একগুচ্ছ নদীবর্তী সনেট
১. নতুন চিহ্নরেখা
সেই নৌকাটি আজও টের পাই দোলে ওঠে অবচেতনে
মেঠোপথ শেষে সোনাইয়ের ঘাট, হিজল গাছটিও নিশ্চয়
আছে, টুংটাং সুর বেজে যায় সুনীলের চায়ের দোকানে
আছি সেই সোনালী সময়েই, এখনও বারবার মনে হয়।
এলোচুলে আসতে বেশি মেঘের মতো তোমার ঘণ সেই চুল
মাঝে মাঝে বেনীতে বেলির মালা, কিংবা খোপায় কদম
গুজে স্বদর্পে নৌকায় উঠে যেতে চারপাশে বাঁধিয়ে হুলস্থুল,
খেয়াপারে কোনোদিন বসা হয়নি পাশে সাহস ছিলো কম।
বাস্তবে অধরা হরিণী তুমি স্বপ্নেই ছিলে বেশি কাছাকাছি,
সময় ধুসর হলেও হৃদয়ের গভীরে আজও অমলিন সেই ছবি
তোমার নামে আজও কথা কয়, চারপাশে ওড়ে প্রণয়ের মৌমাছি,
বয়সতো সংখ্যা কেবল, টানেলের শেষে আলো দেখে ভাবি।
বারবার ভাবি, প্রতিদিন ভাবিÑআবার হয়তো হবে দেখা
সোনাইয়ের তীরে সেই খেয়াঘাটে রেখে যাব নতুন চিহ্নরেখা।
২. টের যদি পাও ঘাই
কথা ছিলো শহর পেরিয়ে আবার দেখা হবে আমাদের
একদিন খুব ভোরে পৌছে যাব দূরে, কালিগঙ্গার ওপারে,
যেখানে জলের ঘূর্ণি গভীরে টেনে নিয়ে যাবে ফের
ভালবাসার মানে কী বহতা নদীর মতো খুঁজে নেব তারে।
বহুদিন পর এ্যালবাম ঘেটে বের করে আনি ছবি
সেই তুমি কেমন আছো, কোথায় কোন দূরের খেয়ায়?
এখনও টের পাই স্পর্শের গন্ধ তোমার জলের দেবি,
সবইতো গেছে স্মৃতি শুধু আঁকা আছে দূর নীলিমায়।
সেই তুমি, সেই আমি কতোদূরে আজ একা একা
চারপাশে ঘণ হয়ে আসে রাত, আঁধারেই আছি দাঁড়িয়ে,
যেতে যেতে যেভাবে বলেছিলে হয়তো হবে দেখা,
দিন যায় তবুও আমি অপেক্ষায় দুই হাত বাড়িয়ে।
তুমুল বাতাসে স্রোতের টানে টের যদি পাও ঘাই
স্মৃতির পাতায় একটুখানি স্থান দিও, তাতেই বেঁচে যাই।
৩. আগুনভরা বুকে নদীর কসম
বানার পেরিয়ে শীতলক্ষ্যার স্রোত হয়ে বইতে বইতে ডুকরে
যে কেঁদেছিলো সে শুধু নদী নয়, নদীবর্তী হাজোরো নারী
নদীর মতোই বিষভরা বুকে আজ দহনের গান ঘরে ঘরে
পত্রিকার পাতায় হয় না লেখা সব খবর কি লিখতে পারি?
কোথাও লাবণ্য নেই না নদী, না নিসর্গ, না অন্য কোনোখানে
জলাশয় গেছে নস্টদের দখলে, বিস্তীর্ণ সবুজও গিলেছে ওরা
নদীবর্তী নারীর কথা কী আর বলি সবইতো সবাই জানে
তারাওযে ত্রস্ত ভীষণ, জলহীন খা খা মাঠে বিস্তৃত হচ্ছে ক্ষরা।
দুঃখী নদী কিংবা নারীর আর্তনাদ শুনতে শুনতে আমরা যারা
ভাতঘুমে যাই প্রতিদিন, বাঘবন্দী খাঁচায় নিঃশেষ হতে হতে দেখি
বারবার হাত বদলায় বানার, শীতলক্ষ্যা কিংবা সাবিনা-শাহানারা
হায় ভাত ঘুম দেবালয়ে লাগলে আগুন কিছুই থাকে না বাকি!
এই আগুনভরা বুকে নদীর কসম, কসম সাবিনা-শাহানাদের
জেনে রেখো, এই দিনও একদিন ফিরবে, হবে আমাদের।
৪. শহরের নদীতে
আসাদগেট ট্রাফিক সিগনালে পুলিশবক্সের কাছে দাঁড়িয়ে
ভেঁজা শহর দেখি, বর্ষার সময় এখনও আসেনি পুরোপুরি
রাজপথ তবু নদী হয়ে ডেকে ডেকে যায় হাত বাড়িয়ে
মতিঝিল থেকে আসবে তুমি, দেখা হওয়াটা জরুরি।
ঠিক যেমন করে আগে অপেক্ষায় দাঁড়াতাম বংশীর তীরে
তারপর ভাসমান নৌকায় দুলতে দুলতে দূর অজানায়
দাঁড়ানোটা সেরকমই গাড়িগুলোও সতর্ক, চলছে ধীরে,
বাজলো কটা ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি বিকেল গড়িয়ে যায়।
মোবাইলে লাইভ কে নাকি ভেসে গেছে পান্থপথের মোড়ে
রাজপথে ম্যানহোলতো অনেক খোলা, সিগনাল পাচ্ছি না
তোমার। গাড়ি আসে গাড়ি যায়, থেকে যাও তুমি দূরে
আমি শুধু দাঁড়িয়ে থাকি, অপেক্ষার শেষ কবে তাও জানি না।
একদিন বলেছিলে, নৌকা ডুবলে সাঁতরেও উঠা যায় তীরে
সে কোথায় যাবে শহরের নদীতে ম্যানহোল ডাকে যারে?
৫. তোমার চিবুকে তার ছায়া
তোমার খোপা খোলা এলোচুলের মতো শ্রাবণ হাওয়ায়
দুলছে নদী, শঙ্খ নাকি সাঙ্গু প্রশ্ন করি কী তোমার নাম
নামে কী বা আসে যায়, নদীরাতো নারীর মাদকতায়
বয়ে চলেÑশুধু আজ তোমার চিবুকে তার ছায়া রাখলাম।
যতোবার বলি নদীর গল্প সেতো বারবার তোমারই নামে
টের কি পাও, নদীতে বিলীন আজ তোমার দেহের ভাষা।
জলেশ্বরী তোমার গভীরে তাই ডুবে যাই কামে ও ঘামে,
তোমারে মন্থন করে বুকের ভেতর রাখি নদীর পিপাসা।
সকল নদীর বুকে অবশেষে তোমাকেই পাব বলে মানি
জলের ভেতর আগুন ঘষে জলের আদরে চাই অবসান
জীবনের এই চন্দ্রহার আমারইতো ছিলো, কিংবা আছে জানি,
সেই অধিকারেই তোমার কোঠরে বন্দী রাখি এই মন প্রাণ।
শুনে যাও জলেভাসা এই গান, তোমারইতো গান গাই
নদী হয়ে হয়তো এসেছো কাছে, হয়তোবা আসো নাই।
৬. মহুয়া মহুয়া
সাঙ্গুর মরা স্রোতও উথলায় দেখি ফাগুনে বইলে হাওয়া,
কানের কাছে কে যেন অকস্মাৎ ডেকে যায়, মহুয়া মহুয়া
মহুয়া কি তোমার ডাক নাম ছিলো নাকি ভোরে ঝরা ফুল,
নামের রহস্য বুঝি না, শুধু এটুকুই জানি ছিলো কিছু ভুল।
ধূলোপথে চলতে চলতে পাহাড়চুড়া, কিংবা সমতলে
যতো গাছ, যতো পাতা, সবাই শুনি তোমার কথা বলে,
সযতনে পুজোর ডালা সাজিয়ে রাখে এই তোমারই নামে,
তোমার নামে গেংখুলীর বাজনা বাজে আদিবাসী গ্রামে।
জেগে ওঠো দাও সাঁড়া, মদির এই বন জোৎস্নায়
আকালের কালে ফলবতী হও মেয়ে, দিন বয়ে যায়
মহুয়াতলে নাচবে মহুয়া, মন মন্দিরে সাজাবো মদিরা
ঘন হয়ে বসবে সকলে, বারবার ডেকে যায় যারা।
তোমার নামে বুকের গহীনে আজও লিখে যাই গান
দিনের শেষে তোমাতেই আরাম খুজি, তোমাতেই নির্বাণ।
৭. আদিবাসী মেয়ে
আমারও কিছু ঋণ আছে দূর গারো পাহাড়ের কাছে
তুলে রেখেছি তারে মরা ব্রহ্মপুত্রের বুকের দেরাজে
কিছু ঋণ রাখা আছে শিশির পাতায়, গাছে গাছে
আর কিছু বুনোফুল রেখেছিলাম তোমার খোঁপায় গুজে।
পাহাড়ে শীত আসে আগাম মান্দিদের ঘরে ঘরে
আমাকে টেনছিলো বন, আর কার মন নীরব নিশুথি
দাঁড়িয়েছিলে অনেক দূরে মহুয়াতলায় মনে কি পড়ে
নিষেধের বাঁকে গোপন কাবিনে লেখা ছিলো সম্মতি।
আদিবাসী মেয়ে পাইনি তোমায় তবুওযে পাওয়ার অধিক
পেয়েছি। শরীরে বুনো ঘ্রাণ মেখে আজও সেই বন পাহাড়ে
পড়ে থাকি।বকুলের ডালে অচিন পাখি আজও গায় ঠিক
আজও কারো মন হাহাকার করে সেদিনের মতোই ঝড়ে।
কবিতায় উঠে আসে আজও তোমার শরীরের অনিন্দ্য রেখা
আদিবাসী মেয়ে অপেক্ষায় আছি, পারতো একবার দিও দেখা।






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান