একটা নদী ভাঙনের শব্দ
-আতিকা হাসান
ভোর ছ’টায় মিতুর ফোন পেয়ে আমি ভীষণ অবাক হলাম। তড়িঘড়ি করে ফোনটা ধরে
বললাম, ‘হ্যালো মিতু, কি হয়েছে? এত সকালে ফোন করেছিস কেন?’
আমার কণ্ঠে ভয় ও উদ্বেগ মেশানো। উদ্বিগ্নতার কারণ গতরাতে মিতুর বিয়ে হয়েছে, বিয়ে হয়েছে চব্বিশ ঘন্টাও পার হয়নি। সে এখন নতুন বউ। তার এখন বাসর ঘরে ঘুমিয়ে থাকার কথা। এর মধ্যে এমন কি হলো যে এত সকালে কল করতে হলো।
ফোনের ওপাশে চুপ।
আমি ওকে চুপ থাকতে দেখে আরো উৎকণ্ঠা নিয়ে বললাম, ‘বল, কি হয়েছে? তুই ঠিক আছিস তো?’
সে কান্নাজড়ানো কন্ঠে বলল ,’আপু,আমার ভালো লাগছে না!’
আমি তো মহাবিস্মিত! এক মুহূর্তের মধ্যে আকাশ পাতাল চিন্তা করেও ভালো না লাগার কোনো কারণ খুঁজে পেলাম না।
বললাম, ‘বলিস কি? ভালো লাগছে না কেন?’
ওপাশে আবারও চুপ।
আমি আরো উদ্বিগ্ন হয়ে বললাম , ‘কি হয়েছে মিতু? …বল, কি হয়েছে?’
সে পুণরায় বলল, ‘আপু আমার ভালো লাগছে না!’
আমি কি বুঝলাম জানিনা, তবে চুপ করে গেলাম। হঠাৎ বুকের গহিন থেকে একটা নিদারুণ কষ্ট দলবেঁধে জেগে উঠে ছড়িয়ে গেল কন্ঠ বরাবর। পাঁজর ভাঙা ঢেউ ক্রমাগত আছড়ে পড়তে লাগলো শিরোনামহীন ব্যথার করতলে। মেয়ে হয়ে জন্মানোর ক্লেদে ছেয়ে গেলো পুরো দেহমন।
ফোনের দু’পাশে দুজন মানুষ নীরবে কাঁদছে। মাঝে মাঝে নাক টানার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে শুধু।
নিজেকে একটু সামলে নিয়ে হঠাৎই আমার মনে হল খুব একটা খারাপ কিছু হওয়ার কথা তো নয়। নিশ্চয়ই নিজের সুখের জন্য ভাইদের বঞ্চিত করলো কিনা সারারাত সেই টেনশন করেছে। পরিবারের কথা চিন্তা করেই হয়তো খারাপ লাগছে। সমস্যাটার আমি নিজে নিজেই সমাধান বের করে একটু যেন স্বস্তি পেলাম।
তারপর ক্ষীণস্বরে বললাম, ‘জীবন তো এমনই সোনা।
কয়দিন যাক দেখিস সব ঠিক হয়ে যাবে। তখন জামাইয়ের এমন ন্যাওটা হয়ে যাবি যে, আমাদের কথা মনেই থাকবে না।’
‘সিয়াম কি করে?’
‘ ঘুমায়।’
‘তুইও যা ওর পাশে ঘুমা। আর একটু বেলা হলে উঠিস।’
এই হচ্ছে মিতু , এক চলমান ইতিহাস। আঁধারের ধাবমান ধ্বনিতেও যে থাকে নীরব , স্থির। দূর দিগন্তের একবিন্দু আলোর ইশারাকে সঙ্গী করে ডানার নীচে নিজের সহোদরদের আগলে যে চলতে থাকে নির্বিঘ্নে। চলার পথে গায়ের উপর উড়ে আসা ধুলো-ময়লাকে যে ঝেড়ে ফেলে অনায়াসে,বিনা বাক্য ব্যয়ে। সে যেন শেকড় জলের অবয়বে জীবনধাত্রী এক বৃহৎ বনস্পতি । যার ছায়ায় খুঁজে পাওয়া যায় সুশৃংখল জীবন, নিরাপদ আশ্রয় ও পথের দিশা।
মিতুর বাবা যখন ওদের চার ভাই বোনকে রেখে মারা যান তখন ওর বয়স ছিল বিশ বা একুশ বছর। অনার্স ফার্স্ট ইয়ারের শিক্ষার্থী | ছোট তিন ভাইয়ের কেউ ই এসএসসি পর্যন্ত শেষ করতে পারেনি। সবচেয়ে ছোট ভাইটি ক্লাস ওয়ানে পড়ে। মা একজন গৃহিনী।
বাবা চলে যাওয়ার বেশ কয়েকদিন পর পরিবারের সবাই মিলে একটা মিটিং বসলো। ওদের পরিবার বেশ বড় এবং সবাই বেশ অবস্থা সম্পন্ন। মিটিং শুরু হওয়ার আগ থেকেই চাচা ,ফুফুদের চোখে মুখে দারুন আতঙ্ক। ছোট ছোট ছেলেমেয়ে রেখে বড় ভাই মারা গেলেন না জানি তাদের উপর কি দায়িত্ব বর্তায়। যদিও এই ভাই ছোটবেলায় বাবা মারা যাওয়ার পর সব ভাই-বোনদের মানুষ করেছেন, বোনদের ভালো ভালো ঘরে পাত্রস্থ করেছেন।
যাই হোক, মিটিং চলাকালীন বাবার এক মামা বৈষয়িক কথা উঠালেন।
বললেন, ‘রায়হানের একটা লোকাল বাস এখনো গাজীপুর থেকে টাঙ্গাইল রুটে যাতায়াত করে বলে জানি। যদি তাই হয় তবে বাসের আয় দিয়ে অন্তত পরিবারে কিছুটা সাহায্য হবে, বাকিটা তোমরা তো আছো।’
শুনে বড় চাচা তড়িঘড়ি বলে উঠলেন, ‘ওই বাস বড় ভাই আমার নিকট অনেক আগেই বিক্রি করেছেন মামা , যা হয়তো পরিবারের কেউ জানে না।’
এই কথা শোনার পর সবাই কেমন যেন অবাক ও বিস্ময়াভূত হয়ে গেল কিন্ত কেউ কিছু বলল না। মিতুও যারপরনাই বিস্মিত হয়ে গেলে। বলেন কি তিনি , এত বড়ো জালিয়াতি। তবুও মিতু কিছু বলল না। সে চাচ্ছিল কেউ একজন এর প্রতিবাদ করুক। কেউ একজন বলুক এটা পুরোই মিথ্যা। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ যাবার পরও যখন কেউ কিছু বলল না, তখন মিতু চোখে যেন অন্ধকার দেখছে। নিজের মানুষে এত বড় বিস্ময়! পৃথিবীতে এর চেয়ে বিস্ময় যেন আর নেই !
তবুও আরো কিছুক্ষণ সে সবাইকে পর্যবেক্ষণ করছিল কেউ কিছু বলে কিনা তা শোনার জন্য। ছোট চাচা, ফুপুরা সবাই নিশ্চুপ। মামারা মিতুদের পরিবারের ব্যাপার বলে কেউ কোন কথা বলছেন না , শুধু শুনছেন। বড় চাচার এমন বাক্য শোনার পর মনে হল সবাই চোখে চোখে, ইশারায় কথা বলছে কিন্তু সে ইশারা, চোখের ভাষা মুখে উচ্চারিত হচ্ছে না। মিতুর মনে ক্ষীণ আশা ছিল হয়তো এমন সময়ে বড় চাচা,বাবার পরেই যার স্থান, তিনি নিশ্চয়ই বড় ভাইয়ের পরিবারের দায়িত্ব নেবেন। আর পুরো দায়িত্ব না নিলেও ছায়া হয়ে পাশে দাঁড়াবেন। উল্টো তিনি বলেন কি!
সবাই যখন নিশ্চুপ, করো মুখে রা শব্দটি নেই। তখন মিতু আর চুপ করে থাকতে পারলনা!
বড় চাচার দিকে ঠান্ডা দৃষ্টি রেখে বলল, ‘বাবা, আপনার নিকট বাসের পুরোটা বিক্রি করেছেন আমাদের কিছু বলেন নি তো! বাবা পুরো শেয়ারটা বিক্রি করলেন? আমাদের কথা একবারও ভাবলেন না?’
বড় চাচা বিরক্ত হয়ে বললেন,’সব কথা তোকে শেয়ার করার মত বয়স তোর হয়নি মিতু! তুই বেশি বুঝিস না!’
পুরো মিটিং জুড়ে পিনপতন নীরবতা। সবাই কেমন যেন স্থবির হয়ে গেছে, হাত পা নাড়াতে পর্যন্ত ভুলে গেছে। কোন আপনজন যে এমন হতে পারে সে সম্পর্কে মূল শিক্ষাটা এখনো মিতুর হয়নি। হয়তো বয়স কম বলে। হয়তো দেখার, জানার পরিধি মাত্র শুরু হল বলে। মিতু অনুধাবন করল নির্জন অরণ্যে সে একজন একাকি নিঃসঙ্গ মানুষ। তার এই দুঃখ, কষ্ট, হতাশার চোরাবালি থেকে উদ্ধার করার কেউ নেই। তাকে চলতে হবে একা, পরিবারের ভার বহন করতে হবে একা। আর তখনই মনে হল হঠাৎ সে অনেক বড় হয়ে গেছে…।
বেশ কিছু সময় চলে যাওয়ার পর মিতু বুকের তলে এক নীরব কষ্ট চেপে রেখে বলল , ‘ঠিক আছে আপনি আমার বড় চাচা, আপনি তো আর মিথ্যা বলতে পারেন না। আমি আপনার সব কথাই মেনে নিলাম।’
আর আপনারা যারা আছেন তাদের উদ্দেশ্যে বলছি,’আমার বাবা যদি আপনাদের করো কাছ থেকে কোন ঋণ করে থাকেন তবে সেটাও বলুন, আমি আমার বাবার সকল ঋণ দিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব। ‘
মিতুর কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে বড় ফুফু বললেন, ‘আমিও তোর বাবার নিকট পঞ্চাশ হাজার টাকা পাই। গত ক’মাস আগে ভাইয়াকে যখন প্রথম হাসপাতালে ভর্তি করা হলো তখন নিয়েছিলেন’, বলে বড় চাচাকে সাক্ষী মানলেন।
সকলের চোখ বিস্ফোরিত। ঘড়ির কাঁটা যেন চলতে ভুলে গেছে। থেমে রইল সময়। এবার যেন মিতু একজন পরিপূর্ণ মানুষ। তার মনে হলো মানুষ ও পশুতে তফাৎ এই যে, মানুষের জীবন সুন্দর চিন্তা দ্বারা, সামাজিক স্বার্থ দ্বারা এবং পশুর জীবন নিজ স্বার্থ ও দৈহিক প্রয়োজনের তাড়নায় পরিচালিত হয়।
এবার মিতু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘ঠিক আছে ফুফু, আমি জানি আপনি বাবার নিকট কিছু টাকা পান তবে এতগুলো টাকা যে পাবেন সেটা জানি না। আমাকে একটু সময় দেন আমি আপনাদের সব টাকা শোধ করে দেবো ইনশাআল্লাহ।
আমি চাইনা আমার বাবা আপনাদের মত আপন ভাই বোনদের নিকট ঋণী থাকুন!’
সেদিনের পর থেকে মিতু নিজের পরিবারকে এমনভাবে ছায়ার নিচে আগলে রাখল যে, বাইরের কোন মানুষের পক্ষে আর ভিতরে প্রবেশ করা সম্ভব হয়নি। বাস্তব জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত, সমস্যা গুলোকে সে একটা আদর্শের সীমারেখায় ধারণ করে এবং সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে সেগুলোর সুন্দর সমাধান করে। সে তার পরিবারকে একটি চমৎকার শক্ত বেষ্টনীর মধ্যে নিগূঢ় বিশ্বাসে সীমাবদ্ধ করে রাখে। যাতে বাইরের কোন ক্ষুদ্রতা, পঙ্কিলতা ও নিচুতা তাদের ছুঁতে না পারে, স্পর্শ করতে না পারে।
আমি অবাক হয়ে দেখি আর ভাবি একটা ছোট মেয়ে কি পরিমান মনোবল ও কত দৃঢ়তার সাথে ছোট ভাইদের মানুষ করে যাচ্ছে, কত তার ধৈর্য ও সহ্য ক্ষমতা। ভাইদের সমাজের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সে ভুলে গেছে নিজের জীবনের কথা,নিজের ভবিষ্যতের কথা। তাদের জীবনের আমানতদারিত্ব নিয়ে সে দৌড়াচ্ছে অবিরাম। একটা দৌড় প্রতিযোগিতায় গন্তব্যে পৌঁছানো যেন তার প্রধান উদ্দেশ্য।
আর একদিন সত্যি সত্যিই সে পৌঁছেও যায় কাঙ্খিত গন্তব্যে…
গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে তাকে যে কত ঘাত প্রতিঘাতের সম্মুখীন হতে হয়েছে ,কত যে কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে যার কোন সীমা পরিসীমা নেই। যেহেতু সে চাকরি করে, ভালো বংশীয় মেয়ে, দেখতে শুনতে ভাল সেহেতু ভালো ভালো ঘর থেকে প্রায়ই তার বিয়ের প্রস্তাব আসে। প্রতিনিয়ত এই ব্যাপারটার সাথেও তাকে সংগ্রাম করেতে হয়। যত ভালো পাত্রই হোক না কেন,বয়স হয়ে যাচ্ছে বলে নানাজন নানান কথা বললেও সে নিজ সিদ্ধান্তে অটল থেকেছে। বাইরের কোন রঙিন হাতছানিই তাকে দায়িত্ব থেকে টলাতে পারেনি ।
একদিন স্কুলের কলিগ একটা ভালো পাত্রের কথা ওকে বলার সাহস না পেয়ে হেড মিস্ট্রেসের নিকট উপস্থাপন করেন। বড় মিস সরাসরি মিতুকে কিছু না বলে আমাকে বলেন ওর সাথে কথা বলার জন্য কারন তিনিও জানেন ওর একাগ্রতার কথা।
সেদিন ক্লাসের ফাঁকে বললাম,’একটা কথা ছিল মনোযোগ দিয়ে শুনবি।’
আমার কথা বলার ধরন দেখেই সে কেমন যেন বুঝে ফেলল।
হেসে বলল , ‘কি বলবেন মনে হয় বুঝতে পেরেছি!’
আমি বললাম,’কি বলতো?’
‘আচ্ছা থাক! আপনিই বলেন কি বলবেন।’
বললাম, এখনতো ভাইয়েরা মোটামুটি বড় হয়েছে। অনেক ভালো একটা পাত্র আছে, বিয়ে করবি?
তার সরাসরি উত্তর, ‘না আপু ! এখন বিয়ে করলে ভাইরা মানুষ হবে না।’
‘কিন্তু সময় তো থেমে থাকবে না মিতু ,বয়স হচ্ছে বুঝিস তো।’
‘কিন্তু,কোন ছেলে কি আমার ভাইদের মানুষ করার দায়িত্ব নেবে আপু ? নেবে না।’
হয়তো আমি যে চাকরি করি আমার ইনকামের উপরেও তার একটা হিসাব থাকবে। তখন আমার ইনকামও আমি আমার ভাইদের দিতে পারব না। তাহলে বলেন আমার ভাইরা মানুষ হবে?
ছোট ছোট ভাইদের অকুলের ভাসিয়ে আমি সুখী হতে পারব?
বিয়ে এমন কিছু নয় আপু। না হয় কয়েকটা জীবনের সুখের বিনিময়ে আমার একটা জীবন উৎসর্গ ই করলাম। তাতে আমি যাই থাকি না কেন, ওরা তো ভালো থাকবে, আম্মা তো ভালো থাকবেন।’
এরপর আমি শুধু অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ। ক্লাসের ঘন্টা পরলে ওর পিঠে আলতো স্পর্শ করে বললাম, ‘ঠিক আছে, তাই হোক!’
ক্লাসে যাওয়ার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে আমার মনে হল যে মানুষটা পরিবারের জন্য এমন ত্যাগ করছে তার জন্য নিশ্চয়ই সৃষ্টিকর্তা অন্যরকম হিসাব করেছেন। যা হয়তো আমাদের মত মানুষের বোঝার বাইরে।
আর এভাবেই একদিন মিতুর ছোট দুইভাই একজন ব্যাংকে, একজন প্রাইভেট ফার্মে ভালো বেতনে জয়েন করে এবং ছোট ভাইটিও বিবিএ ভর্তি হয়।
আমি সায়মা, মিতু আমার জুনিয়র কলিগ। অনার্স শেষ করার পর সে আমার কলিগ হয়। আমার ছোট বোনের নামে নাম বলে চাকুরীর প্রথম দিন থেকেই সে আমার বোন হয়ে যায়। যে কোনো কাজ করতে বা কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সে আমার সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। শিক্ষার্থীরা অনেকে মনে করে আমরা দুজন মায়ের পেটের দুই বোন।
যাইহোক, একদিন চোখ মুখ সাংঘাতিক রকমের উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল ছুটির পর কথা আছে।
‘আমি হতবাক ! কি কথা ? এখনই বল, ছুটির পর কেন!’
মিতু বলল, ‘এখননা ছুটির পরেই বলবো!’
ছুটির পর সে যা বলল তাতে আমি অসম্ভব খুশি হয়ে বললাম,’বাহ! এটা তো খুবই খুশির কথা!
এতো ভালো ছেলে, সরকারি কর্মকর্তা আবার তোর শর্তগুলো সে মেনেও নিয়েছে। এমন ভালো পাত্র, আলহামদুলিল্লাহ!’
‘তাহলে আপনি বলছেন ভালো হবে?’
‘অবশ্যই!’
‘সত্যি বলছেন তো.. নাকি!’
‘আরে সত্যি বলছি! তুই একদম চিন্তা করিস না ! গার্ডিয়ান এর উপর ছেড়ে দে,দেখিস সব ভালো হবে ইনশাল্লাহ!’
গায়ে হলুদের দিন সকাল বেলা মিতুর ফোন, কেমন যেন শব্দ, প্রতিধ্বনি..
আমি বললাম হ্যালো মিতু , ‘কেমন আছিস ? কি হয়েছে?’
‘কিছু হয়নি আপু! একটা কথা জিজ্ঞেস করার জন্য ওয়াশরুমে এসেছি কেউ যাতে না বুঝে। ‘
আমি হেসে বললাম,’কি কথা?’
‘খালারা বলছেন আমার নাক ফুটো করে নাকফুল পড়তে! তাই পার্লারে নিয়ে যেতে চাচ্ছেন। আমাকে কি নাকফুল পরলে ভালো লাগবে ? সত্যি করে বলবেন? আপনি না করলে কিন্তু যাব না।’
আমি অবাক হয়ে হাসলাম এবং মনে মনে ভাবলাম এত মানুষ থাকতে…
‘আরে ভালো তো! তোকে নাকফুল পরলে অনেক সুন্দর লাগবে! তোর গায়ের রঙের মেয়েদের সোনার নাকফুল, সোনার গহনা পরলে সুন্দর দেখায়,মানায়! যা না ফুটো করে আয়।’
মিতু খুশিহয়ে বলল, ‘আচ্ছা।’
এরপর আর ওর সাথে আমার কথা হয়নি। বিয়েতে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু হঠাৎ পারিবারিক সমস্যার কারণে আমার আর সেখানে যাওয়া হয়নি।
ওই দিনের পর থেকে আমি আর ভয়ে ফোন দেই না। ৪-৫ দিন পর স্কুলে আসে! সবাই শুভেচ্ছা বিনিময় করে! আমি প্রথমে কাছে যাই না। এটা ওটা কাজের ভান ধরে আরচোখে বারবার ওর মুখের দিকে তাকাই! ওর মনের অবস্থা আন্দাজ করার চেষ্টা করি। সকলের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় শেষ হলে ও আমার পাশে এসে বসে! আমাদের বসার টেবিল পাশাপাশি। আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে হাত ধরে দেখি হাতটা কেমন যেন বেশি ঠান্ডা। নিচু স্বরে বললাম, ‘এখনো তেমনি আছিস দেখছি। নিজেকে একটু সময় দে,দেখবি সব ঠিক হয়ে গেছে।’
অফিসে জয়েন করার পর সে আগের চেয়েও বেশি আমার ন্যাওটা হয়ে গেলো। ক্লাসের ফাঁকে আমিও ওকে সময় দিতে লাগলাম। যাতে ও সহজ হয়, জীবনটা বুঝতে শেখে।
ওর হাজবেন্ডের নাম সিয়াম, তার পোস্টিং কুমিল্লায়। সে প্রতি বৃহস্পতিবার ঢাকায় আসে আবার রবিবার ভোরে গিয়ে অফিস করে। মাঝে মাঝে আমি বা অন্য কলিগরা হাজবেন্ড নিয়ে মজা করলেও ও কিছু বলে না, শুধু হাসে। একদিন আমি ওর মনটা খুশি দেখে বললাম,’কিরে মিতু, সিয়াম ভালো আছে?’
ও হেসে বলল, ‘আপু মনে হচ্ছে লোকটা ভালই। আম্মুর তো বেশ পছন্দ। আম্মুকে সুন্দর করে ডাকেন, গল্প করেন।’
আমি বললাম, ‘ভালো তো অবশ্যই মিতু। দেখবি আরো ভালো লাগবে।’
আরেকদিন বলল, ‘আপু সিয়াম বলেছে কিছুদিনের মধ্যে ঢাকায় বদলি হয়ে একটা ফ্ল্যাট কিনবে।
আমরা তখন আলাদা থাকবো। ভাইদের ছেড়ে, আম্মাকে ছেড়ে থাকতে পারবো তো ?’
‘নিশ্চয়ই পারবি। প্রয়োজনে কাছাকাছি ফ্ল্যাট কিনবি।’
আচ্ছা, ‘আপনি কিন্তু ঘর কিভাবে সাজাবো , কোন ফার্নিচার কিনব ,কেমন পর্দা কিনব সব বলে দেবেন। অবশ্য পর্দা তো আপনাকে নিয়েই কিনব।’
আমি হেসে বললাম, ‘ঠিক আছে, সব হবে।’
আমি ওর প্রতিটি পদক্ষেপ খুব সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করি। আমি দেখেছি সে খুব আস্তে আস্তে সিয়ামের প্রতি সহজ হচ্ছে। যে মানুষটা ভাইদের মানুষ করতে যেয়ে এক মিনিট নিজেকে দেয়ার ,নিজের কথা ভাবার সময় হয়নি সেই মানুষটার সামান্য খুশিতেও আমার মনটা ভরে যায়।
মিতু এখন বেশ প্রাণবন্ত। চোখে মুখে আগামী স্বপ্ন ঝিলমিল করে। দেখতে দেখতে প্রায় দশ মাস কেটে গেছে। সিয়াম কয়দিন ধরে ঢাকায় বদলিও হয়েছে।
প্রায় সাত বছর পর আমি আমার গ্রামের বাড়ি বেড়াতে এসেছি। দুটো দিন দাদীমার কাছে থাকব বলে। সেই দুটো দিন প্রজাপতির মতো দিগ্বিদিক ঘুরে বেরাচ্ছি। বাড়ির প্রতিটি কোণায় কোণায় যে স্মৃতি সব বুকের ভেতর ভরে নিচ্ছি। ফুপু আমার পছন্দ মতো মোটা চালের ভাত ,পাঁচমিশালী শাক, ক্ষেতের সবজি, পিঠা তৈরি করছেন। আমি খাচ্ছি আর এদিক ওদিক ঘুরছি। দাদীমার মন খারাপ আরো দুটো দিন থেকে যাচ্ছি না কেন। যার কারনে আরও একটা দিন থাকতে হল। ফেরার আগের দিন রাতে আমার কলিগ বন্ধু ফাতিমা মিস কয়েকবার করে ফোন করেছেন। গ্রামের বাড়িতে নেট ঠিকমতো থাকে না। আবার কোথাও বেড়াতে এলে স্কুলের টেনশন মাথায় নিতে ইচ্ছেও করে না। তাই কলিগের ফোন দেখেও রিপ্লাই করিনি। আরো বেশ কিছু ফোন আসলেও দেখে না দেখার ভান করেছি।
পরদিন সকালে আমি ঢাকা ফিরব বলে রেডি হচ্ছি। এর মধ্যে আমার ছোট বোনের হাজবেন্ড সজীবের ফোন। সজীবের ফোন দেখে আমি বেশ অবাক হলাম। কারণ সজীব কারণ ছাড়া খুব একটা ফোন করে না। তাই বিস্মিত মনে ফোনটা ধরলাম। ফোনটা ধরার সাথে সাথে
সে বলল হ্যালো আপু, ‘আপনি কবে আসবেন?’
