তিন মক্কেল
-কৃষ্ণা মালিক
তিনতলা বাড়িটা চোখ টেনে নেয় একটা শক্তসমর্থ পা দাপানো ঘোড়ার মতো। পাটা ফোলানো নাক দিয়ে গরম ভাপ ছাড়ছে সে।
তিনটে লোক বসে বসে গুলতানি করছিল বিড়ি টানতে টানতে। যে তিনতলা বাড়িটার কথা বলছিল ওরা সেটা একদম ফাঁকা মাঠের ভেতর। তার চারদিকে দূরে দূরে গ্রাম। পাশ দিয়ে একটা ক্যানেল চলে গেছে। বাড়িটার চৌহদ্দিতে অনেকগুলো লম্বা দীর্ঘাকার নারকেল গাছ বেশ একটা দৃষ্টিনন্দন বিন্যাস রচনা করে দাঁড়িয়ে আছে। এছাড়া অন্য কোনো গাছ নেই আশেপাশে কোত্থাও। আছে চাষের জমি।
আগাগোড়া সাদা রঙ করা বাড়িটার চেহারা আখাম্বার মতো। সটান তিনতলার দিকে উঠে গেছে বাইরের দিকে কোথাও কোন খাঁজ বা বারান্দাটারান্দা না রেখে। এটা চোখকে বেশ পীড়া দেয় – একঘেয়েমির পীড়া। এমনকি একতলায় কোনো জানালাও নেই। দোতলা তিনতলায় যে জানলা আছে তা আকারে যথেষ্ট ছোট, সংখ্যায় কম আর অনেকটা করে উঁচুতে। সেগুলোর মাথায় কোনো সানসেট পর্যন্ত নেই। এরকম একটা বাড়িকে দূর্গ বা জেলখানা অনায়াসেই বলা যায়। বাড়ি ঘিরে কোনো প্রাচীর পর্যন্ত নেই।
যে ক্যানেলটা ওই বাড়ির কয়েক গজ দূর দিয়ে চলে গেছে তারই উপর একটা কালভার্টে বসে ছিল তিন মক্কেল। জায়গাটা সেখান থেকে এক মাইল দূর হবে।
এক মক্কেল বলল, “বাড়িটা কার তা তোদের জানা আছে?”
“না না! কে জানে কার বাড়ি! আমি তো বাসে চড়ে শহরে যাবার সময় জায়গাটা পেরিয়েছি অন্তত শ’পাঁচেক বার। কাঠের দরজা, কোলাপসিবল গেট কোনোদিন খুলে কেউ বাড়ির বাইরে এসেছে এমনটা কখনও চোখেই পড়েনি”। তার কথায় সবাই ‘হ্যাঁ হ্যাঁ’ করে সায় দিল ঘাড় হেলিয়ে , ঘাড়গুলো বিলকুল টেরিয়ে তাকানো তোতাপাখি।
সূর্য হেলে গেছে পশ্চিমে অনেকক্ষণ।
একজন বলল, বাড়ি না যাবার কথা ভাবছ নাকি তোমরা?
বাকি দুজন কোনো উত্তর না দিয়ে সামনে তাকিয়ে রইল, যদিও তারা কোনো কিছু দেখছে না। প্রশ্নকর্তাও চুপ।
সন্ধ্যের ছায়া ওদের তিন মক্কেলের মুখে পড়েছে। তিনজনই যেন গভীরতর চিন্তায় সূর্যের মতো ডুবে গেল পশ্চিমের দিকে কোথাও।
একটু পরে কেতু বলল, “কামারশালাটা আবার খুলব, বুঝলি? কামারশাল যখন চালু ছিল সেই সময় হাপর টানতে টানতে বুকে হাওয়ার টান পড়তে লাগল, বুকই যেন হাপর হয়ে উঠছিল —”
“হুমম! তোর ছেলে তো তোকে জোর করে কামারশালা থেকে উঠিয়ে নিয়ে গেল। সে পাশে দাঁড়িয়েছিল বলেই না তুই কামারশালাটা বন্ধ করার সাহস পেয়েছিলি! খুব ইমানদার ছেলে তোর, খুব ভাগ্য করে ছেলে পেয়েছিস!”। অন্ধকাররের ভেতর রতনের গলা ভেসে উঠল।
এবার কেতুর দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল আর তা বাতাসে ভেসে থাকল অনেকক্ষণ। -ছেলেটা পেরাইভেট কোম্পানিতে কাজ করত, সেলসের কাজ। কাজ পাবার পর বেশ ফুরফুরে হাওয়া বইল ঘরে। ওই কিছুদিনই! কিন্তু গরীবের সংসারে সুদিন হল পদ্মপাতায় জলের মতো। কড়া রোদেও শুকোয়, পাতা সামান্য হেলে পড়লেও খটখটে।
বলতে বলতে আচমকা থেমে গেল কেতু। খড়গোশ চলতে চলতে ফাঁদে পড়ল বুঝি। আবার ফাঁদ কেটে এগোল খড়গোশ – বলল, “তারপর কোম্পানি দিল এক রামধাক্কা! — ছেলে বলেছিল, “আমি তো আছি, বাবা! অথচ এখন তার মুখের দিকে তাকাতে পারি না। সব সময় ছটফট করছে, একটা কাজ চাই – কাজ! — হুঁঃ! কিন্তু চাইলেই বা দিচ্ছে কে?”
এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল তিন নম্বর মক্কেল। সে কেতুর কথার পিঠে এবার সুর করে বলল।– শানানো দা-খানা ফেলে রাখো। তারপর দ্যাখো কেমন ধীরে ধীরে জং ধরে তার ধার পড়ে যায়! আমাদের ঘরে ঘরে জংধরা দা।
রতন তিন নম্বর মক্কেলের পিঠে একখানা হাত বোলাতে বোলাতে কেতুর দিকে ঘনিয়ে এল, তাকে জিগ্যেস করল, “তা তুমি কী বললে ছেলেকে?”
“ওর কথাটাই ফিরিয়ে দিলুম — আমি আছি তো, বাপ! কামারশালটা আছে, তোর বাপ জান লড়িয়ে দেবে”।
কেতুর এই কথাটার পর সবাই থমকে গেল। তারপর ফাটিয়ে হেসে উঠল ওরা। এমনকি কেতুও।
কিন্তু কেতু ওদের হাসি থামলে বলল, “কিছু একটা করতে হবে।”
কথাটা শেষ হতেই দূরে সেই বাড়িটা যেদিকে, সেদিকে চোখ গেল সবার। সারা মাঠের অন্ধকারের ভেতর একটা আলো জ্বলতে দেখা গেল। এতক্ষণে সে বাড়িতে আলো জ্বলে উঠেছে।
সহসা তিন নম্বর মক্কেল উঠে পড়ল। -এই! একবার চল তো দেখি, ওই বাড়িতে রাতের বেলায় কাউকে দেখা যায় কিনা!
বাকিরাও উঠে পড়েছে। কেতু দোনামোনা করছিল। বাকিরা বলল, “এখন বাড়ি ফিরে কোন রাজকার্য করবি শুনি? তার চেয়ে চল না দেখি, ব্যাপারটা কী?”
একটা মজা পেয়ে মেতে উঠল ওরা।
বাড়িটার খুব কাছে চলে এসেছে কিছুক্ষণ পরে। ভেতর থেকে অল্প স্বল্প বাসনকোশনের আওয়াজ আসছে। কেউ একবার কাশল। কথালাপ শোনা গেল বিনবিন করে মৌমাছির ডানা ঝাপটানোর মতো।
ওরা সতর্কভাবে বাড়ির দরজার সামনে চলে এলো। খুব মিটমিটে একটা আলো দরজার মাথার উপর জ্বলছে । লোহার কোলাপসিবল গেটের পরে ভেতরের দিকে ভারী কাঠের দরজা একটা। গেটে বিরাট একটা তালা ঝুলছে ভেতর দিকে।
হঠাৎ বাড়ির ভেতরটা নিঃশব্দ হয়ে গেল কি? তিন মক্কেল পরস্পর চোখে চোখে তাকাল। সরে গেল গেটের সামনে থেকে। বাড়ির ভেতরের মানুষগুলো সহসা যেন সতর্ক হয়ে গেছে। কারা আছে ভেতরে? পুরুষ, না মহিলা? একটি পরিবার না কি তারা? বাচ্চা বোধহয় নেই, থাকলে তার অস্তিত্ব নিশ্চয় জানা যেত।
দোতলার একটা জানলা খুলে গেল আচমকা। এক ফালি আলো ছিটকে এসে পড়ল এক টুকরো রুটি ছুঁড়ে দেবার মতো। ওরা তিনজন দেওয়ালের গায়ে সেঁটে দাঁড়াল। কয়েক মুহূর্ত পর জানলাটা আবার বন্ধ হয়ে আলো মুছে গেল। ভেতর থেকে আবার কথার কণা ছিটকে আসছে। সম্ভবত ওরা নিঃসন্দেহ হয়েছে।
তিন মক্কেল বাড়িটার চারপাশে ঘুরল একবার। ফের সামনের দিকে এসে পড়লে কেতুর যেন সম্বিত ফিরল, বলল, “চল, বাড়ি ফিরতে হবে!”
পরের দিন সন্ধ্যে ঘন হয়ে নামলে সবাই সবার দিকে তাকাল। তারপর একসঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটা লাগাল – সেই বাড়িটার দিকে!
বাড়ির অদূরে এসে অন্ধকারের চাদর গায়ে তিন মক্কেল দাঁড়াতেই ভেতর থেকে হাসির পাতলা আওয়াজ এলো বুঝি। টের পেল নাকি ওদের আসার? কোনো ফাঁদ পেতে রেখেছে? ভাবখানা এমন – হেঁ হেঁ বাবা! এসেছ, বেশ করেছ! এবার বুঝবে ঠেলা!
কিন্তু বাড়ির বাইরে কাউকেই দেখা গেল না। গেটের গায়ে চোখ ঠেকিয়ে দেখল একটা তালা বেড়েছে। ওরা বাড়িটার চারপাশে ঘুরে ভালভাবে দেখল যদি কোথাও কোনো দরজা পাওয়া যায়। কিন্তু কোত্থাও এমন কিছু নেই, যেখান দিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়া যাবে।
এত আড়াল আবডালের কারণ কী বাপু? কারা থাকে ও বাড়িতে? দেখতেই হবে, নাহলে ওদের পেটের ভাত হজমই হচ্ছে না! যেন রাতের ঘুমের দফারফা হয়ে যাবে। কেতুর হাতে লোহার উকো। গেটের মাথার দিকে লাগানো অতীব টিমটিমে আলোয় একটা তালা ঘষতে লাগল সে। আধখানা কাটা হল যখন মনে হল সে সারাজীবন ধরে এই কাজটাই করে আসছে। কিন্তু গোটা তালাটা কাটা সম্ভব হবে বলে ওর মনে হল না। ভেবে দেখল, তাদের পাড়াগাঁয়ের হিসাবে রাত হয়েছে অনেক। দু-চারদিনের কচি চাঁদ ডুবে গেছে। একটা হতাশা জাগল ওর মনে, হবে না – কিছুই হবার নয়। কামার হয়ে একটা তালা কাটতে পারছে না সে! তাছাড়া এর কোনো মানেও হয় না। কেনই বা এসব করছে ওরা? বাড়িটাতে কারা থাকে জানলে তাদের কি লেজ গজাবে? যত্তসব পাগলামি!
বাকি দুই মক্কেল দেওয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে ঘুমোচ্ছিল এতক্ষণ। কেতু ওদের গায়ে নাড়া দিয়ে ওঠাল।
কিন্তু পরের দিন আবার মাঝরাতে চলে এল চুপিচুপি বাড়ি পালিয়ে। এসে দেখল আধা কাটা তালার বদলে নতুন তালা, তার সঙ্গে আরও একটি তালার সংখ্যা বেড়েছে। ওদের যেন রোখ চেপে গেল। বুঝতে পারল না, ওরা আসলে কী চায়? ঘরের ভেতর ঢুকে দেখা সেখানে কারা থাকে নাকি তালা কাটাই ওদের উদ্দেশ্য?
যাই হোক, কেতু উখো ঘষতে লাগল। ঘষেই চলল, ঘষেই চলল -! একটা তালা কেটে পড়ল এক সময়। তাই দেখে নিঃশব্দে তিনজনে নাচতে লাগল এমন করে যেনবা বাড়িটার ভেতর ওদের স্বপ্ন বন্দী হয়ে আছে, আর ওরা সেই স্বপ্নের কাছাকাছি প্রায় পৌঁছে গেছে!
কেতু এবার দ্বিগুণ উৎসাহে উখো ঘষতে শুরু করেছে। বাকি দুই মক্কেল ঘুমিয়ে পড়ল এ ওর ঘাড়ে মাথা রেখে দেওয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে।
কেতুর বুকের হাপড়ে হাওয়া পাগলামি শুরু করল এবার। উখো ঘষছে পাগলের মতো। এক সময় একটু থেমে কপালের ঘাম মুছতে গিয়ে সামনের দিকে চোখ পড়ল তার। ওটা কী? সূর্য উঠছে! নাকি হাপড়ের হাওয়ায় গণগণে হয়ে উঠছে আগুন? ধন্দে পড়ে গেল সে।






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান