শাকুর মজিদ
এক।
আশির দশকের মাঝামাঝি সময়। আমি তখন ঢাকার বিভিন্ন রকম কাগজের অফিসে লেখা নিয়ে ঘোরাঘুরি করি। কোন
কোন পত্রিকায় ছাপাও হয়। একবার ‘বিচিত্রা’ বড় একটা লেখা ছেপেছিলো। এরপর বিয়ানীবাজার গেলাম।
আমাদের কবি ফজলুল হক বললেন, ‘তুমি বিচিত্রায় গেছো, আমরার শামীম আজাদের লগে দেখা অইছে নি?’
আমি বলি,- না।
ফজলু ভাই বলেন, ‘তাইন তো আমরার এলাকার বেটি, তুমি দেখা করিও’।
এর আগে ‘শামীম আজাদ’ এর লেখা আমি বিচিত্রায় পড়েছিলাম। আমার ধারনা ছিলো এটা কোনো পুরুষ
সাংবাদিকের নাম। ফজলু ভাইর কাছে জানলাম, তিনি একজন নারী। নামটা উভলিঙ্গের জন্য প্রযোজ্য।
দুই।
‘বিচিত্রা’য় তখন অনেক ভালো ভালো কভার স্টোরি হতো। সাপ্তাহিক পত্রিকা মানেই এক ‘বিচিত্রা’। আরো ছিলো –
‘সন্ধানী’, ’রোববার’, এসব। সেই বিচিত্রায় একটা প্রচ্ছদ কাহিনী পড়লাম, নাম- ‘মধ্যবিত্তের ভাঙন’। এই
কাহিনীতে লেখক শামীম আজাদ তার নাম নিয়ে বিষদ ব্যাখ্যা করলেন। পুরো রিপোর্টটি আমার ভালো লেগে
যায়। আমি এই সাংবাদিকের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে পড়ি। শুনি তিনি একটি কলেজের শিক্ষক এবং কবিও। কিন্তু আমার কখনো দেখা হয় না। অনেকদিন পর শুনি তিনি লন্ডন চলে গেছেন।
তিন।
এ শতাব্দীর প্রথম বছর আমার প্রথম লন্ডন যাওয়া। আমার বেশ ক’জন লেখক সাংবাদিক বন্ধু আছে লন্ডনে। তাদের কাছে শামীম আজাদের কথা জিজ্ঞেস করি। তারাও তাঁকে চেনে। লন্ডনেও তিনি শিক্ষকতার সাথে যুক্ত। অনেক ব্যস্ত মানুষ। তাঁর সাথে আমার যোগাযোগ হয় না।
চার।
শামীম আজাদ আমার ফেসবুক বন্ধু। আমি এখন নানা ভাবে তাঁর খোঁজখবর পাই। ‘বিজয় ফুল’ নিয়ে আমাদের অনেক আলাপ হয়। তার আইডিয়াটা আমার ভালো লাগে। বিষদভাবে যখন এর কথা শুনি এবং খুব আগ্রহী হয়ে পড়ি, তখন তিনি আমার উপর কিছু দায়িত্ব দিয়ে দিতে চান। ‘বিজয় ফুল’ এর প্রচার এবং সার্বজনিনতা সংμাšও। আমি মহা চিন্তায় পড়ে যাই। এটা একটা জাতীয় দায়িত্বের মতো বিষয়। এটা করার জন্য যে সকল লোক উদ্যমি হতে পারে বলে আমার ধারনা, আমি সেটা নই। এবং এক সময় আমার কেনো যেনো মনে হলো, বিষয়টা শুনতে যত চার্মিং মনে হয়, একে বাস্তবায়ন করা অনেক কঠিন। রূপকথার গল্প বলে বাচ্চাদের খাওয়ানো যায়,মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনাতে শোনাতে বিজয় ফুল কাটবে আর একজন মুক্তিযোদ্ধাকে খুঁজে এনে তাঁকেও পুরস্কৃত করবে এটা অত্যন্ত চমৎকার আইডিয়া।
বিদেশে বসেই দেখি আমাদের বাঙালীরা আমাদের দেশ, স্বাধীনতা, রাজনীতি আর সংস্কৃতি নিয়ে লড়ছেন, চিন্তা করছেন। শামীম আজাদের এই চিন্তার জন্য আমি তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাবনত হয়ে পড়ি। মনের একটা অংশ আমার বলছে যে, এটা নাটক-সিনেমার প্লট হিসেবে অসাধারণ, কিন্ত বাস্তবে ঘটানো প্রায় অসম্ভব বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের চল্লিশ বছর পর।
তারপরও আমি অধীর আগ্রহ নিয়ে গেলো ডিসেম্বরে তাঁর ‘বিজয় ফুল’ নিয়ে লন্ডনে, দুবাইতে এবং বিয়ানীবাজারে যে সকল অনুষ্ঠান হয়েছে তার খবর দেখেছি, পড়েছি। আমি হয়তো এও জানি যে. একদিন আমার এই ধারনা ভ্রান্ত হবে এবং ‘বিজয় ফুল’ আনুষ্ঠানিকতার উর্দ্ধে উঠে আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গ হবে।
পাঁচ।
শামীম আজাদের সাথে অবশেষে একদিন আমার দেখা হয়। ২০১১ সালের জানুয়ারী মাসে। ব্রাক ইউনিভার্সিটির একটি ঘরে তিনি বসে বসে কাজ করছেন। কী যেনো একটা বেরোবে কোন এক প্রকাশনী থেকে। তাঁর কোনো একটা প্রজেক্টের বই। বাংলাবাজারের প্রকাশকেরা কেনো ডিজিটাল হচ্ছেন না, কেনো যে ই-মেইলে তাদেরকে লেখা দেয়া যাচ্ছে না, ম্যাক-পিসি জটিলতা থেকে বেরিয়ে আসছে না, এই নিয়ে কতো আলাপ। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করি তিনি আমার সব খবর রাখেন। আমরা এমন ভাবে কথা বলি যেনো আমরা পরস্পর কত বছরের চেনা।
আমরা এ কথা সে কথা বলি। ‘বিজয় ফুল’ নিয়ে আলাপ উঠে না। তিনি কি আমার উপর রাগ করেছেন? রাগ
করলেতো আমার প্রতি এতো সদয় হবার কথা নয় তাঁর! আমি তাঁর দিকে মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকি। রূপ আর গুণ দু’টো এক সাথে বিধাতা কম মানুষকে দেয়। শামীম আজাদ সেই কম মানুষদের দলের।
এ কথা সে কথার পর আমি একবার বলেই বসলাম,‘মধ্যবিত্তের ভাঙন’ নিয়ে আবার লেখুন না, এখন তো পারসপেক্টিভ চেঞ্জ হয়ে গেছে।
শামীম আজাদ একটু চমকান। ২৫ বছর আগের লেখা তাঁর সেই কভারস্টোরির কথা আমার এখনো মনে আছে, এটা হয়তো তিনি ভাবতেই পারেন নি।
শামীম আজাদ, আপনি পঁচিশেই আছেন, আরো পঞ্চাশ পরেও আপনি পঁচিশেই থাকুন। আপনার জন্মদিনে এই আমার কামনা।






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান