নাজিম চৌধুরী

শামীম আজাদ একজন কবি, একজন গল্পকার। কথায় ও ছন্দে অপূর্ব মিশ্রন ঘটাতে পটু। পটুয়ার মতো ছবি আঁকেন মানুষের মনে শব্দের ছন্দে। প্রবাসে বসে একজন শিল্পীর সান্নিধ্য পাওয়া একটু দুর্লভ। আমি সে সান্নিধ্য পেয়েছি।

বেতার বাংলাকে প্রবাসী কমিউনিটির কাছে নিয়ে যাওয়ার দুঃসহ সময়ে শামীম আজাদ ছিলেন আমাদের সহযাত্রী। ২০০২ সালে তিনি আমাদের সাথে বেতার প্রশিক্ষণে সাথী হয়েছিলেন। বেতার বাংলা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন আমাকে যখন তাড়িত করছে, তার অনুপ্রেরণা ছিল আমাদের সকলের কাছে জীবনী শক্তি স্বরূপ। এভাবেই তিনি সম্পৃক্ত থেকেছেন বাংলা ভাষাভাষীদের সাথে তথা বাংলাদেশী কমিউনিটির সাথে।
শামীম আজাদ বাংলা সংস্কৃতিকে বিকাশমান করতে অনলস পরিশ্রম করে চলেছেন বিরূপ পরিবেশে। এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্ম যে বাংলা সংস্কৃতির সুফল ভোগ করবে, তিনি তার সব পথগুলোকে পরখ করেছেন। একজন মুক্তিযোদ্ধার মননে যে নিয়ত স্বদেশপ্রেম কাজ করে, তার উজ্জল দৃষ্টান্ত তিনি। বিজয়ফুল তার আরেকটি সৃষ্টি। যার পেছনে শুধু দেশ নয়, দেশের জন্য উৎসর্গীকৃত মানুষের প্রতি ভালোবাসা, ইতিহাসের প্রতি বিশ্বাস এবং আগামী দিনের প্রতি সুদৃঢ় আস্থা, তাকে উদ্বুদ্ধ করেছে বিজয়ফুল সৃষ্টিতে। কেননা তিনি কবিতার নির্মান করে যেমন একটি দৃশ্যকে, একটি ভাবকে পাঠকের কাছে ধরে রাখতে সচেষ্ট হন কালকে অতিক্রম করে, তার বিজয়ফুল তেমনই চিরঞ্জীব হয়ে থাকবে। গানে-ছন্দে দুলে দুলে গল্প বলে অবাক তাকিয়ে থাকা শিশুদের তিনি যে গল্প বলেন, বিজয়ফুল সেভাবেই কাহিনী শোনাবে অনেক শামীম আজাদ হয়ে আমাদের আগামী সন্তানদের।

নিরলস ভাবে তার কাজ করে যাওয়ার ক্ষমতাকে আমরা শ্রদ্ধা করি সর্বদাই। একাধারে তিনি নিজেকে যখন ডকল্যান্ড মিউজিয়াম, সান্ডারল্যান্ড সিটি লাইব্রেরী ও আর্টস সেন্টার, পোয়েট্রি সোসাইটি, ¯প্রেড দ্য ওয়ার্ড প্রভৃতিতে নিজেকে ব্যস্ত রেখেও কেমন করে বিলেতের øাপশট, জন্মান্ধ জুপিটার, স্মৃতিকাব্য রচনা করেন সংসার জীবনের ফাঁকে ফাঁকে, আমাদের ঈর্ষান্বিত করে।
বয়স মানুষের দেহে বাসা বাঁধে, মনে নয়। শামীম আজাদ তার বেলায় ব্যতিক্রম নয়। এগারো এগারো এগারো, ছয়টি দশককে অতিক্রম করে তার মুখোমুখি দাঁড়ালে মনে হয় একজন কিশোরী বেনী দুলিয়ে কৌতুক মাখা চাহনীতে তাকিয়ে আছে মানুষের দিকে। মানুষকে ভালোবাসলে বোধ হয় বয়সের ছাপ লাগে না কোন মানুষের অবয়বে।

সত্তুরের শুরুতে আমরা ক’জন তরুণ মাঝি হাল ধরে সাগর পাড়ি দেওয়ার পন করেছিলাম, শামীম আজাদ সে তরী এখনো বেয়ে যাচ্ছেন। তাই স্বদেশ যখন পুনরায় ক্ষত-বিক্ষত হয় চর্বিদার হায়েনাদের নখরে, তিনি বলতে পারেন, ‘ হায়রে বাংলাদেশ তোমার মিনারে চড়িয়া এ সব শয়তানগনই গাহিতেছে স্বার্থের জয়‘। আমাদের সুসন্তানদের একাত্তুরের মত আবারো মারছে আর আমরা পুনপৌণিকভাবে দাঁড়াচ্ছি ফিউনারেল যাত্রায়। অন্ধরা জানেও না যে তাতে প্রলয় বন্ধ হয় না। অচিরেই তাদের সামনে আসবে ধূ ধূ মরুভূমি আর তাদের গিলে ফেলবে আমাদের নতুন পৃথিবী। মিলিয়ে যাবে তারা পাঁকের কীটদের মত।’

শামীম আজাদ আমাদের মাঝে, আমাদের সাথে, আমাদের পাশে ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন- এমনটাই প্রার্থনা করি তার শুভ জন্মদিনে।

নাজিম চৌধুরী
বেতার বাংলা
লন্ডন


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Trending