শোয়ায়েব চমক
লন্ডনে এসেছি তখন টেনেটুনে ছ’মাস। অভিজ্ঞতা তখনও খুব বেশী হয়নি। মেলা যে একটা হয় সেটা শুনেছি। কিন্তু বৈশাখ তো চলে গেল এপ্রিলে, তাহলে মে মাসে বৈশাখি মেলা কেন ? পরে জানলাম মেলার প্রস্ততি নেবার জন্য এক মাস পর মেলা করা হয়। আর এই মেলা তে আইয়ুব বাচ্চু গান করবেন আর আমি দেখবো না এ তো হতে পারে না। যা থাকে কপালে, কাজ আর পড়াশুনার গুল্লি মারি !! মেলাতে আমি যাবই।
মেলার দিন সকাল বেলা সেজেগুজে দল বেঁধে ব্রিকলেন চলে এলাম। উরিববাপস ! এত বাঙ্গালী কোথা থেকে এলো ? তবে শুধু বাঙ্গালী না প্রচুর বিদেশীও দেখতে পাচ্ছি। হই-চই, ড্রামের শব্দ, ঝালমুরি, ফুচকা, চটপটি কি নেই ! একটা সাড়ে বত্রিশ ভাজা টাইপ পরিবেশ।
হঠাৎ মাটিতে একটা লিফলেট চোখে পড়লো। ‘বৈশাখী মেলার অনুষ্ঠান সূচী’। আইয়ুব বাচ্চু কখন গান করবে খুঁজতে খুঁজতে চোখে পড়লো একটা অপ্রত্যাশিত নাম ‘বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র’। হ্যানব্যুরী স্ট্রীটের ব্রাডি আর্ট সেন্টারে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র লন্ডন শাখার অনুষ্ঠান। লিফলেট হাতে নিয়ে আমি মুহূর্তের মধ্যে চলে গেলাম ২০০২ থেকে ১০ বছর পেছনে ১৯৯২ সালে। সেই একাদশ শ্রেণী বই-পড়া কর্মসূচী, সেই আবদুল আবু সায়ীদ স্যারের আলোচনা, সেই কেন্দ্রের আমতলা, সেই ছাদ, সেই ছাদের ক্যান্টিনের চা-মুড়ি-চানাচুর, সেই আড্ডা, সেই কেন্দ্রের রিসেপসন রুম সুরঞ্জনা…!
অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। সেই সাথে মনটা হঠাৎ ভালো হতে শুরু করলো। মনে হল লন্ডনের এই বৈশাখী মেলাতে আমার খুব কাছের কারো সাথে দেখা হয়েছে, যাকে আমি গত ছ’মাস হারিয়ে ফেলেছিলাম।
আইয়ুব বাচ্চুর কনসার্ট দেখে আমার বন্ধুরা চলে গেল যে যার কাজে, আমি খুঁজে বের করলাম ব্রাডি সেন্টার। বাইরে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের চিরপরিচিত ব্যানার দেখে খুব মজা লাগল। ভেতরে ঢুকে মেইন হলে গিয়ে দেখি আলোচনা পর্ব চলছে। ভিড় ভেঙ্গে এগিয়ে দেখি ‘খাইছে আমারে !’। স্বয়ং আবদুল আবু সায়ীদ বসে আছেন প্যানেলে, পাশে আবদুল গাফার চৌধুরী, আরো আছেন সৈয়দ শামসুল হক। আর একজন ছোটখাটো সুন্দরী মহিলা (যার বয়স বোঝা যাচ্ছে না) মাইক হাতে ছুটোছুাট করছেন দর্শকদের মাঝে। বুঝলাম প্রশ্ন-উত্তর পর্ব চলছে। আমি এক কোনায় বসে পড়লাম।
অনুষ্ঠান শেষে সবাই চলে যেতে লাগল। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম সায়ীদ স্যারের জন্য। একটু একা পেতেই আমি স্যারের সামনে এসে দাঁড়ালাম। উনি আমার দিকে অনেকক্ষন তাকিয়ে থেকে বললেন ‘তোমার গোঁফ কোথায় ?’ আমি হেসে ফেললাম। কুশল বিনিময় শেষ হতেই উনি বললেন ‘দাঁড়াও তোমার সাথে একজনের পরিচয় করিয়ে দি’। এই বলে তিনি সেই ছোটখাটো সুন্দরী মহিলা (যার বয়স বোঝা যাচ্ছিল না) তাঁর কাছে আমাকে নিয়ে গেলেন। আমাকে দেখিয়ে দিয়ে ওনাকে বললেন ‘শামীম, তুমি না কেন্দ্রের ছেলে মেয়েদের খুঁজছিলে, এই দেখো একজন কে পাওয়া গেছে।’ পরে আমি জানলাম উনি হলেন কবি শামীম আজাদ, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র লন্ডন শাখার চেয়ারপার্সন। শামীম আপা আর একজনের কাছে আমাকে সঁপে দিলেন, উনি হলেন খাদিজা এইচ রহমান। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র লন্ডন শাখার সেক্রেটারী। উনি আমার ফোন নম্বর নিয়ে বললেন পরে আমার সাথে যোগাযোগ করবেন। পরদিন উনি আমাকে ফোন করে বিকেলে শামীম আপার বাসায় আসতে বললেন। আমি ঠিকানা মত বিকেলে চলে এলাম।
সেদিনই প্রথম আমি শামীম আজাদ এর সাথে দীর্ঘক্ষণ কথা বলি। সেই থেকে এখন পর্যন্ত ওনার সাথে আমার কথা বলা শেষ হয়নি। সেদিনের পর থেকে আজ পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় সাড়ে নয় বছর শামীম আজাদ আমার মাথার উপর মায়া, স্নেহ, ভালবাসার এক অসামান্য ছাতা ধরে রেখেছেন। এই নয় বছরে তিনি কখনও মায়ের মতো ভালবেসে শাসন করেছেন, কখনও বোনের মতো স্নেহ করেছেন আবার কখনও বন্ধুর মতো কাঁধে হাত রেখে পথ চলেছেন।
কবি শামীম আজাদের হাত ধরে আমরা ক’জন এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র লন্ডন শাখাকে। উনার পরামর্শ এবং দিকনির্দেশনা ছাড়া এতগুলো বছর কেন্দ্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সত্যি এক প্রকার অসম্ভব। ১১.১১.১১ তারিখে কবি শামীম আজাদের ষাটতম জন্মদিন পালন সত্যি অসামান্য এক আয়োজন। শুভ কামনা কবি শামীম আজাদকে।






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান