শামীম আজাদ

শামীম আজাদ- এই তুই আবার চলে এসেছিস? হামিদা যে আবার ফিরে এসেছে তা তো দেখতেই পাচ্ছে রিনা। তবু জিজ্ঞেস করে যেন উত্তরটা না নিজের বিরক্তিটাই বোঝানো।
-জি! হামিদার উত্তরটাও আসলে উত্তর না।এক কিসিমের এফারমেশন।
ঢাকা কলেজে একেকটি ক্লাস নেয়া মানে একেকটি চ্যালেঞ্জ নিয়ে পার পাওয়া। তার উপর ক্লাসগুলো শেষে জুনের ভ্যাপসা গরমে নিউমার্কেট থেকে টুকটাক বাজারপাতি করা সব মিলে যে বিরক্তি ছিল অঙ্গে অঙ্গে হামিদাকে দেখে তা সঞ্চারিত হল রন্ধ্রে রন্ধ্রে। হামিদা হাতির পুল থেকে সে আবার ফিরে এসেছে এটা একটা অপরাধ। অথচ হামিদা কিনা ‘জি’ বলে প্রায় নির্বিকারচিত্তে কোলের বাচ্চাটাকে বাঁ হাতে আটকে রেখে রিনার সদ্য খোলা স্যান্ডেল জোড়া ডান হাতে তুলে নিয়ে জুতা স্ট্যান্ডের দিকে চলে গেল সে। রিনা অবাক হয়ে থাকতে থাকতেই বাজারও নিয়ে গেল। ঐ একহাতেই। রাস্তার ধুলো-ময়লাওলা স্যান্ডেল রিনা ঘরের ভেতরে নেয় না। এর জন্য সবাই বাধ্য দরজার বাইরে জুতো খুলে ঘরে প্রবেশ করে। ‘ঘরের জুতোয়’ ঘরে, বাইরের জুতোয় বাইরে। দু’বেলা ঝাটপাট দেয়া ঘরে ময়লা থাকেই না। আর হামিদা থাকতে তো কথাই নেই। ঈর্ষান্বিত প্রতিবেশীরা বলতেন, ভাবী আপনার কাজের মেয়েটা বটে। কী সুন্দর করে ঘর মোছে, মুখ দেখা যায়। রিনা ওকে ডেকে এনে বলতো

-আমার হামিদাকে কিছু বলতে হয় না। নারে? – ভাবী আমাদের এরকম একটা আনিয়ে দেন না। এ্যাই মেয়ে তোমার কোন বোন-টোন নেই? ঠিক ভাবীর মতই রাখবো। এরকম জামা কাপড়, তেল, ক্লিপ…-আরে না আমি ওসব দিই না। সব বুবলীর কান্ড। ওর নিজের জন্যে কিছু কিনলে তার ভাগ সে হামিদাকে দেবেই। -খুব ভালো, খুব ভালো। মহিলারা মুখে এসব বলতেন আর ঈর্ষা চকিত দৃষ্টিতে হামিদার দিকে তাকাতেন।
হামিদা সরে গেলে ফিসফিস করে বলতেন; আর ভাবী আপনার এটাকে বুঝাই যায় না সে কাজের মেয়ে। সেদিন দুপুর বেলা এসেছিলাম হুমায়ুন আহমেদের বইটা ফেরত দিতে। দেখি হামিদা আপনার সায়েবের পাঞ্জাবির বোতাম লাগাচ্ছে। আরেকদিন দেখি নিচে বুবলীকে স্কুলের গাড়িতে তুলে দিচ্ছে পেছনে ফুঁ দিতে দিতে। আমিতো অবাক। বলে কি- আপার পরীক্ষা। দুয়া পইড়া ফুক দেই। আম্মা দেয়।চোখে মুখে তার গার্জেনগিরি। রিনা এই গৃহ সহকারীদের ‘এইটা’ ‘সেইটা’ বলে বস্তুর মত ভাব করা একদম পছন্দ করে না। আগের সেসব ঘটনা ভাবতে ভাবতেই সে শোবার ঘরে ঢোকে। কলেজের ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামাতেই যেন তার শরীরের ওজন কমে গেল।
আজকাল পাঠ্য বই বাজারে পাওয়া যায় না। ছেলেরা পড়ে নোট বই আর কলেজে আসে বই ছাড়া। পড়াতে হলে নিজের বই নিয়ে যেতে হয়। তিন তিনটে ক্লাস গড়ে। অনার্সের ক্লাসে যদি আলাওয়ালের পদ্মাবতী পড়াতে হয় আর কি লাগে! তার উপর সঙ্গে কন্টেইনারে একটু শশা কাটা, প্লাষ্টিক বোতলে পানি, ছাতা। সব মিলে তো বেশ বড় সড় একটা বোঝা।-মা মা হামিদা এসে গেছে। এখন কী হবে? মহা উত্তেজিত বুবলী।- জানি। পাখা খুলে শুয়ে পড়ে রিনা।-মা মা বাচ্চাটা যা মাজার মা। পিট পিট করে তাকায় একদম কাঁদে না।।নাম রেখেছে শামীম। আমাদের উপর তলার কবি শামীম আজাদের নামে। রিনা এবার হেসে ফেলে।
-আচ্ছা আমাকে এক গ্লাস পানিতো দিবি, না তুই কেবল বকর বকর করছিস। কী কষ্ট যে রাস্তায়–আম্মা এই যে লেবুর শরবত। হামিদা  এসে দাঁড়িয়েছে। বাচ্চাটা কোলে নেই। ওটাকে বাদ দিয়ে তাকে বেশ ঝরঝরে পরিচ্ছন্ন দেখাচ্ছে। বাচ্চার মাথায় কিসব হয়েছে… ফুসকুরির মতো। রানু গ্লাসের দিকে তাকায়। দ্বিধায়। যে রকম বস্তিতে থাকে মেয়েটা আর গায়ের কাপড়ও কি পরিষ্কার? যেন তার মনের কথা শুনতে পায় হামিদা বলে, আম্মা কনুই পর্যন্ত সাবান দিয়া হাত ধুইয়া লেবু কাটনের আগে সেদ্ধ -ঠান্ডা পানিতে ধুইয়া –শুকনো চামচে চিনি দিয়া বানাইছি। আশ্চর্য সেই যে কবে শিখিয়েছিল। এখনো হুবহু মনে আছে। সে হেসে বলে দে এবং সরাসরি হামিদার দিকে তাকায়। পাবনার মলিন ডুরে শাড়িতে হামিদার দেহের দেউরিতে ছড়িয়ে আছে বিষাদ। চোখের উজ্জ্বল মনি স্থিত। কন্ঠার হাড়ের গহ্বরে অনায়সে দু’আউন্স জল ধরা যাবে। সিথিঁ ব্যাপৃত হয়ে পড়েছে দু’ইঞ্চি অব্দি। পুরোনো শাড়ির পাড়ে পেচিঁয়ে বাঁধা খোঁপা। সে বিরল গুচ্ছেও শুষ্কতা। গ্লাসটা হাতে দিয়ে দৃষ্টি হঠাৎ করে ডান হাতের নখ মুখের কাছে তোলে হামিদা কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে হেসে হাত নামিয়ে ফেলে। রিনা হাসে। বুবলীও।ওরা সবাই জানে সেই ছোট বেলায় যখন প্রথম জয়দেবপুরের গ্রাম থেকে ওকে আনা হয়- তখন সে দাঁতে নখ কাটতো। তখন রানুর ছিল তীব্র শাসন। প্রথম যেদিন রিনাদের কারখানার রহমতের সঙ্গে ও আসে ওর সারা গায়ে তখন ফুস্কুরি ছিল। মাথায় ছিল উকুন। কলেজে ভর্তির নির্বাচনী খাতা দেখে দেখে লাগাতার একদিন ও প্রায় আধারাত কাজ শেষে পরদিন তার মাথা অসম্ভব গরম। এখন আবার বিএ ক্লাসের খাতা বাকি। মার্কিং এর জন্য আঙ্গুলের কড়া ধরে নম্বর গুনে গুনে চারিদিকটাই সংখ্যাময় হয়ে উঠেছিল। দু’ভাই-বোন জানে রিনার সংখ্যা এলার্জি। বাসায় খাতা দেখার সময় ধারে কাছে ১৪৪ ধারা জারি থাকে। তবু বাবলুর চিৎকারে দরজার দিকে তাকায়।

-রহমত ভাই আসছে। -বল্ আমি খাতা দেখছি। রকিব অফিস থেকে ফেরার আগেই সে খাতা গুলো উঠিয়ে রাখতে চায়। খাতাসহ দেখলেই তার চেহারা কেমন ম্লান হয়ে যায়। -একটা পিচ্চিও আসছে। এবার রানু সত্যি ক্ষিপ্ত হয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। -কিসের পিচ্চি-ফিচ্চি? কাজের সময় শুধু কথা। উঠে গিয়ে দেখে হাজেরার পাশেই কোমল চেহারার ঘন রঙের একটি মেয়ে। ছেলেদের হাফ প্যান্ট ও ট্রেটনের ছোট্টজামা গায়ে। চুলে লাল মাটির রঙ। জামা পরে থাকলেও তাকে মেয়ে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। বাচ্চাটা রিনার চড়া গলা শুনে শুনে হাজেরার পাশে আরও সরে আসে। আর হাজেরা ওর নোংরা অস্তিত্ব থেকে নিজেকে ছাড়াচ্ছে যেন, ঝাড়ছে বালি। -এ্যাই এটা এখানে ঢুকলো কি করে? কী করে? -রহমত ভাইরে বলে আপনেই কইছিলেন একটা পিচ্ছি জোগাড় করতে! রিনার মনে পড়ে যায়। রহমত বলেছিল একটা বাচ্চা মেয়ে দেবে। বুবলীর সঙ্গে থাকবে। টুকটাক কাজ শিখে নেবে। চেনা জানা মানুষের বাচ্চা এ চুরিটুরি করবে না। ঘরের মেয়ের মতো থাকবে। খাবে। সঙ্গে সঙ্গে রিনার অবয়ব নরম হয়ে যায়। -হাজেরা কিছু খেতে দেও। আর গরম পানি বসাও এরে গোসল দিতে হবে। -মা। ডেটল গরম পানি? সে ঘাড়ের কাছে থেকে বলে ওঠে বাবলু। সে মায়ের কম্পাউন্ডার। খাবার পর ধোলাই করা হবে। মেয়েটা ততক্ষনে বুবলীর দিকে ফিরে অদ্ভুত এক আগ্রহে নিয়ে তাকাতে শুরু করেছে। বুবলী তখন ওর পুতুলের ঝুটি ধরে খেলনা চিরুনি করছে।-এ ছেলে না মেয়ে? রহমত কোথায়?-বাথরুমে গেছে। মাইয়া।হামিদা। -এই মেয়ে হাত নামা। খবরদার নখ কাটবিনা। ওকে ক্রিমির ওষুধ খাওয়াতে হবে। কিশোর বাবলু মা’র অসমাপ্ত কথা সমাপ্ত করে। -পন্ডিত! এবার চলো আমার সংগে।হাজেরা ওকে আটা রুটি ও তরকারি খেতে দিয়েছে। সে এক দৃশ্য বটে। প্লেটের যে প্রান্তে তরকারি সেদিকটা বাঁ হাতে টেনে ধরে পিচ্চিটা যখন খেতে শুরু করেছিল ওরা তিন জনই অবাক ও বিমুঢ় হয়ে গেছিল। মেয়েটির ক্ষিদের মাত্রা সমস্ত আঙুলের ডগা পর্যন্ত সঞ্চারিত হয়েছে। সামান্য রুটি তরকারিকেই মনে হচ্ছিল অত্যন্ত লোভনীয় স্বাদু কোন খাবার। রুটির টুকরো ডান হাতের দু’আঙ্গুলে ছাড়িয়ে প্রথমে এপিট ওপিট দেখে নিয়ে মৃদু হেসে তরকারির ওপর বোরখার মত ঢেকে দিচ্ছে। তারপর শুকনো আঙুলে ঝোল না লাগিয়েই কী এক অদ্ভুত কায়দায় র‍্যাপ করে মুখে পুরে নিচ্ছে। আর মুখেরটুকু শেষ না হওয়া আগে প্লেটের ঝোল, কুচো মসলা, কালো জিরে সব কাচিয়ে কুচিয়ে যেন আচার খাচ্ছে- তেমনি খাচ্ছিল। প্লেট পরিষ্কার করতে থাকে। এই যে তার খাবার প্রক্রিয়া এ চলবার সময় মনে হয় না কাছে–পিঠে কেউ আছে। খুদে চেহারার সংগে খরার মুখের একাগ্রতা। তার ঝুঁকে পড়া অবয়ব সবাইকে আকৃষ্ট করে রাখে। হাজেরা দাঁড়িয়ে দেখে। বুবলী হাঁটুতে ভর দিয়ে আর বাবলু ঠিক পিচ্চির পাশে বসে। রহমতকে জিজ্ঞাসাবাদ করে মেয়েটির নাম-ঠিকানা খাতায় লিখে রাখে। ততক্ষনে রকিব অফিস থেকে ফিরে এসেছে।-কি ব্যাপার বাচ্চা দুটো মহা উত্তেজিত মনে হচ্ছে। ব্রিফকেস রেখেই রকিব তার স্বভাব সিদ্ধ ভঙ্গিতে দু’হাত ওপরে তুলে আড়মোড়া ভাঙ্গে।-রহমত একটি বাচ্চা মেয়ে এনেছে আমাদের জন্য।-দেখলাম। ভাত খাচ্ছে।-ভাত নয় রুটি। এটা রানু করে। পরিষ্কার করে সব বোঝানো চাই। কলেজে আট দশ বছরের মাষ্টারির ফল হয়তোবা।- ঐ হল। তা এখন কোন প্রোগ্রাম শুরু হবে। ড্রাই ক্লিনিং না। ভাঁপে সেদ্ধ? হাতে কাপড় কাঁচার একটা অদ্ভুত ভঙ্গি করে। রিনা গা করে না। অন্য সময় হলে মিনি লেকচার দিত। ওর এই পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ওর স্বামী রকিব ওসিডি রোগ মনে করে। মনে করে বাচ্চারাও।-তুমি নাস্তা খাও। আমি আর বাবলু এখন মেয়েটির মাথা ন্যাড়া করবো।-প্লিজ আজকের দিনটা বাদ দাও। বেচারা ঘাবড়ে যাবে।-মনে হয় না। খাবার খেয়েছে। গুনগুনিয়ে শচিন দেব ধরে, এ্যাই মেয়ে তোর মাথায় পোকা। চামড়া খেয়ে ফেলবে… বলে বেরিয়ে যায়।হাজেরার পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকায় রিনাকে আর বেশি ব্যাখ্যা করতে হল না। বাবলু পুরোনো খবরের কাগজের জোড়া পাতার মধ্যে একটা গোল ফোকড় করে টুপ করে মেয়েটির মাথায় পরিয়ে দেয়। জীবন্ত খেলনা পেয়ে সে মৌজে আছে। বারান্দায় পাতা পিঁড়িতে দু’হাত এক করে মেয়েটি একটি কালো পুটলির মত বর্তুকার হয়ে বসে। খবরের কাগজে তার সমস্ত শরীর ঢাকা। রানুর কাঁচি চলতে থাকে ঘচাঘচ। মেয়েটাই টির পিট পিট তাকায়।কাচিঁর সুরে সুরে ঘাড় এদিক ওদিক করে। মাঝে রিনা কাঁচি থামায়।

