ভার্চুয়াল

-নলিনাক্ষ ভট্টাচার্য

কেউ কাউকে চেনেনা তবু কীভাবে একটা সম্পর্ক পাতিয়ে ফেলে মানুষ ফেসবুক, ওয়টসএ্যাপের মাধ্যমে। এটা সেই রকম একটা সম্পর্কের গল্প যার শুরু এবং শেষ পুরোটাই ভার্চুয়ালের বাইরে যায়নি কোনদিন বা বলা ভাল ওরা দু’জন সম্পর্কটাকে বাস্তবের কঠিন ভূমিতে নিয়ে আসতে চায়নি সঙ্গত কারণেই। কিন্তু ভূমিকা না বাড়িয়ে শুরু করা যাক গল্পটা। নির্মলেন্দু বরাট ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিল সুচন্দা স্যান্যালকে তিনটে কারণে – এক, ও দেখতে সুন্দরী, দুই, ও ভূত-প্রেত, অলৌকিক, অতিলৌকিক গল্পকাহিনি নিয়ে খান পাঁচকে বই লিখে ইতিমধ্যেই কিছুটা নাম করে নিয়েছে আর তিন, সুচন্দা কলকাতায় থাকেনা, ও থাকে বীরভূমের রামচন্দ্রপুর গ্রামে, কলকাতার থেকে অনেকটা দূরে। নির্মলেন্দুর বয়স সাতষট্টি আর সুচন্দার সাঁইত্রিশ। দু’জনই বিবাহিত, তবে নির্মলেন্দুর কোন ছেলেপুলে নেই, সুচন্দার একটা বড়সড় মেয়ে আছে যে সবে মাধ্যমিক পাশ করেছে ভাল নম্বর পেয়েই। সুচন্দার স্বামী প্রবুদ্ধ উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক আর নির্মলেন্দু অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারি, থাকে দিল্লির কাছে নয়ডাতে।

নির্মলেন্দু একসময় ইংরেজিতে টুকটাক লিখত, একখানা উপন্যাস ছাপা হয়েছিল ওর কুড়ি বছর আগে যা বিক্রি হয়েছিল কয়েকশো কপি কিন্তু দ্বিতীয় এবং তৃতীয় উপন্যাস কোনও প্রকাশক নিতে রাজি না হলে ও লেখা ছেড়ে দিয়েছিল। চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর ও এখন আবার বাংলায় লেখা শুরু করেছে। পরিণত বয়সে মাতৃভাষায় সাহিত্যচর্চা শুরু করে কিছুটা এগিয়ে যেতে পেড়েছে নির্মলেন্দু – সাত বছরে দু’খানা উপন্যাস এবং একটি গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে ইতিমধ্যে। বাংলায় লিখে টাকা পাওয়া যায়না, উল্টে অনেক সময়ই পকেট থেকে দিতে হয়। তা দু’খানা উপন্যাস আর গল্পের বইটা বের করতে ওর পকেট থেকে ষাট হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। বন্ধুবান্ধব পরিচিতদের মধ্যে বইগুলো পুশ সেল করে হাজার পনেরো টাকা ঘরে ফিরিয়ে আনতে পেরেছে এটাই সান্ত্বণা ওর। ভূত-প্রেত, অতিলৌকিক, ক্রাইম এসব জঁর-এর বই বাজারে ভাল চলে তাই সুচন্দাকে গাঁটের পয়সা খরচ করে বই ছাপাতে হয়না। বরঞ্চ পয়লা বৈশাখে হালখাতার দিনে প্রকাশক ওকে ডেকে শুধু মিস্টি খাওয়াননা, ওর হাতে যে খামটা তুলে দেন তাতে দশ থেকে বিশ হাজার টাকা থাকে আর সেই সঙ্গে থাকে পরের বইয়ের জন্য অনুরোধ। ফেসবুকে সুচন্দার ইতিমধ্যেই ফ্রেন্ড এবং ফলোয়ারের সংখ্যা বেশ কয়েক হাজার যাদের মধ্যে কিছু ওর বইয়ের ক্রেতাও। নির্মলেন্দুর ফেবুতে হাজার খানেক বন্ধু জুটেছে কিন্তু ওদের মধ্যে অর্থ ব্যয় করে ওর বই কেনার মত লোক নগণ্য। সুচন্দা সুন্দরী, বয়সটাও চল্লিশের নীচে, কাজেই ওর দিকে নজর ফেরাবে অনেকেই সেটা স্বাভাবিক। নির্মলেন্দু দেখতে খারাপ নয়, কিন্তু মাথার চুল বালি ও গোলমরিচের মিশ্রণ, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘স্যান্ড এ্যান্ড পিপার’ তাই বন্ধু বা পাঠক আকর্ষণ করার ক্ষমতা ওর সীমিত। ফেবুতে গল্প দিলে বড় জোর জন পাঁচকে পড়েন আর জন বিশেক লাইক দিয়ে ছেড়ে দেন। তা ছাড়া সামাজিক বিষয়ে মূল ধারার গল্প লেখে নির্মলেন্দু যার পাঠক ক্রমশই কমে যাচ্ছে।

দুই

ফেসবুক থেকে ইনবক্সে ‘কোথায় থাকেন?’ ‘কী করেন?’ ‘ছেলেপুলে ক’টি?’, ‘কী লেখেন?’ ইত্যাদি প্রাথমিক পরিচয় পর্ব শেষ হলে সুচন্দা জানাল ওকে ‘আপনি’ না বলে ‘তুমি’ বললে ও খুশি হবে। সুচন্দা বাংলায় এমএ করেছিল, একসময় একটা স্কুলেও পড়িয়েছিল কিছুদিন কিন্তু করোনার সময় ওর প্রাইভেট স্কুলের চাকরিটা চলে যায়। লেখালেখির অভ্যেস কলেজ জীবন থেকেই শুরু হয়েছিল, চাকরি চলে যাবার পরে তাই ওটাকেই ও রোজগারের একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নিল। “কী করব বলুন? ঘরের সব কাজ করতে হয় আমাকে – মেয়ের আর বরের স্কুলের ভাত টিফিন সবই করে দিতে হয় আমাকে।” “রান্নার লোক রাখতে পার তো তুমি,” লিখল নির্মলেন্দু। “কিন্তু বাবু যে আমার হাতের রান্না খেতে পছন্দ করে।” প্রবুদ্ধর ঘরের নাম বাবু সেটা জেনে গেল নির্মলেন্দু।

সুচন্দার অনুরোধে ওর ভূতুড়ে গল্পের বই ‘ছায়ামানুষ’-এর একটা পাঠ-প্রতিক্রিয়া লিখে দিয়েছিল নির্মলেন্দু। খুশি হয়ে সুচন্দা লিখেছিল “আপনার লেখাটা পড়ে আমার চোখে জল এস গিয়েছিল।” “কেন?” জিজ্ঞেস করেছিল নির্মলেন্দু। “কী বলব আপনাকে, আমাকে অনেকে নীচে টেনে নামাতে চায়।” “কিন্তু ফেবুতে তো তোমার সবাই খুব প্রশংসা করে।” “ওসব লোক দেখানো। আমি যে একটু নাম করেছি তাতে অনেকে হিংসেয় জ্বলে পুড়ে মরে, ক্ষতি করার চেষ্টা করে।”

সুচন্দা জানাল ও যে দেখতে ভাল সেটার জন্য অনেক কুৎসা ছড়ায় ওরা। নামি বাণিজ্যিক পত্রিকায় গল্প বেরোলেই ওরা বলে সম্পাদকের সঙ্গে সুচন্দার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে তাই ওর লেখা বের হয়। নির্মলেন্দু শুনে খুব আশ্চর্য হয় কেননা ও এতদিন জানত সিনেমা জগতে ‘কাস্টিং কাউচ’ বলে একটা কথা আছে কিন্তু লেখার জগতে যে ‘ পাবলিশিং কাউচ’ থাকতে পারে তার কোন ধারণা ছিলনা ওর। সুচন্দা একবার একটা মেয়েদের কাগজে গল্প লিখে খুব প্রশংসা পেয়েছিল। ওই গল্প ছাপবার পিছনেও যে কারও হাত ছিল এরকম গুজব ছড়ালে সুচন্দা লিখেছিল, “ ওই পত্রিকার সম্পাদক তো একজন মহিলা, আমি তার সঙ্গে কি সম্পর্ক পাতাব গল্প ছাপাবার জন্য?” ঠাট্টা করে নির্মলেন্দু লিখেছিল, “ওরা তোমাকে লেসবিয়ান করে দিল মনে হচ্ছে।” সুচন্দা স্মাইলি ইমোজি দিয়ে ওই ব্যাপারে ইতি টেনে দিয়েছিল।

শুধু লেখা নয়, পশু পাখি, গাছপালা, গ্রহ নক্ষত্র, ফোটোগ্রাফি সবদিকেই সুচন্দার অল্প বিস্তর জ্ঞান আছে, উৎসাহ আছে যেটা নির্মলেন্দুর নেই। লেখার বাইরে একমাত্র সিনেমা থিয়েটারে ওর কিছুটা আগ্রহ আছে। একসময় গোটা দুয়েক নাটক লিখে ফেলেছিল ও, কিন্তু ওগুলো ছাপাও হয়নি, মঞ্চেও জায়গা করে নিতে পারেনি। ওদিকে সুচন্দা ছাতবাগানে শুধু গোলাপ আর বেলফুলই নয় নাম-না-জানা দিশি বিদেশি ফুলের ছবি তুলে দেয় ফেসবুকে। সিকিম ঘুরতে গিয়ে পাহাড় আর লেকের যেসব ছবি তুলে দেয় ও সেগুলো পেশাদার ফোটোগ্রাফারের বলেই মনে হয় নির্মলেন্দুর। চন্দ্রগ্রহণের রাতে ছাত থেকে ও মোবাইলে আংশিক থেকে পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের যে ছবিগুলো তোলে সেগুলো দেখবার মত।

“ইউ আর রিয়েলি আ জিনিয়াস!” নির্মলেন্দু লিখে জানায়। মোবাইল নম্বর বিনিময়ের পরে ওরা এখন ইনবক্স ছেড়ে ওয়টসএ্যাপে এসে গেছে।
“থ্যাংক ইউ।” সঙ্গে তিনটে লাভ ইমোজি জুড়ে দিয়েছে সুচন্দা।

একবার প্রজাপতির শূককীট কীভাবে ওর হাতের তালুতে এক রঙিন প্রজাপতিতে রূপান্তরিত হল তার রিল পোস্ট করল সুচন্দা। ও ছবির নিচে লিখল, “দেখুন কীভাবে কীট থেকে পাখি হল আর এটা আমার তালুতেই বসে রইল। কীরকম একটা আঠা আঠা লাগছে তালুতে।” বলা বাহুল্য এই আশ্চর্য ছবির প্রশংসা করল অনেকেই।
“তোমার ফ্যানের সংখ্যা তো অনেক,” লিখল নির্মলেন্দু।
“শত্রুর সংখাও কম নয় দাদা,” উত্তর দিল সুচন্দা।
“জাস্ট ইগনোর দেম।”

তিন

নির্মলেন্দুর উপন্যাস একটা নামি বাণিজ্যিক পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় ছাপা হলে খুব ভোরে প্রথম ফোনটা করল সুচন্দাই। “দাদা কনগ্রাচুলেশন! আপনার উপন্যাস বেরিয়েছে আজ প্রমা পত্রিকার পুজো সংখ্যায়।”
“থ্যাংক ইউ সো মাচ সুচন্দা।”

দু’চারটা কথাবার্তাও হল ওদের মধ্যে। সুচন্দার বাড়িতে ভাঙ্গাচোরা চলছে তখন, চারদিকে ধুলো উড়ছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে ওর। “বাইরে থেকে খাবার আনাতে হচ্ছে আমাকে,” জানাল ও তারপর হ্যাঁচ্চোর আওয়াজ এল। নির্মলেন্দু বলল, “এখন আর কথা বলতে হবেনা তোমাকে, পরে কখনো কথা বলব তোমার সঙ্গে।”
“ঠিক আছে।”

কয়েকদিন পরে একরাতে নির্মলেন্দু ফোন করল সুচন্দাকে। “তুমি এবার একটা উপন্যাস লেখ সুচন্দা। ভূত-প্রেত নিয়ে নয়, মূলধারার উপন্যাস।”
“কিন্তু কী নিয়ে লিখব আমি?”

“তুমি নিজেকে নিয়ে একটা উপন্যাস লেখ সুচন্দা,” বলল নির্মলেন্দু। “তোমার ছবি আর পোস্টগুলো দেখে আমার মনে হয়েছে তোমার জীবন খুব বৈচিত্র্যময়। গ্রামের মেয়ে তুমি, তোমার বড় হয়ে ওঠার গল্প শুনতে চাই আমরা।”
সুচন্দা হাসল। “দেখি কী করতে পারি।”

কিন্তু বাড়ির মেরামত হয়ে যাওয়ার পর শুরু হল রঙের কাজ। সেও এক বড় ঝামেলা। নির্মলেন্দু ওয়টসএ্যাপে মেসেজ করে জানতে চাইল কেমন আছে ও। সুচন্দা লিখল, “একদম ভাল নেই আমি দাদা। হরমোনাল ডিসব্যালান্স হয়ে যাওয়ায় কুড়ি দিন ধরে পিরিয়ড হয়ে চলেছে, খুব দুর্বল হয়ে পড়েছি আমি। নীচের তলায় রঙের কাজ চলছে তাই উপরে এসে আশ্রয় নিতে হয়েছে আমাদের।”
“ওমা! সেকি? তোমার তো এখন চিকিৎসা আর বিশ্রাম দুটোই দরকার।”
উত্তরে কান্নার ইমোজি পাঠাল সুচন্দা।
কিন্তু এর মধ্যেও লেখা থামায়নি সুচন্দা। কিছুদিন পরে নামি স্বদেশ পত্রিকায় ওর প্রথম গল্প ছাপা হল। সুচন্দা ফেবুতে সবাইকে অনুরোধ জানাল ভাল মন্দ যার যেরকম লাগে ওকে জানাতে। গল্পটা সায়েন্স ফিকশন আর ফ্যান্টাসি মিলিয়ে লেখা। নির্মলেন্দু ফেবুতে প্রশংসা করল লেখাটার। ‘ব্যতিক্রমী গল্প যার মর্মে যেতে হলে আবেগ নয় বুদ্ধি দিয়ে বিচার করতে হবে পাঠককে’, লিখল নির্মলেন্দু। সুচন্দা ওকে ‘ থ্যাংক ইউ’ জানাল ফেসবুকে। সঙ্গে লাভ ইমোজি।

চার

ওদের সম্পর্কটা কবে কোন মুহূর্তে নিছক বন্ধুত্ব থেকে প্রেমে উত্তীর্ণ হল তা ওরা বুঝতে পারলনা। ওরা দু’জনই বিবাহিত তাই প্রেমটা ভার্চুয়াল স্তরেই শুরু হবে সেটাই স্বাভাবিক ছিল।

সুচন্দা খোলামেলা স্বভাবের মেয়ে তাই কোন কিছুই ওর বলতে বাধা নেই, অবশ্য সভ্যতার সীমার মধ্যেই। “আপনি এখন কী করছেন?” একদিন সন্ধের দিকে জানতে চাইল সুচন্দা।
“পার্কে ইভনিং ওয়াক করছি আর তোমার কথা ভাবছি,” পার্কে ঘুরতে ঘুরতেই জবাব দিল নির্মলেন্দু।
“আপনার গিন্নি জানেন যে আপনি আমার সঙ্গে প্রেমালাপ করেন?”
“না, এখনো জানেননা। ফেবুর কমেন্টস দেখলে মনে হয় তোমার তো প্রেমিকের সংখ্যা অনেক হবে।”
“তা হবে, ওদের অনেকেই ইনবক্সে কান গরম করা মেসেজ পাঠায়।”
“যেমন?”
“একজন আমাকে নুন লংকা দিয়ে মেখে খেয়ে ঢেকুর তুলতে চায়।”
“তোমাকে নুন লংকা দিয়ে মাখবার সময় সঙ্গে দু ফোঁটা লেবুর রস দিতে বোলো না হলে বদহজম হয়ে যাবে।”
সুচন্দা খান তিনেক অট্টহাসির ইমোজি পাঠাল।
সুচন্দা নিশাচর, বর আর মেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে ও উঠে লিখতে বসে আর লেখার ফাঁকে কোন কোন দিন মেসেজ করে নির্মলেন্দুকে।
“কী করছ এখন?” মেসেজ পাঠাল সুচন্দা রাত সাড়ে এগারোটায়। নির্মলেন্দু তখন শুতে যাচ্ছিল, ওর বউ পৌলমী সাড়ে দশটার সিরিয়াল দেখে শুতে চলে যায়, ও বসে নিউজ চ্যানেল সার্ফ করে।
“নিউজ দেখছি,” জানাল নির্মলেন্দু।
“ধুর! একই খবর বার বার দেখতে ভাল লাগে তোমার?”

“এই সব দেখতে দেখতে পরের গল্প বা উপন্যাসের প্লট ভাবি আমি।”
“আমি আগে টিভির নিউজ দেখে ইন্সপায়ারড হতাম, এখন আর হইনা। খুব বোর লাগে।”
“আচ্ছা তোমার কখনো ডিপ্রেশন হয়না?” নির্মলেন্দু জিজ্ঞেস করল। ও একটা উপন্যাসে একটি মেয়ের পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন দেখাতে চায়, তাই এই প্রশ্ন। গল্পে নায়িকার বাচ্চা হবার মাস তিনেক পরে এই ডিপ্রেশন এসেছিল, ঠায় দেয়ালের দিকে তাকিয়ে কাঁদত ও। সেটাই একটু ভালভাবে লিখবার জন্য ওর এই প্রশ্ন।

“একটু আধটু হয় কিন্তু আমি ওটাকে বেশি পাত্তা দিইনা। মন খারাপ হলে কাছে পিঠে দু’চারজন বন্ধুবান্ধব আছে ওদের কাছে চলে যাই। ঘণ্টা দুঘণ্টা কল কল করি কিংবা ওদের সঙ্গে নিয়ে বাজারে সিংগল স্ক্রিন যে সিনেমাটা এখনো কোনোরকমে টিকে আছে, যেখানে সব বস্তাপচা পুরনো ছবি আসে সেখানে টেনে নিয়ে যাই ওদের। সিনেমার পরে ফুচকা খাই প্রাণভরে আর একটা লম্বা সিগারেট ধরাই, ডিপ্রেশন ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়।”
“দারুণ! আসলে আমি একটা উপন্যাসে আমার নায়িকার পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন নিয়ে লিখছিলাম, তাই তোমাকে একটু বাজিয়ে নিলাম। তোমার কি ওটা হয়েছিল?”
“না, মেহুর জন্মের ছমাস পরে ওটা হবার উপক্রম হয়েছিল, কিন্তু আমি আমল দিইনি। তখনই জিমে যাওয়া শুরু করলাম, নতুন কিছু বন্ধু হল, ওটা আর ঘাড়ে চাপতে পারেনি।”
“তুমি সত্যি অসাধারণ সুচন্দা!”
“এখন থেকে তুমি আমাকে চন্দা ডাকবে কেমন?”
“তাই ডাকব। সত্যি তোমাকে না ভালবেসে পারা যায়না।”
“আচ্ছা আমার সঙ্গে দেখা হলে . . . ধর যদি কলকাতা বই মেলায় দেখা হয়ে যায় কী করবে তুমি?”
“কী করব সেটা আগে ভাগে বলতে পাচ্ছিনা, তবে কী করবনা সেটা বলতে পারি।”
“বলো, শুনি।”
“ওই ভিড়ের মধ্যে তোমাকে চুমু খেতে পারবনা।”
“আমার বাবু সঙ্গে না থাকলে কী অসুবিধা? কোন স্টলের পিছনে টেনে নিয়ে গিয়ে . . .”
“না ওরকম রিস্ক নিতে পারবনা। এই বয়সে ছেলের বয়সি ছেলেপুলেদের হাতে ঠ্যাঙানি খেতে পারবনা।”
“আমাদের প্রথম দেখা তো তাহলে মাটি হয়ে যাবে।”
“ভিড়ের মধ্যে তোমার হাতটা তো ধরতেই পারি।”

“ধুর! পঞ্চাশের দশকে সেই উত্তম-সুচিত্রার প্রেম করার স্টাইল এখন আউটডেটেড হয়ে গেছে।”
“তাহলে কী করব আমি?”

সুচন্দা একটু ভাবল খুব সম্ভবত, কারণ ওর উত্তরটা আসতে একটু দেরি হল। তারপর ও লিখল, “তুমি আমাকে একটা ভাল বারে নিয়ে যাবে আর আমার জন্য রেড ওয়াইন অর্ডার দেবে। রেড ওয়াইনে আঙুল ডুবিয়ে তুমি আমার ঠোঁটে আঙুল বুলিয়ে দেবে।”
“হাও রোমান্টিক!”

তিনখানা অট্টহাসির সঙ্গে পাঁচটা লাভ ইমোজি পাঠাল সুচন্দা, সঙ্গে “গুড নাইট।”
“গুড নাইট।”

পাঁচ

বইমেলায় এসেছিল ওরা দু’জনই। কিন্তু দূর থেকে এক ডজন ছেলেমেয়ে যেভাবে ঘিরে ধরেছিল সুচন্দাকে তাই দেখে নির্মলেন্দু সাহস পেলনা ওর সামনে আসতে। ওদের বয়স পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশের মধ্যে, কেউ কেউ বেশ সুন্দরী বা হ্যান্ডসাম। ওকে সুচন্দার দিকে এগোতে দেখলে ওরা নিশ্চয়ই হাসাহাসি করবে, খিল্লি ওড়াবে। সুচন্দাও হয়ত একটু অপ্রস্তুত হবে। কয়েকটা স্টল ঘুরে খান তিনেক পছন্দের কবিতা আর গল্পের বই কিনে নিয়ে বইমেলা থেকে বেরিয়ে এল নির্মলেন্দু। সুচন্দা ওর স্তাবকদের প্রশংসা শুনতে শুনতে আর ওর সদ্য প্রকাশিত ‘ভয়ের ঠিকানা’ উপন্যাসে সই করতে করতে এদিক ওদিক তাকাল সেই মানুষটাকে খুঁজতে যার দেখা পাবার জন্য ও এতদূর থেকে ছুটে এসেছে। বই মেলায় জ্যামার থাকায় ফোনেও যোগাযোগ করা সম্ভব হলনা ওর সঙ্গে। কিন্তু বইমেলা থেকে বেরিয়েই ক্যাবে বসে সুচন্দা ফোন করল নির্মলেন্দুকে।
“কী হল? তোমার জন্য ওয়েট করে করে আমার পা ব্যথা হয়ে গেল? তুমি এলেনা কেন?”

“আমি এসেছিলাম কিন্তু তোমাকে দেখে এগোতে সাহস পেলামনা।”
“সে কি? আমি কি ফিল্মস্টার? বাউন্সার নিয়ে ঘুরছিলাম নাকি?”
“না কিন্তু তোমার ফ্যানরা তোমার চারপাশে ছিল, ওরা সব অল্পবয়স্ক। আমাকে তোমার পাশে দেখে ওরা হাসাহাসি করত, সেটা তোমারও ভাল লাগতনা, তাই পালিয়ে এলাম বইমেলা থেকে।”
“ও মাই গড! তুমি এত লাজুক কেন গো? আমি তো কয়েক মিনিটের মধ্যে ওদের ভাগিয়ে দিয়েছিলাম যাতে তুমি এলে তোমাকে নিয়ে কোন বারে যেতে পারি।”

নির্মলেন্দু তখন একটা বাসে ফিরছিল ওর দাদার বাড়ি বাগুইআটিতে। বাসের মধ্যে অনেক আওয়াজ, ঠিকভাবে কথা বলা যাচ্ছিলনা। ও তাই ফোন সুইচ অফ করে ওয়টসএ্যাপে মেসজে পাঠাল-
“আমাদের সম্পর্কটা ভার্চুয়ালে শুরু হয়েছিল আর ভার্চুয়ালেই থাকুক। ওটাকে রিয়েল করতে যেওনা, টিকবেনা। লাভ ইউ, চন্দা।”


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Trending