কাউন্টার অ্যাটাক

-সম্বুদ্ধ সান্যাল


ঠিক তিরাশি মিনিটে ভবানীপুর এসসি ক্লাবের সাত নম্বর বক্সের মধ্যে মোক্ষম ফাউল করে বসল রেলওয়ে এফসি’র এগারো নম্বরকে। সবেমাত্র দুইজনকে কাটিয়ে বক্সের মধ্যে ঢুকে পড়তেই পিছন দিক থেকে জার্সি টেনে কড়া ট্যাকল, সাক্ষাৎ লালকার্ড। রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজিয়েছে ততক্ষণে। ক্যালকাটা ফুটবল লিগের অবনমনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা ভবানীপুরের বেঞ্চে তখন আক্ষেপের ছাপ। কোচ প্রদীপ দে সাইডলাইনের পাশ থেকে বেঞ্চের সামনে এসে ছাব্বিশ নম্বরের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, “রুদ্র, জলদি, নামতে হবে। দশজন হয়ে গেছি বলে হার মানব না কিন্তু। দুইয়ের জায়গায় তিন ফরোয়ার্ড করে দিচ্ছি একটা ডিফেন্স তুলে। তুই লেফটে গিয়ে অপুকে সেন্টার ফরোয়ার্ড হয়ে যেতে বল আর রঘুকে বল ডানে চেপে আসতে। এই কয় মিনিটে একটা গোল করে মুখটা বাঁচাতে পারিস কিনা দেখ।”
বর্ধমান জেলার বনপাশ গ্রামের রুদ্র চক্রবর্তী এইবারই প্রথম ময়দানে খেলার সুযোগ পেয়েছে। মাস ছয়েক আগে তাদের গ্রামের ট্যুর্নামেন্টে ময়দানের‌ই এক সময়ের দাপুটে স্ট্রাইকার প্রদীপ দে ফাইনাল ম্যাচের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে এসে তার খেলা দেখে যাকে বলে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন ছেলেটি নবীন সঙ্ঘে নিয়মিত খেলে। অনুষ্ঠানের শেষে তাকে ডেকে পাঠিয়ে ভবানীপুর ক্লাবে খেলার প্রস্তাব দেন অমনি। কিন্তু ছেলেটি তখনই কিছু না জানিয়ে বাড়িতে ফিরে যায়। তারপর আর যোগাযোগও করেনি। দিন পনেরো আগে হঠাৎই এক রাতে তিনি ফোন পেয়েছিলেন, “প্রদীপদা, আমি কলকাতায় খেলতে চাই…।”

ময়দানে প্রথমবার পা রাখার আগে মাঠের ঘাসে হাত ছুঁয়ে কপালে ঠেকাল রুদ্র। দৌড়ে নিজের জায়গা নিতে নিতে চেঁচিয়ে কোচের নির্দেশ জানাল অপর দুই স্ট্রাইকারকে। ততক্ষণে ভবানীপুরের বক্সে পেনাল্টির আয়োজনে স্ট্রাইকার এগিয়ে গেছে, রুদ্ররাও নিজেদের হাফে বক্সের বাইরে। গোলকীপার দু’হাত ছড়িয়ে পোজিশন নিতেই রেফারির বাঁশি বেজে উঠল। রেলওয়ের আট নম্বর গোলপোস্টের বাঁ-দিক লক্ষ্য করে শট নিতে এগোল। গোলকীপার যেন মুহূর্তটার জন্য তৈরিই ছিল, নিজের ডানদিকে ঝাঁপিয়ে দুই হাতে বল গ্রিপ করে একটু দৌড়ে সর্বশক্তিতে ছুঁড়ে দিল বক্সের বাইরের জটলা পেরিয়ে রাইট উইঙ্গার রঘুর দিকে। তার সামনে তখন বিপক্ষের দুই মিডফিল্ডার এগিয়ে আসছে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল রুদ্রর সামনে বেশ অনেকটা ফাঁকা জায়গা। বলটাকে লাথি মেরে শূন্যে ভাসিয়ে সে চিৎকার করল, “রুদ্র, বলটা ধরে এগো তাড়াতাড়ি। অপুও ওঠ, ওরা পাঁচজন ওদিকে।”
সেই চিৎকার শুনে রুদ্র চমকে উঠল যেন মুহূর্তের জন্য। কানে ভেসে আসল সাগর ডাকছে, “রুদ্র, বেরো তাড়াতাড়ি। ম্যাচ শুরু হয়ে যাবে।”
বনপাশ শিক্ষানিকেতন হাই স্কুল থেকেই বন্ধুত্ব তাদের। কলেজের পাশাপাশি মাঠেও স্ট্রাইকার পোজিশনের খেলোয়ার দু’জনে। এলাকার সবচেয়ে বড় ক্লাব নবীন সঙ্ঘের হয়ে যেকোনও ট্যুর্নামেন্টে দলে তাদের জায়গা পাকা। কতবার আলোচনা হয়েছে বড় হলে তারা ময়দানে খেলবে। স্কুলটা কোনোরকমে পাশ করলেই হয়। কলকাতায় কলেজে পড়বে আর সারাদিন প্র্যাক্টিস করবে তারা একসঙ্গে। এলাকায় নামডাকও তো কম নেই তাদের। বছরের পর বছর নবীন সঙ্ঘকে কত ট্রফি দিয়েছে দু’জনে মিলে।

বছরখানেক আগে একদিন ভোম্বলদা ক্লাবের পিছনদিকে নিয়ে গিয়ে রুদ্রকে বলেছিল, “চাকরিটা নিয়ে নে রুদ্র। বাবা পুরোহিতগিরি করে আর কতদিন চালাবে? বোনেরও তো বিয়ের বয়স হচ্ছে।”
“কিন্তু ভোম্বলদা, আমি তো খেলতে ভালোবাসি, ময়দানে খেলব।” রুদ্র উত্তর দিয়েছিল।
“এখানে ভালো খেলিস বলে ময়দানেও চান্স পাবি তুই? জানিস ওটা কত বড় জায়গা? বনপাশ নবীন সঙ্ঘের মাঠে খেলে ওই স্বপ্ন দেখিস না। বরঞ্চ এটাই সুযোগ তোর, ছাড়িস না।” ভোম্বলদা বলেছিল।
মাসখানেক বাদে সাগর কারখানার সুপারভাইজারের চাকরিটা নিয়ে দুর্গাপুরে চলে যাচ্ছে বলে রুদ্র যখন খবর পেল, অবাক হয়ে একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, “হ্যাঁ রে সাগর, আমাদের ময়দানে খেলার কী হবে?”
“ভাই, তুই চাকরিটা ছেড়ে ঠিক করিসনি। আমি এই সুযোগ ফেলতে পারলাম না রে।”

রুদ্র সেদিন সাগরকে আটকায়নি, কিন্তু আজ বলটা শূন্যে ভেসে পায়ের সামনে পড়তেই আর ছাড়ল না সেটাকে। বাঁ-পায়ে রিসিভ করে খানিকটা সামনের দিকে ঠেলে দিল। ততক্ষণে সামনের দিক থেকে দুইজন ডিফেন্ডার দৌড়ে আসছে। উপরের প্লেয়ারগুলোও যথারীতি নিচে নেমে আসছে তাড়াতাড়ি, বোধ করল সে। বলটার পেছনে অনেকটা স্প্রিন্ট টেনে সামনের জায়গা কভার করে একটু দাঁড়াল। অপু মাঝমাঠ ছাড়িয়ে উঠে গেছে বেশ খানিকটা। তাদের মাঝখানে বিপক্ষের দুই ডিফেন্ডার ওয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে।
সুনন্দার বাড়ির থেকে বিয়ের চাপ ছিল গত দুই বছর ধরেই। রুদ্রর সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা বনপাশের কারোর অজানা নয়, বাড়ির কানেও উঠেছে বেশ কয়েকবার। গত শীতে চার্চে বেড়াতে গেলে সুনন্দা বলেছিল, “এবার একটা কিছু জোগাড় কর চেষ্টা করে। আমি বাবাকে আর সামলাতে পারছি না। তুই কিছু করলে বাড়িটা কাটিয়ে বেরিয়ে পড়ব তোর সঙ্গে। বাবা পিসির ছেলেকে ডেকেছে আলোচনা করতে। চাকরিটা ছেড়ে ভুল করেছিস তখন, সাগর সেদিন বাইক কিনেছে জানিস?”
“সামনেই তো ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা। পাশ করলেই কলকাতায় চলে যাব। ওখানে ক্লাবে ট্রায়াল দেব। তারপর আর ভাবতে হবে না তোকে। আর দুই বছর অপেক্ষা কর।” রুদ্র সুনন্দাকে আশ্বাস দিল।
“না রে, আর বোধহয় পারব না। বাবা আমার কলেজ শেষের অপেক্ষাই করছে। রন্তুদাকে ডেকেছে মানে আমি জানি কী নিয়ে আলোচনা করবে। জানি না আর সুযোগ পাব কি না।” সুনন্দা রুদ্রর বুকে মাথা রেখে কেঁদে উঠেছিল আর রুদ্রও বার বার তাকে বুঝিয়েছিল। কিন্তু চারমাস আগে অন্য মাধ্যমে জানতে পেরেছে যে বর্ধমানের কোনও ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে সুনন্দার বাবা পাকা কথা বলে এসেছে।
বলটা পায়ে হোল্ড করে রেখে ফাঁকা জায়গা খুঁজতে লাগল রুদ্র। অপুকে একেবারে গার্ড করে রেখেছে তারা। নিচে বল সাপ্লাই দিলে সামনের সুযোগটা আর থাকবে না। গোলের সামনে এই দুইজনকে কাটালে আর একজন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার। ডানপাশ থেকে রঘুও অনেকটা এগিয়ে এসেছে। দু’জনকে টপকাতেই হবে লক্ষ্যপূরণের জন্য। এক ডিফেন্ডার তার দিকে হঠাৎ পা বাড়াতেই আউটসাইড কাটে তাকে কাটিয়ে উঠতেই সামনে পড়ল আরেক ডিফেন্ডার। তাকে পেরিয়ে অপুকে ততক্ষণে গার্ড করেছে উপর থেকে নেমে আসা এক মিডফিল্ডার। ডিফেন্ডারটা শরীরের মধ্যে ঢুকে আসতে সে ব্যাক হিল জাগলে বলটা পেছনে ফেলে পাঁকাল মাছের মতো ছিটকে বেরিয়ে এল তার আড়াল থেকে। এবার অপুকে ছেড়ে মিডফিল্ডারটি তার দিকে এগিয়ে আসছে। বলটাকে ঠেলে নিয়ে বক্সের মাঝামাঝি সুবিধাজনক জায়গায় যেতে চাইল রুদ্র।

সুনন্দাকে আটকাতে চেষ্টার কসুর করেনি রুদ্র সেই সময়। ফাইনাল ইয়ার পরীক্ষার আগেই তার আর বাবার পরিচিতির সুবাদে নানা মাধ্যম খাটিয়ে কয়েকটি চাকরির ব্যবস্থাও করেছিল। কারখানার সুপারভাইজারের চাকরির পর খেলার আর সময় পাওয়া যাবে না বিকেলবেলায়। খেলতে না পারলে সে বাঁচবে কী করে? কাছাকাছি এদিক ওদিক কয়েকবার চেষ্টাচরিত্রের পর সমস্ত দিক বজায় রাখতে সে কলকাতার এক কল সেন্টারে সুযোগও পেয়ে গেল মাস তিনেক আগে। মেসে থেকে রাতের বেলায় কাজ। সকালে ফিরে খানিক ঘুমিয়ে বিকেলে মাঠে যেতে পারবে সে। কয়েকদিন গিয়েও ছিল প্রদীপদার কল্যাণে। তবে রাত্রি জেগে দিনের পর দিন কাজে বিকেলে দেহেমনে স্ফূর্তি থাকে কম। আর স্ফূর্তি না থাকলে খেলবে কীভাবে? দুই দিক সামাল দিতে পারছিল না সে। অফিসের সিনিয়র একদিন তাকে ডেস্কের উপর ঘুম থেকে তুলে আচ্ছা করে অপমান করল সবার সামনে। রাতে চাকরি আর বিকেলে মাঠের পর একরাশ ক্লান্তি তাকে গ্রাস করে ফেলেছিল। বাড়িতে এই অসুবিধা জানানোয় তার বাবাও বকাবকি করে ভীষণ। কিন্তু কয়েকদিন পরে আবারও একই ঘটনা ঘটায় অফিস আর তার কোনও অজুহাত শুনতে চাইল না। খেলা আর অফিসের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বলায় মাসখানেক আগে সে বাড়ি ফিরে আসে রেজিগনেশন লেটার সিনিয়রের সামনে ফেলে।
মিডফিল্ডারটা সরাসরি চার্জের উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসছে, তার গতিবেগ দেখে যা ধারণা হল রুদ্রর। দশাসই চেহারা, বিদেশি নিগ্রো। বয়সের জন্য খানিক গতিহীন হলেও ক্ষীপ্রতা কমেনি। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অভিজ্ঞতার ফলে শেষ চেষ্টা হিসেবে সরাসরি চার্জই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। রুদ্রও বলটা ঠেলে বক্সের লাইন বরাবর মাঝখানে আরও খানিকটা এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। গোলকীপার গোলের কোন ছোট করছে।
বনপাশে ফিরে এসে সুনন্দার সঙ্গে কোনোভাবেই দেখা করতে পারেনি সে। তবে কয়েকদিন পর শুনতে পেল এই পুজোর পরে অগ্রহায়ণেই নাকি বর্ধমান নিবাসী ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে তার বিয়ের দিন দেখা হয়ে গেছে। শেষ চেষ্টা হিসেবে তার বাবাকে জানাতেই তিনি খেপে উঠেছিলেন, “অপদার্থ বেকার ছেলের জন্য আমি কথা বলতে যাব প্রদ্যুতবাবুর বাড়িতে? জেনে রাখ, ও মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে। তোর মতো বেকার ছেলের বাবা হয়ে আমি কিছুতেই ও বাড়ি যেতে পারব না। আমার যজমানের কাছে আমি অপমানিত হতে পারব না কখনও।”
“বাবা, আমাকে একটা বছর সুযোগ দিতে বলো কেবল। আমি কথা দিচ্ছি তোমাদের নিরাশ করব না।” অঝোর নয়নে বাবার পায়ে ধরে রুদ্র মিনতি করেছিল সেই রাতে। তারপর জেদের বশে বলেছিল, “তোমরা যদি আমার পাশে না থাকো, তবে আমি ঠিক একটা কিছু করে ফেলব।”
সেই কথা শুনে তার বাবা বলে উঠেছিল, “বেয়াদপ ছেলে, আমাকে ব্ল্যাকমেল করা? বেরিয়ে যা এখনই তুই বাড়ির থেকে। আর জীবনে ওই অপদার্থ মুখ আমাকে দর্শন করাবি না। আমি আজ থেকে জানব আমার একটাই মেয়ে।”
কাঁদতে কাঁদতে সেই সন্ধ্যায় হাতে ব্লেড নিয়ে পুকুরপাড়ে বসেও নিজের কব্জির ধমনি চিরতে পারেনি সে। বাজারে এক এসটিডি বুথের থেকে ফোন করেছিল প্রদীপ দে’কে। তারপর সেই রাতে স্টেশনে ঘুমিয়ে পরের দিন সকালের ট্রেনে কলকাতা।

বিদেশিটা সজোরে কাছাকাছি এগিয়ে আসতে সে ডান পায়ে বল নিয়ে অপুর দিকে ইশারা করেই আবার চকিতে বাঁ-পায়ে বলটাকে নিয়ে খানিক সামনে ফেলে এক ঝটকায় ঘুরে গিয়ে বক্সের ভিতরে ঢুকে পড়ল। মিডফিল্ডারটা ততক্ষণে তার গতি রোধ না করতে পেরে বেশ খানিকটা এগিয়ে আবার পিছু ফিরল। এখন তার সামনে কেবল গোলকীপার। রুদ্রকে বক্সে ঢুকতে দেখে সেও গোলের কোণ ছোট করে এগিয়ে আসতে থাকল রুদ্রর পায়ের থেকে বল কাড়তে। তাই দেখে একটা ছোট স্টেপ এগিয়ে রুদ্র লক্ষ্য করল ডান দিকে গোলকীপার আর সেকেন্ড পোস্টের মধ্যে একটা বড় ফাঁক। এই সুযোগটা আর ছাড়বে না সে।


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Trending