বিবাহ অতঃপর 

-খাতুনে জান্নাত

এইমাত্র বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দেবী চৌধুরাণী’ পড়া শেষ করলেন আসাদ নূর। কালো প্রচ্ছদে সাদা রেখায় আঁকা জাহাজের ছবি; সাদা ঢেউ। অনেক জায়গায় ঘষা লেগে কাগজ উঠে যাওয়া প্রচ্ছদের দিকে তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। বাইরে নিস্তব্ধতার সাথে তাল মিলিয়ে তুরুল্লার ডাক। টিনের চালে নারিকেল ডোগলার মতো কী যেন পড়ে ঝপ করে! রাত দশটা। সাদা চেইনওয়ালা চারকোণা ঘড়িটা খুলে ঘড়ি ও বই রাখেন ছোট বর্গাকার কালো টেবিলে। টেবিলের উপর লাল কাপড় বিছানো; যার নীচে ঝুলছে সাদা ক্রুশ কাঁটার জালি লেস। হারিকেনের আলোটাকে কমিয়ে হাসিমুখে তাকিয়ে দেখেন পাশে  বসে থাকা তুহিনার বুকের উপর ধনুকের মতো কালো চুলের বেণীটা নেমে গেছে কোমর তলপেট পার হয়ে। বিছানায়ও কিছু চুল স্তরে স্তরে জমা পড়েছে। চুলের আগায় কোনো ফিতা নেই রাতের কারণে। নয়তো দীঘল চুলের আগায় ঝুলতো শিমুল, জামরুলের থোকার মতো রেশমী ফিতার লাল, বেগুনী ফুল। জবাকুসুম তেল ও তিব্বত স্নোর হালকা মিষ্টি ঘ্রাণে ভরে আছে টিনের বেড়া ঘেরা এ কোঠা। দুটো  ছোট ছোট জানালা থাকলেও এ কক্ষটির কোন দরোজা নেই। একটা নীল রঙের ভারী পর্দা ঝুলে আছে শোয়ানো মূলি বাঁশের উপর থেকে। বেড়ার নীল আর পর্দার নীলে ব্যবধান দৃশ্যমান। মাঝারি গড়নের কোমল তুহিনা স্বামীর  বাহুর উপর শোয়। নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাস, ছোট ছোট মিষ্টি ধ্বনির হাসি ও গল্পের তরঙ্গ একসময় ঘুমে মিশে রাত হয় নিস্তব্ধ । স্তব্ধতার সীমা ভেঙে রাতের পাখি ডেকে উঠে দূরে।

স্কুলের লাইব্রেরি থেকে বই এনে পড়া ও লাইব্রেরিতে বইয়ের সংগ্রহ বাড়ানোতে আনন্দ আসাদ নূর মাস্টারের। বই পড়ো, জ্ঞান বাড়াও জীবনের মূলমন্ত্র। বিশিষ্ট সুধীজন স্কুলের জন্য আলমারি দেন দান বাবৎ।   একজনে পুরোটা দিতে না পারলে দু’ তিন জনকে একত্রিত করে কাচের দরোজাওয়ালা আলমারি বা বুক শেল্ফ কিনেন তিনি । ডিজাইন করা আলমারির কাঠের উপর এশিয়ান পেইন্টে লেখা দাতাদের নাম। ফাতেমা গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষক, মুখে বিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞতা মিশ্রিত হাসি বহমান। কালো বুট-জুতো, সাদা শার্ট এর উপর কালো স্যুট পরে ‘ফনিক্স’ সাইকেল চালিয়ে দুপুরের রোদ মেখে তেল চকচকে হয়ে বাড়ি ফিরলে  তুহিনা আঁচলে ঘাম মুছে নেন। পাখার বাতাস করতে করতে হয়ে উঠেন আদুরে পাখি। আসাদ মাস্টারের কালো রঙ ও বেঢপ গঠনের বিপরীতে তুহিনার অপরূপ ও মায়াবী গড়ন। তার ত্বক মিহি সাদারঙে হালকা হলুদ মেশানো। জাল দেয়া দুধের উপর হলুদ সর যেন। আধা ঘোমটা দেয়া রূপবতী স্বামীর পিছু পিছু ঘোরেন সম্মোহন ভঙ্গীতে। বিশ বছরের বিবাহিত জীবন পেরিয়ে তার বয়স মধ্য ত্রিশের কোটায়। মেদহীন শরীর জানায় ত্রিশ। তুহিনা স্বামীর হাত-মুখ ধোয়ার জন্য নলকূপ চেপে দেন। তার আগে বাগানের শেষ মাথায় কাঁচা পায়খানায় যেতে বদনা এগিয়ে দেন। সুপারি বনের মদীরা গন্ধের ভেতর হঠাৎ উস্কে পাওয়া আদর মাখিয়ে দিতে ইচ্ছে করে মনমোহিনীকে; আসাদ মাস্টার তাকান মায়ার দৃষ্টিতে। আনন্দ ঝিলিক ছড়ানো  পান্দান মুখের তুহিনার মুখমণ্ডল থেকে শাপলা ফুলের ঘ্রাণ। মাস্টারের রসিকতা নিয়ে গ্রামের নরনারীর মধ্যে আলাপ আলোচনা প্রচলিতঃ কম হাসেন, হাসান বেশি। অনেক জটিল সালিশের মারপ্যাচেও তাঁর রসিকতা ঠিকঠাক। রসালো বাক্য শ্রবণে স্ত্রী হেসে কুটি কুটি হয়ে মুখে কাপড় ধরেন। বনের ধোঁয়াশা রঙের ভেতর রূপালি দাঁতের ঝিলিকে গাবগাছে বসে থাকা পেঁচা পরখ করে অভিসার। একটি গুইসাপ সর সর শব্দে শুকনো পাতা মাড়িয়ে সমতলের দিকে নামে। শুধু লাল পিঁপড়েরা নির্বিকার। কাঁচা মাটির চিকন পথের উপর  আড়াআড়ি দুটো লাইন করে দূর দৃষ্টিগামী ট্রেনের মতো চলছে তো চলছে। হাঁটার সময় তুহিনার কাপড়ের পাড়ে কয়েকটি উঠে আসে ও কামড়ায়। তা নিয়েই আসাদ মাস্টারের রসিকতা আর তুহিনার কুটি কুটি হাসি।

স্বামীর কাছে লবঙ্গ লতিকা হলেও তুহিনা যথেষ্ট ব্যক্তিত্ব সম্পন্না।  সংসারের কাজ পরে বাড়ির মহিলা ও শিশুদের যাবতীয় রোগ, শোক, কলহের সমস্যা সমাধানে সিদ্ধহস্ত। চিকন ভ্রু তীক্ষ্ণ করে, বাম গালে ঠোঁটের কাছাকাছি উপর নীচে তীর্যকভাবে দাঁড়ানো দুটো মাসায় আঙুল বোলাতে বোলাতে তিনি ভাবেন অন্যের সমস্যার সঠিক সমাধান। কখনো মাথার আঁচলের খুঁটটি দাঁতে কামড়ে ধরেন ভারী ঠোঁটে। সমাজের গুরুত্বপূর্ণ কাজের কারণে সংসারে পায়ে পায়ে দোষ খুঁজে পাওয়া জটিলা কুটিলা শাশুড়িও বৌকে কিছুটা সমীহও করেন। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে স্বামী বেড়িয়ে আনেন ‘হ্যাপী সিনেমাহল’ থেকে। ‘পাতালপুরীর রাজকন্যা’ কখনো ‘মানুষের মন’ কখনো ‘নীল আকাশের নীচে‘ ‘সারেং বৌ’। ঠোঁটের মাঝ বরাবর ভাঙা ঢেউয়ে নায়িকা কবরীর ঝলক দেখে ডাকেন কবরী। 

কিন্তু জীবন এখানেই পরিতৃপ্ত হয় না। তার চাই বর্তমান এবং ভবিষ্যতের বুনন, গঠন। এখানে তুহিনা পরাস্ত সাপের মতো কাতর, অচল। সংসারে শিশুদের কান্না-হাসি নাই।  একমাত্র ছেলে বংশ রক্ষা হবে কিভাবে? শাশুড়িকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে যে, এত মানুষ বর্তমান পৃথিবীতে তাঁরই বা একটি সন্তান কেন?  বংশটাই বুঝি কম প্রজননশীল! দেশের জনসংখ্যা হঠাৎ দ্বিগুণ হওয়ায় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে পরিবার পরিকল্পনার কথা গ্রামে গ্রামে মাইকে বলছে সরকার। স্কুলের দেয়ালে প্রজেক্টরে দেখাচ্ছে রঙিন উন্নয়নমূলক ভিডিও। এ বিশাল সংসার পতিত জমির মতো ফাঁকা। বাতাসে ঠকঠকি শুরু হয় প্রান্তরের পাশে শন গাছের ভিটি জমির মতো। ধান, পাট ও রবিশস্যের ক্ষেত, আম, নারিকেল, সুপারি বাগান শত একর। শাশুড়ি বিলাপ করেন। সামনের দিকে দাঁতহীন মাড়ি। চোখ ও মুখবিহ্বর থেকে গড়িয়ে পড়া জল ছাই রঙের জমিন ও লাল পাড় টাঙ্গাইল শাড়ির আঁচলে মুছতে মুছতে বিলাপের শব্দ দৈর্ঘে প্রস্থে ব্যাপ্ত হয়। বাড়ির মহিলারা জড়ো হয় উঠানে “আহা! আসাদ মাস্টারের কপাল বালা না। অলক্ষ্মী বউ!’ যারা বিপদে আপদে তার পেছনে ঘোরে তারাই এখন শাশুড়ির সমব্যাথী। বৌকে বেশি আহ্লাদ দিলে নাকি এ রকম হয়, কেউ কেউ দিব্যজ্ঞান করেন।  দুর্বলের উপর সবলের ঘাই। ধনী ঘরের সন্তান হলেও যেহেতু সে বাড়িঘর ছেড়ে এ বাড়ি এসে উঠেছে তাই সে এ মাপে দুর্বল। এখানেই শাশুড়ির কাছে  খুঁত, এখানেই দমিত তুহিনা। স্বামীর অগোচরে গায়ে মাখে হেলামিশ্রিত বাক্যবাণ। বিষে দগ্ধ তুহিনার চোখে বেদনাশ্রু। 

