শামীম আজাদ
যে গুণে বাক্য কাব্য হয়ে ওঠে, যে কারণে অনুদিত সাহিত্যকে যে ভাষায় অনুদিত হয়েছে তার মূল ভাষা মনে হয়, যে কারণে বিলেতের চৈনিক খাবার অর্ডার করলেও স্বাদে তা সাংহাইর পথপার্শ্বের দোকানের খাবার বলিয়া প্রতীয়মান হয়, যে জন্য লন্ডনের এশিয়ান কমেডিয়ানের পরিবেশনা বিষয় বস্তু ছাড়া ইংলিশ কমেডি মনে হয়, রুপি কাউর লিখলে মনে হয় তাঁর পৈত্রিক দেশ ভারতের সঙ্গে আছে বিদেশ। সেটাই আসল রূপান্তর অথবা তা নয়। আমার আরাধ্য ঐ সূক্ষ্ম অধরা ব্যাপারটা। এ যে কোন অভিবাসী বা বৈশ্বিক কবির আরাধ্য। যে আমি একদিন পূর্বাচল ছাড়িয়ে পশ্চিমে চলে এসেছিলাম তার আঁচলে কি বেঁধে দিয়েছিলো আমার মা! আমার বর্ণমালা। তারপর একদিন নিয়মিত শিক্ষকতা ছেড়ে ‘সাহিত্য’ করে জীবিকা নির্বাহ করবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তখন হাল্কা হলেও সে আমি ঐ কথাটি বুঝেছিলাম। না, না, মাইকেল মধুসূদনের কথা ভেবে পিছাইনি। জানতাম বৈশ্বিক বিবেচনায় তাঁর সে উপলব্ধি এখন আর প্রাসঙ্গিক নয়। এখন জিয়া হায়দার, ঝুম্পা লাহিড়ী, মনিকা আলী ও তাহমিমা আনামের কাল। তাঁদের সাফল্যে তাঁরা হয়েছেন সূচক। আমি যেহেতু তাঁদের আগের প্রজন্ম এবং আগাগোড়া বাংলাদেশ থেকে বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করে দেশের কবি ও লেখক হয়ে এসেছি, আমাকে হতে হয়েছে আরো কৌশলী। আমি লক্ষ্য রেখেছি আমার বিষয়-বস্তু ও নিজ অভিজ্ঞতালব্ধ বাংলাদেশের বিষয় আশয়ের দিকে। তা যেন হাতচ্যূত না হয়ে যায়। যা কিনা এখনো কি অনুবাদ কাজে, কি সাহিত্য নির্মানে অথবা ওহীপ্রাপ্ত কবিতার জন্য নিত্য কাজে লাগাচ্ছি। এই বিদেশে আমিই হতে পারি আমার এবং অন্যের অভিধান। এতে একটা দিক থেকে আমার পরিশ্রম কমলো বটে কিন্তু কমতি রয়ে গেল ভাষার ব্যাপারে। কিন্তু এ ঘাটতি আর ঐ বাড়তিতে কাটাকাটি হয়ে বাকি রইলো ইংলিশত্ব এবং আমার পরিবেশনায় নিজস্বতা – আমার অলংকার।ভাষা শিক্ষক তো ছিলামই এবার শ্রেণী কক্ষে কবিতা ও স্টোরিটেলিং প্রশিক্ষন দেবার যোগ্যতা আয়ত্ব করতে খোলা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুটো সংক্ষিপ্ত স্নাতক সম্পন্ন করলাম। আমাদের পড়ালেন মাইকেল রোজেন, স্যালি পম ক্লেইটন, হেলেন ইস্ট, ওয়েন্ডি কোপ এঁরা। আমার লেখায়জোখায় বা পরিবেশনায় কি আমি যোগ করতে পারি বা কি আমি আমার বাংলাভাষার কাছ থেকে ব্যবহার করতে পারি সেটারও পরামর্শ দিলেন আমার শিক্ষকগন। সেই সম্মোহনী হল আমার ‘বাংলাত্ব’র অভিজ্ঞান। যা অজ্ঞেয় হয়েও দ্যোতনার সৃষ্টি করে। ভাষান্তরে বা ভাবনান্তরে। আমূল তুলে আনে আমাদের ভঙি বা ঢং। এ যদি যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারি তারপর যা বাকি থাকবে তা হল ঐ ‘ইংরাজীতে বাংলার মত ঝগড়া করার ক্ষমতা!’—দেড় দশক আগের কথা। সেদিন পুরো দুপুরটাই বরফের ঝিলিকে ভরে ছিলো। কেন্দ্র লন্ডনে গাড়ি রাখা ব্যয় সাপেক্ষ। তাই ষ্টিভেনকে বলাই ছিল, আমার বাড়ী থেকে বেথনাল গ্রীন পাতাল রেলের কাছে গাড়ি রেখে আমি তার জন্য অপেক্ষা করবো। ষ্টেশনটি ওর ফ্ল্যাট থেকে একদম কাছে। তারপর দু’বন্ধু মিলে ট্রেনে করেই কভেন্ট গার্ডেনে ব্যাটারটন সড়কের পোয়েট্রি সোসাইটির ‘পোয়েট্রি ক্যাফেতে’ কবিতা পড়তে যাবো। ফিরে এসে এখান থেকে সে চলে যাবে তার বাড়ীতে আর আমি উঠে পড়বো আমার গাড়ীতে। আমার পার্থরোডের বাড়ী পৌঁছতে লাগবে পঁচিশ মিনিট। ফেরার পথে ট্রেনের জন্য পাতালে নামার এস্কেলেটারে কোন ব্যত্যয় ছাড়াই বরাবরের মত শুরু হয়ে গেল আমাদের বচসা। ঠিক দেশের হরতালের সময়ে যুবলীগ আর পুলিশের ধাওয়া পালটা ধাওয়ার মত। চলতি ট্রেনের শব্দ বাড়লে আমরা একটু চুপ হই। কিন্তু শব্দ কমলেই উদ্ধৃতি, উদাহরণে অন্যকে নাজেহাল করতে ছাড়ি না। এমন কি বেথনাল গ্রীনে নেমেও তার সুরাহা হল না বিধায় আমরাই সিদ্ধান্ত নিলাম বাকিটুকু চলবে ফোনে ফোনে। সে সময় লন্ডনের রাস্তায় গাড়ী চালাতে চালাতে মোবাইলে কথা বললে ফাইন দিতে হত না। আমার কোন হেড ফোন ছিল না। আমি গাড়ীর চাবি ঘুরিয়ে ফোনটা স্পিকারে দিয়ে তর্কাতর্কিতে যেখানে ‘কমা’ দিয়েছিলাম সেখান থেকেই শুরু করে দিলাম। কথা বলি আর পেরিয়ে যাই এ টুয়েলভ, রেডব্রীজ, ক্রমশ এগুতে থাকি বাড়ির দিকে এবং এক সময় হাসতে হাসতে ফোন বন্ধ করি। গাড়ী স্থির হলে নেমে মনে হল বরফ গলে গেছে! আমার মাথাটা হালকা লাগছে। বেল শুনে আজাদ দরজা খুলেই তাকিয়ে বলে, কি ব্যাপার এত খুশী কেন?- আজ ইংরাজীতে বাংলার মত ঝগড়া করতে পেরেছি।- কার সঙ্গে ঝগড়া করলে, কখন?- ষ্টিভেনের সঙ্গে। নামটা উচ্চারণ করতেই আজাদের কপালের দুঃশ্চিন্তার রেখা সাঁই করে উবে গেল। আমাদের গল্প পুরো ব্রিকলেন জানে। কিন্তু আজ আমি খুশি আমার প্রয়োগভাষার অব্যর্থতা নিয়ে। ইংরেজ কবি স্টিভেন ওয়াটস আমার তিন দশকের বন্ধু। সে ১৯৭১ এ এদেশে বাংলাদেশের জন্য কবি সাহিত্যিকদের জড়ো করে আলোচনা ও আমাদের দেশের পক্ষে সমর্থনের জন্য কাজ করেছেন। আসলে ঐ কথা শোনার পর থেকেই তাঁর সঙ্গে হয় নৈকট্যের সূচনা। তিনি আইনস্টাইনের মত শুধু দেখতে নয় আরো মিল আছে- যেন এ কবিও এক গবেষক। যাবতীয় কবিতা, তার ভাষা, অনুবাদ- এর নিয়ে তিনি নতুন কিছু না কিছু বলবেনই – অথবা লিখবেনই। আমরা হয়তো একটি বই এক সাথে অনুবাদ বা সম্পাদনা করছি তিনি পারলে তা উনিশবার দেখবেন, নয় দশবার বদলাবেন, তেরো বার আমার সঙ্গে মতানৈক্য হবে এবং উত্যক্ত হয়ে কর্মক্যাফে টেবিল ছেড়েই রাগে বাইরে চলে যাবেন। তিনি যে সেই উনিশ শ’ নব্বুই থেকে যে সে আমার সহচর সেটাই তো আমার পরম ভাগ্য। আমরা দু’বন্ধু শিল্পের টেবিল থেকে শুরু করে ব্রিকলেনে গরম গরম ডাল ভাত আর ইলিশ ভাজা খেয়ে খেয়ে প্রয়োজনীয় প্রায়োগিক ভাষা শিখে যাই! এমন জীবনানন্দ অনুবাদক ও ভক্ত পুরো বিলেতে আর একজন নেই। ভাবা যায়! আমি তো তাঁর জন্য সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ পুরস্কারের প্রস্তাব করতে চাই। তাহলে তিনি তাঁর স্বপ্নের দেশ বাংলাদেশ দেখতে পাবেন। স্টিফেনের উপর আমার রাগ ফাগও হয় না। সাহিত্যের বিষয় নিয়ে মত বিরোধে বরং আড্ডাটা জমেই ওঠে। কিন্তু সেদিনের আগে তা এমন করে বুঝিনি। আমি বুঝলাম – দীর্ঘ পনের বছর লাগলো আমার ইংরাজী ভাষার কথ্য রীতি অর্জন করতে।ভাষা তো কেবল অর্থবোধক শব্দমালা উচ্চারণ বা বানী নয়। তার মধ্যে আছে শব্দের অভিব্যক্তি, বিনয়, শারীরিক বিস্তার, চেতনে ও অবচেতনে সে নতুন ভাষার অধিষ্ঠান। তাই যে ভাষায় লেখা হবে মাথায় তা বাংলায় নয় ইংরাজীতেই আসতে হয়। কেউ কেউ বলেন স্বপ্নও নাকি দেখতে হয়। শুধু স্টিভেন নয়। আছে আমারই মত একদল অভিবাসী কবি সাহিত্যিকের বন্ধুদল। এক্সাইল রাইটার্স ইংক, এবং বার্ডস উইদাউট বর্ডার। সেখানে প্রত এরা কেউ কেউ তাঁর দেশের এবং বিদেশের উচ্চতর পর্যায়ের সম্মাননা বা পুরস্কারপ্রাপ্ত। এবং এঁদের বেশির ভাগই আমারই মত দেশে পরিচিত ও নিজ মাতৃভাষায় সেখানে নিয়মিত লিখে যাচ্ছেন। আমারই মত তারা দ্বিভাষিক। যাঁরা কম বয়সে এসে এদেশে লিখছেন তাঁদের ইংরাজীর মত আমার বাংলা আর তাদের দেশী ভাষার সমান আমার ইংরাজী। বোধ বা উপলব্ধিতে কমতি কম। আমাদের নিয়মিত চর্চা চলে অন্তর্জালে। এখন এই কোভিড কালেও আমরা জুমে একত্রিত হই নিজেদের ইংরাজী কবিতা নিয়ে, বিলেতের খ্যাতনামাদের প্রবন্ধ বা শৈল্পিক উচ্চারণ নিয়ে এবং সাহিত্যের কলাকৈবল্যবাদ নিয়ে।প্রতিনিয়ত আমার প্রতিবেশী, হাসপাতালের নার্স, ট্যাক্সি চালক, মুদি, নাপিত, ডাস্টবিন পরিষ্কারক আমাকে তাঁর সংস্কৃতির তালিম দিয়ে গেছেন অজান্তে। আমি আমার উপযোগী কোন কথা শোনামাত্র তা লুফে নিয়ে বলেছি বার বার। ঠোঁটের ধন করেছি। গাড়ি চালাতে চালাতে রেডিও ফোরের নাটকের পাত্রপাত্রীর শব্দোচ্চারণের প্রতিধ্বণি করে করে কখন গন্তব্যে পৌঁছে যেতাম বলতেই পারতাম না। নিজের রেকর্ডকৃত পরিবেশনা ছেড়ে দিয়ে শুনেছি আর শুনেছি যতক্ষণ না নিজের কন্ঠে নিজেই বিরক্ত হয়ে গেছি।ব্রিটিশ না ইংলিশ মানুষের কথা বলছি। যাদের কাছে এদেশের ভাষার ভূগোল দু’রকম। এক ইংলিশ, দুই অভিবাসী ইংলিশ। কোন অভিবাসী যতক্ষন না, এ্যা কাপ্পা, ইউ কান্ট হ্যাভ ইয়োর কেক এ্যান্ড ইট ইট টু, ম্যাগপাই, ইয়েস অফকোর্স, দা ওয়েদার ইজ বিউটিফুল, ক্যান আই প্লিজ, আই এ্যাম সো স্যরি, হানি ক্যান ইউ কাইন্ডলি গেট মি দি …..এসব রপ্ত না করছে এক সঙ্গে পাবে যাওয়া হচ্ছে না। প্রবাদ হল, দু’নৌকায় পা রাখলে তুমি নির্ঘাত ডুবে যাবে। এ হল জলে ভাসা বা ডোবা নিয়ে কথা। কিন্তু আমার দু’ভাষার নৌকা চলছে ভালোই। করেছি আমি এক নতুন নির্মান। ভাষা আরো যত হবে তত নৌকা তত দেশে চলবে। মাইকেল মধুসূদন নয় সৈয়দ মুজতবা আলী, ড: মোঃ শহীদুল্লাহ কিংবা বিলেতের প্রবাস পিতা তসাদ্দুক আহমদের কথা মনে হচ্ছে। যেখানে যে রত্ন পাবো সে আমার। ইংলিশরা আমার দেশের রত্ন লুট করেছে। আমি করছি মেধা। যত দূরেই যাই না কেন বাংলাদেশ আমার পাঁজরলগ্ন হয়ে আছে। বহির্বিশ্বে আমি বাংলাদেশের এক লুটেরা কবি। বাঙালি জাতি সম্পর্কে নৃবিজ্ঞানীরা বলেন, এটি একটি মিশ্রিত জাতি এবং এ অঞ্চলে বসবাসকারী আদিতম মানবগোষ্ঠীসমূহের মধ্যে অন্যতম। পৃথিবীর বহু জাতি বাংলায় শাসক ও শোষক হিসেবে এসেছে আবার চলেও গেছে আর ভাষায় রেখে গেছে তার প্রমাণ। বৃহত্তর বাঙালির রক্তে মিশ্রিত আছে বহু এবং বিচিত্র সব নরগোষ্ঠীর অস্তিত্ব। আমাদের আদি পুরুষরা বঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করেছে, এবং একে অপরের সঙ্গে মিশ্রিত হয়েছে। আমাদের যে প্রাকৃত বাংলা বাংলাদেশের ভিন্ন ভিন্ন অংশে রয়েছে তারও নানা রূপ আছে । সংস্কৃতের যুগে যেমন ভিন্ন ভিন্ন রূপ ছিল তেমনি। সে সময় প্রাকৃতই প্রচলিত ছিল। ধারনা করি এখন সে প্রাকৃত আমার বেঁচে থাকার কালেই একটা বিশেষ প্রাকৃত হয়ে গেছে। এমন কি তা চলে এসেছে আমাদের ছাপায় ও বৈদ্যুতিনে। যা এসেছে বলা,শোনা, লেখাপড়া নির্ভর ‘ভাষাজ্ঞান’ থেকেই। আমি এখন নিজ বাসভুমে পরবাসী-নোম্যাড। সালমান রুশদী বা অরুন্ধতী নই বলেই নিজেই আমার মাখন গলানোর পদ্ধতি বের করেছি। নিয়ত দেশে গিয়ে ছেলেমেয়ের শিল্পক্লাশ নিয়ে ফতুর হয়ে উজ্জিবীত হয়ে লন্ডনে ফিরি। তাতেই হয়তো আমরাই একদিন বুক কেটে এই বিদেশে ফুটিয়ে ছিলাম বাংলাদেশের বিজয়ফুল। তাতে দেশ ও বিদেশে ছড়িয়েছে দেশের সমান সুগন্ধ। এই অব্যাহত যাত্রায় আবদ্ধ আছি, বহুদিন চলেছি । আমি বাতাস, বর্ষা, আকাশ, আশপাশ, নতুন ফুল ও কুঁড়ির মদ্যপান করি আর এলপি হার্টলীর লাইন বলি “ দ্যা পাস্ট ইজ এ্যা ফরেন কান্ট্রি; দে ডু থিংস ডিফারেন্টলি দেয়ার।” তিন দশকের বেশীদিন ধরে আমি বাংলা নয় ইংরাজী যেখানে লিংগুয়াফ্রাঙ্কা সেখানে আছি। কিন্তু লেখক বলেই। আর আমার লেখার মূল ভাষা এখনো বাংলা বলেই দেশের যোগাযোগ ধরে রেখেছি আমার প্রাকৃত আর প্রমিতে। লিখতে প্রমিত। বলতে প্রাকৃত। এই বিদেশে সারাক্ষনই বাইরে ভিন ভাষা হলেও মনে মনে বলে চলেছি একটাই ভাষা – সে বাংলাভাষা। তবে এই থাকা না থাকার কালে আমার ভাষার মধ্যে যা কিছু শূন্যস্থান তৈরি হয়েছিল তা ডায়াস্পোরার কুটো, কষ, ফুল, ফসফরাস, লেগুন ও লবঙ্গে ভরে ফেলেছি।
শামীম আজাদ
লন্ডন১৫,২,২১
ধন্যবাদ সমকাল
যে গুণে বাক্য কাব্য হয়ে ওঠে, যে কারণে অনুদিত সাহিত্যকে যে ভাষায় অনুদিত হয়েছে তার মূল ভাষা মনে হয়, যে কারণে বিলেতের চৈনিক খাবার অর্ডার করলেও স্বাদে তা সাংহাইর পথপার্শের দোকানের খাবার বলিয়া প্রতীয়মান হয়, যে জন্য লন্ডনের এশিয়ান কমেডিয়ানের পরিবেশনা বিষয় বস্তু ছাড়া ইংলিশ কমেডি মনে হয়, রুপি কাউর লিখলে মনে হয় তাঁর পৈত্রিক দেশ ভারতের সঙ্গে আছে বিদেশ। সেটাই আসল রূপান্তর অথবা তা নয়। আমার আরাধ্য ঐ সূক্ষ্ম অধরা ব্যাপারটা। এ যে কোন অভিবাসী বা বৈশ্বিক কবির আরাধ্য।যে আমি একদিন পূর্বাচল ছাড়িয়ে পশ্চিমে চলে এসেছিলাম তার আঁচলে কি বেঁধে দিয়েছিলো আমার মা! আমার বর্ণমালা। তারপর একদিন নিয়মিত শিক্ষকতা ছেড়ে ‘সাহিত্য’ করে জীবিকা নির্বাহ করবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তখন হাল্কা হলেও সে আমি ঐ কথাটি বুঝেছিলাম। না না মাইকেল মধুসূদনের কথা ভেবে পিছাইনি। জানতাম বৈশ্বিক বিবেচনায় তাঁর সে উপলব্ধি এখন আর প্রাসঙ্গিক নয়। এখন জিয়া হায়দার, ঝুম্পা লাহিড়ী, মনিকা আলী ও তাহমিমা আনামের কাল। তাঁদের সাফল্যে তাঁরা হয়েছেন সূচক। আমি যেহেতু তাঁদের আগের প্রজন্ম এবং আগাগোড়া বাংলাদেশ থেকে বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করে দেশের কবি ও লেখক হয়ে এসেছি, আমাকে হতে হয়েছে আরো কৌশলী। আমি লক্ষ্য রেখেছি আমার বিষয়-বস্তু ও নিজ অভিজ্ঞতালব্ধ বাংলাদেশের বিষয় আশয়ের দিকে। তা যেন হাতচ্যূত না হয়ে যায়। যা কিনা এখনো কি অনুবাদ কাজে, কি সাহিত্য নির্মানে অথবা ওহীপ্রাপ্ত কবিতার জন্য নিত্য কাজে লাগাচ্ছি। এই বৈদেশে আমিই হতে পারি আমার এবং অন্যের অভিধান। এতে একটা দিক থেকে আমার পরিশ্রম কমলো বটে কিন্তু কমতি রয়ে গেল ভাষার ব্যাপারে। কিন্তু এ ঘাটতি আর ঐ বাড়তিতে কাটাকাটি হয়ে বাকি রইলো ইংলিশত্ব এবং আমার পরিবেশনায় নিজস্বতা – আমার অলংকার।ভাষা শিক্ষক তো ছিলামই এবার শ্রেণী কক্ষে কবিতা ও স্টোরিটেলিং প্রশিক্ষন দেবার যোগ্যতা আয়ত্ব করতে খোলা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুটো সংক্ষিপ্ত স্নাতক সম্পন্ন করলাম। আমাদের পড়ালেন মাইকেল রোজেন, স্যালি পম ক্লেইটন, হেলেন ইস্ট, ওয়েন্ডি কোপ এঁরা। আমার লেখায়জোখায় বা পরিবেশনায় কি আমি যোগ করতে পারি বা কি আমি আমার বাংলাভাষার কাছ থেকে ব্যবহার করতে পারি সেটারও পরামর্শ দিলেন আমার শিক্ষকগন।সেই সম্মোহনী হল আমার ‘বাংলাত্ব’র অভিজ্ঞান। যা অজ্ঞেয় হয়েও দ্যোতনার সৃষ্টি করে। ভাষান্তরে বা ভাবনান্তরে। অমূল তুলে আনে আমাদের ভঙি বা ঢং। এ যদি যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারি তারপর যা বাকি থাকবে তা হল ঐ ‘ইংরাজীতে বাংলার মত ঝগড়া করার ক্ষমতা!’—দেড় দশক আগের কথা। সেদিন পুরো দুপুরটাই বরফের ঝিলিকে ভরে ছিলো। কেন্দ্র লন্ডনে গাড়ি রাখা ব্যয় সাপেক্ষ। তাই ষ্টিভেনকে বলাই ছিল, আমার বাড়ী থেকে বেথনাল গ্রীন পাতাল রেলের কাছে গাড়ি রেখে আমি তার জন্য অপেক্ষা করবো। ষ্টেশনটি ওর ফ্ল্যাট থেকে একদম কাছে। তারপর দু’বন্ধু মিলে ট্রেনে করেই কভেন্ট গার্ডেনে ব্যাটারটন সড়কের পোয়েট্রি সোসাইটির ‘পোয়েট্রি ক্যাফেতে’ কবিতা পড়তে যাবো। ফিরে এসে এখান থেকে সে চলে যাবে তার বাড়ীতে আর আমি উঠে পড়বো আমার গাড়ীতে। আমার পার্থরোডের বাড়ী পৌঁছতে লাগবে পঁচিশ মিনিট।ফেরার পথে ট্রেনের জন্য পাতালে নামার এস্কেলেটারে কোন ব্যত্যয় ছাড়াই বরাবরের মত শুরু হয়ে গেল আমাদের বচসা। ঠিক দেশের হরতালের সময়ে যুবলীগ আর পুলিশের ধাওয়া পালটা ধাওয়া্র মত। চলতি ট্রেনের শব্দ বাড়লে আমরা একটু চুপ হই। কিন্তু শব্দ কমলেই উদ্ধৃতি, উদাহরনে অন্যকে নাজেহাল করতে ছাড়ি না। এমন কি বেথনাল গ্রীনে নেমেও তার সুরাহা হল না বিধায় আমরাই সিদ্ধান্ত নিলাম বাকিটুকু চলবে ফোনে ফোনে।সে সময় লন্ডনের রাস্তায় গাড়ী চালাতে চালাতে মোবাইলে কথা বললে ফাইন দিতে হত না। আমার কোন হেড ফোন ছিল না। আমি গাড়ীর চাবি ঘুরিয়ে ফোনটা স্পিকারে দিয়ে তর্কাতর্কিতে যেখানে ‘কমা’ দিয়েছিলাম সেখান থেকেই শুরু করে দিলাম। কথা বলি আর পেরিয়ে যাই এ টুয়েল্ভ, রেডব্রীজ, ক্রমশ এগুতে থাকি বাড়ির দিকে এবং এক সময় হাসতে হাসতে ফোন বন্ধ করি। গাড়ী স্থির হলে নেমে মনে হল বরফ গলে গেছে! আমার মাথাটা হালকা লাগছে। বেল শুনে আজাদ দরজা খুলেই তাকিয়ে বলে, কি ব্যাপার এত খুশী কেন?- আজ ইংরাজীতে বাংলার মত ঝগড়া করতে পেরেছি।- কার সঙ্গে ঝগড়া করলে, কখন?- ষ্টিভেনের সঙ্গে। নামটা উচ্চারণ করতেই আজাদের কপালের দুঃশ্চিন্তার রেখা সাঁই করে উবে গেল। আমাদের গল্প পুরো ব্রিকলেন জানে। কিন্তু আজ আমি খুশি আমার প্রয়োগভাষার অব্যর্থতা নিয়ে।—–ইংরেজ কবি স্টিভেন ওয়াটস আমার তিন দশকের বন্ধু। সে ১৯৭১ এ এদেশে বাংলাদেশের জন্য কবি সাহিত্যিকদের জড়ো করে আলোচনা ও আমাদের দেশের পক্ষে সমর্থনের জন্য তিনি কাজ করেছেন। আসলে ঐ কথা শোনার পর থেকেই তাঁর সঙ্গে হয় নৈকট্যের সূচনা। তিনি আইনস্টাইনের মত শুধু দেখতে নয় আরো মিল আছে- যেন এ কবিও এক গবেষক। যাবতীয় কবিতা, তার ভাষা, অনুবাদ- এর নিয়ে তিনি নতুন কিছু না কিছু বলবেনই – অথবা লিখবেনই। আমরা হয়তো একটি বই এক সাথে অনুবাদ বা সম্পাদনা করছি তিনি পারলে তা উনিশবার দেখবেন, নয় দশবার বদলাবেন, তেরো বার আমার সঙ্গে মতানৈক্য হবে এবং উত্যক্ত হয়ে কর্মক্যাফে টেবিল ছেড়েই রাগে বাইরে চলে যাবেন। তিনি যে সেই উনিশ শ’ নব্বুই থেকে যে সে আমার সহচর সেটাই তো আমার পরম ভাগ্য।আমরা দু’বন্ধু শিল্পের টেবিল থেকে শুরু করে ব্রিকলেনে গরম গরম ডাল ভাত আর ইলিশ ভাজা খেয়ে খেয়ে প্রয়োজনীয় প্রায়োগিক ভাষা শিখে যাই! এমন জীবনানন্দ অনুবাদক ও ভক্ত পুরো বিলেতে আর একজন নেই। ভাবা যায়! আমি তো তাঁর জন্য সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ পুরস্কারের প্রস্তাব করতে চাই। তাহলে তিনি তার স্বপ্নের দেশ বাংলাদেশ দেখতে পাবেন। স্টিফেনের উপর আমার রাগ ফাগও হয় না। সাহিত্যের বিষয় নিয়ে মত বিরোধে বরং আড্ডাটা জমেই ওঠে। কিন্তু সেদিনের আগে তা এমন করে বুঝিনি।আমি বুঝলাম – দীর্ঘ পনের বছর লাগলো আমার ইংরাজী ভাষার কথ্য রীতি অর্জন করতে।ভাষা তো কেবল অর্থবোধক শব্দমালা উচ্চারণ বা বানী নয়। তার মধ্যে আছে শব্দের অভিব্যক্তি, বিনয়, শারীরিক বিস্তার, চেতনে ও অবচেতনে সে নতুন ভাষার অধিষ্ঠান। তাই যে ভাষায় লেখা হবে মাথায় তা বাংলায় নয় ইংরাজীতেই আসতে হয়। কেউ কেউ বলেন স্বপ্নও নাকি দেখতে হয়।শুধু স্টিভেন নয়। আছে আমারই মত একদল অভিবাসী কবি সাহিত্যিকের বন্ধুদল। এক্সাইল রাইটার্স ইংক, এবং বার্ডস উইদাউট বর্ডার। সেখানে প্রত এরা কেউ কেউ তাঁর দেশের এবং বিদেশের উচ্চতর পর্যায়ের সম্মাননা বা পুরস্কারপ্রাপ্ত। এবং এঁদের বেশির ভাগই আমারই মত দেশে পরিচিত ও নিজ মাতৃভাষায় সেখানে নিয়মিত লিখে যাচ্ছেন। আমারই মত তারা দ্বিভাষিক। যাঁরা কম বয়সে এসে এদেশে লিখছেন তাঁদের ইংরাজীর মত আমার বাংলা আর তাদের দেশী ভাষার সমান আমার ইংরাজী। বোধ বা উপলব্ধিতে কমতি কম। আমাদের নিয়মিত চর্চা চলে অন্তর্জালে । এখন এই কোভিড কালেও আমরা জুমে একত্রিত হই নিজেদের ইংরাজী কবিতা নিয়ে, বিলেতের খ্যাতনামাদের প্রবন্ধ বা শৈল্পিক উচ্চারণ নিয়ে এবং সাহিত্যের কলাকৈবল্যবাদ নিয়ে।প্রতিনিয়ত আমার প্রতিবেশি, হাসপাতালের নার্স, ট্যাক্সি চালক, মুদি, নাপিত, ডাস্টবিন পরিষ্কারক আমাকে তাঁর সংস্কৃতির তালিম দিয়ে গেছেন অজান্তে। আমি আমার উপযোগী কোন কথা শোনামাত্র তা লুফে নিয়ে বলেছি বার বার। ঠোঁটের ধন করেছি। গাড়ি চালাতে চালাতে রেডিও ফোরের নাটকের পাত্রপাত্রীর শব্দোচ্চারণের প্রতিধ্বণি করে করে কখন গন্তব্যে পৌঁছে যেতাম বলতেই পারতাম না। নিজের রেকর্ডকৃত পরিবেশনা ছেড়ে দিয়ে শুনেছি আর শুনেছি যতক্ষণ না নিজের কন্ঠে নিজেই বিরক্ত হয়ে গেছি।ব্রিটিশ না ইংলিশ মানুষের কথা বলছি। যাদের কাছে এদেশের ভাষার ভূগোল দু’রকম। এক ইংলিশ, দুই অভিবাসী ইংলিশ। কোন অভিবাসী যতক্ষন না, এ্যা কাপ্পা, ইউ কান্ট হ্যাভ ইয়োর কেক এ্যান্ড ইট ইট টু, ম্যাগপাই, ইয়েস অফকোর্স, দা ওয়েদার ইজ বিউটিফুল, ক্যান আই প্লিজ, আই এ্যাম সো স্যরি, হানি ক্যান ইউ কাইন্ডলি গেট মি দি …..এসব রপ্ত না করছে এক সঙ্গে পাবে যাওয়া হচ্ছে না।প্রবাদ হল, দু’নৌকায় পা রাখলে তুমি নির্ঘাত ডুবে যাবে। এ হল জলেভাসা বা ডোবা নিয়ে কথা। কিন্তু আমার দু’ভাষার নৌকা চলছে ভালোই। করেছি আমি এক নতুন নির্মান। ভাষা আরো যত হবে তত নৌকা ততদেশে চলবে। মাইকেল মধুসূদন নয় সৈয়দ মুজতবা আলী, ড: মোঃ শহীদুল্লাহ কিংবা বিলেতের প্রবাস পিতা তসাদ্দুক আহমদের কথা মনে হচ্ছে। যেখানে যে রত্ন পাবো সে আমার। ইংলিশরা আমার দেশের রত্ন লুট করেছে। আমি করছি মেধা। যত দূরেই যাই না কেন বাংলাদেশ আমার পাজরলগ্ন হয়ে আছে। বহির্বিশ্বে আমি বাংলাদেশের এক লুটেরা কবি।বাঙালি জাতি সম্পর্কে নৃবিজ্ঞানীরা বলেন, এটি একটি মিশ্রিত জাতি এবং এ অঞ্চলে বসবাসকারী আদিতম মানবগোষ্ঠীসমূহের মধ্যে অন্যতম। পৃথিবীর বহু জাতি বাংলায় শাসক ও শোষক হিসেবে এসেছে আবার চলেও গেছে আর ভাষায় রেখে গেছে তার প্রমাণ। বৃহত্তর বাঙালির রক্তে মিশ্রিত আছে বহু এবং বিচিত্র সব নরগোষ্ঠীর অস্তিত্ব। আমাদের আদি পুরুষরা বঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করেছে, এবং একে অপরের সঙ্গে মিশ্রিত হয়েছে। আমাদের যে প্রাকৃত বাংলা বাংলাদেশের ভিন্ন ভিন্ন অংশে রয়েছে তারও নানা রূপ আছে । সংস্কৃতের যুগে যেমন ভিন্ন ভিন্ন রূপ ছিল তেমনি। সে সময় প্রাকৃতই প্রচলিত ছিল। ধারনা করি এখন সে প্রাকৃত আমার বেঁচে থাকার কালেই একটা বিশেষ প্রাকৃত হয়ে গেছে। এমন কি তা চলে এসেছে আমাদের ছাপায় ও বৈদ্যুতিনে। যা এসেছে বলা,শোনা, লেখাপড়া নির্ভর ‘ভাষাজ্ঞান’ থেকেই।আমি এখন নিজ বাসভুমে পরবাসী-নোম্যাড। সালমান রুশদী বা অরুন্ধতী নই বলেই নিজেই আমার মাখন গলানোর পদ্ধতি বের করেছি। নিয়ত দেশে গিয়ে ছেলেমেয়ের শিল্পক্লাশ নিয়ে ফতুর হয়ে উজ্জিবীত হয়ে লন্ডনে ফিরি। তাতেই হয়তো আমরাই একদিন বুক কেটে এই বিদেশে ফুটিয়ে ছিলাম বাংলাদেশের বিজয়ফুল। তাতে দেশ ও বিদেশে ছড়িয়েছে দেশের সমান সুগন্ধ। এই অব্যাহত যাত্রায় আবদ্ধ আছি, বহুদিন চলেছি । আমি বাতাস, বর্ষা, আকাশ, আশপাশ, নতুন ফুল ও কুঁড়ির মদ্যপান করি আর এলপি হার্টলীর লাইন বলি “ দ্যা পাস্ট ইজ এ্যা ফরেন কান্ট্রি; দে ডু থিংস ডিফারেন্টলি দেয়ার।”তিন দশকের বেশীদিন ধরে আমি বাংলা নয় ইংরাজী যেখানে লিংগুয়াফ্রাঙ্কা সেখানে আছি। কিন্তু লেখক বলেই। আর আমার লেখার মূল ভাষা এখনো বাংলা বলেই দেশের যোগাযোগ ধরে রেখেছি আমার প্রাকৃত আর প্রমিতে। লিখতে প্রমিত। বলতে প্রাকৃত। এই বিদেশে সারাক্ষনই বাইরে ভিন ভাষা হলেও মনে মনে বলে চলেছি একটাই ভাষা – সে বাংলাভাষা। তবে এই থাকা না থাকার কালে আমার ভাষার মধ্যে যা কিছু শূন্যস্থান তৈরি হয়েছিল তা ডায়াস্পোরার কূটো, কষ, ফুল, ফসফরাস, লেগুন ও লবঙ্গে ভরে ফেলেছি।শামীম আজাদলন্ডন১৫,২,২১ ধন্যবাদ সমকাল






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান