সকলে প্রত্যেকে একা

ছেলেবেলায় আমাদের মহালয়া শুরু হয়ে যেত মহালয়ার অনেক আগেই। মহালয়াকে শুভ বলা হবে নাকি অশুভ–সেসব নিয়ে তখন আমাদের মাথাব্যথা ছিল না। দিনটি যে পিতৃতর্পণের দিন, তাও জানতাম না। জানতাম যে, মহালয়া এল মানেই পুজো শুরু হয়ে গেল। আর সাত দিন পরে দুর্গাপুজো। আর এই জন্যই আমাদের মহালয়া শুরু হয়ে যেত অনেক আগে। আমাদের মানে আমার আর আমার পরের ভাই টিকলার। আমাদের পাড়ার যে-সর্বজনীন দুর্গোৎসব, তার সঙ্গে আমাদের পরিবারের তখন ছিল নাড়ির যোগ। এই পুজোর এক সময় সেক্রেটারি ছিল আমার বাবা। তারও আগে আমার জেঠু। দোলা যেত আমাদের বাড়ি থেকেই সেজেগুজে। ঠাকুর তৈরি করত আমাদের বাড়ির সরস্বতী ঠাকুর তৈরি করত যে-শিবুকাকু, সেই শিবুকাকু। আর তার খড়ের কাঠামোতে প্রথম মাটি পড়ার দিন থেকেই শুরু হয়ে যেত আমাদের দুই ভাইয়ের পুজো। মানে মহালয়া। আমরা দেখতাম ঠাকুর এক মেঠো থেকে দু-মেঠো হচ্ছে। রং হচ্ছে। চক্ষুদান হচ্ছে। মাটির মূর্তি জীবন্ত হচ্ছে।

বললাম বটে আমাদের মহালয়া শুরু হয়ে যেত সত্যিকারের মহালয়ার অনেক আগেই, কিন্তু মহালয়ার জন্য আমাদের প্রতীক্ষাও থাকত। যে-সময়টার কথা বলছি, তখন আমাদের গ্রাম বেলিয়াতোড়ে আমাদের পাড়াটি ছিল বোধহয় সবচেয়ে ফাঁকা পাড়া। মাত্র গুটি কয়েক বাড়ি ছিল আমাদের পাড়ায়। ছিল স্কুলের কোয়াটার্স। আর অনেক গাছ। তখন এখনকার মতো পুজোর সময়ে ভরা বর্ষা থাকত না। বরং অল্প অল্প শীত করত ভোরের দিকে আর রাত্রিবেলা। সে সময় আমাদের মহালয়ার জন্য কেবল যে প্রস্তুত করে রাখত শিবু কাকুর গড়তে থাকা দুর্গা ঠাকুর, তাই নয়। প্রস্তুত করে রাখত আগমনী গানও। জানি না এখন প্রায় শহর হয়ে-ওঠা বেলিয়াতোড়ে ভোরের বেলা আগমনী গান গেয়ে কেউ ফুল তুলতে বেরোয় কি না। কিন্তু তখন বের হতেন। এক বৃদ্ধ। শরতের কাকভোরে অল্প অল্প ঠান্ডা লাগত আর দূর থেকে ভেসে আসত তাঁর আগমনী গান। সে গান ক্রমশ কাছে আসত, পুজো এগিয়ে আসার মতো, মহালয়া এগিয়ে আসার মতো। অল্প শীতের মধ্যে ওই আগমনী গান শুনতে পেলেই আমরা বুঝতে পারতাম চলে এসেছে মহালয়া। দরজায় কড়া নাড়ছে দুর্গাপুজো।

মহালয়ার তিন-চার দিন আগে থেকেই শুরু হয়ে যেত আমাদের প্রস্তুতি। আমাদের বাড়িতে একটা বেশ বড়সড়ো রেডিও ছিল। সেটা রোজই বাজত। বিকেলে আমরা শুনতাম অনুরোধের আসর। রোজই বাজত তবুও আমার পিসতুতো দাদা মহালয়ার আগে আগেই একটু নেড়েচেড়ে ঘেঁটেঘুটে দেখে নিত রেডিওটার সব যন্ত্রপাতি ঠিকঠাক আছে কি না। যেন কোনোমতেই কোনো গোলমাল না হয় মহালয়ার ভোরে, তাই এ ব্যবস্থা। আমাদের পিসতুতো দাদা তখন আমাদের সঙ্গেই থাকত। আমাদের ছিল যৌথ পরিবার। মাথার ওপর ঠাম্মা, তারপর বাবা, জেঠু, বড়মা, মা, আমরা পাঁচ ভাই-বোন, আর আমাদের পিসতুতো দাদা গৌতম–এই নিয়েছিল আমাদের পরিবার। মহালয়ার আগের দিন জেঠুর কড়া নির্দেশ থাকত তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ার। জেঠুকে আমাদের পরিবারের সবাই যমের মতো ভয় করত। এমনকি ঠাম্মাও। কাজেই তাড়াতাড়ি খেয়ে আমরা সব্বাই শুয়ে পড়তাম। স্টিল রংয়ের ঘড়ি ছিল একটা। টেবিল-ক্লক। তাতে অ্যালার্ম দিয়ে রাখত জেঠু। কী তীক্ষ্ণ শব্দ ছিল সেই অ্যালার্মের! বাজলে কারও সাধ্য ছিল না ঘুমিয়ে থাকে।

ঘুম থেকে উঠেই আমরা ব্রাশ করতে শুরু করতাম। কেরোসিনের স্টোভ জ্বালিয়ে মা বড়োমারা চা বসাত। কোথায় তখন গ্যাস! আমাদের বাড়িতে রান্না হত গুলে। আর ব্যাকআপ বলতে ওই কেরোসিনের স্টোভ। চা খেয়ে আমরা রেডি হয়ে উঠতে না উঠতেই শুরু হয়ে যেত মহালয়া। সাড়া বাড়ি জুড়ে গমগম করত বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর চণ্ডীপাঠ। মনে হত যেন সমুদ্রের গর্ভ থেকে, পর্বতের শীর্ষ থেকে ভেসে আসছে স্বর। যে-অংশগুলি বাংলাতে আছে মহালয়ার, সেগুলোও, কেন কে জানে, মনে হত সংস্কৃতে পাঠ করা হচ্ছে বুঝি। এমনই ছিল বীরেন্দ্রকৃষ্ণর পাঠ! ঈশ্বরে বিশ্বাস বহুদিন চলে গেছে আমার। কিন্তু, এখনও আমার মনে হয় দেবত্ব বলে যদি কিছু থাকে, তাহলে তা আছে বীরেন্দ্রকৃষ্ণর ওই পাঠে। ওই পাঠটুকুই ঈশ্বর। আর যখন ওই গানটা হত–-’বাজল তোমার আলোর বেণু’’, তখন আমার মনে হত সত্যি সত্যি মা দুর্গা বুঝি মর্ত্যে নেমে এলেন।

সে সব দিন আর নেই। ঠাম্মা নেই, জেঠু নেই, বাবা নেই। যার থাকার কথা ছিল, সেই টিকলাও নেই। আমরা ভাই-বোনরাও ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছি নানা জায়গায়। আলাদা আলাদা করে মহালয়া শুনি। তবে, মাঝে কিছুদিন এই সকলে মিলে মহালয়ার শোনার অনুভূতিটা ফিরে এসেছিল। তখন মা আর আমার ছোটো ভাই টুকাই থাকত আমাদেরই সঙ্গে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসনে। মহালয়া নিয়ে তখন সবচেয়ে বেশি উৎসাহ ছিল আমার মেয়ে তিন্নির। মহালয়া শোনার জন্যই বর্ধমানে এসে রেডিও কেনা হয়েছিল একটা। সারা বছর সেই রেডিও বাজত না। কেবল মহালয়ার আগের দিন তাকে বাজাবার চেষ্টা করা হত। মাঝে মাঝে সে বাজত না। তখন তাকে নিয়ে ছুটতাম বোরহাটের এক দাদার কাছে। আলমদা আমার রেডিওকে ঘেঁটেঘুঁটে ঠিকঠাক করে দিত। ভোরবেলা ঠিক শোনা যেত মহালয়া। তারপর একসময় টুকাইয়ের বিয়ে হল। তার আলাদা সংসার হল। তখনও অবশ্য আমরা চারজন মিলে ভোরবেলায় উঠে শুনতাম মহালয়া। আর এই সবাই মিলে মহালয়া শোনার ক্ষেত্রেও মূল উদ্যোগী ছিল আমার মেয়ে। ওরই ছিল যত উৎসাহ। একবার তো ওর গানের স্যারের সঙ্গে মিলে মহালয়ার ছোট্ট একটি অংশ পরিবেশনও করেছিল সমাজমাধ্যমে।

এবছর আর এসব কিছুই হবে না। তিন্নি আমেরিকায়। আমাদের ভোর মানে ওর রাত। ও বলেছে মহালয়ার দিন ওদের ভোরবেলায় ও শুনবে মহালয়া। এখন তো আর রেডিওর ওপর নির্ভর করতে হয় না কাউকেই। বছরের যে কোনো সময়, যখন ইচ্ছে, যেখানে ইচ্ছে মহালয়া শোনাই যায়। তাই আমেরিকায় ভোরবেলাতেই ও শুনবে মহালয়া, যখন আমাদের এখানে রাত। আর আমরা যখন ভোরবেলা শুনব মহালয়া, তখন ওর ওখানে রাত। মেলাবেন তিনি মেলাবেন এর বদলে এ জীবনে দেখলাম মহালয়া হয়ে গেল সেই বস্তু যিনি একে একে সকলকে দূরে সরালেন।

সত্যি বলতে কী, আমার অভিজ্ঞতা হয়তো অনেকেরই। কেবলই পিতৃতর্পনের দিন নয় মহালয়া। আমারই মতো, আমার বয়সি অনেকেই হয়তো ভাবছেন মহালয়া হয়তো আসলে আমাদের এটুকুই বুঝিয়ে দেওয়ার দিন যে, সকলে প্রত্যেকে একা। বুঝিয়ে দেওয়ার দিন যে, জীবন আসলে একা হতে থাকার একটা জার্নি। আর কিছুই নয়।


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Trending