– তো হামিদা বেগম এ অবস্থা কেন? হামিদা হাতটা মানে হাতের নখ মুখের কাছে আনতে নিয়ে থেমে যায়। -ও হাজেরা, হামিদাকে কিছু খেতে দাও। আম্মা , আমি আসছিলাম একটা কথা বলতে… হজেরা চুপ করে যায়। হামিদা কথা বলে না। রিনাও বলতে বলে না। বাথরুমের কোন এক ট্যাপ থেকে পানি পড়ার শব্দ হতে থাকে। দু’জনেই নিঃশব্দে শোনে। রিনা একটু নড়ে উঠতেই হামিদা দৌড়ে গিয়ে ওদের বাথরুমের কল টাইট করে খোলা দরজা বন্ধ করে আসে।মেয়েটি ওর সব অভ্যাস মনে রেখেছে।বাথরুমের দরজা খোলা রাখাটা একদম পছন্দ করেনা রিনা।এসময় একটি শিশুর কান্না ঐ দক্ষিনের ব্যালকনি থেকে এঘরে এসে পৌছায়। রানু চঞ্চল হয়ে উঠে। হামিদা শান্ত পায়ে এগিয়ে যেতে যেতে বলে, আম্মা আইজ থাকুম।রিনা অবাক হয় না, অস্বস্তিতে আচ্ছন্ন হয় অথচ না বলতে পারে না। কী এক বিচ্ছিরি অবস্থা। এনিয়ে হামিদা তিনবার স্বামীর বস্তি ছেড়ে চলে এসেছে। নিজেকে কেমন দোষী মনে হয়। শিশুটি শান্ত হয়েছে। নিজের বাচ্চাদু’টোর স্বর শোনা যাচ্ছে সেখান থেকেই। হাজেরারও। বিছানা ছাড়তে ছাড়তে ভাবে কী করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। হালকা ধানী রঙা শাড়িতে শ্যাওলা ব্লাউজ সকালে তাকে যেমন চনমনে করে তুলেছিল- এখন তা বিষাদ গীতিকা গাইছে। আশ্চর্য দুটো রঙই এখন কেমন মরা মনে হচ্ছে। রিনার এমন হয়- মনের সঙ্গে বাইরের রঙগুলো সরাসরি মিলে যায় যায়। সে চড়া রঙের কাপড় নিয়ে বাথরুমে ঢোকে।বন্ধ বাথরুমের ঝাঁপসা আয়নায় তাকাতেই মনে পড়ে যায় হামিদার কথা। হামিদাই থাকতে ভিনেগার পানিতে স্পঞ্জ ভিজিয়ে আয়না করতো পরিষ্কার, নিউজ প্রিন্ট দিয়ে বুক শেল্ফের আলমারি। সে সাপ্তাহিক বিচিত্রার ‘খাদ্যবিলাস’ পড়ে রান্না করতো। বাজারের প্রয়োজনীয় তালিকা লিখে ফ্রিজের গায়ে চুম্বকে সেটেঁ রাখতো।বাথরুমে কাপড় না ছেড়ে রিনা দাঁড়িয়ে থাকে। চোখ ভিজে আসে। ঐ ঝাঁপসা আয়নায়ই যেন সব দেখতেই পায়, একদম পরিষ্কার। মা একদিন তো অবাক স্বরে টেলিফোন ধরে বলেছিলেন, হামিদা এমন সুন্দর করে সালাম দিয়ে ফোন ধরেছে-আমিতো চিনতেই পারিনি।-হ্যাঁ মা ওতো এখন ফোনের মেসেজও ভুল বানানে লিখে রাখে।-আহা। মা, মানুষ পরিবেশের কারণে কী যে হয়! কর মা, কর আল্লাহ্ ছোওয়াব দেবেন।-কি জানি! -মেয়েটা তোকে খুব মায়া করে। মনে নেই তুই যেবার রিকশা থেকে পড়ে পা মচকেছিলি। সে সারা রাত জেগে জলপট্টি দিল আর যেবার তোর কলেজের খাতায় পানি পড়ে গেছিল কী করে সে ওভেনে দিয়ে শুকিয়ে ইস্ত্রি করে ঠিক করে দিয়েছিল!

এবার মা মেয়ে সেই স্মৃতিতে হেসে ওঠেন।বাথরুম থেকে বেরিয়েই দেখে হামিদা দাঁড়িয়ে আছে। রানু তবু কিছু জিজ্ঞেস করে না। মুখ থেকে পানি পরতে থাকে। ও সাধারণতঃ মুখে চোখে পানির ঝাপটা দিয়ে মোছে না। ভালো লাগে। নিজেকে কেমন প্রাকৃতিক করে রাখে পানি। পানির ফোটা। আবারো বাচ্চাটা রাখা। রায়া- রানা ধারে কাছে নেই বোঝা যায় ওখানেই ওরা।হামিদা কলেজের ব্যাগ থেকে টিফিন বাক্স, পানির বোতল নামিয়ে নেয়। ব্যাগের ভেতরের হ্যান্ড টাউয়েল ধুতে নিয়ে যায়। সবই কেমন করে যেন হতে থাকে রিনা না করতে পারে না। একটু বিরক্ত হয় হাজেরার ওপর কিন্তু বয়সের ওজনে ওর সঞ্চরমানতা কমে এসেছে কি আর করা? এসময় দেখে বুবলী বারান্দা থেকে সাঁই করে ওর নিজের ঘরে ঢুকছে। আঁচ করা যায় ফ্ল্যাটে একটা প্রচ্ছন্ন ছোটাছুটি। দু’ভাই বোন মিলে কি যেন করছে।-ডলি কি কর? রিনা তার সহকর্মী ও বন্ধু ফিরোজাকে ফোন করে। শোনো-আমার হামিদা না এসে গেছে আবারও। এ নিয়ে তিনবার হল! আর ভালো লাগে না ভাই। আই হেড হেনাফ। আবার কাল ভোরেই ওর পাজি স্বামীটা আসবে…আবার সেই ঘ্যান ঘ্যান…-কী বল! অপর প্রান্ত থেকে ডলি বলে। তো কি বললে?

-ওকে দেখলে আমার কথা বন্ধ হয়ে যায়। আমার গলা আটকে আসে। ডলি, ও বড় কষ্টে আছেরে। রিনার গলা ধরে আসে।-মা মা দেখ। দেখ। বাবলু হাঁপাচ্ছে। দু’হাতে সামনে টাঙিয়ে ধরেছে হামিদার বাচচাটাকে। এী ফাঁকেই ওটাকে সাফ সুতরো করে তুলেছে দু’ভাইবোন। গায়ে বাবলুরই একটা গেঞ্জি। ট্যাঁট্যাঁ ঢেকে গ্যাছে পা অব্দি। আইব্রো দিয়ে ভুরু আকাঁ হয়েছে। এত পাউডার দিয়েছে যে ন্যাড়া মাথাটা সাদা হয়ে গেছে। বাচ্চাটাও ঝুলে আছে কোনো নড়চড় নেই। শুধু ইটির মত চোখ বড় বড় করে তাকাচ্ছে।-দে। নিজের অজান্তেই হাত বাড়িয়ে দেয় রিনা।হামিদা ধারে কাছে নেই। সমস্ত বাড়িতে একটা উৎসব লেগেছে যেন। হামিদা দায়িত্ব নিয়ে ফেলেছে রান্না ঘরের। আজ রাতে নির্ঘাত টেবিলে থাকবে হামিদা স্পেশাল সবজির ডাল বা রকিবের প্রিয় পেঁপেঁ মুরগি আর বাচ্চাদের জন্য ফ্রেঞ্জ ফ্রাইজ।অস্বস্তি তবু যায় না। কী বলতে এসেছে হামিদা। নতুন কি কথা? বুকটা টিপ টিপ করে।বুবলীর সংগে সংগে বড় হয়ে সে রকম পছন্দেই তৈরী হয়েছে হামিদার মন। টেলিভিশনে একদিন এক নায়ককে দেখে দুটো মেয়ের কি হুটোপুটি। রানু তখন কিছু কাগজ ফাইলআপ করেছিল।-হামিদা ছেলেটার পরা জিন্স আর লুজ টি-শার্ট। ভাল না?-হে টেষ্ট আছে।আর দেখেন ওর বন্ধুটা কিন্তু একদম খ্যাত।বলে কি! চমকে ওটে রিনা। ওদের দিকে তাকায়, দুটোই সমান মগ্ন।-আসলে নায়কটা সালমান খানকে নকল করেছে। -হে আপা। আর দেখেন কি সুন্দর বাড়ীটা একদম ‘এইসব দিনরাত্রির’ মতো।আহা বসন্তে নবীন এই তারুন্যে দু’টো মেয়ে কি দারুণ একাকার হয়ে গেছিল। বুবলী বলছিল, মা হামিদা না এত ছোট বেলায় আমাদের কাছে এসেছে তাই স্বপ্নেও সে আমাদেরই দেখে।-কি দেখে রে? -এ্যাই দেখে তুমি আর বাবা গাড়ি থেকে নামলে, বড়খালা আমেরিকা থেকে এসেছে, সে ভ্যানিলা ফ্লেভারের কাষ্টার্ড বানাচ্ছে।

***রাতের খাবারের পর শুরু হল উচ্ছন্ন এক বৃষ্টি। কোনদিক থেকে যে আসে দিশা পাওয়া যায় না। বুবলী– হামিদা ঠিক আগের মটি দৌড়াদৌড়ি ও খিলখিল করে সমস্ত জানালা দরজা বন্ধ করলো। একটানা বৃষ্টি চলবে আরও হাওয়া তাই বলছে। রিনা এদিকের বারান্দায় একা এসে দাঁড়ায়। হামিদারই লাগানো একটা বেগুনি অর্কিডগুচ্ছ বৃষ্টি ও চোখের জলে কেমন ঘোলা হয়ে উঠেছে। সেদিকে তাকিয়ে তার চোখের জল চোখেরই আল ছাড়াতেই আবার ফুলটি পরিষ্কার হয়ে উঠে।হামিদাকে তুলে দেবার দিনেও এমনি বৃষ্টি ছিল।একটা সেলাইর মেশিন, জামাইর চাহিদা মত একটা রেডিও ও নগদ অর্থসহ মিরপুর কাতানপরা হামিদা যখন বিদায় নেয় তখন বুবলীর কান্নায় আর থাকা যাচ্ছিল না। আর হামিদা দরজার কাছ থেকে বার বার ফিরে এসে আছড়ে পড়ছিল একবার রকিবের পায়ে আরেকবার রানুর বুকে। জামাই ছেলেটা হতচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।আর রহমত বার বার বুঝাচ্ছিল। জড়সড় হয়ে সিড়িঁর কোনায় দাড়িঁয়ে ছিল হামিদার বাবা-মা। তার দর্শক মাত্র। কোনো ভুমিকা তাদের নেই।তবু ওদেরই তো মেয়ের বিয়ে। বিয়ের জন্য ওদের আনিয়েছিল রিনাই। রকিবও বলেছিল, আসল বাবা মা তো ওরাই।দোকানদার ছেলে। যোগ্য পাত্র। পরীবাগের বাজারে শাক-সবজির শেডে বসে।ওরা খুশি, অনেক দোয়া করেছে। বস্তির ঘরে ফ্যান থাকবে না, ফ্রিজ থাকবে না। বিয়ের আগে দেড় মাস রিনার কড়া নির্দেশে তাকে বাইরের সেদ্ধ পানি খেতে হয়েছে, ফ্যান বন্ধ রেখে হাত পাখায় ঘুমুতে হয়েছে। শুনতে হয়েছে কীভাবে টাকা ভাগ করে করে সংসার করতে হবে।ঘরকে পরিষ্কার রাখতে হবে। পাশের মহিলাদের নিয়ে সেলাই মেশিন দিয়ে কিছু একটা করে বাড়তি আয় করতে হবে… ততদিন রিনা নিয়মিত কিছু টাকা দিয়ে যাবে।

-আম্মা সকলের বিছানা ঝাড়ছি, হেরা গুমাইতে গেছে আপনে কি ইসবগুলের ভুসি এখন খাইবেন না ঘরে দিয়া আসুম?-উ। রিনা চমকে ওঠে।- ভিজতাছেন ক্যান?-এমনি। তুই সামনে থেকে যা তো। একটু রুঢ় শোনায় তার স্বর। গ্লাস হাতে হামিদা অপরাধীর মত সরে যায়। রিনা আবার তাকায় তার বুনো অর্কিডগুচ্ছের দিকে।চোখ যায় সামনের ফ্ল্যাট বাড়িতে।সেই জানালাটা এখনো খোলা। সেই ছেলেটা এখন দেশের বাইরে। এখানেই হামিদা এসে দাঁড়িয়ে থাকতো। বিকেলে কাজল পরে, বেনী বেধেঁ।আহারে… -মা, হামিদার প্রেম হয়ে যেতে পারে। প্রাকটিক্যাল খাতা গুছাতে গুছাতে বুবলী বলেছিল।-কি বলিস? আতকে উঠেছিল রানু।-হ্যাঁ মা। সামনের বাসার ছেলেটা পাজি আছে। এখন দেখি হামিদা আমাকেও লুকায়। আর তারপরই রানুর মা পরামর্শ দিয়েছিলেন,

-একটা কেলেংকারি হবার আগেই বিয়ে দিয়ে দে। জলদি কর।-মা এভাবেইতো ওকে যেনতেন জায়গায় দিতে পারিনা। ওতো আমার মেয়ের মতো। – মতো কিন্তু মেয়ে তো না।রিনা তার অর্কিডের ভেজা শরীরে আদর করে ঘরে ঢোকে। রাতে কাজ করার পর এক আলাদা শান্তি । চাপা ভলুমে গান চালায় সে শচীন দেব, জগম্ময়ের । টেবিল বাতির ঘেরে নিয়ন্ত্রিত আলোয়, মৃদু মায়াময় গানে রকিবের ঘুমের কোন অসুবিধা হয় না। রিনা রাত জেগে পড়াশোনা করার সময় বা যতক্ষণ সজাগ থাকে বাচ্চাদের জন্য দরোজাটা খোলাই রাখে। আগামী কালের ক্লাস প্রস্তুতির জন্য দীপ্তি ত্রিপাঠীর আধুনিক বাংলা কাব্য পরিচয় নিয়ে বসেছে।

বাইরে ঘরের মেঝেতে হাজেরার সঙ্গে আজ হামিদা ও তার বাচ্চা মেয়েটা ঘুমাচ্ছে।বুবলি ও বাবলু ও যার যার ঘরে ঘুমোচ্ছে। হামিদার বিয়ের পর এক বছরেই যেন বুললিটা অনেক বড় হয়ে গেছে। আজ হামিদার সঙ্গে এত কি গল্প করেছে যে গম্ভীর হয়ে গেল! ফ্যানের বাতাসে পর্দা কাঁপছে। নিঃস্তব্দ এ ঘুমন্ত বাড়িতে চিন্তায় কাতর অবস্থার মন বসাতে পারছে না।

-আম্মা …!পা টিপে টিপে কখন পেছনে এসেছে হামিদা? চমকে ওঠে রিনা।-আম্মা কাইলকা সিগমা খালারে নাইলে লুলু খালারে এট্টু ফোন করবেন?-কেন রে? বলেই হামিদার দিকে মুখ তুলে উঠে দাঁড়িয়ে পিঠে হাত দিয়ে সন্তর্পনে শোবার ঘর থেকে তাকে প্যাসেজে নিয়ে আসে। সেখানে আলোতে দেখা যায় হামিদা মুখ নিচু করে পায়ের বুড়ো আঙ্গুলে মোজাইক ঘষছে।রিনার আইনজীবী বন্ধু ব্যারিস্টার সিগমা হুদা ডমেস্টিক ভায়োলেন্স নিয়ে লড়েন। আর লুলু আপা ব্যারিস্টার সুলতানা কামাল কবি সুফিয়া কামালের কন্যা মানবাধিকার কর্মী ও আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক। এসব তথ্য মাথায় আসতেই গলার স্বর ভেঙে যায় রিনার।একটু জোরেই বলে ওঠে, -কেনরে হামিদা?-আমি আইন দিয়া মুক্তি নিমু।-কী? হতভম্ভ হয়ে যায় রিনা।-আম্মা আমি চইল্লা আসুম।এবার গলার স্বর কারোরই আর চাপা থাকে না। হামিদাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে রিনা। হামিদা তাকে অষ্ট বাহুতে বেষ্টন করে ফোঁপাতে থাকে। ঘুম ভেঙে উঠে আসে রকিব। হতচকিত দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকিয়ে থাকে ।কিছু বলে না।  অর্কিড                                         

