বিষণ্ণতার আর্কাইভে পাঁচজন ছায়াকবি
১.
মির্জা গালিব জানালার গায়ে ধোঁয়ার আঁচড় কেটে নক্ষত্রের নাম মুছে দেন,
তার ঠোঁটে হেমলক হেমলক গন্ধ,
তিনি বলেন না , “দিল তো ছিল…”
শুধু একটা হারিয়ে যাওয়া শহরের মানচিত্র
তার শিরায় ধুকপুক করে।
কবিতা নয় সেটা এক বিপর্যস্ত আলপথ,
যেখানে শব্দ হাঁটে পিছনে ফেলে নিজস্ব ছায়া।
২.
জয় গোস্বামী আর উচ্চারণ করেন না।
তিনি তুষারে ঢাকা জানালার ভেতর
আলোর অভ্যন্তরে হারিয়ে যাওয়া চিঠি খোঁজেন।
তাঁর চোখ একটি গোপন আর্কাইভ
যেখানে “রাত” আর “রাতের ফাঁটল”
সমার্থক হয়ে উঠে।
তার মৌনতা একটা অলিখিত উপন্যাসের ভূমিকা,
যা শুধু আয়নার ভাষায় লেখা যায়।
৩.
আল মাহমুদ শব্দের গায়ে লেপেন নিরাবেগতা।
তিনি বারান্দায় দাঁড়িয়ে
একটি “ভালোবাসা?” উচ্চারণ করে
ভাষার সমস্ত ব্যাকরণে চুলকানির দাগ রেখে দেন।
তার নৈঃশব্দ্য একটি ফসিল হয়ে যায়,
যা পাঠ করা যায় কেবল সময়ের বিপরীতে।
৪.
পাবেলো নেরুদা ফিরে আসেন
একটি অগ্নিনির্বাপক কল্পনার গলি থেকে—
তার হাতে জলভেজা নোটবুক,
যাতে লেখা:
“আমি একাকিত্বকে খাই না—
সে আমায় চিবায় প্রতিদিন।”
তার শব্দ রং বদলায়,
কখনো নীল, কখনো কার্বন ধূসর,
যেন প্রতিটি বাক্যই নিজস্ব মৃত্যুর আগে একবার প্রেমে পড়ে।
৫.
মোহাম্মদ ইকবাল নির্বিকার ,
আয়নার দিকে চেয়ে বলেন না কিছুই।
তাঁর নিঃশ্বাসে লেগে থাকে
একটি ব্যাকরণহীন গোধূলির গন্ধ।
তিনি নিজেকে ঠেলে দেন অদ্ভুত ফাঁকা একটি পরিচয়ের দিকে,
যেখানে প্রেম আর দর্শন একই ক্যানভাসে ঝুলে থাকে।
বাতাসে উল্টো হয়ে যাওয়া ছবির মতো।
এই শহরের একটি বিষন্ন ফ্ল্যাট,
সময় সেখানে গলে পড়ে
ব্যান্ডির গ্লাসে,
আর দেয়াল জুড়ে আঁকা থাকে
একটি অনূঢ় কবিতার পরাধীনতা।
সন্ধ্যার ছায়ায়
পাঁচ কবির জীবন্ত বিষন্নতা গোল টেবিল ঘিরে,
তাঁরা ডিনার করেন না।
তাঁরা খান পুরনো কবিতার “কাঁচচুর্ণ স্লোক”,
তাঁদের কাঁটা-চামচে জমে থাকে
“ঠান্ডা হয়ে যাওয়া দীর্ঘশ্বাস”।
ছাদের চিলেকোঠায় ঝুলে থাকা
ফানুসের নিচের নীরবতা প্রশ্ন করে;
“তুমি কি কবিতা?
নাকি ভুলে যাওয়া একটি শ্রমজীবী প্রবাসী কবির আত্মজৈবনিক?”
যার শেষ পৃষ্ঠায় লেখা থাকে
“আমার নাম একাকিত্ব নয়।
আমি সেই পান্ডুলিপি,
যে লেখা হয় প্রবাসে,
একজন ক্লান্ত কবির ভেতরে
যিনি প্রতিদিন সন্ধ্যায় নিজের মৃত্যুর ভাষা আবিষ্কার করেন।”






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান