সেই মাকে মনে রেখে

আমিতো জানি মা, তোমার সেদিনের চোখের জল শুধু
কান্না ছিলো না, ছিলো এদেশের প্রথম বৃষ্টি—
যে বৃষ্টিতে ভিজেছিল স্বাধীনতা, বিজয়ের প্রথম বিকেল।
আর যে বৃষ্টিতে ডানা ভিজিয়ে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলজুড়ে
আকাশের দিকে উড়ে গিয়েছিলো হাজার পায়রা।

মা, তুমিতো জেনেছিলে ছেলেটা আর ফিরবে না,
তবুও প্রতিদিন দরজাটা খোলা রাখতে।
এই খোলা দরজাটাই একদিন দেশের সীমারেখা হয়ে
রোদ ছড়াতে এলো তোমার উঠোনে।

তোমার আঁচলের ভাঁজে ভাঁজে আমি মানচিত্র দেখেছি মা—
কোথাও রক্তে ভেজা পদ্মা, কোথাও বারুদের ঘ্রাণে মত্ত মেঘনা,
কোথাও সবুজ মাঠের মাঝ বরাবর একফালি লাল।
আর তোমার নিঃস্ব বুকে বারবার কানপেতে শুনেছি
আরেকটা নাম না জানা নদীর কলচ্ছল—
যেটা শুধু বয়ে যায় সেই একাত্তরের দিকে,
তোমার সন্তানের দিকে—
ঘোর অন্ধকার শেষে তাদের নামে প্রস্ফুটিত আলোর দিকে।

তুমি যখন নামাজে দাঁড়াতে মা,
দেখেছি সেজদায় মাথা রাখলে মাটিটা কেঁপে ওঠতো;
কারণ ওখানে ঘুমিয়ে আছে তোমার সেই ডানপিটে ছেলেটা
আর তার সঙ্গে স্বাধীনতার জন্য ঘরছাড়া হাজারো না ফেরা মুখ।
শোনো—যারা ইতিহাস মুছতে চাও, আগে মুছো আমার সেই মাকে
যারা ইতিহাস মুছতে চাও, আগে মুছো লাখো শহীদের মাকে।
তারা হিসাব বুঝে না, সংখ্যা বুঝে না—তারা শুধু বুঝে
একটা সন্তান কমে গেলে পৃথিবীটা ঠিক কতখানি ছোট হয়ে যায়।
জানি শত চেষ্টাতেও এইসব কোনো কিছুই মোছা যাবে না,
মুছতে পারবে না তোমরা।
তাহলে জেনে রেখো—
এই দেশ মুছবে না, মুক্তিযুদ্ধও মুছবে না কোনোদিন।
কারণ মুক্তিযুদ্ধ মানে অসংখ্য মায়ের খালি বুক—
যারা প্রতিনিয়ত হাতছানি দিয়ে ডাকে ফিরে না আসা সন্তানদের।
যতদিন মায়েদের সেই ডাক আছে, থেকে যাবে কালের গর্ভে
ততদিন তোমাদের মিথ্যে এই মাটিতে টিকবে না।


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Trending