ভেলায় ভেসে

-স্নেহাশিস ভট্টাচার্য

কলাবতীর সামনের স্ক্রিনে তরঙ্গটা ভেসে এলো, কান আর মন দুটোই বুঝে নিলো বিশ্বামিত্র প্রেরিত প্রভাতী শুভেচ্ছা। নীচে সাইকেল আর ব্যাটারি গাড়ির ঝাঁক। তবে চলছে দিব্যি, গতিশীল।আজকের আকাশটাও পরিষ্কার। আকাশপথে সেক্টর ৮ পৌঁছতে বেশী সময় লাগবে না। দেবাদৃতা আজ তাই আকাশ পথে। ওর ভেলার নাম কলাবতী। পথে পাশ দিয়ে যাবার সময় দেবতনু ওর ভেলা বিশ্বামিত্র থেকে তরঙ্গ পাঠিয়েছে। দেবাদ্রিতা ও হেসে প্রতিতরঙ্গ প্রেরণ করলো। তরঙ্গ আবার জানান দিলো যে বার্তা প্রাপকের কাছে পৌঁছে গেছে। তরঙ্গের ওঠা নামা বেশ প্রকাশ করছে দেবতনুর খুশী খুশি ভাব। যান্ত্রিক ভাবতরঙ্গ এইভাবে খেলা করার বেশী সময় পাবে না। দপ্তরে পৌঁছে যন্ত্র আর নিজের যন্ত্রণা ভোলা। মুক এক সমাজ, বধির এক সময়।

মার্গে গার্গী, কপিল, অর্জুন, লোপা, মহাশ্বেতা একে একে অনেকের সাথেই তরঙ্গের আদান প্রদান হলো কলাবতীর। রাই, দীপ্ত, সুধাকর, পৌষালি আর বকুল সবাই আজ ভেলা নিয়েই বেরিয়েছে। ১৫ মিনিটের অবসর, ভেলা হাজির হয়ে গেল দপ্তরে। সরকারি স্বাস্থ্য দপ্তরের উচ্চপদে আসিনা দেবাদ্রিতা। পুরো ভবনটাই জাতীয় পতাকার রঙে রাঙানো, বেশ লাগে দেখতে, সমস্ত সরকারী দপ্তর এখন এই ভাবে রঙিন। ঢুকতে ঢুকতে নিঃশব্দ পরিসরে ওর নিজস্ব যন্ত্রে একটার পর একটা বিভিন্ন তরঙ্গের সুপ্রভাতের বার্তা। তার প্রত্যুত্তরে কি তরঙ্গ প্রেরিত হবে সেটাও যন্ত্রে আগে থেকেই ভরা।

কাজের জগতে প্রবেশ করলো দেবাদৃতা। একটু পড়েই বুঝতে পারলো কেউ একজন বাইরে অপেক্ষা করছে, তরঙ্গ তাই বলছে। ভিতরে আসতে চাওয়ার নিঃশব্দ অনুভূতি। ব্যক্তির যাবতীয় নথি সামনে, প্রশ্নটিও , কারুর মুখেই কোনো কথা নেই, প্রতিটি শব্দ নিখুঁতভাবে তরঙ্গবাহিত হয়ে আছড়ে পড়ছে। সংস্কৃত ভাষার পরিসরে গিয়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে তৈরি হচ্ছে বাংলা ভাষা, যাকে কম্পনাঙ্কের ভগ্নাংশে ভেঙে তরঙ্গের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে যন্ত্রের গায়ের ওপর। সবার সাথে যন্ত্র। বর্তমানে অভিযোগ প্রায় নেই ই। যিনি এসেছেন তিনি যুবক। যন্ত্র জানাচ্ছে তার নাম সিদ্ধার্থ ঘোষাল। বয়স ২৮। নিবাস চারুলতা ধাম, ৩৬ নম্বর,মাধবী সরনী, কলকাতা । তার প্রেরিত বার্তা তরঙ্গ জানাচ্ছে যে সে খুব ক্ষুব্ধ যে , কোনো কিছুই লিখিত রূপে দেওয়া যাচ্ছে না বলে।সে বর্তমানে বাংলা ভাষায় ছাপানো ফর্মে সব লিখতে চায়, আর এইভাবে কিছু করা যাবে না বলে যখন কোনো আইন নেই তখন তার কথা কেন শোনা হবে না।

বাড়ির বাইরে বেরিয়ে কর্মস্থল, প্রেক্ষগৃহ, সমস্ত জায়গাতেই এখন শুধু তরঙ্গ প্রেরিত হয়। মোবাইল কোম্পানি গুলো দেউলিয়া হয়ে গেছে। বাড়ির ভিতরে সকলে নিজের মত কথা বলবার ছাড়পত্র পেলেও সবাই ওই তরঙ্গায়িত জীবনেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। এ হেন সময়ে এরকম দাবী এখন যন্ত্র দানবে আটকা রাজনৈতিক দলগুলোও করে না। দেবাদ্রিতার তরঙ্গ সঠিকভাবে কারন জানতে চাইলে সিদ্ধার্থ বলে বাঙালী হিসেবে বাংলা ভাষাকে ভালোবাসার সুবাদে তার এইটুকু অধিকার কি নেই? দেবাদ্রিতা একটু অবাকই হয়। তার তরঙ্গ প্রশ্ন পাঠায় বর্তমানে সকলের সুবিধার জন্যই তো এই ব্যবস্থা। কোনো অভিযোগ নেই, অল্প সংখ্যক মানুষ। পুরো কাজটাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়ে চলেছে। একটু চুপ থাকে সিদ্ধার্থ, বলা ভালো ওর যন্ত্র। তার তরঙ্গ একটা মুহ্যমান দুঃখী বাঙালীর প্রতিমূর্তি হিসেবে দেখা দিতে থাকে দেবাদ্রিতার কাছের যন্ত্রে। একটা হতাশা একটা রাগ সব ফুটিয়ে তুলে এক নিষ্ফল তরঙ্গ যাবার অনুমতি চায়। সব নিয়মগুলো কে একটু এক পাশে সরিয়ে রেখে তার ব্যক্তিগত তরঙ্গের কম্পন নম্বর চেয়ে বসে দেবাদ্রিতা।
একক মাতৃত্বে যে বড় করে তুলছে নম্বরহীন তরঙ্গের শিশু টিকে, নাম দিয়েছে অলীক। বয়স প্রায় ৩৮ ছুঁই ছুঁই। ঘরে মা বাবা আর অলীক, এখন ৬ বছর। না ও সময় পায়নি কোনো তরঙ্গের সাথে নিজের তরঙ্গকে মিলিয়ে নেবার।
সিদ্ধার্থের কম্পন নম্বর ভেসে ওঠে ।

আজ ছুটির দিন, বৃহস্পতিবার। সপ্তাহের মাঝের দিনটাই ধার্য হয়েছে। আকাশে আজ খুব ভেলা নেই। কিন্তু সাইকেলের খুব ভিড়। সিদ্ধার্থকে দেখা করতে বলেছিল ও। আজ কত বছর পর ও কোনো এক অজানা কারণে শাড়ি আর টিপ, ব্যাটারী গাড়ীতে , কিছুটা পর ই তরঙ্গের জানান দেওয়া যে সিদ্ধার্থ কাছেই। একই গাড়িতে। গন্তব্য অনেক পুরোনো একটা জায়গা। গঙ্গার ঘাট। নির্মল নদী প্রকল্প হবার পর গঙ্গা আজ সত্যি নির্মল। মাঝিদের গান আর শোনা যায় না ঠিক, কিন্তু
নানান ধরণের যান্ত্রিক বিনোদনের ব্যবস্থা আছে। ওরা সরে এলো একটু দূরে। গঙ্গার ধারে বসার একটু পরেই তরঙ্গ জানান দিলো সিদ্ধার্থর চাহিদা। ওরা দুজনেই কম্পনাঙ্ক থেকে মুক্ত করলো একে অপরকে।
ওরা কথা বলতে শুরু করলো। নিজেদের মাতৃভাষা বাংলায়। দেবাদ্রিতার মনে হলো কত বছর পরে ও যেন শিকল খোলা পেয়েছে। একটু এলোমেলো সিদ্ধার্থ। উচ্চতা চোখে পড়ে। রোগাটে গড়ন। গায়ের রং উজ্জ্বল। এদিক ওদিক তাকিয়ে ধূমপানের নির্দিষ্ট জায়গা খুঁজে না পেয়ে সিগারেটের প্যাকেটটা জিন্সের পকেটেই রেখে দিল।
আছা এইভাবে বাংলা ভাষা যে উবে যাচ্ছে , আপনার কিছু মনে হয় না! সিদ্ধার্থের গলাটা হঠাৎ করেই আছড়ে পড়ে কানে। চোখ তুলে তাকালো ও। দোহারা চেহারার এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বসম্পন্না মহিলা দেবাদ্রিতা। ধীর গলায় বললো উবে যায় নি তো। এখনই তো বেঁচে উঠলো। এখন তো বাংলায় সব হচ্ছে। আমি আপনি কথা বলছি, সরকারি কাজ হচ্ছে, শিশুরাও শিখছে । একটু অবাক হয়ে সিদ্ধার্থ জিজ্ঞেস করে বসলো কেমন করে? সবই তো যন্ত্রে ভেসে ওঠা, হ্যাঁ ঠিক, কিন্ত সবটাই তো বাংলায়। অন্য কোন ভাষার সাথে মিশিয়ে জগাখিচুড়ি কোন বাংলা তো নয়। আজ আমরা প্রকৃত অর্থে বাংলায় কাজ করি, বাংলায় গান করি, বাংলায় হাসি, এই বলেই চুপ করে দেবাদ্রিতা। দেখে হাসছে সিদ্ধার্থ। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় ও। থামলেন কেন বলুন। গান গাইতে, হাসতে কেমন লাগে একটু শুনি। ঠিক কথা যোগায় না দেবাদ্রিতার মুখে।

অনেক গুলো সময় পেরিয়ে এসে বর্তমান সময় প্রযুক্তির হাত ধরে যখন বৈপ্লবিক বদল এলো সমাজের বুকে, তখন হায় হায় রব ওঠেনি যে তা নয়, কিন্ত সুবিধাটাই বেশী হয়ে দেখা দিলো। আকাশ পথের ভেলা, সব আলাদা আলাদা নামের। মানুষ আর কিছু বলতে লিখতে সময় নষ্ট করে না। শুধু ভাবে। আর সেই ভাবনা ছড়িয়ে পড়ে যন্ত্রের মাধ্যমে আর একজনের ভাবনায়, বাংলা ভাষায়। এ এক অভিনব অভিযোজন। মানুষ নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। যথারীতি পুরোনো আর নতুনের মাঝের লোকজন হিমশিম খাচ্ছেন এখনো। তাই বাড়ীর ভিতরে এখনো পুরনো পন্থা একই ভাবে। টিভি, রেডিও, সিনেমা সবেরই হাতিয়ার ওই ভাবনা। হ্যাকার রা কিন্তু এর মধ্যেই সক্রিয় ,ভাবনার স্তর গুলো ভেঙে অন্যের ভাবনায় ঢুকে পড়ার কৌশল আয়ত্ত করে ফেলেছে। মানুষ তাই দ্রুত ভাবনা বদলে ফেলছে। যদিও টাকার অঙ্ক এখনো ভাবনার স্তরের সাথে পরিবর্তনশীল হয় নি, কেবল কাজের স্তর আর রোজকার জীবন যাত্রা যন্ত্রময় হয়ে উঠেছে।

না কোন জবাব ছিল না ওর কাছে সিদ্ধার্থের কথার। সত্যি তো কতদিন নিজের গলায় গান গায়নি ও। ঠা ঠা করে হেসে ওঠে সিদ্ধার্থ। গাংচিলটা অনেক দিন পর শব্দ শুনে উড়ে গেল। ভাবনা এসেছে , বাংলা ভাষা ও এসেছে, ভাবনার ইনকিলাব ও বিদ্রোহের ভাবনা ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা করছে, যন্ত্রগুলো সমানে হৃদস্পন্দনের মতো ওঠা নামা করব চলেছে, সরলরেখায় আসবে না আমাদের মত। আমরা যত্ন করি না, আমরা ভালোবাসি না আমাদের, আমাদের ভাষাকে। ম্যাডাম আমরা ইংরাজিতে ভাবি, স্প্যানিশে ভাবি, হিন্দিতে ভাবি, শুধু বাংলা তর্জমা হয়। খোলা গলায় বনলতা সেন আওড়াই না। আমরা হারিয়ে গেছি। বলতে বলতে ছেলেটা এগিয়ে চলেছে, মেঘমুক্ত আকাশে গাঙচিলটা উড়েই বেড়াচ্ছে। কবিতা বলছে ছেলেটা, সব ভাবনা ওলট পালট করে দিয়ে কবিতা বলছে, –

যা কিছু আমার চার পাশে ছিল
ঘাসপাথর
সরীসৃপ
ভাঙা মন্দির
যা কিছু আমার চার পাশে ছিল
নির্বাসন
কথামালা
একলা সূর্যাস্ত
যা কিছু আমার চার পাশে ছিল

কখন যেন গলা মিলিয়ে দিয়েছে দেবাদ্রিতা, ওর এক সময়ের অতি প্রিয় শঙ্খ ঘোষের পুনর্বাসন

ধ্বংস
তীরবল্লম
ভিটেমাটি
সমস্ত একসঙ্গে কেঁপে ওঠে পশ্চিম মুখে
স্মৃতি যেন দীর্ঘযাত্রী দলদঙ্গল
ভাঙা বাক্স প’ড়ে থাকে আমগাছের ছায়ায়
এক পা ছেড়ে অন্য পায়ে হঠাৎ সব বাস্তুহীন |

দুটো কম্পন যন্ত্র নিজেদের মধ্যে ভাব বিনিময় করে চলছে বাংলায়, সে ভাব বিনিময় ভালোবাসার, পরের দিন ২১।ভাষার ভেলায় চেপে ভালোবাসার ডিঙি এক নির্মল আকাশে বৃষ্টির মেঘ পেরিয়ে গঙ্গার জলে ছায়া ফেলতে শুরু করলো।


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Trending