পুরুষের চোখে নারী- এক নিষ্পাপ শিশু, ম্যানিকুইন আর এক কাগজ কুড়ানো ছেলের গল্প

রাজেশ কুমার

নারীর প্রতি দৃষ্টির কথা মনে এলেই সেই এক দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে বারবার। ফ্ল্যাসব্যাকের মতো নিয়ে যায় ব্যস্ততা ফুরিয়ে আসা এক উঠতি মফস্বল শহরের গাঢ় হয়ে আসা রাতের দিকে। রাস্তার দু-ধারে পেভমেন্টের ওপর পর পর ব্র্যান্ডেড আউটলেট। সামনে কাচ ঘেরা আলোয় দাঁড় করানো সুসজ্জিত সব ম্যানিকুইন। প্লাস্টিকের মুখ, সামান্য উঁচু চিবুক। বুকের গঠন নিখুঁত সমান্তরাল। হাত দুটো নেমে এসেছে নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে। না আরাম, না টান। একে একে নিভে যাচ্ছে আলো। সশব্দে নেমে আসছে সাটার, যেন তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থা কাটাতে থেকে থেকে মাথার ভেতর কর্কশ আওয়াজ করে উঠছে কেউ। ক্রমশ লঘু হয়ে আসা ভিড়ে বাবার হাত ধরে হেঁটে যাওয়া এক চার-পাঁচ বছরের শিশু থমকে দাঁড়ায় অর্ধ-নগ্ন এক ম্যানিকুইনের দিকে চেয়ে। তার দুই চোখে অপার বিষ্ময়। মুগ্ধতা সীমাহীন, নিবিড়, অনড়। বাবার হাত ছাড়িয়ে সে যেতে চায় ম্যানিকুইনের কাছে। আমি খানিক তফাতে দাঁড়িয়ে দেখি। ওদিকে এক কাগজ কুড়ানো ছেলে পিঠে বস্তা নিয়ে হেঁটে যায় স্ট্রিট বিন থেকে স্ট্রিট বিনে, হলুদ আলোর ধার বরাবর। কুড়িয়ে নেয় শহরের যত আবর্জনা।

এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা ঘিরে ধরে আমায়। ম্যানিকুইন কোনও নারী নয়। নারীর সামান্য এক প্রতিরূপ। অথচ কী গভীরভাবে তৈরি করা হয়েছে তাকে। নিখুঁত স্তন, সরু কোমর, আকর্ষণীয় নিতম্ব। বাস্তব নারীর মতো কোনও দাগ নেই তার। নেই ক্লান্তি, নেই লজ্জা। সে এক কল্পিত দেহ। প্রতিদিন অসংখ্য পুরুষ হেঁটে যায় তার সামনে দিয়ে। কেউ চেয়ে থাকে নিষ্পাপ, কেউ চলে যায় উদাসীন। আবার কারও কাছে সে নির্মিত প্রদর্শন। কাছে আসে, উলটে পালটে দাম দেখে।

আমার মনে পড়ে সেই শিশুটির সরল প্রশ্ন ,“বাবা, ও নড়ছে না কেন?” অবাক হই না এতটুকু। সবে তো দৃষ্টি মেলছে সে এক প্রতীকী নারীতে। আর কে না জানে দৃষ্টি কখনও নিরপেক্ষ হয় না। তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে অভ্যাস, শিক্ষা, আর ক্ষমতার মিশ্রণ। সেই শিশু মনে নেই কোনও শরীরী হিসাব। তার চোখেও নারী এক রহস্য, এক অমলিন সত্তা। যেমন মা, স্কুলের ম্যাডাম, পাশের বাড়ির দিদি।

এই শিশুটি পুরুষ হয়ে ওঠেনি এখনও। তার দৃষ্টি শুধুমাত্র অভ্যাসেই সীমাবদ্ধ। সমাজ এখনও মেজারিং টেপ ধরিয়ে দেয়নি তার হাতে। শেখায়নি জরিপের কাজ। কোথায়, কতটুকু দৃষ্টি দিতে হবে ঠিক কতক্ষণ সময়ের জন্য। তবুও এই দৃশ্যটি আপাতভাবে অপ্রাসঙ্গিক লাগে না আমার। খালি মনে হয় সমাজ, বাজার, বিজ্ঞাপনী ভাষার আড়ালে আজও হয়ত ওই শিশুটির দৃষ্টি চাপা পড়ে আছে কিছু পুরুষের অন্তস্তলে। আজও হয়ত কেউ কেউ বিশ্বাস করে ম্যানিকুইন আসলে বাজারকে নয় প্রতিনিধিত্ব করে তারই কোনও প্রিয় নারীকে। যার বুকে শুধু স্তন নয়, মন বলে বস্তু আছে একটা। শিশু-মন কামনা বোঝে না। ভেঙে ভেঙে তাকাতে জানে না সে। বুক, ঠোঁট, কোমর নয়- ম্যানিকুইন তার কাছে এক সম্পূর্ণ নারী। সমাজ, বাজার, বিজ্ঞাপন যে পুরুষ-দৃষ্টি শেখায় তা একান্ত ব্যক্তিগত নয়, আসলে এক সামাজিক নির্মাণের প্রতিকৃতি। কিন্তু সেই শিশুটির দৃষ্টি! তা যদি আচ্ছন্ন করে সমাজ, বাজার, বিজ্ঞাপনের নির্মাণ! পরিণত বয়সেও পুরুষ কি হয়ে উঠতে পারে এক জেনেরিক প্রোডাক্ট! নাকি সে এক নিষ্পাপ শিশুর মতই আঁকড়ে ধরতে চায় তার প্রিয় নারীকে। নিরাপত্তা, আশ্রয় খুঁজতে চায় তারই মধ্যে। পেতে চায় হাতের উষ্ণতা। এ-প্রশ্নের উত্তর দেয় না ফ্ল্যাশব্যাকের সেই ম্যানিকুইন। বহু পুরুষ দৃষ্টির কেন্দ্রে সে শুধু দাঁড়িয়ে থাকে নিঃশব্দে। ঘুরে ফিরে আসে আমার চেতনায়। অনুভূতি প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভাস্কর মূর্তির মতো। ফেড আউট হয়ে যায় ধীরে ধীরে।

ভেসে ওঠে সেই কাগজ কুড়ানো ছেলেটা। মাটির দিকে তাকিয়ে যে শুধু হেঁটে যায় পেটের সন্ধানে। ম্যানিকুইন তার কাছে কোনও রহস্য নয়। সৌন্দর্য, শরীর, রোমান্টিকতা শেখার দায় নেই তার। সে যেন সমাজ বহির্ভূত কোনও অস্তিত্ব। আমার ফ্ল্যাশব্যাকের দৃশ্যে ঢুকে পড়েছে ভুল করে। ম্যানিকুইনের আয়নায় পড়েছে তার প্রতিচ্ছবি। এই শহরের সবকিছুই নিষিদ্ধ উপাদান তার কাছে। তথাকথিত দৃষ্টি রাজনীতির বাইরে সে এক অবস্থানমাত্র, শহরের মানুষের যাবতীয় অব্যবহারযোগ্য দ্রব্য সে শুধু ফিরিয়ে নিয়ে যায় কোনও এক অজানা জায়গায়। আর ‘পুরুষের চোখে নারী’ বিষয়টাকে করে তোলে জটিল, বহুমাত্রিক। লিঙ্গ অতিক্রম করে পোঁছে দেয় ক্ষমতা, শিক্ষা ও সামাজিকীকরণের প্রশ্নে। শিশুটিকে দেখতে শেখায় তার বাবা-মা, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি। কিন্তু কাগজ কুড়ানো ছেলে! সে তো হেঁটে যায় সেই হলুদ আলোর ধার বরাবর এক প্রান্তিক অস্পষ্টতার দিকে, কার যেন নির্দেশে। স্বাভাবিক প্রবৃত্তি ছাড়িয়ে আর কি কিছু সঞ্চয় করা সম্ভব হয়ে ওঠে তার পক্ষে! নাকি তার চোখে সবকিছুই দ্রব্য সামগ্রী, ব্যবহারযোগ্য কিম্বা অব্যবহারযোগ্য! এ প্রশ্নেরও উত্তর দেয় না কাচ ঘেরা আলোয় বন্দি প্লাসস্টিকের ম্যানিকুইন। সন্ধে ঘন হয়ে রাত নামার সেই দৃশ্যে তার দেহের অতিরজ্ঞিত বক্রতা, সুস্পষ্ট স্তন শুধু যেন সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে আরও খানিক। দোকানি স্টোরের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলে পেভমেন্টের ওপর রাখা কাচের বাক্সের ম্যানিকুইন।

একে একে সব আলো নিভে গেলে আমার ভেতর জ্বলে ওঠে শিশুটির সেই প্রশ্ন, বাবা ও নড়ছে না কেন! এক অদ্ভুত অস্বস্তির মতো ঘুরে বেড়ায়, যেন ঘাই মারে থেকে থেকে। পর্যায়ক্রমে গাঢ় হয়, হালকা হয় অন্ধকারে ঠোঁটে ধরা সিগারেটের আগুনের মতো। শপিং মলের এক বৃহৎ চাতালে বসে থাকি আমি। মনে করতে পারি না প্রিয় কোনও নারীর মুখ। আলো নিভে গেলে অদ্ভুত এক বিপন্নতা ঘিরে ধরে আমায়। ধীরে ধীরে পালটে যায় ন্যারেশন। ভেতর থেকে কে যেন হঠাৎ বলে ওঠে প্রশ্নটা হবে, নড়াচড়া করা মানুষকে পুতুলের মতো দেখতে শিখলাম কবে! এক অনুভূতিহীন পুতুল এই অন্ধকার বাজারে এই অসময়ে কেন হয়ে উঠছে স্বাভাবিক রক্ত মাংসের নারীর সাক্ষী বুঝতে পারি না ঠিক। শুধু বুঝি এই শহরে বড় হতে হতে পুরুষের চোখ বদলায়। সমাজ শেখায় পৌরুষ মানে অনুভূতি লুকিয়ে ফেলার ক্ষমতা। না পাওয়া, হতাশা, চোখের জল, যাবতীয় আবেগ গিলে ফেলা নিজের ভেতর। আর সেই গিলে ফেলার আড়ালে কখনও কখনও দৃষ্টিও হয়ে ওঠে কঠিন, কৌতূহলী, অবচেতনভাবে মালিকানাসূচক। সে ভুলে যায় হাতে হাত রাখতে। পাশাপাশি হাঁটতে। অনুমোদনের জন্য হাঁটু মুড়ে বসতে। সে ভুলে যায় নারী পুরুষ মিলেই সংসার। দুজনেরই সমান অধিকার।

সময় বয়ে যায়। জানি এই শিশুটিও বড় হয়ে গেছে আজ। তার চোখও হয়ত শিখে গেছে সমাজের শেখানো ভাষা। কিন্তু যদি ধ্বংসস্তূপের ভেতর চারাগাছের মতো কোনও ভাবে বেঁচে যায় তার ভেতরের সেই ছোট্ট জিজ্ঞাসা! যদি মাথাচারা দিয়ে ওঠে বটগাছের মতো! ফাটিয়ে দেয় বিপননযোগ্য ধ্যান-ধারণার যত শ্যাওলা জমা পাথর! যদি তার সেই নিষ্পাপ দৃষ্টি দৈত্যকূলে প্রহ্লাদের মতো হত্যা করে নারীমাংসের লোভ! তাহলে হয়ত দিন দুপুরে ভরা বাজারে আবার কখনও জন্ম নেবে এমনই কোনও ডেজা ভ্যু। একই দৃশ্য বার বার পুনর্ঘটিত হতে থাকবে চোখের সামনে। কাচের ঘরে রাখা ম্যানিকুইন হয়ে উঠবে মানুষ দেখার এক নতুন অভ্যাস। খুব কাছে দাঁড়িয়ে প্লাস্টিকের সেই মুখে কেউ হয়ত খুঁজবে তার মৃত মা, বিয়ে হয়ে যাওয়া বোন কিম্বা ছেড়ে যাওয়া প্রেমিকাকে। যদি সেই কাগজ কুড়ানো ছেলেটি ফিরে আসে আবার, একটি বার হয়ত মুখ তুলে তাকাবে। খুব সামান্য সময়ের জন্য হলেও ম্যানিকুইনের মুখে খুঁজে পাবে শূন্য চোখের, কোঁচকানো চামড়ার কোনও বৃদ্ধাকে। তার মুখ দিয়েও অস্ফূটে বের হবে, কেন চেয়ে আছো গো মা মুখপানে! এভাবেই পুরুষ বার বার ফিরে যাবে তার আশ্রয়দাত্রীর কাছে, স্নেহময়ী বোনের কাছে, প্রেমিকার ভালোবাসার কাছে, সহকর্মী যুবতীটির কাছে। নারী হয়ে উঠবে প্রথমে মানুষ তারপর শরীর।

মনে রাখতে হবে, দৃষ্টি শুধু দেখা নয়, সে এক আয়না। আমরা কেমন মানুষ হয়ে উঠেছি তা প্রতিফলিত হওয়ার।


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Trending