নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

‘আমার পুত্রের নাম’ শামীম আজাদের লেখা কবিতা। তাঁর কবিতার কথা মনে হলেই আমার যে কতিপয় কবিতার কথা প্রথমেই মাথায় আসে তাদের অন্যতম হল এই কবিতা। এর কারণ কী? কারণ অতি সামান্য ও কাকতালীয়। কেননা কবিতার প্রথম লাইন হল ‘তার নাম হবে অ্যাকিলিস’। কার নাম? পুত্রের নাম। কবির পুত্রের নাম। এই কবিতা প্রথম পড়বার বহু বছর আগেই খুব ছোটবেলায় হোমারের ইলিয়াড পড়তে গিয়ে কেন জানি না হেক্টর নয়, অ্যাকিলিসকেই আমি ভালোবেসে ফেলেছিলাম বলে আমিও ভেবে রেখেছিলাম আমার পুত্রের নাম হবে অ্যাকিলিস। আর পুত্রীর নাম হবে তরঙ্গিণী। কিন্তু হয়নি। পৃথিবীকে জনভারাক্রান্ত করতে চাইনি বলেই তাদের রেখে দিয়েছি অপৃথিবীতে। সে যাই হোক, এখন আলোচ্য কবিতাটি পড়ব।

তার নাম হবে অ্যাকিলিস
মুহূর্তের গৌরবের জন্যে যে
বর্ণহীন অশেষ জীবনকে
অবসিত করেছিল।
ব্যাঘ্র, অগ্নি ও খাপহীন তরবারি
যার উপমা—
ক্রোধ যার মহাকাব্যের সূচনা
যার দৃষ্টিতে খুলে যায় অপর আকাশ
অ্যাকিলিস তার নাম।

বিস্মরণের নদীতে, স্নানে
সূচাগ্র স্থান থাকবে না পড়ে
যুদ্ধক্ষেত্রে পরাস্ত তীর ফিরে যাবে
ভোগাক্রান্ত কাপুরুষেদের গতিপথ
অবসিত হবে ক্লেদাক্ত ফেনায়,
স্বচ্ছ জলে অ্যান্ড্রোম্যাকি বিষাদ ধুয়ে নেবে।

তার নাম হবে অ্যাকিলিস
বৈদূর্যমণির বিভায় সে আসবে
এই ক্ষীণ স্কন্ধ উচ্চবীর্য মানুষের দেশে
নাড়ার আগুনে পোড়া মাঠে— রাজপথে
স্তব্ধ হবে সখিনার ক্রন্দন।

যেই কবিতা মাত্র পড়লাম, এটা মূলত বীরত্ব, আকাঙ্ক্ষা ও ইতিহাসের অবিনির্মাণের এক গভীর কাব্যিক অভিব্যক্তি। এই কবিতায় ‘পুত্র’ কেবল একজন ব্যক্তিগত উত্তরসূরি নয়, বরং এক আদর্শের প্রতীক, যা এক নতুন ভবিষ্যৎ আর প্রচলিত মূল্যবোধের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র অ্যাকিলিস, যার নামে নাম রাখা হবে পুত্রের। অ্যাকিলিস গ্রিক পুরাণে ট্রয় যুদ্ধের শ্রেষ্ঠ বীর। এই নামকরণের মাধ্যমে কবি প্রাচীন মহাকাব্যিক বীরত্বের একটা মানদণ্ডকে তার সন্তানের মধ্যে দেখতে চান।

কবিতার শুরুতেই অ্যাকিলিসের অমরত্বের জন্য এক স্বল্প ও তীব্র জীবন বেছে নেওয়ার পৌরাণিক কাহিনির প্রতি ইঙ্গিত করে, যা ক্ষণস্থায়ী গৌরবের কাছে দীর্ঘ, কিন্তু বর্ণরহিত জীবনকে তুচ্ছ করে।
অ্যাকিলিসের উপমা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ব্যাঘ্র, অগ্নি ও খাপহীন তরবারি, যা তার অমিত শক্তি ও অপ্রতিরোধ্য ক্রোধের প্রতীক। এই ক্রোধকে মহাকাব্যের সূচনা বলা হয়েছে, যা হোমারের ইলিয়াডের মূল সুর।
কবি চান তাঁর পুত্র বিস্মরণের নদী মানে লিথি কিংবা স্টিক্সে পতিত হবে না, বরং সুস্থ স্থান থাকবে না পড়ে, অর্থাৎ সে এমন এক স্থান অর্জন করবে যা ইতিহাসে স্থায়ী হবে।

পুত্র এমন বীর হবে যে, যুদ্ধক্ষেত্রে পরাস্ত তীর ফিরে যাবে, ভোগাক্রান্ত কাপুরুষদের গতিপথ অবসিত হবে ক্লেদাক্ত ফেনায়, স্বচ্ছ জলে অ্যান্ড্রোমাকি বিষাদ ধুয়ে নেবে। এখানে কাপুরুষতা ও ভয়ের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে বীরত্ব ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা কামনা করা হয়েছে।
শেষ স্তবকে পুত্রকে এক পরিবর্তনের দূত হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যে বৈদূর্যমণির বিভায় সে আসবে। এই ক্ষীণ স্কন্ধ উচ্চবীর্য মানুষের দেশে। এইখানে সমসাময়িক সমাজের দুর্বল কিন্তু অহংকারী উচ্চশ্রেণির প্রতি কবি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে।
পুত্রের আগমন নাড়ার আগুনে পোড়া মাঠে ঘটবে, যা ধ্বংসের পর নতুন সৃষ্টির প্রতীক। তার আগমনে রুদ্ধ হবে সখিনার ক্রন্দন, যা দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা নারীর বা সাধারণ মানুষের দুঃখ ও নিপীড়নের সমাপ্তি ঘোষণা করে। এখানে আকাঙ্ক্ষিত উপস্থিতি হল মুক্তি। কিন্তু এই মুক্তির ধারণাটি সম্পূর্ণভাবে ক্রন্দন নামক পূর্ববর্তী বেদনার ওপর নির্ভরশীল। মুক্তি যদি চূড়ান্ত অর্থ হত, তবে কবিকে ক্রন্দন শব্দটা উচ্চারণ করতে হত না। কিন্তু মুক্তি তার বিপরীত ধারণা নিপীড়নকে অস্বীকার করতে পারে না, বরং সেই নিপীড়নের চিহ্ন হিসেবে ক্রন্দন শব্দটা মুক্তির ভেতরেই লীন হয়ে থাকে।

কবিতাটা পৌরাণিক আদর্শের মধ্য দিয়ে সমকালীন সামাজিক অবক্ষয় দূর করে একটি নতুন, বলিষ্ঠ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার তীব্র আশা ও সংকল্প ব্যক্ত করে।
কবি অ্যাকিলিসের বীরত্বকে কেন্দ্রীয় অর্থ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান, যা কাপুরুষতার বিপরীতে থাকে। অ্যাকিলিস স্বয়ং এক অনুপস্থিতি। তিনি পৌরাণিক চরিত্র, বাস্তব নন। পুত্রের নামকরণের মাধ্যমে পিতা যে বীরত্বকে আহ্বান করছেন, তা আসলে ইতিহাসের অনুপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। বীরত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে কবিকে এক অবাস্তব, মৃত নায়কের স্মরণ নিতে হচ্ছে। অ্যাকিলিস গৌরব লাভ করেছিলেন মারা গিয়ে। অর্থাৎ তার চূড়ান্ত উপস্থিতি এসেছে অনুপস্থিতির মাধ্যমে। এটা সেই অচল অবস্থা, সমস্যা, বিভ্রান্তি, বা সমাধানহীন সংশয়, যেখানে বীরত্ব ও মৃত্যু দুটি বিপরীত ধারণা একই সঙ্গে সত্য।
কবিতায় গৌরবকে অশেষ জীবনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। কিন্তু এই গৌরব অর্জিত হয় বিনাশ করবার মাধ্যমে, অর্থাৎ গৌরব শব্দটা তার বিপরীত বিনাশের ওপর নির্ভরশীল।

এখানে অশেষ জীবন এক ধনাত্মক ধারণা। কবি এই ধনাত্মকতাকেই বিসর্জন দিতে চাইলেন। এর অর্থ, তিনি জীবনের চেয়ে মৃত্যু-পরবর্তী কীর্তিকে বেশি মূল্য দিলেন। এই বিচার জীবন বা মৃত্যু নামক যুগল বৈপরীত্যকে উলটে দেয়।

কবি আলোচ্য কবিতায় একটা সুসংগঠিত, বীরত্বপূর্ণ ও আশার বার্তা দিতে চাইলেও, ভাষা ব্যবহারের অনিবার্য ফল হিসেবে সেই বার্তাটি তার বিপরীত অর্থ, তার অসঙ্গতি ও অস্থিরতা দ্বারা পূর্ণ। অ্যাকিলিস হলেন একই সঙ্গে বীরত্বের উপস্থিতি এবং অতীতের অনুপস্থিতি। পুত্রের আগমন হল মুক্তির আগমন, যা একই সঙ্গে পূর্ববর্তী দুঃখের চিহ্ন বহন করে। কবিতাটা একই সঙ্গে অবিচল আশার কথা বলে এবং সেই আশার ভিত্তি হিসেবে অস্থির, পৌরাণিক ও যুগল-বিপরীত ধারণার ওপর নির্ভর করে।

কবি শামীম আজাদের ‘আমার পুত্রের নাম’ কবিতাটা কেবল একটি নামকরণের আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং এটা পৌরাণিক আদর্শের আয়নায় সমকালীন সামাজিক অবক্ষয় এবং নতুন সৃষ্টির সংকল্পের এক জটিল চিত্রায়ণ। কবি অ্যাকিলিসের মতো বীরকে আহ্বান করে কাপুরুষতা ও নিপীড়ন দূর করতে চাইলেও, এই আহ্বান ভাষা ও ইতিহাসের অনিবার্য দ্বৈরথে এক গভীর অস্থিরতা ধারণ করে। পুত্রের নামে অ্যাকিলিসকে প্রতিষ্ঠা করবার মাধ্যমে কবি এক অবাস্তব, মৃত নায়ককে সমকালের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন। অ্যাকিলিস একই সঙ্গে বীরত্বের চূড়ান্ত উপস্থিতি এবং ইতিহাসের অতীতের অনুপস্থিতির প্রতীক। কবিতা গৌরবের জন্য অশেষ জীবনকে বিসর্জন দেবার মূল্যবোধকে তুলে ধরে, যা জীবন ও মৃত্যুর স্বাভাবিক যুগল-বিপরীত ধারণাকে উলটে দেয়। এখানে গৌরব অর্জিত হয় বিনাশের ওপর নির্ভর করে, অর্থাৎ ইতিবাচক কীর্তি তার বিপরীত নেতিবাচক ভিত্তিকে অস্বীকার করতে পারে না। পুত্রের আগমনকে সখিনার ক্রন্দন অবসানের মাধ্যমে মুক্তির আগমন হিসেবে চিত্রিত করা হলেও, মুক্তি তার সম্পূর্ণ অর্থ পায় কেবল পূর্ববর্তী বেদনার চিহ্নের ওপর দাঁড়িয়ে। ফলে কবিতাটা একদিকে যেমন একটি সুসংগঠিত ও অবিচল আশার বার্তা দেয়, অন্যদিকে তেমনি ভাষা ব্যবহারের অনিবার্য প্রক্রিয়ায় তা অস্থিরতা দ্বারা পূর্ণ। এই কবিতা তাই বীরত্বের বাসনা, মুক্তির সংকল্প, এবং অস্তিত্বের যুগল-বিপরীত ধারণার এক কাব্যিক প্রতিধ্বনি, যেখানে চূড়ান্ত সত্য এসে মিলেছে তার বিপরীত ধারণার অনিবার্য আলিঙ্গনে।

‘আমার পুত্রের নাম’ কবিতাটা শামীম আজাদের দ্বিতীয় কবিতার বই ‘স্পর্শের অপেক্ষা’য় আছে। এটা এই বইয়ের দ্বিতীয় কবিতা। বইটা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮৪ সালের এপ্রিল মাসে বাঙলাদেশের ঢাকার লেখক প্রকাশনী থেকে।




Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

“আমার পুত্র অ্যাকিলিস” এ একটি মন্তব্য

  1. অনন‍্য ভাবনার চিন্তক কবি, শিল্পী ও লেখক নির্ঝর নৈঃশব্দ‍্য। আমার জন‍্য তার আজকের এ অর্ঘ‍্যও ব্যতিক্রম নয়।

    সে আমার সৃজনযাত্রার অত‍্যাবশ‍্যক সহযোগী, নির্দেশক কখনো আমার বিবেচনা-বিবেক। জীবনানন্দ দাশের মায়ের মতই আমি নতমুখি স্বপ্নবাজ আদর্শীক জায়গায় সুশক্ত ও সন্তানসম নির্ঝরকে দেখে ভাবি, আমাদের দেশে কবে এমন ছেলেরা আরো হবে যারা কথায় না বড় হয়ে কাজে বড়ো … কবে হবে!!

    ধন‍্যবাদ শিকড়।🙏🏽

    ধন‍্যবাদ ও ভালোবাসা নির্ঝর 🙏🏽💚

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Trending