আসাদ মাস্টারকে এ নিঃসন্তানবস্থা ততটা পীড়িত করে না। পুস্তক পাঠে ও কাজের ব্যস্ততায় সময় কাটায় আনন্দময়। তাঁর একটি গভীর প্রেমের সুখস্মৃতিও আছে। তিনি বলেন মধুর দুঃখ। সেই উঠতি কাল। খালাতো বোন সুরাইয়া। বড় বড় টানা চোখ, আহত করে দেবার মতো চাহনি ও হাসি। বইয়ের ভেতর চিঠি; কবিতায় মন বিনিময়। কত বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে এবাড়ি ওবাড়ি  মায়া। খালারা সিলেটে চলে গেলেও হার মানেনি আসাদ নূর! সিলেটে গিয়ে খালা খালুর কাছে সাহসে বলেছে।  খালা খালুরও আদরের  নূর। কিন্তু সমস্যা হাদিসে। মা অসুস্থ থাকায় বুকের দুধ খাইয়েছিল নানি। হায় নানি দুধ নয় আপনি খাইয়েছেন  জীবন নষ্টের মধু। ‘ডাইনী, রাক্ষসী নানি’ কত কবিতাও লিখেছে সে যুবক আসাদ নূর। বুঝাতে চেয়েছে এ সামাজিক ধার্মিকদের। বুকের দুধ খেলে কেউ মা হয়ে যায়? তবে জন্ম দেয়াদেয়ির কি মূল্য থাকে? দুধ মা’দের সন্তান কেউ বিয়ে করতে পারবে না।  সুরাইয়া বুকের ভেতর খঞ্জনা। কথার ফাঁকে, কাজের ব্যস্ততায়, পাঠের আমোদে ডানা নাড়ে। বুক ধড়ফড় করে। নেপথালিনের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে স্মৃতির বাক্স ছুঁয়ে। এরই ভেতর তুহিনার মান অভিমান জড়ানো। স্ত্রীকে নিয়ে মায়ের ইচ্ছায় ঢাকা শহরে ওভুলেশন সেন্টারে চৈনিক ডাক্তার লিন চ্যাং এর স্বরণাপন্ন হন। বিয়ের দশ বছরের পর থেকেই মাঝে মাঝে  আসেন। এ আসার পেছনে যতটা না চিকিৎসা তার চেয়ে বেশি স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো। চিঁড়িয়াখানা, রমনা পার্ক ঘুরে শিশু পার্কে বিশ্বচক্রে চড়েন। সুরাইয়ার ঘরে স্বজন বেষ্টিত হয়ে রসালো গল্পে মাতিয়ে রাখেন বর্তমান।

ডাক্তারের ধরে দেয়া হিসাব অনুযায়ী এবারেও বাচ্চা জন্মে  না তুহিনার জরায়ুতে। দিন গড়িয়ে যায়। মা আর থামতে চান না। 
-আমার মরার পরে কে খাইবে না খাইবে আমার কি যায় আসে? তুহিনা তুমি মারে চুপ করাও।
-মা তো ঠিকই কইছে? কর বিয়া আমিও চাই।  
রাগী চোখে তাকায় আসাদ। ভেজা চোখে মাথা নাড়ে তুহিনা। 
-পাগলী তুই খুশি? তোর মাথা ভাঙুম।

মাথা ভাঙা আর হয় না। স্বজনদের চাপে আসাদ নূর রাজি হন রাগের মাথায়। মা আরেকটি মায়াবতী বিধবা মেয়ে খুঁজে আনেন। সুচিত্রা সেনের আদলে মেয়েটির বিষণ্ন মায়ামুখ সবার অন্তর স্পর্শ করে। ডাক্তার স্বামীর সাথে মটর সাইকেলে এক্সিডেন্ট করেছিল। মাদাম পোল থেকে নামতে গিয়ে খাদে পড়ে ওলটপালট হয়ে দু’জনই মারাত্মক জখম হয়; স্বামী চলে যায় ‘ময়ূরী ময়ূরী’ বলে। চোখের সামনে স্বামীকে দেখে কাঁপতে কাঁপতে শিথীল হয়ে যেতে। মন মরে যায় ময়ূরীর। কথা বলা বন্ধ করে পৃথিবীর সাথে। ময়ূরী হাসে না, আর কাঁদেও না। দু-বছর গড়িয়ে গেলে  বুঝিয়ে বুঝিয়ে বিয়েতে রাজি করায় মা-বাবা ও তিন ভাইবোনের পরিবার। স্তব্ধ ময়ূরী কোনো কথা না বলেই বিয়ের আসরে বসে। জীবন যখন পাথর হয় গড়িয়ে পড়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।

বিরাট গৃহস্থ ঘরে ময়ূরী কর্মী হয়ে ওঠে। ঘরের বৌ কাজ করবে না তো কী করবে? ভারী কাজ করতে কাজের লোকও রয়েছে । ধান মাড়ানো, শুকানো, সেদ্ধ করা, ঢেঁকিতে  কুটা, আতপ চাল, মরিচ ও হলুদের গুড়ি কুটা, চিঁড়া মুড়ি, খৈ ভাজা, ঝালের লাড়ু । আত্মীয় স্বজনদের নতুন শিশুর আগমনে এবাড়ি ওবাড়ি পিঠা পায়েশ পাঠায়। শাশুড়ি কাজের লোকদের তদারকি করেন। রান্না ও ঘর গোছানো বৌদের কাজ; চুপচাপ কাজ করে নতুন বৌ। শাশুড়ি শিখিয়ে দেন। হাড়িপাতিল ধুয়ে কোন মাচার উপর শুকাতে দিতে হবে? কোথায় কোন পিঁড়ি, কোনটাতে আগুনের দিয়াশলাই, কোনটাতে গন্ধকের শলা? চাল, ডালের মটকা, আটার টিন, তেলের শিশি, মসলাপাতি। আচারের বয়্যাম, কেরোসিনের টিন ও হারিকেন, দোয়াতের ও পেতলের চেরাগের সজ্জিত শোভা। বিশ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে তুহিনার যে অহংকার জড়ো হয়েছিল তা এ নবাগতর থাকার কথা নয়। নতুন মাটি সেপে আনতে বেশ লাগে। খুশি-খুশি শাশুড়ি ভাবে এ মেয়েই গর্বিত করবে  বংশ। ঘরবাড়ি পরিপাট করে রাখে ময়ূরী। কোঠায় গিয়ে টেবিলে রাখা বই পড়ে। বড় বউ তুহিনা  নতুন দালানে থাকে। নকশি কাজ করে, রেডিওতে গান শোনে, গুনগুন  করে। স্বামী হারানোর বেদনা প্রবোধের সুর। স্বামী নতুন বৌ নিয়ে তার কোঠায় থাকে। তার বালিশে ঠিক তার মতোই আসাদের হাতের উপর শোয়। সপ্তাহে একদিন তার ঘরে আসে। প্রতিদিনের গুঞ্জরণ অতীতের স্মৃতির মোড়কে বন্দি। তিনমাস পর স্বামী চুরি করে রাতে আসলে গভীর কান্নায় ভেঙে পড়ে। তার চেয়ে বেশি কাঁদে স্বামী; বকে কেন বিয়ে করাতে পিড়াপিড়ি করেছিস? এখন মর। রাত গভীরের কষ্টগুলো দিনের আলোয় ছড়িয়ে দেয় সূচীকর্মে। সে ভাবে কী তার প্রয়োজন এ সংসারে? টেনে টেনে জীবন দাঁড়ালো শূন্যের নামতায়। স্বামী কাজ থেকে আসলে উঠে আসে, খাবার বেড়ে দেয়। কোনোদিন ময়ূরীকেও ডেকে দুজনকে পাশাপাশি বসিয়ে খাওয়ায়। বড় সে; বড়দের ছাড় দিতে হয়। ছোটবেলায় মা সবসময় বলতেন, তুই বড়। ছোটদের দোষ খুঁজবি না। ময়ূরী ইতিমধ্যে পোয়াতি হয়ে সংসারের আশা ও আনন্দ পরিপূর্ণ করেছে। ময়ূরীকে স্বামী-স্ত্রী-শাশুড়ি মিলে যত্ন করে। 

বিয়ের দ্বিতীয় বছর পেরিয়ে গেলে নয় মাস সাত দিনের বদলে চার দিন পর সংসারের কোলে আসে রঙ।  জীবনের রঙ-রূপ মূর্ত হোক রঙে। হিংসার বদলে খুব খুশি হয় তুহিনা। একটি মিষ্টি নতুন মুখ গান হয়ে উঠে। ময়ূরীর চেয়েও বেশি আনন্দে জড়িয়ে নেয় শিশুটিকে। যত্ন, মমতায় ঘিরে রাখে। রঙের পায়খানা, প্রস্রাবের কাঁথা মায়ের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে নিজেই পরিষ্কার করে আনে। বয়সে ও কর্মে দক্ষ  তুহিনা সন্তানের যত্নের মূল হয়ে দাঁড়ায়। ময়ূরী থাকে সাংসারিকতায় জড়িয়ে। শাশুড়ি ও কাজের লোকের ডাক তার দিকেই বেশি। স্বামী ফিরে আসে স্বরূপে। স্কুল থেকে ফিরে তুহিনার ঘরেই আসে। রঙকে নিয়ে আহ্লাদ করে। তুহিনাকে রঙ ডাকে মা, নিজের মাকে ‘ময়ূ মা’। তুহিনার সাথে সাংসারিক জটিলতার যে ব্যবধান বা কষ্টের স্তর জমেছিল তাতে পলি জমে জমে নতুন মাটির মতো নরম হয়ে আসে, চারা বাড়ে। নব বিবাহিতের মতো আদর-আহ্লাদ, মান অভিমানের সুর নতুন করে গুনগুনায়।  হাড়িপাতিল ধুতে ধুতে, এ ঘর ও ঘর দৌড়াদৌড়ি করতে করতে, রান্নার ধোঁয়ায় ঢলে পড়া চোখের জল মুছতে মুছতে ময়ূরী লক্ষ করে অটুট বন্ধনের চালচিত্র, আবেগের মধুলতা কিভাবে জড়িয়ে ধরে আবেগ। ময়ূরী দেখে তার ঘরে আসা স্বামীর রাত কমতে থাকে। আসলেও তা নিরাবেগ দেহজ বন্ধনে সীমাবদ্ধ। বয়সের ব্যবধানও চোখ মেলে। স্বামীর আদর ও জ্ঞানবোধ ময়ূরীকে জীবনের প্রতি সচল করেছিল কিছুটা। স্বামীর সাথে টুকটাক কথা বলা শুরু করেছিল ধীরে ধীরে। শিল্পমনা স্বামীর কবিতা ও উপন্যাস পাঠ তাকে নতুন এক জগতের সন্ধান দিচ্ছিল। কিন্তু এখন সময়ের গড়ানো চাকায় সে ধীরে ধীরে শুধু তুহিনার স্বামী হয়ে উঠে। ময়ূরী গল্পের কোন চরিত্র নিয়ে আলোচনা করে কিংবা উপন্যাসের কাহিনি। আসাদের শিক্ষা ও রুচির প্রশংসা করে। প্রশংসায় উদ্বেলিত না হয়ে আসাদ আন্তরিক আলোচনা করে বটে, তা যেন শিক্ষক ছাত্রীর আলোচনার মতোই একপাক্ষিক। ময়ূরী আত্মমগ্ন হয়ে পড়ে। মথ হয়ে উড়তে চাওয়া শুককীট গুটিয়ে থাকে নিজের গুটিতে। 

এক বছর পর থেকে রঙ তুহিনার কাছে ঘুমায় বেশি রাত। ময়ূরীর দিনে রাত কাটিয়েই ভোরে আসাদ  তুহিনার ঘরে ফিরে । কেরোসিনের চুলায় চা বানিয়ে দু’জন পুকুরের দিকের বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে চা-বিস্কুট খায়। দুই-মা ও বাবার আদুরে রঙ ঘুমায় বিছানায়। ওদিকে কুয়োর জলের স্তব্ধ দিনরাতের হাহাকারে রক্তের স্পন্দনে আবার পরিবর্তন লক্ষ করে ময়ূরী। সকালের বিছানা থেকে উঠতে কে যেন টেনে ধরে! ঘুম কিছুতেই ভাঙতে পারে না। দম বন্ধ, দম বন্ধ। দালান থেকে তুহিনা ও আসাদের হাসির উচ্চরোল। সহস্র সুঁই, সহস্র বেলের কাঁটা লাউয়ের মোরব্বার মতো কেচতে থাকে কলিজা। জোর করে উঠে পড়ে। ‘না, বুঝতে দেয়া যাবে না এ বাড়িপক্ষকে।’ সেই মোটর সাইকেলসহ পড়ে যাওয়া ময়ূরী আজও মাদাম পুলের নীচে কাতরায়। সন্তান জন্মদানের কষ্ট নেবার মতো শারীরিক ও মানসিক কোন বলই নেই। সংসার খেয়ে নিয়েছে অন্তঃসার। খোলসটুকু নিয়ে বেঁচে থাকবে স্মৃতির সাগরে ডুবে ভেসে। শাশুড়িকে অনুনয় বিনয় করে মা-বাবার বাড়ি যায়। বান্ধবী মোহনাকে নিয়ে লক্ষ্মীপুর হসপিটালে বাচ্চা ছোট আর এখন বাচ্চা চায় না বলে বোঝায় নার্সকে। ৩০০ টাকার বিনিময়ে নার্স সুরভী ভ্রূণটিকে কুচে কুচে ফেলে জরায়ু পরিষ্কার করে দেয়।

খবর ঠিকই বানের জলের মতো ঢোকে আসাদ মাস্টারের স্কুলে। এ কী করেছে ময়ূরী! কোথাও ফাঁক পড়ে গেছে ফাঁকে! ততদিনে ছোট ভাইকে নিয়ে ফিরে এসেছে সংসার কর্মে ময়ূরী। প্রেমহীন এ ঘানি টানাও  শ্বাসবন্ধকরা অভিধান। মনের মধ্যে উঁকি দেয় মহীমের সাথে সংসারী সুষমা অলঙ্কার। শ্রদ্ধা, আদর আর ভালোবাসার উড়ো হাওয়া ভরা হাসিমাখা কারুকাজ।  দিন আজ একা একা এ অদৃশ্য পারাবারে ঢেউয়ের সন্তরণে। ঘরে ফিরে এসে আসাদ মাস্টার ময়ূরীর মুখোমুখি হয়। স্কুল পালানো ছাত্রীর সামনে  যেমন লাল হয়ে উঠে চোখ, হাতে উঠে আসে বেত তেমনই মারমুখো, বাক্যাঘাতে রক্তাক্ত ময়ূরীর মনের দেহকাণ্ড। ফুঁসে উঠে ময়ূরী। রঙকে কোলে করে উঠানে– স্তূপ করে রাখা আমন ধানের খড়ের গাদায় ছুঁড়ে মারে মেয়েকে। 

-লও তোমার সংসার, হুনো, আমি তোমার বাইচ্চা বানানোর মেশিন না, সেলাম গেলাম। 

বিস্মিত আসাদ মাস্টার তাকিয়ে থাকে একি সেই! কথা না বলা লবঙ্গ লতিকা সবার অবিচারের দায় নিয়ে চলে যাচ্ছে একটি ছাতা মাথায়, তিন মাইলের দীর্ঘপথ বাপের বাড়ি কোণাগ্রাম অভিমুখে। যেখানে পড়ে আছে বিরহী, বিষণ্ন, রক্তাক্ত অতীত।

ময়ূরীর বিদায় খুশি করে তুহিনাকে। স্বামী ও সন্তান দুটোই রইলো। উদাস ময়ূরীর কাছে কৃতজ্ঞ থাকে সে।  মনে খুশির রঙ মাখিয়ে শাশুড়ির সাথে ঘরকন্নার কাজে হাত বাটায়। “আনন্দধারা বহিছে ভুবনে। ‘মধুর মধুর ধ্বনি বাজে/ হৃদয়কমল বন মাঝে।’ তুহিনার আনন্দে সকলের অগোচরে লাল হয়ে ফোটে ডালিম গাছটি। বকুলের থোকা সুঘ্রাণ ছড়ায় সংসারী বাতাসে। শীত পুকুরের জলে স্নান করে উঠানের রোদে পিঠে ছড়িয়ে দেয় দীর্ঘ কালো খোলাচুল। হিম হিম বাতাস ঢেউ খেলে চুলে; তুহিনার মনে সুখের তরণী বয় কুলকুলকুল। কোনো দরিদ্র পরিবার থেকে একটি ছেলে পালকপুত্র করার কথা ভাবে সে। দুজনের ভালোবাসা উজাড় করে ঢেলে দেবে সংসার গড়ার কাজে। মাঝের হেলার কথা ভেবে নিজেকে অপরাধির কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। পুরুষরা যেখানে নারী শিকারির ভিড়ে তার স্বামী জ্ঞান ও ভালোবাসা চর্চারত। তুহিনার মন আনন্দরসে মেঘবতী, ফুলবতী ও ফলবতী হয়ে ওঠে। ভোরের সাথে সাথে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে। সংসারের কাজে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়। দোতলা কাঠের খোয়াড়ের নীচতলায় হাঁস ও উপর তলায় মুরগির বসবাস। হাঁস-মুরগির খোয়াড় খুলে আনমনে তাকিয়ে থাকে হুড়োহুড়ি করা হাঁসমুরগির দিকে। নিজের কেনা ও প্রিয় অনেকগুলো হাঁসমুরগি আছে। কালো-সাদা, খয়েরি বরণ। ফুটফুটে নানারঙের মিতালি। আহা আজ মনে এত সুখ, এত আনন্দ! কাজের মেয়ে খুকিকে দিয়ে হাঁস, মুরগির ডিম সংগ্রহ করায় ঝুড়িতে। মনটা আবারও গর্বানন্দে ফুলে উঠে। শাশুড়ি বের হয় এবাদতখানা থেকে। মুখ দেখে বোঝা যায় না তিনি কেমন আছেন? স্টোভে চা বানিয়ে শাশুড়িকে দেন বিস্কুটসহ, স্বামীর জন্য চা ও বিস্কুট নিয়ে আসেন। স্বামী ঘুম ভেঙে অচেনা চোখে তাকিয়ে থাকে শুধু। মুখ থেকে বাদলা দিনের রোদ উধাও হয়ে মেঘ জমে। 

-কী হলো গো মাস্টার? শরীর ভালো?

‘হু’ একটি শব্দ করে মাস্টার উঠে পড়ে বিছানা থেকে। গম্ভীরমুখে চা পান করে। টোস্টের শব্দটাই সারা দালানঘর জুড়ে ধ্বনি প্রতিধ্বনি তোলে।  নানা প্রশ্নবানে আবদ্ধ করেও উত্তরহীন বা বিলম্বে উত্তর মেলা। দীর্ঘদিন এ চর্চা চলতে থাকলে তুহিনার পাঁজর ভেঙে ভেঙে খান খান হতে থাকে। ময়ূরীর উপস্থিতিও যে আসাদ নুরকে টলাতে পারেনি ভালোবাসা ও আদর আহ্লাদ থেকে; সে কেমন অচেনা, বিড়ম্বিত, হতাশাগ্রস্থ আর নিঃস্ব! তুহিনার কান্না, আবেগ ও প্রেমরাশি ভেসে যেতে থাকে উত্তরী হাওয়ায়। বনের বিবর্ণ গাছগাছালি, পুকুরের ঢেউ স্তব্ধ নির্লিপ্ত। ঘরের চালে শিমের বোটার ফুল ঝরতে শুরু করেছে। তুহিনা সেদিকে তাকিয়ে কাঁদে। ছোট রঙ চোখ মোছে , মা তান্দো কা? মা তাকে জড়িয়ে ধরেই কাঁদে মরণ কান্না। এ কান্না হৃদয়ের অন্তদহনে শুধু নয় এ যে দাফন, মনের দাফন।

এস.এস.সি পরীক্ষা শেষ হলে প্রায়ই রাত করে বাড়িফেরা আসাদ মাস্টার টানা ঘুম দেয়। ঘুম থেকে উঠে ফুরফুরে মনে বসলে পুকুরের দিকের বারান্দায় বিকালের চায়ের আসর আনন্দময় হয়ে উঠে। রঙকে নিয়ে হাসে, গল্প করে। স্বস্থির শ্বাস ফেলে তুহিনা। ফিরে পায় আনন্দ অভিসার। উঁইপোকা খেয়ে ফেলা অংশটুকু সারাবে হৃদয়ের আলো জ্বালিয়ে।  ‘হারায়ে হারায়ে বন্ধুরে আবার ফিরে ফিরে পাই গো।’  কি যেন বলতে চেয়ে পরে বলবে বলে বের হয়ে যায় আসাদ মাস্টার। ঘরে বসেই ক্ষণ  গোনে তুহিনা। শাশুড়িকে বড় ঘরে খাবার দিতে যায়। কিন্তু সে ঘরে আরও অনেক বাড়ির গৃহিণীদের সমাবেশ।  গল্পের চাপানো কণ্ঠের রেশ কান ছোঁয়- ‘আবার বিয়া কইরছে ক্যা গো মাস্টার, তাও কইচ্চা মাইয়া? পরীক্ষা দিছে হবে!’ বুঝতে পারে তুহিনা। মাস্টারের অস্থিরতা ও গুম হয়ে থাকা। মাস্টার তবে ছুটে চলছে মাংসের ঘ্রাণের দিকে। মেরুদণ্ডে উত্তর গাঙের শীতবাতাস, বিষের থোকা হাড়ে-হাড়ে, কোষে-অনুকোষে। সংসারটা গিলে ফেলছে অক্টোপাসের বাহু। সুপারি বাগান, কাঠ বাদাম তলা, পুকুর ঘাট, সুপারি গাছের সাথে ঝুলানো দোলনা তুহিনার চোখের জলে ভেসে যেতে থাকে। পরদিন কাউকে কিছু না বলেই চাচাতো দেবর বাবলাকে দিয়ে রিকসা ডেকে রঙকে শাশুড়ির কোলে রেখে চলে যায় তুহিনা।

তুহিনার চলে যাওয়া বুকের ভেতরের অনেকাংশ  খালি করে  আসাদ মাস্টারের। বাজারের চায়ের দোকানে বসে শুনেছেন চলে যাওয়ার খবর। এ জীবন শূন্য মরীচিকা কার পেছনে তবে এলোমেলো পা ফেলে হেঁটে চলেছেন বিকেলের বুকের উপর দিয়ে? তিনি তো বুঝেছিলেন বেশ আগেই এ প্রকৃতি কেবল সৃষ্টি আর ধ্বংসের খেলা। নিজের অজান্তে মনের বাঁধন আলগা হলো।  দীর্ঘদিনের ধরে রাখা নাটাইয়ের সুতো কেটে গেছে। গোত্তা খাওয়ার অপেক্ষা। সে অপেক্ষার পা ফেলে মাস্টার বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে কৃষক হজমের বাড়ির দিকে… পাঠকাঠির বেড়ার ফাঁক ভরানো নীল পলিথিনে  ঠিক করে রাখা বাসরকক্ষে  ঢোকেন। তৃতীয় নববধু ডাক্তার হতে চাওয়া এস.এস,সি পরিক্ষার্থী প্রিয় স্কুলের ফাস্ট  ছাত্রী হিরামণি। হিরামণি না সুরাইয়া? ডাক্তার ঘোর নিয়ে ঘরে ঢোকে। নিজের ওড়না প্যাচিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়েছে ঘরের রুয়ার সাথে। হিরামণির হাতে মেহেন্দি, পায়ে আলতা, পরনে টাঙ্গাইল জামদানী। মাস্টারের মুক্তির বাণীর বিমুগ্ধ শ্রোতা হিরামণি লোভের প্যাচে আটকে পড়েছে ছটকার মাছের মতো। ময়ূরী ও তুহিনার বিদায় হৃদয় শূন্য হয় আগেই; তারপরও এসেছিল যা রক্ষায় হিরামণি সেটুকু মুছে দিয়ে গেল। ঝুলন্ত দেহের দিকে তাকিয়ে নির্বিকার মাস্টার।  নতুন বর-কনেকে পান-চিনি ও শরবত দিয়ে একা রেখে দিতে হয়। কোনো সাড়াশব্দ নাই দেখে হিরামণির ভাবি ঘুমুতে যাবার আগে একচক্কর দিয়ে যেতেই দরোজার ফাঁকে জামদানী পরা আদরের হিরামণ পাখিকে ঝুলে থাকতে দেখে। চলৎশক্তিহীন আসাদ মাস্টারকে এম্বুলেন্স ডেকে সকালে শহরে হাসপাতালে নেয় জমাদ্দার বাড়ির প্রাক্তন ছাত্র দালাল খান। পথেই পৌঁছে গেছে হিসাবের, ভোগের, আবেগের ঊর্ধ্বে আসাদ নুর মাস্টার। শিক্ষার আলো ধ্যানে, প্রগতির  সোপান প্রাণে নিয়েও সমাজের পরিবারের লোভের জিহ্বে পেঁচিয়ে পথ শেষ করলেন সময়ের আগেই। যদিও সময়ের কোনো মাপনযন্ত্র নেই, নেই গজ ফিতা, সেলুলয়েড শিল্পের মতো গুছানো কোনো চিত্রনাট্যও। শুধু স্বপ্ন আর সংগ্রাম আর আশার কূহক জালের গোলক ধাঁধাঁ। উত্তরসুরী রঙ এ সমাজের বাহুতলে। উচ্চাসন নয়, সমাদর নয় তাকে ঘিরে স্বপ্নের গুঞ্জনও  নয়। আছে একাকীত্ব ও নিগৃহীতের অসীম যাপন।

দু-বছর পর তুহিনা আসে প্রাপ্য সম্পত্তি আদায় করতে। কোলে ছয় মাসের এক পুত্রশিশু। কামানখোলা হাইস্কুল হেডমাস্টারকে বিয়ে করার ফলাফল দেখে সবাই হায় হায় করে!


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Trending