জাকিয়া রহমান

যতবার পড়ি তোমার কবিতা
ততবারই হতে চাই আমি কবি!
হতে চাই রায়া রায়া তোমার শব্দ রাশির সঙ্গে।
কত নব্য শব্দরাশি এনেছো সেঁচে বাংলা কাব্যে,
গচ্ছিত হয়ে থাকবে সবই,
শুঁকবে বিভোর তোমার মায়া কলমের আতর।
শামীম আজাদের কবিতাগুলো জাগতিকতার সুবাসে ভরপুর। তাঁর কাব্যশৈলী, চিন্তা ও দর্শন সব সময় চলমান। কোন দশকের দেয়ালে আবদ্ধ নেই। সব সময় নতুনত্বের হাওয়ায় কবিতা ভরপুর হয়ে থাকে। একজন উদারমনা কবি, কবিতায় দেখা যায় বিশ্ব বিচরণের আমেজ।
আমার সাথে শামিম আজাদের একবারই দেখা হয়েছিল। খুব সম্ভব ২০০৫ সালে। লন্ডনের এক কাফেতে দাওয়াত দিয়েছিল পুনম প্রিয়ম, আমার প্রয়াত ভ্রাতা সঙ্গীত শিল্পী শেখ ইশতিয়াকের স্ত্রী। সঙ্গে তাদের একমাত্র মেয়ে সিমন ইশতিয়াক আর আমারা দুজন। পুনম বলেছিল, একজন উচ্চমানের কবি আসছেন, আপনার খুব ভালো লাগবে। উনি দারুণ কবিতা লিখেন। খুব কম সময়েই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন।
আমি তখন লেখালেখির জগত থেকে প্রায় ২০ বছর আগে বিদায় নিয়েছিলাম, কবিতা গল্প কিছুই লিখিনি। অথচ এক সময় দিনে একটা কবিতা কি গল্প না লিখলে ঘুম হতো না। আমার বিদেশে বাস অর্ধ শতাব্দী ধরে, পেশা পদার্থবিদ। কাজেই সাহিত্যের জমিনে আমি এক অজ্ঞাত অঙ্কুর।
কাফেতে পৌঁছে সাক্ষাত হলো কবি শামীম আজাদের সঙ্গে… হাস্যময়ী একজন সুন্দর মানুষ। তারপর চা কফি জমল ভালো। মাঝে দুই একটা কথা হচ্ছিল অনেক কিছু নিয়ে। উনি আবৃত্তি করে শোনালেন তার ডায়েরি খুলে। আমি সত্যই অভিভূত হলাম। তারপর মন থেকে কয়েকটি পঙক্তি রচে শোনালেন। আমি অনুভব করলাম উনার উচ্চমানের রূপক ও ভাষার শৈলীকে, তা সত্যই আমার কাছে অচেনা, এক অপূর্ব অপ্সরীর সাথে আচমকা সাক্ষাৎ হবার মতো অনুভূতি।
আমি মিন মিন করে বললাম, আমিও ছাত্র জীবনে সামান্য কিছু লিখতাম, প্রকাশ করেছি, তবে, একাত্তরের পর আর লিখিনি। উনি ঝরঝরে উজ্জ্বল মুখে ডাগর নয়ন মেলে অতি আগ্রহে বললেন, তাহলে শোনান না কিছু… আমি সত্যি দ্বিধাগ্রস্ত তখন! বললাম, সে সব দিন চলে গেছে আমার মাথায় কেবল কম্পিউটারের হার্ড ডিস্কে কি করে বেশি ইনফরমেশন চাপানো যায় তার চিন্তা। কবিতা, গল্প সব পদ্মায় ভেসে গেছে।
আবার তো শুরু করা যায়…
উনার এই কথা সত্যি মনে একটা অতি মূল্যবান কিছু হারাবার ব্যথা গেঁথে দিল।
ছাত্রী ছিলাম পদার্থবিদ্যার কিন্তু ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য খুব ভালো লাগতো বিশেষ করে কবিতা লিখতে। বহুদিন আগের কথা তখন প্রিন্টিং বিজনেসটাই ছিল অতি দুর্লভ। সাহিত্য সম্পর্কে পড়াশুনা করা সাহিত্যের ছাত্রী ছাড়া বেশ কষ্টকর ছিল। কারণ, সেটা মিডিয়ার যুগ ছিল না। কয়টা পত্র পত্রিকাইবা ছাপা হতো? আর ছাত্রী মানুষ আমি কিনতে পারতাম কয়টি? ছিল ‘বেগম’ আর কয়েকটা খবরের কাগজ দৈনিক ইত্তেফাক, আজাদ, তাতে ছিল শিশুদের আসর সেখানে লিখতাম কবিতা কি গল্প। সম্পদনা করেছি দেয়াল পত্রিকা, লিখেছিলাম একুশের সংকলনে যার নামটাও ভুলে গেছি। প্রকাশিত লেখার কাটিং জমিয়ে রেখেছিলাম কিন্তু একাত্তরের মুক্তি যুদ্ধে সব ছেড়ে ভারতে পালাতে হয়েছিল। ফিরে এসে কিছু পাইনি।
সব চেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশ থেকে আসার পর ইংল্যান্ডে তারপর আয়ারল্যান্ডে বসবাস। বাংলা সাহিত্য সম্পর্কিত কোন রকম পত্রিকা কি খবরের কাগজ আয়ারল্যান্ডে অদৃশ্য ছিল। তখন আমার শহর লিমেরিকে আমরাই ছিলাম একমাত্র বাঙালি পরিবার। দিনরাত প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, গবেষণাগার আর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতি নিয়ে আলোচনা ছাড়া দুনিয়াতে আর যা চিন্তা করার মতো তা ছিল নিজের ছেলেমেয়ে আর পরিবার। সাহিত্য সেখানে কবে সমাহিত হয়ে গিয়েছিল! একাত্তুরের পর আর কিছু লেখা হয়নি। সাহিত্য বলে কিছু আছে চেতন মন ভুলে গিয়েছিল।
তবে, আমাকে পুনরায় কবিতা লেখার প্রেরণা, আবার সব কিছু ফিরিয়ে এনেছে। আমি আবার লেখালেখি করছি।
আজ প্রিয় কবি শামীম আজাদের জন্মদিন। আমি তাঁর জন্যে এক সাগর শুভেচ্ছা নিয়ে এলাম। আশা করি, তিনি সাহিত্যের আকাশে আরও উজ্জ্বলভাবে জ্বলতে থাকবেন, এই শুভকামনা রইল।






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান