে, তুমি দ্যাখো,
এই ঠাণ্ডাকরতলে
আমি সেই দেশটাকে সযত্নে লুকিয়ে রাখলাম–
আমি আর কোথাও যাব না:
এখানে দাঁড়িয়ে থেকে, আমি যাব… সবখানে যাব।
যদি ভালোবাসা পাই
এখানে দাঁড়িয়ে থেকে এই সীমাবদ্ধ দেশ ছেড়ে
আমি চলে যাব অন্য দেশে, অন্য এক বাংলাদেশে
যার কোনও সীমা ও সীমান্ত নেই
যেখানে থাকে না কোনও জাতীয় পতাকা জাতীয় সঙ্গীত আর রাজদণ্ড
যেখানে থাকে না হিংস্র হায়েনার থাবা, গর্ভবতী হরিণীর মর্মভেদী ডাক
যেখানে থাকে না মানুষের জন্ম-পরিচয়, ধর্ম-পরিহাস
সকালে দুপুরে আর অপরাহ্নে যেখানে থাকে না
ক্ষুধার মিছিল
মিছিলে পিতার লাশ
মিছিলে ভাইয়ের লাশ
মিছিলে বোনের লাশ
মিছিলে আমার লাশ
যদি ভালোবাসা পাই
আমি হতে পারি সব উলঙ্গ শিশুর হাফপ্যান্ট
আমি হতে পারি সব ক্ষুধার্ত শিশুর মাতৃদুগ্ধ
যদি ভালোবাসা পাই
আমি হতে পারি সব গৃহহীন মানুষের গৃহ
আমি হতে পারি সব স্নেহহীন মানুষের স্নেহ
যদি ভালোবাসা পাই
আমি হতে পারি সব গন্ধহীন গোলাপের ঘ্রাণ
আমি হতে পারি সব প্রাণহীন উদ্ভিদের প্রাণ
যদি ভালোবাসা পাই
আমি এক সমুদ্র থেকে আর এক সমুদ্রকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে এনে
নিঃশব্দে লুকিয়ে রাখব অন্যএক সমুদ্রের নিচে
যদি ভালোবাসা পাই
আমি এক নারী থেকে আরেক নারীকে পথে ও বিপথে এনে
তরতাজা অন্ধকারে লুকিয়ে রাখবো অন্যএক নারীর ভেতর
কেউ দেখবে না, কেউ জানবে না… টেরও পাবে না…
যদি ভালোবাসা পাই
যুদ্ধে লিপ্ত প্রতিটি ভূখণ্ডে আমি রেখে আসব রবীন্দ্রসঙ্গীত
সাতটি তারার তিমির, শস্যমুগ্ধ কৃষকের হাত
বেলাশেষে ঘরে ফেরা শ্রমিকের রসালো চুম্বন আর জেলেনির ঠোঁট
যদি ভালোবাসা পাই
হোমার ও দান্তের আত্মা থেকে আমি এক মুহূর্তে এনে দেবো
একঝাঁক আশ্চর্য সুন্দর সূর্যোদয়, সহস্র আলোর পাখি;
যদি ভালোবাসা পাই
আমি ঐ পাখির মতো উড়ে যাব
অন্ধকারে নিমজ্জিত যুদ্ধবাজ হাওয়ার তাঁবুতে
যুদ্ধরত সৈনিকের মাথার খোড়লে
শান্তির স্বপক্ষে আমি বারবার উড়ে যাব অষ্টম নরকে।
যদি ভালোবাসা পাই
এ অশান্ত রাজপথে পাড়ায় পাড়ায় নিঃসঙ্গ পার্কের কোণে
খিলিখিলি ভালোবাসা ছড়াতে ছড়াতে
হ্যাঁ হ্যাঁ ছড়াতে ছড়াতে ছড়াতে ছড়াতে… …
যদি ভালোবাসা পাই
অই আলোহীন ল্যাম্পপোস্টে আমি গেঁথে দেবো লক্ষ সূর্য
ঘরে ঘরে ভালোবাসা, হাজার গোলাপ;
খোলামকুচির মতো যত্রতত্র দু’হাতে নক্ষত্র ছিটিয়ে ছিটিয়ে
এক নদী থেকে অন্য এক নদীর ভেতর দিয়ে
এক নারী থেকে অন্য এক নারীর ভেতরে গিয়ে
নৈঃশব্দ্য ধারণকারী অরণ্যের তালাচাবি নিয়ে
এক সূর্যোদয় ছেড়ে অন্য এক সূর্যোদয়ে গিয়ে
আমি তোমাকে দেখবো– শুধু দেখবো তোমাকে…
যদি ভালোবাসা পাই
হে আমার মাতৃভূমি!
আমাদের মৃত্যুঞ্জয় মহান পিতার নামে
সকল মৃত্যুকে পরাজিত করে
শুধু একবার তোমাকে চুম্বন দেবো–
বার বার ভয় আর মৃত্যুকে উপেক্ষা করে
শুধু আর একবার তোমাকে চুম্বন দেবো
ও আমার প্রিয় মাতৃভূমি!
বার বার এই কণ্ঠে তুলে নেবো
বিজয়ের গৌরবের অবিনাশী জয়ধ্বনি : জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু।
পাহাড় কাটার পর
সে কবে জন্মের পর একদিন মাটির উপর
ভর করে দাঁড়ালাম আমি এক নগ্ন নরশিশু;
দক্ষিণে সমুদ্র রেখে সামনে দেখি সুউচ্চ পাহাড়
দিগন্তে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে হাত-পা ছড়িয়ে
নিখুঁটি মেঘের খাটে; আহা! এমন অপূর্ব দৃশ্য
যে না দেখে মারা যায় তার জন্ম বৃথা; দিবালোকে
যে আঁকে নির্জন পটে নানা মুখ কুমারী সন্ধ্যার
সে এক পাথর ভেঙে উঠে আসা পাকা তীরন্দাজ:
জগতে এমন কিছু দৃশ্য আছে চোখের আলোয়
কখনো যায় না দেখা—দেখতে হয় মনে দীপ জ্বেলে।
আস্থা কত পোক্ত হলে অন্ধ বরফের জুতো পায়ে
আগুনের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে পারে শূন্যের মহলে!
কে ছোটে শাবল হাতে ভেঙে দিতে পাহাড়ের ঘুম—
মৃত্যুর অদৃশ্য রূপে নীরবতা দেখে তার ছায়া:
কতটা গরিব আর বোকা হলে অক্ষম কাঠুরে
যে পাহাড়ে বাঘ থাকে সে পাহাড়ে কাঠ কাটতে যায়!
বাঘের রাজত্বে ঋষি ধ্যানে মগ্ন আয়েশি ভাষায়;
যে কাটে পাহাড় স্বপ্নে বাস্তবে সে দুঃখ চাষ করে—
পাহাড় কাটার পর ভেঙে যায় দুঃখের নীলিমা।
মরুভূমি স্বপ্ন দ্যাখে জল
দাঁড়াও নদীর জলে স্থির চিত্তে কিছুক্ষণ পর ঝড় উঠবে
মাঝি ও মাল্লার দল বৈঠা হাতে তুলে নেবে শেষ গান
বড় স্বাধ জাগে জন্মান্তরে কোকিলের আশা নিয়ে ভাষা নিয়ে
যাকে ভালোবাসি তাকে দেখে দেখে মরে যেতে চাই
যে মানুষ মরে নাই প্রেমিকের শ্রমিকের নিরন্তর গুপ্ত বাসনায়
দাঁড়াও বৈশাখী মেঘ রুমালের সঙ্গে তাকে অশ্বারোহী করো।
২.
নিঃসঙ্গ দুরন্ত মনে রুমালের ফুল ফোটে আর ঝরে যায়
কে তার হিসাব রাখে কে তাকে কুড়িয়ে রাখবে চুলের বেদীতে
জঙ্গলের জন্তুগুলো মানবের সঙ্গে তার মনীষাকে খায়
নারীশিশু অগ্নিদগ্ধ জনপদে হানা দেয় অশান্তির দানো
নাগিনী নদীর ঢেউয়ে ফণা তুলে গ্রাস করে রুমালের ঘুম
তবুও আশার তরী বেয়ে যায় প্রজন্মের সাহসী নাবিক।
৩.
অস্থির স্বপ্নের পায়ে অবিরাম বেজে যায় জলের নূপুর
মরুকে জড়িয়ে ধরে একা বহু রঙে উলঙ্গ বসন্ত নাচে:
হাওয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখি হাওয়া বসে আছে সুন্দরের চোখে
অবেলায় নতুন প্রেমের হাটে সে আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবে
যতই কুয়াশা তার অশুভ বর্বর থাবা হানে বৈশাখী মেলায়
নতুন রুমাল দিয়ে এ বুকে কুড়িয়ে নেব বসন্তের শেষ অস্তরাগ।
একটা অদৃশ্য মুখ
করোনার আগ্রাসনে যেন মৃত কবিতা সুন্দরী–
লাওয়ারিশ লাশ হয়ে পড়ে আছে কাফন জড়ানো
পৃথিবীর হিমাগারে; মাছি ওড়ে দুর্গন্ধের টানে-
এতটা চাপের মধ্যে কে সে গায় জীবনের গানঃ
স্বপ্নকে বাঁচাতে গিয়ে আঁকড়ে থাকে মাটির বন্ধন।
কে এসে হাতের কাছে টেনে নেয় আকাশের হাত
যে-চোখে পাখির মতো কোনো ছায়া এখন ওড়ে না
সে-চোখ কবির নয়, এক আত্মবন্দী কয়েদীর
রঙ-রূপ-স্বপ্ন ছাড়া মানুষ কী করে বেঁচে আছে?
কবিতা কবিকে ছেড়ে চলে গেছে অন্যের বাসরে।
এ মনোটোনাস শূন্যতায় হঠাৎ কেন যে আজ
তাকে খুব মনে পড়ছে ; আহা! কতদিন মুখোমুখি
দু’জনে বসিনি খুব গাঢ় মৌনতার বেদীমূলে!
শরীরে শরীর জ্বেলে বাসনার মোমের আলোয়
জড়িয়ে ধরিনি তাকে কতদিন কতরাত ধরে!
মৃতের জানাজা শেষে ইচ্ছে হয় তাকে নিয়ে একা
কোথাও অনেক দূরে উড়ে যাই কুয়াশা কুটিরে
অন্ধকারে নক্ষত্রবীথির আলো কুড়োতে কুড়োতে;
কবিতাকে খুঁজতে গিয়ে বার বার কেন খুঁজে পাই
একটা অদৃশ্য মুখ– যেন টাটকা পূর্ণিমার চাঁদ।
মানুষ তোমার নামে
না, আমি মৃত্যুর আগে ইঁদুরের চোখের ভেতরে
জীবন্ত ধানের ক্ষেতে না-বাঁচার ছাড়ব না আশা;
চাষার লাঙল হয়ে খুব ভোরে দক্ষিণের চরে
মাটিতে হৃদয় খুঁড়ে ঢেলে দিতে স্বপ্ন ভালোবাসা–
ছিটাবো গমের বীজ; ঝড় ঠেলে নদীতে উদ্দামে
নৌকো বেয়ে পাড়ি দেবো কল্লোলিত জলের পাহাড়;
স্রোতের বিরুদ্ধে যেতে যেতে দয়াল মুর্শিদ নামে
নতুন মরমি টানে আলীমের গানের বাহার
কণ্ঠে তুলে ছিঁড়ে দেবো আকাশের স্তব্ধ নীরবতা ;
যে-অামি মেশিন হাতে পরিয়েছি সভ্যতাকে জামা
তার হাতে কাজ আর গায়ে কুর্তা নেই! এ কী কথা!
এ লজ্জা কোথায় রাখি তার নেই মা- বাবা ও মামা!
না, আমি জীবন থাকতে এক বিন্দু পরোয়া না- করে
মানুষ তোমার নামে যুদ্ধে আছি স্ববন্দীর ঘরে।
জবাব দেবে না কেউ
এ অস্থির পৃথিবীতে আজ
শিশুরা আনন্দে নেই
ফুলেরা আনন্দে নেই
পাখিও আনন্দে নেই
নদীও আনন্দে নেই
চারিদিকে নেই নেই…
সবখানে দেখি শুধু আনন্দহীনতা
তার সঙ্গে যুক্ত আছে
খুন
হত্যা
লম্পটের আস্ফালন
ধর্ষিতার নিঃশব্দ বিলাপ।
আজ হরিণীর মাংস খেয়ে মানুষ গিয়েছে বনে
বাঘ কিংবা বাঘিনী শিকারে; মনে জাগে অদ্ভুত বাসনা
বাঘিনীর স্তন কেটে যদি খুঁজে পাওয়া যায়
মানুষের রক্তচিহ্ন ; হায়!
এতটা নৃশংস কেন আজ মানব প্রজাতি!
মানুষ যদি না হয় প্রকৃত মানুষ
তবে কি সভ্যতা বাঁচে?
আনন্দের লেশ মাত্র থাকে?
এ সবের জবাব কে দেবে? — জবাব দেবে না কেউ–
মৃতদের জবান থাকে না।
তুমি চক্ষু খুলে দেখো
তুমি স্বপ্ন থেকে স্বপ্নের সমুদ্রে যাও
জল থেকে জলের শীতলে
তুমি পাতা থেকে পাতার সবুজে যাও
অগ্নি থেকে অগ্নির দহনে
তুমি মাটি থেকে মাটির আঁধারে যাও
একা থেকে একার গভীরে-
তুমি সবখানে যাচ্ছো, যাও-একা
শুধু চক্ষু খুলে দেখো-সব অন্ধকার একা নয় ।
তোমার চুলের মতো কালো দীর্ঘ অন্ধকার চোখে নিয়ে
একা
আমি জেগে আছি
আগুনের মতো লকলকে অন্ধকার গায়ে নিয়ে
একা
আমি জেগে আছি
ঝর্ণার মতো বহমান অন্ধকার পায়ে নিয়ে
একা
আমি জেগে আছি-
ও অশ্রু
হাওয়াকে বললাম
তুমি থামো
হাওয়া হাওয়া হয়ে গেল;
বৃষ্টিকে বললাম
তুমিও থামো তো!
আহা! কতদিন ধরে মিস্টি মেয়ে বৃষ্টিকে দেখিনা
দৃষ্টির আড়ালে মেঘ জমে জমে বুক ভরা নদী
এটা কি কান্নার কোনো পূর্ব লক্ষণই, না
যন্ত্রণার পূর্বাভাষ?
পাহাড়ের আত্মা কেটে কেটে
আমার চোখের নিচে অন্ধকার অশ্রু বহমান
আমি এত করে বলি, অশ্রু — ও অশ্রু! আমাকে তুমি
নরকে ভাসিয়ে নাও– স্বর্গে গিয়ে কী কাজ আমার!
একটা মুখের জন্য
একটা মুখের জন্য এক জোড়া চোখের কী মরু তৃষ্ণা!
তৃষ্ণার শুকিয়ে যাওয়া সেই মৃত আকুল আকুতি
এখনও বহন করে পউষের এই মরা নদী :
আজ এতকাল পরে আমার কেবল কান্না পাচ্ছে
ফেলে আসা গাছগুলো কী নিবিড় ভালোবাসা দিয়ে
আমাকে জড়িয়ে রাখে কী মধুর নিমগ্ন নেশায়!
যে যাবার সে যাবেই পথ শুধু পথে রবে পড়ে
প্রিয় হলুদিয়া পাখি কেন ডাকে পাতার সংসারে?
ঐ শৈশব যেন এক হাবাগোবা দিগম্বর নদী;
পাড় ভাঙা যৌবনের বৃষ্টিময়ী প্রেমের উৎসবে
ময়ূর ময়ূরী নাচে ,খুলে যায় ভোরের জানালা;
যে তুমি নদীর মতো বাতাসের হাত ধরেছিলে
আমাকে উন্মাদ করে সে এখন পাহাড়ে উঠেছ–
তোমার ভেতরে যেতে কতবার পথে নামি– পথ
চলে গেছে অন্যদিকে অন্য কারও গোপন খামারে।
সভ্যতার কাঁধে মৃত মনীষার লাশ
মনীষা এখন মৃত; তার লাশ নিয়ে জরাজীর্ণ
সভ্যতা বিপদে আছে; অন্ধকারে ভয়ার্ত মানুষ
লুকিয়ে আড়াল থেকে চোখ না-খুলে তাকিয়ে দেখে
জনারণ্যে শকুন সময়: একটা পুরনো কালো
অলৌকিক এম্বুলেন্স সাইরেন বাজিয়ে তীব্র বেগে ছুটছে —
চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে এ কেমন শোকাতঙ্ক!
শোক ও আতঙ্ক ছড়াতে ছড়াতে ওই দুঃখী শোকাতুর
এম্বুলেন্স সভ্যতার বুক চিরে চিরে মনীষাকে
দাফনের জন্য নিয়ে যাচ্ছে বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে–
এখানে প্রত্যেক দিন কত কান্না কত আহাজারি
আর্তনাদ জমা হয় তার সাক্ষী শুধু এক কবি,
সুগন্ধি গোলাপ হয়ে জন্ম থেকে যার বুকে ফুটে
মনীষা নামক এক সুবিমল সবুজ মানবী,
দুর্বিনীত জল্লাদের কোপে যার শিরশ্ছেদ হলো ।
মৃত মনীষাকে আজ দাফন করার মতো মাটি
কোথাও মেলে না আর –কেন? পৃথিবীর বক্ষ যেন
দস্যুদের এটমিক ঘাঁটি ; মনুষ্য লেবাসধারী
কতিপয় জন্তুর দখলে আজ সভ্যতার সব
হাড় গোড় মাংস কলা বহমান মানব সাগর।
মানুষের রক্ত- মাংসে তৈরি হয় যাদের খাবার
সভ্যতা ওদের হাতে ভূলুণ্ঠিত বেহুলার মতো
ইন্দ্রের সভায় নাচে ফিরে পেতে আপন বাসর!
সভ্যতা এখন কাঁদে — তার কাঁধে মনীষার লাশ
বসন্তের বৃন্দাবনী প্রেম
যেখানে বসন্তে ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের ঘূর্ণিঝড়ে
নীলিমা বিধ্বস্ত হলে ডুকরে কাঁদে চন্দ্রাবতী খুকু,
সুনামির আগ্রাসনে লণ্ডভণ্ড সাজানো সংসার ;
রবীন্দ্র রচনাবলি ধূলোপড়া ভূতুড়ে খোঁয়াড়ে;
ঋতুবতী বালিকার স্বপ্নমালা শূন্যে ঝুলে থাকে,
মানুষে লুকিয়ে হাসে বুনো জন্তু হিংস্র জাগুয়ার ,
অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনে নির্বিচার বোমার আঘাতে
নিয়ত মানুষ মরে — নির্বিকার মানব মনীষা
পাথর জড়িয়ে গায়ে মরুদ্বীপে ঘুমিয়ে রয়েছে;
চারিদিকে এ কেমন জীবন বিনাশী বর্বরতা!
লাশের উপরে লাশ পড়ে আছে — শকুন- শিয়াল
মৃত্যুর উৎসবে এসে লাশ নিয়ে বিবাদে মিলেছে–
বিকলাঙ্গ মানবতা নির্বাসনে গহীন জঙ্গলে
নপুংসক প্রতারক চাটুকার চতুর সুশীল
একই অঙ্গে বহুরূপে ছদ্মবেশ ধারণ করেছে
জৈবিক নেশার ঘোরে যুদ্ধরত মাতাল বেনিয়া–
দিবালোকে এ কেমন রক্তলীলা ! চোখের পলকে
নিঃশ্বাস নিঃশেষ হয়, দেশে দেশে হায়েনার থাবা
কে পারে থামাতে তাকে? কেউ কি আছেন — কেউ নেই!
আছে আছে, কিন্তু হবেটা কী তাতে?– ওদের বিবেক
খেয়ে ফেলে ঘুণপোকা — সভ্যতাকে ন্যাংটা করে ওরা
নিজেরা উলঙ্গ হয়ে মাঠে-মঞ্চে অন্ধের মতন
বানরের হাত ধরে নাচে আর বাজায় ডুগডুগি;
আরব্য গাথার রসে উল্টো স্বরে হরেক রকম
নষ্টাচারী মাহফিলে কী দারুণ ধ্রুপদী বয়ান!
এ বয়ানে মর্মাহত সমাহিত আলীম-আব্বাস;
ছায়ানটে নট আছে –ছায়া নেই ললিত কলায়;
বাঘের ক্ষুধার কাছে মর্মভেদী হরিণীর ডাক
অরণ্যে রোদন ছাড়া এ মূহুর্তে আর কিছু নয়;
নাগ দেবী মনসার ক্রোধান্বিত অভিশাপ নিয়ে
বেহুলা বাঙালি নারী আনন্দের বাসর ঘরেই
বারবার বৈধব্যের নিদারুণ পোশাক পাল্টায়;
মিথ্যাচারী অমাবস্যা গিলে খায় পূর্ণিমার তিথি
সেখানে কী করে কবি তার প্রিয় নববর্ষ নিয়ে
রবীন্দ্রনাথের মতো কবিতা বা গান না-লিখেই
একা একা পাড়ি দেবে কূলহারা অথই যমুনা!
২.
আমার হবে না লেখা এ বৈশাখে কোনো গান কিংবা
আগুনে তাতানো তাজা একটি কবিতা; তার চেয়ে
বরং এটাই ভালো — কাউকে না বলেই চুপচাপ
শ্রীকৃষ্ণের মধুর মুরলি বাঁশি বাজাতে বাজাতে
বঙ্গোপসাগর তীরে শৈশবের চৈত্রের মেলায়
ঘুরতে ঘুরতে বৃন্দাবনে অন্ধকারে ডুব দিয়ে যাই
বৈশাখী বটের মূলে — যৌবনের জলন্ত জুলীর
দুরন্ত চুলের ঘন মেঘে ঢাকা স্মৃতির ক্যাম্পাসে;
অশরীরী ফুলে ফলে নতুনের গন্ধ খুঁজে নিতে
এ আমি এখনো হাঁটি তীর হাতে অন্ধ তীরন্দাজ
কখনো ঘুমের মধ্যে ডানাহীন তোমার বাগানে
প্রেমিক কোকিল কিংবা কারো অন্তরঙ্গ ছায়া হয়ে
উড়ে যাই বেলুনে বাতাস ভরে ফূর্তির আনন্দে ;
সময়ে ফুরিয়ে যাচ্ছে দ্রুত — তবু কেন ফুরাচ্ছে না
হাজার বছর ধরে বসন্তের বৃন্দাবনী প্রেম?
মরুভূমি স্বপ্ন দ্যাখে জল
দাঁড়াও নদীর জলে স্থির চিত্তে কিছুক্ষণ পর ঝড় উঠবে
মাঝি ও মাল্লার দল বৈঠা হাতে তুলে নেবে শেষ গান
বড় স্বাধ জাগে জন্মান্তরে কোকিলের আশা নিয়ে ভাষা নিয়ে
যাকে ভালোবাসি তাকে দেখে দেখে মরে যেতে চাই
যে মানুষ মরে নাই প্রেমিকের শ্রমিকের নিরন্তর গুপ্ত বাসনায়
দাঁড়াও বৈশাখী মেঘ রুমালের সঙ্গে তাকে অশ্বারোহী করো।
২.
নিঃসঙ্গ দুরন্ত মনে রুমালের ফুল ফোটে আর ঝরে যায়
কে তার হিসাব রাখে কে তাকে কুড়িয়ে রাখবে চুলের বেদীতে
জঙ্গলের জন্তুগুলো মানবের সঙ্গে তার মনীষাকে খায়
নারীশিশু অগ্নিদগ্ধ জনপদে হানা দেয় অশান্তির দানো
নাগিনী নদীর ঢেউয়ে ফণা তুলে গ্রাস করে রুমালের ঘুম
তবুও আশার তরী বেয়ে যায় প্রজন্মের সাহসী নাবিক।
৩.
অস্থির স্বপ্নের পায়ে অবিরাম বেজে যায় জলের নূপুর
মরুকে জড়িয়ে ধরে একা বহু রঙে উলঙ্গ বসন্ত নাচে:
হাওয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখি হাওয়া বসে আছে সুন্দরের চোখে
অবেলায় নতুন প্রেমের হাটে সে আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবে
যতই কুয়াশা তার অশুভ বর্বর থাবা হানে বৈশাখী মেলায়
নতুন রুমাল দিয়ে এ বুকে কুড়িয়ে নেব বসন্তের শেষ অস্তরাগ
আছিয়ারা মরে নাই
লক্ষ্মণ মোটেই ভালো নয়– চারিদিকে শুধু
ভয় আর ঘনঘোর আতঙ্কের বিভৎসিত ছায়া ;
অবাক হবার মতো তেমন কিছুই ঘটছে না,
বরং এটাই স্বাভাবিক; কেননা মানুষ নামে
যারা পরিচিত তারা কিন্তু জীব নয় –শুধু জন্তু,
জন্তু ছাড়া অন্য কিছু ইদানীং চোখেই পড়ে না।
মিশন সমাপ্ত হলে সারি সারি নিহত গোলাপ
রক্তমাখা মেঘ হয়ে উড়ে যাচ্ছে ফ্যাকাশে জ্যোৎস্নায়–
হিমাগারে অন্ধকার; কতিপয় হিংস্র জানোয়ার
অবুঝ শিশুকে নিয়ে এ কেমন অশ্লীল নেশায়
মেতে ওঠে! কে দেবে উত্তর? গন্ডারের চামড়া গায়ে
সভ্যতার সুশীল বাবুরা চোখ কান বন্ধ করে
মিডিয়া সেলুনে বসে পরম আনন্দে পা দুলিয়ে
তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছে; আর বাল কামানোর ক্ষুরে
গোপন বাসনা বুকে ধার দিচ্ছে নাপিত মশায়।
হাটে ঘাটে দেখা যাচ্ছে গোবেচারা বনিক বেনিয়া
যদিও আগের মতো খোস মনে খুব ভালো নেই,
তবু তার কায়-কারবার ঠিক ঠাক বেশ চলছে :
নিজের নিয়মে নিত্যদিন সূর্য ওঠে সূর্য ডুবছে;
যদি ভয় সর্বত্রই সারাক্ষণ ওঁৎ পেতে রয়
তবে আল্লাহ মালুম গরীবের কী আছে কপালে!
আসন্ন মৃত্যুর গন্ধে ঝরে যাচ্ছে পলাশের কুঁড়ি–
মলিন বদনে আমাদের হতভাগী মা জননী
চোর ডাকাতের পাশাপাশি বর্ণচোরা খুনি আর
ধর্ষকের ফাঁসির দাবিতে আজ নামে রাজপথে —
নিজের শিশুর জন্য সুরক্ষার মহল বানাতে
নিষ্ফল প্রহর গুণতে গুণতে তার চোখে ঘুম নেই।
রমজানের ঈদ আসে রক্তে ভেজা চাঁদের বেদীতে ;
ঈদের জ্বলন্ত চাঁদ পুড়ে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে —
ভস্মীভূত ছাইয়ে মোড়া খুকুমণি আছিয়ার লাশ–
এ লাশ কবরে নেই, শুয়ে আছে প্রাণের কেল্লায়:
আছিয়ারা মরে নাই অভিমানে ঘুমিয়ে পড়েছে ।






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান