মহালয়ার স্মৃতিচারণ

মহালয়া নামটি শুনলেই আমার কানে ভেসে আসে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গম্ভীর চণ্ডীপাঠ। হয়তো বাঙালিদের অনেকের কাছেই মহালয়া মানে এ-ই সুর। সেই সুরেই দেবীপক্ষের সূচনা, সেই সুরেই আমার ছোটবেলার স্মৃতি বাঁধা। মহালয়া মানেই তখন রেডিও, আর ভোরের অদ্ভুত এক জাদু।

শৈশবে আমরা থাকতাম মহারাষ্ট্রের এক দূরবর্তী ফ্যাক্টরি এস্টেটে—ভরাঙ্গাঁওয়ে। মহালয়ার আগের দিন বাবা যত্ন করে রেডিওর ব্যাটারি পরীক্ষা করতেন। ভোর হতেই বিছানায় শুয়ে আমি আর বোন অন্ধকার জানলার বাইরে তাকাতাম। মনে হতো—আকাশের ওপারে চলছে দেবী আর অসুরের যুদ্ধ, আর এক পণ্ডিতমশাই যেন আমাদের জন্য তার সবকিছুর সরাসরি সম্প্রচার করছেন। টেবিলের ওপর রাখা রেডিও থেকে ভেসে আসা সেই সুরে আকাশ, মাটি, মন—সব ভরে উঠত। একবার কালীমন্দির ক্লাবের পঁচিশ বছরের উৎসব উপলক্ষে ভোরে মাইক লাগিয়ে মহালয়া বাজানো হয়েছিল। চারপাশের নিঝুম অন্ধকার ভেদ করে ছড়িয়ে পড়েছিল চণ্ডীপাঠ, আর আমরা সবাই জানলা খুলে শুনেছিলাম। ছোট্ট মনে সে অভিজ্ঞতা ছিল একেবারে অলৌকিক।

মহালয়ার আরেক আনন্দ ছিল শিউলি ফুল কুড়োনো। কোয়ার্টারের পেছনের সরু পথের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিউলিগাছের নিচে ঝরে থাকত অসংখ্য সাদা-কমলা ফুল। মনে হতো, শিউলি যেন কেবল আমার জন্যই ফোটে—কারণ আমার ছোট্ট হাত উঁচু ডালে পৌঁছাত না, তাই ফুল নিজেই মাটিতে নেমে আসে। আমি এক ঝাঁকা ফুল কুড়িয়ে দিতাম মাকে পুজোর জন্য। তারপর স্কুলের জন্য তৈরি হতাম, কিন্তু মনে থাকত একটাই উৎকণ্ঠা—সন্ধ্যায় ক্লাবে প্রতিমার চোখ আঁকা হবে। আমরা বসে থাকতাম, কখন মিহির জেঠু আর স্বপন জেঠু সেই জাদুকরি মুহূর্তটিকে সম্পূর্ণ করবেন। সে ছিল এক সরল অথচ ভরপুর আনন্দে ভরা জীবন, যা আজ মোবাইল আর প্রযুক্তির ভিড়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।

অষ্টম শ্রেণিতে উঠতেই বাবার বদলি হলো ইছাপুরে, আমাদের পৈতৃক ভিটেয়। সেখানেই প্রথম জানলাম মহালয়ার সকালে তর্পণ হয়—পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে জল দেওয়া। মনে হতো—মেয়েরা কেন তর্পণ করতে পারে না? এসব ভাবতে ভাবতে কখনো কখনো ভয়ও পেতাম। ইছাপুরে আসার পর মহালয়ার সকাল মানে ছিল আগে রেডিও, পরে টিভিতে মহিষাসুরমর্দিনী দেখা। ঠাকুমার সঙ্গে বসে দেখা ছিল বিশেষ আনন্দের। কত আলোচনা হতো—কারা এবারের দুর্গা, কার নাচ বা অভিব্যক্তি ভালো হলো। ঠাকুমা ভোরে উঠে সকাল ছ’টার মধ্যে স্নান, পরিষ্কার সাদা শাড়ি, আর থালায় সাজানো শ্বেতপদ্ম—এই সবকিছুর ভেতরেই বাঁধা আছে আমার শৈশবের মহালয়া।

বিশ্বকর্মা পুজোর দিনে বাড়িতে হতো অরন্ধন পুজো। তার পরদিনই শুরু হতো পুজোর বাজার। বাবা আমাদের নিয়ে বেরোতেন। মহালয়ার দিন ছিল পাড়ায় ঘোরাঘুরি, কার নতুন জামা কেমন হলো তা দেখা। মা-র সঙ্গে বসে ঠিক করতাম, কোন দিন কোন পোশাক পরব।

আজও মহালয়া আছে, কিন্তু নেই সেই শিউলি ফুলের গন্ধ, নেই নতুন জামার উৎকণ্ঠিত আনন্দ। এখন সারা বছরই জামা আসে, অথচ সেই উচ্ছ্বাস নেই। তবু বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠস্বর আজও গায়ে কাঁটা দেয়। মন ছুটে যায় সেই শৈশবের দোরগোড়ায়—যেখানে দু’চোখ ভরে লুকিয়ে আছে রঙধনুর মতোই উৎসবের সাত রঙ।


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

“কাবেরী মুখোপাধ্যায়” এ একটি মন্তব্য

  1. অসাধারণ লেখনী। 👌🏻❤️

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Trending