অর্কিড                                       

শামীম আজাদ-এই তুই আবার চলে এসেছিস? হামিদা যে আবার ফিরে এসেছে তা তো দেখতেই পাচ্ছে রিনা। তবু জিজ্ঞেস করে যেন উত্তরটা না নিজের বিরক্তিটাই বোঝানো।

-জি!হামিদার উত্তরটাও আসলে উত্তর না।এক কিসিমের এফারমেশন।

ঢাকা কলেজে একেকটি ক্লাস নেয়া মানে একেকটি চ্যালেঞ্জ নিয়ে পার পাওয়া। তার উপর ক্লাসগুলো শেষে জুনের ভ্যাপসা গরমে নিউমার্কেট থেকে টুকটাক বাজারপাতি করা সব মিলে যে বিরক্তি ছিল অঙ্গে অঙ্গে হামিদাকে দেখে তা সঞ্চারিত হল রন্ধ্রে রন্ধ্রে। হামিদা হাতির পুল থেকে সে আবার ফিরে এসেছে এটা একটা অপরাধ। অথচ হামিদা কিনা ‘জি’ বলে প্রায় নির্বিকারচিত্তে কোলের বাচচাটাকে বাঁ হাতে আটকে রেখে রিনার সদ্য খোলা স্যান্ডেল জোড়া ডান হাতে তুলে নিয়ে জুতা স্ট্যান্ডের দিকে চলে গেল সে। রিনা অবাক হয়ে থাকতে থাকতেই বাজারও নিয়ে গেল। ঐ একহাতেই। রাস্তার ধুলো-ময়লাওলা স্যান্ডেল রিনা ঘরের ভেতরে নেয় না। এর জন্য সবাই বাধ্য দরজার বাইরে জুতো খুলে ঘরে প্রবেশ করে।‘ঘরের জুতোয়’ ঘরে, বাইরের জুতোয় বাইরে। দু’বেলা ঝাটপাট দেয়া ঘরে ময়লা থাকেই না। আর হামিদা থাকতে তো কথাই নেই।ঈর্ষান্বিত প্রতিবেশীরা বলতেন, ভাবী আপনার কাজের মেয়েটা বটে। কী সুন্দর করে ঘর মোছে, মুখ দেখা যায়। রিনা ওকে ডেকে এনে বলতো

-আমার হামিদাকে কিছু বলতে হয় না। নারে? – ভাবী আমাদের এরকম একটা আনিয়ে দেন না। এ্যাই মেয়ে তোমার কোন বোন-টোন নেই? ঠিক ভাবীর মতই রাখবো। এরকম জামা কাপড়, তেল, ক্লিপ…-আরে না আমি ওসব দিই না। সব বুবলীর কান্ড।ওর নিজের জন্যে কিছু কিনলে তার ভাগ সে হামিদাকে দেবেই।-খুব ভালো, খুব ভালো। মহিলারা মুখে এসব বলতেন আর ঈর্ষা চকিত দৃষ্টিতে হামিদার দিকে তাকাতেন। হামিদা সরে গেলে ফিসফিস করে বলতেন; আর ভাবী আপনার এটাকে বুঝাই যায় না সে কাজের মেয়ে। সেদিন দুপুর বেলা এসেছিলাম হুমায়ুন আহমেদের বইটা ফেরত দিতে।দেখি হামিদা আপনার সায়েবের পাঞ্জাবির বোতাম লাগাচ্ছে।আরেকদিন দেখি নিচে বুবলীকে স্কুলের গাড়িতে তুলে দিচ্ছে পেছনে ফুঁ দিতে দিতে। আমিতো অবাক। বলে কি- আপার পরীক্ষা।দুয়া পইড়া ফুক দেই। আম্মা দেয়।চোখে মুখে তার গার্জেনগিরি।রিনা এই গৃহ সহকারীদের ‘এইটা’ ‘সেইটা’ বলে বস্তুর মত ভাব করা একদম পছন্দ করে না। আগের সেসব ঘটনা ভাবতে ভাবতেই সে শোবার ঘরে ঢোকে। কলেজের ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামাতেই যেন তার শরীরের ওজন কমে গেল।আজকাল পাঠ্য বই বাজারে পাওয়া যায় না। ছেলেরা পড়ে নোট বই আর কলেজে আসে বই ছাড়া। পড়াতে হলে নিজের বই নিয়ে যেতে হয়। তিন তিনটে ক্লাস গড়ে। অনার্সের ক্লাসে যদি আলাওয়ালের পদ্মাবতী পড়াতে হয় আর কি লাগে! তার উপর সঙ্গে কন্টেইনারে একটু শশা কাটা, প্লাষ্টিক বোতলে পানি, ছাতা। সব মিলে তো বেশ বড় সড় একটা বোঝা।-মা মা হামিদ্ এসে গেছে। এখন কী হবে? মহা উত্তেজিত বুবলী।- জানি। পাখা খুলে শুয়ে পড়ে রিনা।-মা মা বাচ্চাটা যা মাজার মা। পিট পিট করে তাকায় একদম কাঁদে না।নাম রেখেছে শামীম। আমাদের উপর তলার কবি শামীম আজাদের নামে। রিনা এবার হেসে ফেলে। -আচ্ছা আমাকে এক গ্লাস পানিতো দিবি, না তুই কেবল বকর বকর করছিস। কী কষ্ট যে রাস্তায়–আম্মা এই যে লেবুর শরবত। হামিদা  এসে দাড়িঁয়েছে।বাচ্চাটা কোলে নেই। ওটাকে বাদ দিয়ে তাকে বেশ ঝরঝরে পরিচ্ছন্ন দেখাচ্ছে। বাচ্চার মাথায় কিসব হয়েছে… ফুসকুরির মতো।রানু গ্লাসের দিকে তাকায়। দ্বিধায়।যে রকম বস্তিতে থাকে মেয়েটা আর গায়ের কাপড়ও কি পরিষ্কার? যেন তার মনের কথা শুনতে পায় হামিদা বলে, আম্মা কনুই পর্যন্ত সাবান দিয়া হাত ধুইয়া লেবু কাটনের আগে সেদ্ধ -ঠান্ডা পানিতে ধুইয়া –শুকনো চামচে চিনি দিয়া বানাইছি। আশ্চর্য সেই যে কবে শিখিয়েছিল। এখনো হুবহু মনে আছে। সে হেসে বলে দে এবং সরাসরি হামিদার দিকে তাকায়।পাবনার মলিন ডুরে শাড়িতে হামিদার দেহের দেউরিতে ছড়িয়ে আছে বিষাদ। চোখের উজ্জ্বল মনি স্থিত। কন্ঠার হাড়ের গহবরে অনায়সে দু’আউন্স জল ধরা যাবে। সিথিঁ ব্যাপৃত হয়ে পড়েছে দু’ইঞ্চি অব্দি। পুরোনো শাড়ির পাড়ে পেচিঁয়ে বাধা খোপাঁ। সে বিরল গুচ্ছেও শুষ্কতা। গ্লাসটা হাতে দিয়ে দৃষ্টি হঠাৎ করে ডান হাতের নখ মুখের কাছে তোলে হামিদা কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে হেসে হাত নামিয়ে ফেলে। রিনা হাসে। বুবলীও।ওরা সবাই জানে সেই ছোট বেলায় যখন প্রথম জয়দেবপুরের গ্রাম থেকে ওকে আনা হয়- তখন সে দাঁতে নখ কাটতো। তখন রানুর ছিল তীব্র শাসন।প্রথম যেদিন রিনাদের কারখানার রহমতের সঙ্গে ও আসে ওর সারা গায়ে তখন ফুস্কুরি ছিল। মাথায় ছিল উকুন।কলেজে ভর্তির নির্বাচনী খাতা দেখে দেখে লাগাতার একদিন ও প্রায় আধারাত কাজ শেষে পরদিন তার মাথা অসম্ভব গরম।এখন আবার বিএ ক্লাসের খাতা বাকি। মার্কিং এর জন্য আঙ্গুলের কড়া ধরে নম্বর গুনে গুনে চারিদিকটাই সংখ্যাময় হয়ে উঠেছিল। দু’ভাই-বোন জানে রিনার সংখ্যা এলার্জি। বাসায় খাতা দেখার সময় ধারে কাছে ১৪৪ ধারা জারি থাকে। তবু বাবলুর চিৎকারে দরজার দিকে তাকায়।

-রহমত ভাই আসছে। -বল্ আমি খাতা দেখছি।রকিব অফিস থেকে ফেরার আগেই সে খাতা গুলো উঠিয়ে রাখতে চায়। খাতাসহ দেখলেই তার চেহারা কেমন ম্লান হয়ে যায়।-একটা পিচ্চিও আসছে। এবার রানু সত্যি ক্ষিপ্ত হয়ে ঘুরে দাঁড়ায়।-কিসের পিচ্চি-ফিচ্চি? কাজের সময় শুধু কথা। উঠে গিয়ে দেখে হাজেরার পাশেই কোমল চেহারার ঘন রঙের একটি মেয়ে। ছেলেদের হাফ প্যান্ট ও ট্রেটনের ছোট্টজামা গায়ে। চুলে লাল মাটির রঙ। জামা পরে থাকলেও তাকে মেয়ে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। বাচ্চাটা রিনার চড়া গলা শুনে শুনে হাজেরার পাশে আরও সরে আসে। আর হাজেরা ওর নোংরা অস্তিত্ব থেকে নিজেকে ছাড়াচ্ছে যেন, ঝাড়ছে বালি।-এ্যাই এটা এখানে ঢুকলো কি করে? কী করে?-রহমত ভাইরে বলে আপনেই কইছিলেন একটা পিচ্ছি জোগাড় করতে! রিনার মনে পড়ে যায়। রহমত বলেছিল একটা বাচ্চা মেয়ে দেবে। বুবলীর সঙ্গে থাকবে। টুকটাক কাজ শিখে নেবে। চেনা জানা মানুষের বাচ্চা এ চুরিটুরি করবে না। ঘরের মেয়ের মতো থাকবে। খাবে। সঙ্গে সঙ্গে রিনার অবয়ব নরম হয়ে যায়।-হাজেরা কিছু খেতে দেও। আর গরম পানি বসাও এরে গোসল দিতে হবে। -মা। ডেটল গরম পানি? সে ঘাড়ের কাছে থেকে বলে ওঠে বাবলু। সে মায়ের কম্পাউন্ডার।খাবার পর ধোলাই করা হবে।মেয়েটা ততক্ষনে বুবলীর দিকে ফিরে অদ্ভুত এক আগ্রহে নিয়ে তাকাতে শুরু করেছে। বুবলী তখন ওর পুতুলের ঝুটি ধরে খেলনা চিরুনি করছে।-এ ছেলে না মেয়ে? রহমত কোথায়?-বাথরুমে গেছে।মাইয়া।হামিদা। -এই মেয়ে হাত নামা। খবরদার নখ কাটবিনা।ওকে ক্রিমির ওষুধ খাওয়াতে হবে। কিশোর বাবলু মা’র অসমাপ্ত কথা সমাপ্ত করে। -পন্ডিত! এবার চলো আমার সংগে।হাজেরা ওকে আটা রুটি ও তরকারি খেতে দিয়েছে। সে এক দৃশ্য বটে।প্লেটের যে প্রান্তে তরকারি সেদিকটা বাঁ হাতে টেনে ধরে পিচ্চিটা যখন খেতে শুরু করেছিল ওরা তিন জনই অবাক ও বিমুঢ় হয়ে গেছিল। মেয়েটির ক্ষিদের মাত্রা সমস্ত আঙ্গুলের ডগা পর্যন্ত সঞ্চারিত হয়েছে। সামান্য রুটি তরকারিকেই মনে হচ্ছিল অত্যন্ত লোভনীয় স্বাদু কোন খাবার।রুটির টুকরো ডান হাতের দু’আঙ্গুলে ছাড়িয়ে প্রথমে এপিট ওপিট দেখে নিয়ে মৃদু হেসে তরকারির ওপর বোরখার মত ঢেকে দিচ্ছে । তারপর শুকনো আঙুলে ঝোল না লাগিয়েই কী এক অদ্ভুত কায়দায় র‍্যাপ করে মুখে পরে নিচ্ছে। আর মুখের টুকু শেষ না হওয়া আগে প্লেটের ঝোল, কুচো মসলা, কালো জিরে সব কাচিয়ে কুচিয়ে যেন আচার খাচ্ছে- তেমনি খাচ্ছিল। প্লেট পরিষ্কার করতে থাকে। এই যে তার খাবার প্রক্রিয়া এ চলবার সময় মনে হয় না কাছে–পিঠে কেউ আছে। খুদে চেহারার সংগে খরার মুখের একাগ্রতা। তার ঝুঁকে পড়া অবয়ব সবাইকে আকৃষ্ট করে রাখে। হাজেরা দাঁড়িয়ে দেখে। বুবলী হাঁটুতে ভর দিয়ে আর বাবলু ঠিক পিচ্চির পাশে বসে। রহমতকে জিজ্ঞাসাবাদ করে মেয়েটির নাম-ঠিকানা খাতায় লিখে রাখে। ততক্ষনে রকিব অফিস থেকে ফিরে এসেছে। -কি ব্যাপার বাচ্চা দুটো মহা উত্তেজিত মনে হচ্ছে। ব্রিফকেস রেখেই রকিব তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে দু’হাত ওপরে তুলে আড়মোড়া ভাঙ্গে। -রহমত একটি বাচ্চা মেয়ে এনেছে আমাদের জন্য। -দেখলাম। ভাত খাচ্ছে। -ভাত নয় রুটি। এটা রানু করে। পরিষ্কার করে সব বোঝানো চাই। কলেজে আট দশ বছরের মাষ্টারির ফল হয়তোবা। – ঐ হল। তা এখন কোন প্রোগ্রাম শুরু হবে। ড্রাই ক্লিনিং না। ভাঁপে সেদ্ধ? হাতে কাপড় কাঁচার একটা অদ্ভুত ভঙ্গি করে। রিনা গা করে না। অন্য সময় হলে মিনি লেকচার দিত। ওর এই পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ওর স্বামী রকিব ওসিডি রোগ মনে করে। মনে করে বাচ্চারাও। -তুমি নাস্তা খাও। আমি আর বাবলু এখন মেয়েটির মাথা ন্যাড়া করবো।-প্লিজ আজকের দিনটা বাদ দাও। বেচারা ঘাবড়ে যাবে।-মনে হয় না। খাবার খেয়েছে। গুনগুনিয়ে শচিন দেব ধরে, এ্যাই মেয়ে তোর মাথায় পোকা। চামড়া খেয়ে ফেলবে… বলে বেরিয়ে যায়। হাজেরার পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকায় রিনাকে আর বেশি ব্যাখ্যা করতে হল না। বাবলু পুরোনো খবরের কাগজের জোড়া পাতার মধ্যে একটা গোল ফোকড় করে টুপ করে মেয়েটির মাথায় পরিয়ে দেয়। জীবন্ত খেলনা পেয়ে সে মৌজে আছে। বারান্দায় পাতা পিড়িতে দু’হাত এক করে মেয়েটি একটি কালো পুটলির মত বর্তুকার হয়ে বসে। খবরের কাগজে তার সমস্ত শরীর ঢাকা। রানুর কাঁচি চলতে থাকে ঘচাঘচ। মেয়েটা পিট পিট তাকায়। কাঁচির সুরে সুরে ঘাড় এদিক ওদিক করে। মাঝে রিনা কাঁচি থামায়।

– তো হামিদা বেগম এ অবস্থা কেন? হামিদা হাতটা মানে হাতের নখ মুখের কাছে আনতে নিয়ে থেমে যায়। -ও হাজেরা, হামিদাকে কিছু খেতে দাও। আম্মা, আমি আসছিলাম একটা কথা বলতে… হাজেরা চুপ করে যায়। হামিদা কথা বলে না। রিনাও বলতে বলে না। বাথরুমের কোন এক ট্যাপ থেকে পানি পড়ার শব্দ হতে থাকে। দু’জনেই নিঃশব্দে শোনে। রিনা একটু নড়ে উঠতেই হামিদা দৌড়ে গিয়ে ওদের বাথরুমের কল টাইট করে খোলা দরজা বন্ধ করে আসে। মেয়েটি ওর সব অভ্যাস মনে রেখেছে। বাথরুমের দরজা খোলা রাখাটা একদম পছন্দ করেনা রিনা।এসময় একটি শিশুর কান্না ঐ দক্ষিনের ব্যালকনি থেকে এঘরে এসে পৌছায়। রানু চঞ্চল হয়ে উঠে। হামিদা শান্ত পায়ে এগিয়ে যেতে যেতে বলে, আম্মা আইজ থাকুম। রিনা অবাক হয় না, অস্বস্তিতে আচ্ছন্ন হয় অথচ না বলতে পারে না। কী এক বিচ্ছিরি অবস্থা। এনিয়ে হামিদা তিনবার স্বামীর বস্তি ছেড়ে চলে এসেছে। নিজেকে কেমন দোষী মনে হয়। শিশুটি শান্ত হয়েছে। নিজের বাচ্চাদু’টোর স্বর শোনা যাচ্ছে সেখান থেকেই। হাজেরারও। বিছানা ছাড়তে ছাড়তে ভাবে কী করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। হালকা ধানী রঙা শাড়িতে শ্যাওলা ব্লাউজ সকালে তাকে যেমন চনমনে করে তুলেছিল- এখন তা বিষাদ গীতিকা গাইছে। আশ্চর্য দুটো রঙই এখন কেমন মরা মনে হচ্ছে। রিনার এমন হয়- মনের সঙ্গে বাইরের রঙগুলো সরাসরি মিলে যায় যায়। সে চড়া রঙের কাপড় নিয়ে বাথরুমে ঢোকে। বন্ধ বাথরুমের ঝাপসা আয়নায় তাকাতেই মনে পড়ে যায় হামিদার কথা। হামিদাই থাকতে ভিনেগার পানিতে স্পঞ্জ ভিজিয়ে আয়না করতো পরিষ্কার, নিউজ প্রিন্ট দিয়ে বুক শেল্ফের আলমারি। সে সাপ্তাহিক বিচিত্রার ‘খাদ্যবিলাস’ পড়ে রান্না করতো। বাজারের প্রয়োজনীয় তালিকা লিখে ফ্রিজের গায়ে চুম্বকে সেঁটে রাখতো। বাথরুমে কাপড় না ছেড়ে রিনা দাঁড়িয়ে থাকে। চোখ ভিজে আসে। ঐ ঝাপসা আয়নায়ই যেন সব দেখতেই পায়, একদম পরিষ্কার। মা একদিন তো অবাক স্বরে টেলিফোন ধরে বলেছিলেন, হামিদা এমন সুন্দর করে সালাম দিয়ে ফোন ধরেছে-আমিতো চিনতেই পারিনি। -হ্যাঁ মা ওতো এখন ফোনের মেসেজও ভুল বানানে লিখে রাখে। -আহা। মা, মানুষ পরিবেশের কারণে কী যে হয়! কর মা, কর আল্লাহ্ ছোওয়াব দেবেন। -কি জানি! -মেয়েটা তোকে খুব মায়া করে। মনে নেই তুই যেবার রিকশা থেকে পড়ে পা মচকেছিলি। সে সারা রাত জেগে জলপট্টি দিল আর যেবার তোর কলেজের খাতায় পানি পড়ে গেছিল কী করে সে ওভেনে দিয়ে শুকিয়ে ইস্ত্রি করে ঠিক করে দিয়েছিল!

এবার মা মেয়ে সেই স্মৃতিতে হেসে ওঠেন।বাথরুম থেকে বেরিয়েই দেখে হামিদা দাঁড়িয়ে আছে। রানু তবু কিছু জিজ্ঞেস করে না। মুখ থেকে পানি পরতে থাকে। ও সাধারণতঃ মুখে চোখে পানির ঝাপটা দিয়ে মোছে না। ভালো লাগে। নিজেকে কেমন প্রাকৃতিক করে রাখে পানি। পানির ফোঁটা। আবারো বাচ্চাটা রাখা। রায়া- রানা ধারে কাছে নেই বোঝা যায় ওখানেই ওরা। হামিদা কলেজের ব্যাগ থেকে টিফিন বাক্স, পানির বোতল নামিয়ে নেয়। ব্যাগের ভেতরের হ্যান্ড টাউয়েল ধুতে নিয়ে যায়। সবই কেমন করে যেন হতে থাকে রিনা না করতে পারে না। একটু বিরক্ত হয় হাজেরার ওপর কিন্তু বয়সের ওজনে ওর সঞ্চরমানতা কমে এসেছে কি আর করা? এসময় দেখে বুবলী বারান্দা থেকে সাঁই করে ওর নিজের ঘরে ঢুকছে। আঁচ করা যায় ফ্ল্যাটে একটা প্রচ্ছন্ন ছোটাছুটি। দু’ভাই বোন মিলে কি যেন করছে। -ডলি কি কর? রিনা তার সহকর্মী ও বন্ধু ফিরোজাকে ফোন করে। শোনো-আমার হামিদা না এসে গেছে আবারও। এ নিয়ে তিনবার হল! আর ভালো লাগে না ভাই। আই হেড এনাফ। আবার কাল ভোরেই ওর পাজি স্বামীটা আসবে…আবার সেই ঘ্যান ঘ্যান…-কী বল! অপর প্রান্ত থেকে ডলি বলে। তো কি বললে?

-ওকে দেখলে আমার কথা বন্ধ হয়ে যায়। আমার গলা আটকে আসে। ডলি, ও বড় কষ্টে আছেরে। রিনার গলা ধরে আসে। -মা মা দেখ। দেখ। বাবলু হাঁপাচ্ছে। দু’হাতে সামনে টাঙিয়ে ধরেছে হামিদার বাচ্চাটাকে। এই ফাঁকেই ওটাকে সাফ সুতরো করে তুলেছে দু’ভাইবোন। গায়ে বাবলুরই একটা গেঞ্জি। ট্যাঁট্যাঁ ঢেকে গ্যাছে পা অব্দি। আইব্রো দিয়ে ভুরু আকাঁ হয়েছে। এত পাউডার দিয়েছে যে ন্যাড়া মাথাটা সাদা হয়ে গেছে। বাচ্চাটাও ঝুলে আছে কোনো নড়চড় নেই। শুধু ইটির মত চোখ বড় বড় করে তাকাচ্ছে। -দে। নিজের অজান্তেই হাত বাড়িয়ে দেয় রিনা। হামিদা ধারে কাছে নেই। সমস্ত বাড়িতে একটা উৎসব লেগেছে যেন। হামিদা দায়িত্ব নিয়ে ফেলেছে রান্না ঘরের। আজ রাতে নির্ঘাত টেবিলে থাকবে হামিদা স্পেশাল সবজির ডাল বা রকিবের প্রিয় পেঁপে মুরগি আর বাচ্চাদের জন্য ফ্রেঞ্চ ফ্রাইজ। অস্বস্তি তবু যায় না। কী বলতে এসেছে হামিদা। নতুন কি কথা? বুকটা টিপ টিপ করে। বুবলীর সঙ্গে সঙ্গে বড় হয়ে সে রকম পছন্দেই তৈরী হয়েছে হামিদার মন। টেলিভিশনে একদিন এক নায়ককে দেখে দুটো মেয়ের কি হুটোপুটি। রানু তখন কিছু কাগজ ফাইলআপ করেছিল। -হামিদা ছেলেটার পরা জিন্স আর লুজ টি-শার্ট। ভাল না? -হে টেষ্ট আছে। আর দেখেন ওর বন্ধুটা কিন্তু একদম খ্যাত। বলে কি! চমকে ওঠে রিনা। ওদের দিকে তাকায়, দুটোই সমান মগ্ন। -আসলে নায়কটা সালমান খানকে নকল করেছে। -হে আপা। আর দেখেন কি সুন্দর বাড়ীটা একদম ‘এইসব দিনরাত্রির’ মতো। আহা বসন্তে নবীন এই তারুন্যে দু’টো মেয়ে কি দারুণ একাকার হয়ে গেছিল। বুবলী বলছিল, মা হামিদা না এত ছোট বেলায় আমাদের কাছে এসেছে তাই স্বপ্নেও সে আমাদেরই দেখে। -কি দেখে রে? -এ্যাই দেখে তুমি আর বাবা গাড়ি থেকে নামলে, বড়খালা আমেরিকা থেকে এসেছে, সে ভ্যানিলা ফ্লেভারের কাষ্টার্ড বানাচ্ছে।

রাতের খাবারের পর শুরু হল উচ্ছন্ন এক বৃষ্টি। কোনদিক থেকে যে আসে দিশা পাওয়া যায় না। বুবলী– হামিদা ঠিক আগের মতোই দৌড়াদৌড়ি ও খিলখিল করে সমস্ত জানালা দরজা বন্ধ করলো। একটানা বৃষ্টি চলবে আরও হাওয়া তাই বলছে। রিনা এদিকের বারান্দায় একা এসে দাঁড়ায়। হামিদারই লাগানো একটা বেগুনি অর্কিডগুচ্ছ বৃষ্টি ও চোখের জলে কেমন ঘোলা হয়ে উঠেছে। সেদিকে তাকিয়ে তার চোখের জল চোখেরই আল ছাড়াতেই আবার ফুলটি পরিষ্কার হয়ে উঠে। হামিদাকে তুলে দেবার দিনেও এমনি বৃষ্টি ছিল। একটা সেলাইর মেশিন, জামাইর চাহিদা মত একটা রেডিও ও নগদ অর্থসহ মিরপুর কাতানপরা হামিদা যখন বিদায় নেয় তখন বুবলীর কান্নায় আর থাকা যাচ্ছিল না। আর হামিদা দরজার কাছ থেকে বার বার ফিরে এসে আছড়ে পড়ছিল একবার রকিবের পায়ে আরেকবার রানুর বুকে। জামাই ছেলেটা হতচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।আর রহমত বার বার বুঝাচ্ছিল। জড়সড় হয়ে সিঁড়ির কোনায় দাঁড়িয়ে ছিল হামিদার বাবা-মা। তারা দর্শক মাত্র। কোনো ভুমিকা তাদের নেই। তবু ওদেরই তো মেয়ের বিয়ে। বিয়ের জন্য ওদের আনিয়েছিল রিনাই। রকিবও বলেছিল, আসল বাবা মা তো ওরাই।দোকানদার ছেলে। যোগ্য পাত্র। পরীবাগের বাজারে শাক-সবজির শেডে বসে। ওরা খুশি, অনেক দোয়া করেছে। বস্তির ঘরে ফ্যান থাকবে না, ফ্রিজ থাকবে না। বিয়ের আগে দেড় মাস রিনার কড়া নির্দেশে তাকে বাইরের সেদ্ধ পানি খেতে হয়েছে, ফ্যান বন্ধ রেখে হাত পাখায় ঘুমুতে হয়েছে। শুনতে হয়েছে কীভাবে টাকা ভাগ করে করে সংসার করতে হবে।ঘরকে পরিষ্কার রাখতে হবে। পাশের মহিলাদের নিয়ে সেলাই মেশিন দিয়ে কিছু একটা করে বাড়তি আয় করতে হবে… ততদিন রিনা নিয়মিত কিছু টাকা দিয়ে যাবে।

-আম্মা সকলের বিছানা ঝাড়ছি, হেরা গুমাইতে গেছে আপনে কি ইসবগুলের ভুসি এখন খাইবেন না ঘরে দিয়া আসুম? -উ। রিনা চমকে ওঠে। – ভিজতাছেন ক্যান? -এমনি। তুই সামনে থেকে যা তো। একটু রুঢ় শোনায় তার স্বর। গ্লাস হাতে হামিদা অপরাধীর মত সরে যায়। রিনা আবার তাকায় তার বুনো অর্কিডগুচ্ছের দিকে। চোখ যায় সামনের ফ্ল্যাট বাড়িতে। সেই জানালাটা এখনো খোলা। সেই ছেলেটা এখন দেশের বাইরে। এখানেই হামিদা এসে দাঁড়িয়ে থাকতো। বিকেলে কাজল পরে, বেনী বেঁধে। আহারে… -মা, হামিদার প্রেম হয়ে যেতে পারে। প্রাকটিক্যাল খাতা গুছাতে গুছাতে বুবলী বলেছিল। -কি বলিস? আঁতকে উঠেছিল রানু। -হ্যাঁ মা। সামনের বাসার ছেলেটা পাজি আছে। এখন দেখি হামিদা আমাকেও লুকায়। আর তারপরই রানুর মা পরামর্শ দিয়েছিলেন,

-একটা কেলেংকারি হবার আগেই বিয়ে দিয়ে দে। জলদি কর। -মা এভাবেইতো ওকে যেনতেন জায়গায় দিতে পারিনা। ওতো আমার মেয়ের মতো। – মতো কিন্তু মেয়ে তো না। রিনা তার অর্কিডের ভেজা শরীরে আদর করে ঘরে ঢোকে। রাতে কাজ করার পর এক আলাদা শান্তি । চাপা ভলুমে গান চালায় সে শচীন দেব, জগম্ময়ের। টেবিল বাতির ঘেরে নিয়ন্ত্রিত আলোয়, মৃদু মায়াময় গানে রকিবের ঘুমের কোন অসুবিধা হয় না। রিনা রাত জেগে পড়াশোনা করার সময় বা যতক্ষণ সজাগ থাকে বাচ্চাদের জন্য দরোজাটা খোলাই রাখে। আগামী কালের ক্লাস প্রস্তুতির জন্য দীপ্তি ত্রিপাঠীর আধুনিক বাংলা কাব্য পরিচয় নিয়ে বসেছে।

বাইরে ঘরের মেঝেতে হাজেরার সঙ্গে আজ হামিদা ও তার বাচ্চা মেয়েটা ঘুমাচ্ছে।বুবলি ও বাবলু ও যার যার ঘরে ঘুমোচ্ছে। হামিদার বিয়ের পর এক বছরেই যেন বুললিটা অনেক বড় হয়ে গেছে। আজ হামিদার সঙ্গে এত কি গল্প করেছে যে গম্ভীর হয়ে গেল! ফ্যানের বাতাসে পর্দা কাঁপছে। নিঃস্তব্দ এ ঘুমন্ত বাড়িতে চিন্তায় কাতর অবস্থার মন বসাতে পারছে না।

-আম্মা …!পা টিপে টিপে কখন পেছনে এসেছে হামিদা? চমকে ওঠে রিনা।-আম্মা কাইলকা সিগমা খালারে নাইলে লুলু খালারে এট্টু ফোন করবেন?-কেন রে? বলেই হামিদার দিকে মুখ তুলে উঠে দাঁড়িয়ে পিঠে হাত দিয়ে সন্তর্পনে শোবার ঘর থেকে তাকে প্যাসেজে নিয়ে আসে। সেখানে আলোতে দেখা যায় হামিদা মুখ নিচু করে পায়ের বুড়ো আঙ্গুলে মোজাইক ঘষছে। রিনার আইনজীবী বন্ধু ব্যারিস্টার সিগমা হুদা ডমেস্টিক ভায়োলেন্স নিয়ে লড়েন। আর লুলু আপা ব্যারিস্টার সুলতানা কামাল কবি সুফিয়া কামালের কন্যা মানবাধিকার কর্মী ও আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক। এসব তথ্য মাথায় আসতেই গলার স্বর ভেঙে যায় রিনার। একটু জোরেই বলে ওঠে, -কেনরে হামিদা?-আমি আইন দিয়া মুক্তি নিমু।-কী? হতভম্ভ হয়ে যায় রিনা।-আম্মা আমি চইল্লা আসুম। এবার গলার স্বর কারোরই আর চাপা থাকে না। হামিদাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে রিনা। হামিদা তাকে অষ্ট বাহুতে বেষ্টন করে ফোঁপাতে থাকে। ঘুম ভেঙে উঠে আসে রকিব। হতচকিত দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকিয়ে থাকে ।কিছু বলে না।                                        


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Trending