ওর স্বরে কেমন যেন উৎকণ্ঠা! আমি ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস না করেই বললাম, ‘কেন?
আজই ফিরব রেডি হচ্ছি।’
‘আপু ,আপনি কিছু জানেন না?’
‘না তো ,কি জানবো?’
‘আপনাকে কেউ ফোন দেয়নি?’
‘গতরাতে ফাতিমা মিস ফোন করেছিল কিন্তু আমি ধরতে পারিনি।’
‘কেন সজীব কি হয়েছে?’
সজীব বলল, ‘আপু, একটু শক্ত হন! গত রাতে মিতু মিসের হাজবেন্ড মারা গেছেন!’
‘মানে? কি বলছ তুমি ? মিতু মিস মানে?’
‘জি আপু, মিতু মিস , নিহাদের বাংলা টিচার তো!’ সজীব আমাদের একজন অভিভাবক! ওর মেয়ে আমাদের শিক্ষার্থী!
‘তবুও দেখ, তুমি ঠিক বলছো তো? অন্য কেউ না তো!’
‘না আপু, আমি ঠিক বলছি! আপনাকে ফোনে না পেয়ে স্কুল থেকে আমাকে ফোন দিয়ে বলা হয়েছে আপনাকে জানানোর জন্য।’
আমার কান বিশ্বাস করতে পারছিল না। পুরো শরীর কাঁপছিল। কান ঝাঝা করছিল, দাঁড়াতে পারছিলাম না।
আবারও বললাম,’সজীব ঠিক বলছো তো ?কোথাও ভুল হয়েছে বোধ হয়। ওর তো কয়দিন আগেমাত্র বিয়ে হয়েছে। ওর হাজবেন্ডও একজন সুস্থ মানুষ। কোন অসুখ-বিসুখ নেই তো। তুমি দেখো অন্য কেউ কিনা, মনে হচ্ছে ভুল শুনেছো।’
‘না আপু আমি ঠিক বলছি ,আপনি বরং সুস্থ থাকুন।’
‘কি হয়েছিল জানো কিছু?’
‘আমি এতকিছু জানি না আপু ,শুধু শুনলাম অতিরিক্ত জ্বরের কারণে হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।’
‘বেশি টেনশন করবেন না আপু , আপনি ভালোমতো ফিরে আসুন।’
বাড়ি থেকে কিভাবে বেরিয়েছি, কিভাবে এত রাস্তা পার হয়ে ঢাকায় এসেছি আজও তা এক বিস্ময়!
রাস্তায় অসংখ্য ফোন পেয়েছি ,আমার আসতে কতক্ষণ লাগবে, আমি পৌঁছে যেন মিতুর বাসায় যাই। দেরি যেন না করি ইত্যাদি ইত্যাদি..
আমি শুধু হা হু শব্দে উত্তর করেছি।
আমি বেশ তাড়াতাড়ি ঢাকায় ফিরলেও ওই দিন আমার পক্ষে মিতুর বাসায় যাওয়া সম্ভব হয়নি বা ওর মুখোমুখি হওয়ার মত অবস্থা আমার ছিল না। সারাদিন আমি নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি। আশ্চর্য এই জীবন ব্যবস্থার প্রতিটি বাঁকের যোগ-বিয়োগ, গুণ-ভাগ নিখুঁতভাবে হিসাব করেও জীবনের এই সরল অঙ্কের জটিল সমাধান মিলাতে পারিনি কিছুতেই। ওর জীবনের সাথে ঘটা এমন ঘটনা যতবার মনে পড়েছে ততবারই মহাবিস্ময়ের ঘোর, কষ্টের ছায়ায় ছেয়ে গেছে পুরো দেহমন। হিসাব মিলেনি তবুও। হয়তো এমন হিসাব মিলেনা কখনোই!
পরের দিন স্কুল থেকে কয়েকজন কলিগ সহ ওর বাসায় যাই। যেয়ে দেখি সে স্বাভাবিক হাঁটাচলা করছে। খালাম্মা মনে হচ্ছে রাজ্যের বিস্ময় বুকে ধারণ করে পাথর হয়ে গেছেন। ছোট ভাইটা হাঁটছে কিন্তু মাঝে মাঝে দু’গাল পেয়ে দুফোটা করে ঝরা অশ্রু হাতের তালুতে মুছে নিচ্ছে। পুরো থমথমে পরিবেশ। শুধু মিতুই স্বাভাবিক। আমি মিতুর কাছে গিয়ে ওর হাত ধরলাম। আমাকে দেখে আমার চোখের দিকে তাকালো একবার। তারপর জড়িয়ে ধরলে আমি ওকে নিয়ে সোফায় বসে পড়লাম। সে আমার ঘাড়ে মাথা রেখে নীরবে বসে রইল। এক সময় আমার হাঁটুতে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো। আমি একহাতে ওকে জড়িয়ে রেখে অন্য হাতে ওর মাথার চুল বিলি কাটতে লাগলাম।
মনে হচ্ছে শব্দহীনতার যুগে অনাদিকাল ধরে বসে আছি… কথারা যেন ভুলে গেছে স্বরে উচ্চারিত ধ্বনি, বোবা হয়ে গেছে একটা পৃথিবীর ছোট্ট ঘরের কিছু মানুষ!
মাঝে মাঝে একটি অস্ফুট দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসছে হঠাৎ। কম্পমান নীরবতা বাতাসের গায়ে ধাক্কা খেয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে অজানায়!
যে মানুষটা দুঃখ উৎসবকে বিজয় উৎসবে পরিণত করার একজন দক্ষ কারিগর। বিজয়ের শেষ দৃশ্যে মুহূর্মূহ হাততালির অনুকম্পের অনুরণনে যার মুখমন্ডল জয়ের উৎসবে রক্তাভ হয়ে
আরো নুয়ে যায়, হয় আরো বিনয়ী তার নিশ্চল পরাজয়টা বড় বেশি অদ্ভুত মায়াজালে ঘেরা,
বড় বেশি গভীর ব্যঞ্জনাময়! যেন —-
” ঝরাপাতার দেহে ঝড় নেমে এলে-
তুমি আশ্রয় নিও, উপসম খামে!”
দীর্ঘক্ষণ ওকে জড়িয়ে বসে থেকে ওর বুকের ভেতরে কিছু অব্যক্ত কান্না, কিছু গুঁড়িগুঁড়ি শিলাবৃষ্টি আর কিছু নিগূঢ় ভালোবাসা সন্ধান পেলেও কারো প্রতি কোনো অভিযোগ আমি পাইনি।
তবে মাঝে মাঝে ক্ষীণ দীর্ঘশ্বাসের সাথে দিগন্ত ব্যাপী সবুজ পেন্সিলে আঁকা আগামী জীবন চিত্রের খসড়াটাকে পাথর জলে ক্রমাগত ধুয়ে ফেলার ছলছল শব্দ এবং বুকের গহীনে আস্ত একটি নদী ভাঙনের শব্দ শুনেছি মাত্র…






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান