সৈয়দ হিলাল সাইফ

লন্ডন শহরের একই রাস্তায়, ভিন্ন ফ্ল্যাটে আমাদের বাস। তাই শামীম আপা আর আমি আসলে একে অপরের প্রতিবেশী। ২০০১ সাল থেকে বৃটেনে আমার বসবাস, যদিও তখন ঘর ছিল লন্ডন থেকে প্রায় তিনশ মাইল দূরে, সাগরপাড়ের শান্ত শহর হার্টলিপুলে।
তাঁঁর নামের সঙ্গে পরিচয় বহু আগেই, তবে প্রথম দেখা ২০০৪ সালে লন্ডনের বৈশাখী মেলায়। তখন থেকেই যেন কবিতা, মানুষ আর মমতার এক অদৃশ্য বন্ধনে বাঁধা পড়ে যাই আমরা।
লন্ডনের সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলোয় শামীম আপার লেখা নিয়মিত ছাপা হতো। তাঁর কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ—সবই ছিল গভীর চিন্তা, মানবিকতা ও ভাষার সৌন্দর্যে ভরপুর। আমি নিজেও তখন সাহিত্য পাতায় ছড়া ও কবিতা লিখতাম, ফলে তাঁর পাশে নাম দেখলে একধরনের অনুপ্রেরণা কাজ করত।
২০১৪ সালে আমি স্থায়ীভাবে লন্ডনে চলে আসি। এই সময় থেকেই আমাদের সম্পর্ক আরও গভীর হয়—বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সাহিত্য সভা, বৈশাখী মেলা, কিংবা ফেসবুকের আলাপ—সবখানেই শামীম আপা যেন এক আলোকবর্তিকা। বঙ্গবন্ধু, একাত্তর ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমরা দুজনেই এক আদর্শে বিশ্বাসী। সেই মিল আমাদের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে।
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ভাস্কর্যের সামনে স্বরচিত কবিতা পাঠ, মেলায় আড্ডা, আমার বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, কিংবা তাঁর সাথে গাড়িতে চেপে অনুষ্ঠানে যাওয়া—এমন কতশত স্মৃতি জড়িয়ে আছে শামীম আপাকে ঘিরে।
অমর একুশের গানের রচয়িতা আব্দুল গাফফার চৌধুরীর মৃত্যুর পর, বৃটেনে সংস্কৃতি অঙ্গনের কর্মীদের কাছে শামীম আপাই যেন আমাদের একমাত্র অভিভাবক। তার স্নেহ, যত্ন আর সাহচর্য আমাদের প্রজন্মকে বারবার অনুপ্রাণিত করে।
আমাদের প্রায়ই কথা হয়। তিনি এখন কবিতা শেখান, নতুন প্রজন্মকে সাহিত্যচর্চায় উৎসাহ দেন। আমি সময়ের অভাবে তার ক্লাসে নিয়মিত যেতে না পারলেও, শামীম আপার সেই মিষ্টি বকুনি আজও কানে বাজে।
তাঁর লেখা “চূর্ণ কবিতা” ও “পকেটভরা পাপড়ি”—আমার ভীষণ প্রিয়। তাঁর কবিতায় যেমন আছে গভীর অনুভব, তেমনি আছে সহজ-সাবলীল উপস্থাপনা। তাঁর হাস্যোজ্জ্বল মুখ, প্রাণবন্ত কণ্ঠ আর কবিতার প্রতি নিবেদন আমাকে বারবার মুগ্ধ করে।
শামীম আজাদ শুধু কবি নন—তিনি নাট্যকার, গদ্যকার, গল্পকার ও অসাধারণ এক পরিবেশক। বাংলা ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষাতেও তাঁর সমান দখল। তিনি ব্রিটিশ কবি সমাজেও সমানভাবে শ্রদ্ধেয়।
বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় তাঁর রচিত কবিতা সংকলন, নাটক ও শিশুতোষ রচনাগুলো আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত হয়েছে।
২০২৩ সালে কবি শামীম আজাদ বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হন—এ এক প্রাপ্য সম্মান, যা তার দীর্ঘদিনের সাহিত্যসাধনার স্বীকৃতি বহন করে।
শামীম আপার কবিতা যেমন মমতাময়ী, তেমনি দৃঢ়। তিনি আমাদের প্রবাসী সমাজে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির আলোকবর্তিকা হয়ে আছেন। তাঁর জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ যেন বলে—কবিতা শুধু লেখা নয়, কবিতা এক জীবনযাপন।


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Trending