আবু তাহেরের জন্ম১২ই মে, ১৯৬৮ সালে বাংলাদেশের সিলেটের জেলার চন্দরপুর গ্রামে। একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনার নাম, আবু তাহের। শব্দের সঙ্গে তার বন্ধন যেন জন্মসূত্রেই বাঁধা। শৈশবেই লেখালেখির সূচনা, আর সময়ের স্রোতে একদিন সে শব্দগুলো হয়ে উঠল সংগঠন, নাটক, ছড়াও অকৃত্রিম বন্ধুত্বের সুতোয়। সেই সূত্রেই আমার সঙ্গে তাহেরের সাথে বন্ধুত্ব নয় বরং ভাইয়ের মতো আত্মিক এক বন্ধন।
১৯৮৭ সালে বিলেতে আগমন। নতুন করে নিজেকে ভাঙ্গনের যাত্রা শুরু হয়, ভিন্ন ভাষা-সংস্কৃতি, নতুন সমাজ ও বাস্তবতার পাশাপাশি তার লেখনীও স্বপ্নের ধারাবাহিকতায় অব্যাহত থাকে অনেক দিন।

তাহেরের সঙ্গে আমার পথচলা দীর্ঘ ছত্রিশ বছরের। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় শুধু বন্ধুত্ব নয়, গড়ে উঠেছে এক আত্মিক ভ্রাতৃত্ব যার শিকড় প্রোথিত রয়েছে সংহতি সাহিত্য-সংগঠনের উন্মেষেই। বিলেতের মাটিতে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির একটি মাইলফলক হিসাবে সংহতি একটি উজ্জ্বল আলোকশিখা।
বিলেতের প্রাচীনতম সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন সংহতি-র প্রারম্ভিক পথচলার অন্যতম কান্ডারি। প্রতিষ্ঠাকালীন সেক্রেটারি হিসেবে তার নেতৃত্ব ও সাহিত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা আজো সংগঠনের শরীরে প্রবাহিত যার ফলশ্রুতিতে আজ এই সংগঠের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে।

তাহেরের ছড়া একদিকে যেমন কাব্যিক ছন্দে ভরপুর, তেমনি তীক্ষ্ণ সামাজিক সচেতনতায় দীপ্ত। পাশাপাশি সে একাধারে সফল নাট্যকারও। মঞ্চনাটকের অন্তরঙ্গ দৃশ্য থেকে শুরু করে সমাজমনস্ক কাহিনির বিস্তার, সবখানেই তাহেরের লেখনী এক আলাদা স্বাক্ষর রাখে। তার মঞ্চনাটকগুলোতে পাওয়া যায় সময়ের সংকট, প্রবাসের দ্বন্দ্ব, পারিবারিক টানাপোড়েন, আর বাঙালির আত্মপরিচয়ের কোলাহল।
ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে তার বেশ কয়েকটি ছড়ার ও নাটকের গ্রন্থ, যেগুলো পাঠকের হৃদয়ে অনুরণন তোলে। ছড়া আর নাটকের ধারালো ছন্দে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রোহ জানাতে, আর নাটকের পর্দায় ফুটিয়ে তুলে অভিজ্ঞ সমাজবাস্তবতা।
তাহের সিদ্ধহস্ত ছড়াকার, তার ছড়ায় থাকে সমাজের প্রতি প্রশ্ন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার সাহস। নব্বইয়ের দশকে লেখা তাহেরের একটি বিখ্যাত ছড়া, যা আজও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আগুনের মতো প্রাসঙ্গিক:

“মার শালাদের মার
যেই শালারা পরের টাকায়
চালায় মটরকার
সেই শালাদের মার”

এই চারটি চরণই বলে দেয় তাহের কতটা নির্মমভাবে সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে জানে। এমন সাহসী উচ্চারণ শুধু সাহিত্যে নয়, জীবনের প্রতিটি স্তরে তার নৈতিক দৃঢ়তারই প্রতিফলন। সে উচ্চারণ আজো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেন তেমনি প্রাসঙ্গিক, তেমনি বিদ্যুৎঝলকে দীপ্ত। তার ভাষা যেমন ধ্রুপদি ছন্দে বুনে যায় ন্যায়বোধের চিত্ররূপ, তেমনি আবার হাস্যরসের মধ্যেও থাকে সূক্ষ্ম কটাক্ষ, সমাজ-বাস্তবতার নির্মম প্রতিচ্ছবি।

তবে দু’:খজনক হলেও সত্যি, তাহের ইদানিং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক কাজ নিয়ে অনেকটা ব্যস্ত থাকাতে সে বিচ্ছিন্ন প্রায় সাহিত্যজগৎ থেকে। আমি এই লেখাটির মাধ্যমে তাহেরকে বলবো ফিরে আসতে আবারো ছড়া কবিতার ছন্দে।

আজ তাহেরের জন্মদিনে তার সাহিত্যিক পথচলা, সাংগঠনিক অবদান ও একান্ত ব্যক্তিগত সম্পর্কের জালে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিময়তার প্রতি জানাই গভীর শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। জন্মদিনে শুধু শুভেচ্ছা নয়, সেই সঙ্গে আরও অনেক সৃষ্টির প্রত্যাশা- যেখানে ছন্দে, শব্দে, নাট্যে ও বন্ধনে বাঁচবে আবু তাহের।
একজন শিল্পীর উন্মোচন, তেমনি অনুভব করা যায় একজন ভাইয়ের কোমল অভিমান।
শুভ জন্মদিন, আবু তাহের।

  • ফারুক আহমেদ রনি
    সম্পাদক, শিকড়


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Trending