শামীম আজাদ

যতবারই জমায়েতে বসে ঘ্রাণে স্বাদু ইলিশ খেতে বসেছি, ততবারই আমার পাশে বসা কেউ না কেউ এর কাঁটা নিয়ে নালিশ করেছেন। কিন্তু খাওয়া থামান নি। এ যেন ছোটবেলায় কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের ‘কাটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে/ দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহীতে’র সম্মুখ ভাব সম্প্রসারণ! এর অপ্রতিরোধ্য স্বাদ মানুষকে কাঁটা অগ্রাহ্য করে তা রসনায় তুলে নেয়াটাই মুখ্য। সে আমি আমার বাবাকেও দেখেছি। আমরা তখন বাংলাদেশের জামালপুর নামের মিষ্টি এক মহকুমা শহরে থাকতাম।

টেবিলে ইলিশ এলে শুনতাম আব্বা গজ গজ করছেন। ‘অত মজার মাছ’র বিতরে কেনে যে অত কাঁটা’! এঁর আম্মা বলছেন, ‘তে না খাইলেই অয়’! না গজ গজ করতে করতেই মি: তরফদার অতি যত্নে প্লেটের ভাতগুলো একদিকে ঠেলে দিয়ে সে জায়গায় ভাজা ইলিশের টুকরোটা মায়াভরে স্থাপন করতেন। আশ্চর্যের বিষয় হল তারপর বিরক্ত মুখে কিন্তু পরম নিবিষ্টতায় সময় নিয়ে একটু একটু মাছ ভেঙে প্লেটেই আলাদা করে রাখতেন। তারপর ডান হাতের তর্জনি দিয়ে টিপে টিপে কাঁটা সনাক্ত করে বাঁহাতের দুই আঙুলকে টুইজারের মত করে ইলিশের ‘কুর’ থেকে সরু ও সূক্ষ্ম কাঁটা তুলে নিতেন। তারপর হাত ঝেড়ে মনে মনে নিজেকে বাহবা দিয়ে একটা ছোট্ট ইলিশগোলা বানাতেন। আমরা ভাইবোনেরা মাছ এর ফেব্রিক কহ্লার সে সুগন্ধ পেতাম। তবে নিজেরাই আম্মার শেখানো পদ্ধতিতে দাঁত দিয়ে কাঁটা বেছে চপাৎ চপাৎ চিবিয়ে চলেছি। আব্বা আমাদের দিকে বিস্ময়ের ও গর্বের চোখে চেয়ে দ্বিতীয় দফায় তার সে মাছের লাড্ডু থেকে কাঁটা বিহীনতা নিশ্চিত করতে ব্যপৃত হয়ে যেতেন। আম্মা কৌতুকের চোখে দেখতেন আব্বা এবার চোখ বন্ধ করে আঙ্গুলের বোধে কাঁটা সনাক্ত করছেন।

বিলেত থেকে সোনামামার পাঠানো প্রেশার কুকার আসার আগে এই ছিল আমাদের বাসার ইলিশচিত্র। প্রেশার কুকার আসার পর দেখলাম আম্মা কোরমা মশলা আলাদা ভুনা করে খাসা ছাড়ানো, পেট চিড়ানো ছোট্ট একটা আস্ত ইলিশ মাখিয়ে প্রেশার কুকারে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। ম্যাজিকের মত ইলিশকে কাঁঁটাহীন করে ফেলছেন। আসলে প্রেশার কুকারের ভেতরের মহাতাপে মাছ সেদ্ধ হয়ে কাঁটা পর্যন্ত গলে যেত। কুকার্যের ভেতরের গোল ট্রেতে মাছ ও উপরে মশলা দিয়ে ঢাকনা লাগালে বিস্ময়ের সঙ্গে দেখতাম – ঢাকনার মাথায় বসা দাবার নৌকা বা ‘রুকের’ মত ক্ষুদ্র জিনিসটা ফিছ ফিছ করে শব্দ করে চুপ হয়ে গেল।আম্মা ঘড়ি দেখে রুকের সূচক নেমে এলে চুলো বন্ধ করতেন। ঢাকনা খুলতেন আরো পরে। খুললে সে সুগন্ধ আমাদের রান্না ঘর ছাড়িয়ে হিম সাগর গাছের নিচ পর্যন্ত চলে যেত। আমরা তা পোলাও দিয়ে আমের আচার মেখে খেতাম। আব্বা খেতেন মহা আনন্দে। সে গল্প শুনে কাঁটাবিহীন ইলিশ খেতে আসতেন তাঁদের বন্ধুরা। সে রীতিমত এক হৈ হৈ কাণ্ড।আরেকদিন বলা যাবে। আগের গল্পটা শেষ করি আগে।

পাতের সে ইলিশের টুকরোটা সিলেটী ‘মাছ বিরান’ হতো তাহলে গরম ভাতের সঙ্গে ডালে মাখা লোকমার উপরে বাছা মাছলাড্ডুটা বসিয়ে দিয়ে খেতেন। আর ঝোল বা সর্ষে-ইলিশ হলে তার ঝোলে মাখা গোলার উপর ইলিশের লাড্ডু বসিয়ে রেলিশ করে চোখ বুজে মুখগহ্বরে পাঠিয়ে দিতেন। তখন দেখতাম তাঁর অবয়বের একটু আগের বিরক্তি উবে গেছে। শিবরাম চক্রবর্তীর ইলিশের ঘরে পড়ে গেছেন। আমার প্রিয় লেখক শিবরাম চক্রবর্তী নাকি পদ্মার ইলিশ খেলে ৭ দিন হাত না ধুয়ে বার বার শুঁকে দেখার কথা বলেছেন। আব্বাও হাতটা নাকের কাছে নিতেন। পরম আনন্দে মুখটা উদ্ভাসিত হয়ে উঠত। কিন্তু তাতে কি! আমরা চার ভাইবোন আশঙ্কায় তাঁর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে খেতাম। কারণ যে কোন সময়ে নাটক শুরু হয়ে যেতে পারে। কখন গলায় ইলিশের কাঁটা লাগে … কাঁটা লাগে। কাইক্কা খেলেও প্রায় নিয়মিতভাবে তাই হত। এ ছিল জামালপুরের এবং পরবর্তী সময়ে নারায়ণগঞ্জের জীবনে একটা নিত্যদিনের সাধারন ঘটনা।

পরিষ্কার মনে আছে, আব্বা দু’লোকমা খেয়েছেন কি খান নি আমরা দেখতাম তিনি থেমে গেছেন। আম্মার দিকে বেফানা চোখে চেয়ে আছেন। আর আম্মা দ্রুত দোয়া পড়ে পড়ে ভাতের দলা পাকিয়ে আব্বার হাতে দিয়ে বলছেন, ‘না চাবাইয়া গিলুক্কা… গিলুক্কা’। আব্বা চোখ মুখ লাল করে গেলার চেষ্টা করতেন। কাজ হতো না। আমরা খাওয়া থামিয়ে দেখতাম আম্মা তবু আবার গোল্লা পাকাচ্ছেন আর দোয়ার ফুঁ দিচ্ছেন। এবার আমরা ভাইবোনরা খাওয়া রেখে উঠে দাঁড়াতাম, এক্ষুনি এসওএস লাগবে। ভাইয়া দৌড়ে গিয়ে টেবিল ফ্যানের স্পিড বাড়াবে। আমি শোবার ঘরের কাঠের আলমারীর উপর থেকে বিশেষ ‘মুচনা’ নিয়ে আসবো। অতি দীর্ঘ ঐ মুচনা বা চিমটা বা টুইজার যাই হোক সেটা সিংজানি বাজারের কামার দিয়ে আব্বার গলায় বেঁধা কাঁটা ধরার জন্যই বানানো হয়েছিল। তো আমি হাজির হলে দেখতাম আব্বা বাঁহাতে আয়না ধরে মুখগহব্বর যত বড় করা যায় তা করে – আনোয়ারা আনোয়ারা করছেন। মিসেস তরফদার তখন পেশাজীবি নার্সের মত বুজানের হাত থেকে চশমা নিয়ে হাঁ’র ভেতরে মাছের কাঁটা খোঁজার চেষ্টা করছেন। ভাবছেন আলোকপাতের জন্য রোদের উৎস খুঁজে জানালার কাছে যাবেন কিনা। ততক্ষণে আমাদের একজন আলমারীর উপর মারফি রেডিওর পেছন থেকে তিন ব্যাটারির ‘এভারেডী টর্চ’ এনে ফেলেছি। অপারেশন টিম তো পুরাই রেডি। কাঁটা তুলে নিলে আমরা প্রায় হাততালি দেবার মত ভাব নিয়ে পুনরায় খাদ্য অধিবেশন শুরু করতাম। মইসে তরফদার কোটুক করে আবার বলতেন ‘ইলিশ’র কাঁটারে অত ডর- তে ই মাছ না খাইলে কিতা অয়’? তারপর আম্মার বেছে দেয়া মাছ দিয়ে ভাত মেখে খেতে খেতে তাঁর পড়াশোনার কালে কলকাতার মেস এর গল্প করতেন। মেসমেট সৈয়দ মুজতবা আলীর গল্পও বাদ যেতো না। শেষ করতেন যা বলে তা হ’ল, ইলিশ এমনি এক দুর্লভ স্বাদের মাছ যে তাঁর ঘ্রাণ মেখেই ভাত খেয়ে ফেলা যায়।

আমি তাই ভাবি ইলিশের স্থান অনন্য হবার কারণই এর স্বাদ। ইলিশ দেখতে খেতে শুঁকতে চাখতে সব দিক থেকেই অনন্য। রকমারি রান্নার রেসিপিও লাগে না শুধু এক চিমটি নুন দিয়ে হালকা সেদ্ধ করে ভাতের সঙ্গে কাগজী লেবুর রস মেখে মুখে তোলাই যে যথেষ্ট। সে গরম কিম্বা ঠাণ্ডা ভাতের সঙ্গে এ এক অমৃত। তাই কাঁটা হেরি ইলিশ খাওয়া থেকে কেউ ক্ষান্ত হয় না।

শামীম আজাদ

কবি

২৮.৮.২৫

লন্ডন।


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Trending