মহালয়ার ভোর ও স্মৃতিচারণ

আজকাল অভ্যাসমতই ভোরের আকাশ দেখার সুযোগ তেমন খুউব একটা হয়ে ওঠেনা কেবলমাত্র শুটিং ছাড়া। তবে আজ… ঘুমিয়ে থাকা অভ্যস্ত জীবনের মোড়ক খুলে চোখের পাতা খুললো…  মোবাইল টা হাতে নিয়ে জানলাম সময় এখন ভোর 3.58 । একরাশ অস্বস্তি নিয়ে এ-পাশ থেকে ঘুরে ও-পাশ ফিরে চোখ বন্ধ করে পুনরায় ঘুমানোর চেষ্টা । ব্যর্থ হলো সে চেষ্টা । খুউব একটা দূরে নয় বরং একটু নিকটবর্তী স্থান থেকেই একটা খুউব পরিচিত ভোরাই সুরের মূর্ছনা ভেসে আসছে। কানকে আরেকটু সজাগ করে বুঝতে চেষ্টা, সুরের সাথে কথা গুলো কী মিশে আছে ?
আশ্বিনের শারদ প্রাতে …
বুঝতে পারলাম, এ তো সেই অমোঘ কণ্ঠস্বর , যা ভক্তি, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার স্পষ্ট উচ্চারণ।
এ বছর পাড়ার ক্লাবের নতুন পুজো কমিটির নতুন উদ্যোগ সমগ্র পাড়া কে একদম রেডিওর প্রথাগত সময়সূচি মেনে মহিষাসুর মর্দিনী অনুষ্ঠান শোনানো ।
আধো ঘুম জড়ানো চোখে, ক্লান্ত শরীরটা কে বিছানা থেকে টেনে , আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে ক্লাবের পুজো কমিটির এমন উদ্যোগ কে সাধুবাদ জানালাম।
আজকের দিনে এমন করে মানুষের শান্তির ঘুম ভাঙ্গানোর সাহস রাখার জন্য আর বিছানা ছেড়ে দাঁড়িয়ে একদম সক্রিয়ভাবে ধন্যবাদ জানালাম এমন এক অনন্য অনুভূতিকে নাড়া দেওয়ার জন্য, যা বাঙালির রক্তে মিশে আছে । এই অনুভূতি কে সঙ্গী করে, ভালোলাগাকে আশ্রয় করে দিনটা শুরু করলাম । আজকাল বিশেষ কিছুতে ভালোলাগা আর তেমন করে পেয়ে বসেনা। কিন্তু কি অদ্ভুত,আজকের দিনটা একটু অন্যরকম …… ফ্রেশ হয়ে , রান্না ঘর থেকে চা নিয়ে আমার কাজের ঘরের জানালার সামনে দাঁড়ালাম । জানালাটা খুলতে খুলতে শরতের পূবের আকাশে চোখ মেললাম, জানালার পাল্লা খোলার শব্দে কখন যেন স্মৃতির জানালা খুলে বসলাম …

“সময় ছিলো , আমাদেরও “…

সময় বদলায় , বিগত বছর গুলোতে অনেক কিছু বদলেছে, মানুষে মানুষে যোগাযোগ কমেছে, মূল্যবোধ আর তেমন করে সাড়া দেয় না। কলকাতা সহ শহর, গ্রামের চেহারা বদলেছে, সুনীল গাঙ্গুলীর ” স্মৃতির শহর ” কেবলমাত্র আগলে রেখেছে আমার কলেজ বেলার কলকাতাকে।
মানুষ, মানুষের যাপিত জীবন, জীবন শৈলী, আচার, আচরণ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি , ধর্ম, ভাষা, জাতীয়তাবাদ , প্রেম, ভালোবাসা এ সব কিছুই বাজার অর্থনীতির নিরীখে বদলে নিয়েছে । এটা অবশ্যই বলা যায় সময় এখন স্মৃতির চেয়ে বেশি গতিশীল। এই সময় দাঁড়িয়ে এই এত কিছু বদলে যেতে দেখে আশ্চর্য হচ্ছি এখনো একফোঁটা অনুভূতির বদল হয় নি এই মহিষাসুরমর্দিনি গীতি আলেখ্যটির সম্পর্কে । জেনেছিলাম চেষ্টা হয়েছিল এই জনপ্রিয় অনুভূতির গ্রহণযোগ্যতা কে নস্যাৎ করতে, অনেক প্রখ্যাত মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগে, এমনকি স্বয়ং উত্তমকুমার ও যুক্ত ছিলেন সেই কর্মকাণ্ডে। বিফল হয় সেই প্রচেষ্টা।

ছোটবেলা থেকে যেমন করে দিনটাকে চিনতে শিখেছিলাম তেমন করে আজও চিনে নিতে পারছি…. দিনটা আজ মহালয়া।
রেডিওর একটি বিশেষ অনুষ্ঠান মহিষাসুরমর্দিনী গীতি আলেখ্য দিয়ে শুরু হয় মহালয়া। যদিও মহিষাসুরমর্দিনীর সাথে মহালয়ার কোনো সম্পর্ক নেই এটা একটু বড় হয়ে বুঝেছিলাম । মহিষাসুরমর্দিনী কে নিয়ে একটি স্থিরচিত্র প্রদর্শনী করতে গিয়ে এর সম্পর্কে বিশেষ ভাবে জেনেছিলাম অনেক তথ্য। তাতে শ্রদ্ধা আরো অনেক বেড়ে গিয়েছিল। এও এক স্মৃতি।

মহালয়া—এই শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালি জীবনের আবেগ , উৎসবের আহ্বান আর অসংখ্য স্মৃতি।
ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে কানে ভেসে আসছে এক গম্ভীর আহ্বান—
“জাগো দুর্গা, জাগো দুর্গতিনাশিনী…”
মনে হয়, আকাশ ভেদ করে দেবীর পদধ্বনি নেমে আসছে মর্ত্যে।

অতীত বেলার স্মৃতি পাক খেয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠছে…. শিউলি ফুলের গন্ধ মাখা উঠোন, শিশিরে ভেজা ঘাসের কার্পেট ,
ভোরের কুয়াশায় রেডিওর মিলিয়ে যাওয়া শব্দ,তবুও প্রতিটি সুরে লেগে থাকত হৃদয়ের গভীরতম আবেগ।

শৈশবের সেই মহালয়া মানেই ছিল…
অপেক্ষা, আনন্দ আর আশার সুর।
মা-বাবার পাশে বসে আগমনী গান শোনা,বন্ধুদের সঙ্গে দুর্গাপুজোর আলো কল্পনা করা, আর নতুন জামা-পড়ার অস্থির প্রতীক্ষা।

আজ সময় পাল্টেছে, বদলেছে মাধ্যম—
রেডিওর জায়গা নিয়েছে টেলিভিশন, মোবাইল আর ইউটিউব।
কিন্তু মহালয়ার ভোরে চোখ বুজলেই মনে হয়, আমি আবার ফিরে গেছি সেই উঠোনে—
যেখানে শিউলি ফুলের গন্ধে ভেসে আসে বীরেন্দ্রকৃষ্ণের অমর কণ্ঠ,
যেখানে প্রতিটি সুরে দেবী আগমনের বার্তা বেজে ওঠে।

মহালয়া তাই শুধু একটা দিন নয়, একটা তারিখ নয়…
এ এক অনুভূতি , এটি বাঙালি হৃদয়ের আবেগ । যা বাংলা সংস্কৃতি ও ধর্মীয় জীবনের সাথে দারুন ভাবে জড়িয়ে রয়েছে ।

শাস্ত্র মতে আবার এই দিনেই প্রথাগত আনুষ্ঠানিক নিয়ম মেনে পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে স্মৃতিচারনের মাধ্যমে শ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয় অর্থাৎ এই ভাবে বলা যায় মহালয়ার গুরুত্ব মূলত আমাদের পিতৃপুরুষদের স্মরণে প্রতিষ্ঠিত। যা তর্পণ নামে জ্ঞাত।

প্রাচীনকাল থেকে এই দিনে মানুষেরা পিতৃপুরুষদের স্মরণ করে তাঁদের তর্পণ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে আসছে। এই বিষয়টিকে শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে না দেখে বরং একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবেই দেখা উচিত। কারণ এই দিনে পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে পিতৃতর্পণ ও পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া হয়, যা জীবনের চিরন্তন সত্য ও সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দেয়।
মহালয়া স্মৃতিচারণ শুধুমাত্র পিতৃপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ। বর্তমান যুগে প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় আমরা আমাদের ঐতিহ্য থেকে অনেক দূরে সরে গেছি। মহালয়া সেই ঐতিহ্যের সেতুবন্ধন। পিতৃপুরুষদের স্মরণ করেই আমরা নিজেদের সংযোগ ও মূল্যের পুনর্মূল্যায়ন করি।
আমাদের পূর্বপুরুষরা সমাজ গড়েছিলেন, তাদের শিক্ষার আলোয় আমরা আজকের এই উন্নত সমাজে অবস্থান করছি।
মহালয়া একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রাসঙ্গিকতা বহন করে। এটি শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, একটি ঐতিহ্যবাহী স্মৃতিচারণ। আমাদের জন্য এটি আত্মপরিচয় ও জাতীয় চেতনার এক প্রতীক। আজকের প্রজন্মের উচিত এই দিনটির গুরুত্ব উপলব্ধি করে যথাযথভাবে পালন করা, যাতে এই মহান সংস্কৃতির জ্যোতি চিরকাল জীবন্ত থাকে।
এমন ধারণা কে পোষণ করে আজ থেকে প্রায় বেশ কিছু বছর আগে তর্পণ এর উপর একটি তথ্যচিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। সেই তথ্যচিত্র নির্মাণের প্রয়োজন এ একটু বিষদে জেনেছিলাম এই সব বিষয় , আচার , মন্ত্র গুলি সম্পর্কে এবং যথাযথ ভাবে তথ্যচিত্রে তুলেও ধরেছিলাম । কিন্তু যে প্রশ্নটার উত্তর এড়িয়ে যেতে হয়েছিল আজ ও তার উত্তর মেলেনি ,আজ ও এড়িয়ে যেতে হয় জানিনা অদূর ভবিষ্যতেও এড়িয়ে থাকতে হবে কিনা , তবে আশাবাদী আমি নিশ্চই উত্তর মিলবে ,কেউ না কেউ উত্তর দিতে পারবে , হয়তো আপনাদের মধ্যে থেকেই কেউ উত্তর দিতে আসবেন এমন সম্ভবনা নিশ্চই থাকছে । কারণ আকস্মিকতা আর সম্ভবনার দ্বন্দ্ব আমরা কেউ অস্বীকার করতে পারিনা যে।
এখন প্রশ্ন টা কী সেটাই বলছি ,
তর্পণ এর সকল ধর্মীয় আচার সম্পন্ন হওয়ার পর ঘাট থেকে বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই দেখা যায় একদল ভিখারী মানুষ ভিক্ষার ঝুলি বাড়িয়ে ভিক্ষা চাইতে থাকে আর সদ্য তর্পণ সম্পন্ন করা মানুষ জন তাদের ভিক্ষা দিতে দিতে এগিয়ে চলে পুণ্যার্জনের উদ্দেশ্যে । এটাতো একটা পরিচিত স্বাভাবিক ছবি এতে আর প্রশ্ন কী , অস্বাভাবিক তখনই যখন এই ভিখারী দলের লাইন যখন বাবুঘাট থেকে স্ট্যান্ডরোড ধরে সোজা ফেয়ারলিঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত, শুধু এই খানেই নয় প্রায় সব ঘাটেই সেদিন ভিখারীর দল এর ভিড় দেখা যায় বেশি পরিমাণে । এবার প্রশ্ন টা রাখছি, যে এই দিন তর্পণ করে পুণ্যার্জনের নিয়মে এই সকল ভিখারী কে ভিক্ষা দানের যে প্রয়াস তা কেন? অর্থাৎ একদল মানুষের পুণ্যার্জনের নিয়মে আরেক দল মানুষকে ভিখারী হয়ে ভিক্ষা অর্জন করতে হবে এই নিয়ম কেন ?

চায়ের কাপে শেষ চুমুক….. অন্ধকার কেটে ভোরের আলো এখন বেশ পরিষ্কার , অনতিদূরে চন্ডিপাঠ এখন শেষ লগ্নে রূপংদেহী, যশদেহী …

স্মৃতির ঘোর কাটিয়ে নিজের জগতে ফিরতেই যে প্রশ্নটার সম্মুখীন আমি হলাম , তার উত্তর দিতে দিতে আজকের এই স্মৃতিচারণ পর্ব শেষ করব।
প্রশ্ন হলো আমি ব্যক্তিগত ভাবে তর্পণ কে কী ভাবে দেখি ?
আমি যে ভাবে দেখি সেটাই বলছি …

তর্পণ মানে শুধু আচার নয়। তর্পণ মানে স্মরণ, তর্পণ মানে নিবেদন।
স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখাই আসল তর্পণ।
মা-ঠাকুমার রান্নাঘরের গন্ধ, বাবার কলমের দাগ,
হারিয়ে যাওয়া যৌবনের দিন—
এসবই একেকটি অঞ্জলি, একেকটি তর্পণ।
নারীর জীবনও এক অনন্ত তর্পণ
প্রতিদিন আনন্দ-আকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দিয়ে সংসারকে বাঁচিয়ে রাখা।
সৃষ্টির ভাণ্ডারই সবচেয়ে বড় তর্পণ।
তাই তর্পণ মানে শুধু পূর্বপুরুষের আচার নয়—
তর্পণ মানে স্মৃতির সংরক্ষণ,
অভিজ্ঞতার ভাগ করে নেওয়া,
নারীর আত্মত্যাগকে স্বীকৃতি দেওয়া,
এবং মানুষের হাতে সৃষ্টিকে অর্পণ করা।


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

“জয়তু মন্ডল” তে 3 টি মতামত

  1. খুব সুন্দর লেখনী… 🙏 খুব ভালো লাগলো ❤️

  2. সহমত।তর্পণ মানে নিবেদনের সাথে সাথে পূরব পুতুষদের স্মৃতিকে বাচিয়ে রাখা।আমার ও ব্যাক্তিগত মত এটাই।

    ভালো লাগলো লেখাটা।

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Trending