শামীম আজাদ
আমার কাছে ‘ভাষা’কে লাগে পোশাকের মত, জামার মত, কিছুর ভেতরে আরামে থাকার মত। অনেকটা চেহারার মত মানুষ যা দিয়ে যাচাই করে। মানুষ শনাক্ত করার জন্য ভাষাই আসলে শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞান। যে অভিজ্ঞান বুকে নিয়ে মানুষ হাঁটে। মানুষকে হাঁটতে হয়। মাইলকে মাইল- বাস্তব অথবা পরাবাস্তব দূরত্ব অবধি। ভাষার বৈঠায়ই বারি দিয়ে দিয়ে মানুষকে পাড়ি দিতে হয় দুস্তর পারাবার অথবা খন্ডন করতে হয় তার দূরত্ব। ভাষা দিয়েই প্রয়োজনে ব্যবধান বাড়িয়ে রাখতে হয়। ভাষায় হয় সকল অবসাদ অবসান, আচানক আহ্লাদ। তাই এ ভাষাজামার পকেটে, বেল্টে, ব্যাগে, কোমরে, ফোকড়ে অকাতরে কতগুলো সুন্দর ও চকচকে পাথর ভরে দিলেই হয়না। তার ওজন সঠিক হতে হবে না হলে সে ব্যক্তি আর হাঁটতে পারবেনা। অনতি বিলম্বে দাঁড়িয়ে পড়বে অথবা চলবে টেনে টেনে, চলার গতি তার সুন্দর হবে না। সে যতটুকু ভার নিতে পারবে তাকে অতটুকুই দিতে হবে। সে বিলাবে, মাখবে ও মাখাবে। তখন তার ভাষা সুন্দর সুগন্ধি হয়ে আশেপাশের সবাইকে জড়িয়ে ধরবে। তবে গন্তব্য বুঝে মাঝেসাঝে হালকা পাতলা পাতলুনের বদলে অমন কিছু দামী পাথর ও পোশাকে বসিয়ে দেয়া যায়। যদি জানা যায় যে আপনি যেখানে যাচ্ছেন সেখানে লোকজন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে, টিকিট কিনে কেবল আপনার অপেক্ষায় বসে আছেন। সেখানে আপনি যা পরে মঞ্চে দাঁড়াবেন- তাহাই পোশাক। যাহা খাইবেন- তাহাই খাদ্য। যাহা বলিবেন- তাহাই বাক্য!অনুরূপভাবে, আপনি লেখক হলে, আপনার গদ্যের ব্যাপারে তাহাই প্রযোজ্য। আপনার পাঠকদের আপনি তৈরী করেছেন। এখন আপনি ও আপনার পাঠক মজার এক মাদকতায় ডুব দেবেন। এ অলৌকিক অবস্থায় এমনকি ‘নিজস্ব নানান রীতি, গদ্য-স্টাইল ও স্ট্যান্ট সবই চলতে পারে। কিন্তু আমার অবস্থা ভিন্ন। লিখতে শুরু করে শ’পাঁচেক শব্দ টাইপ করার পর, কি লিখলাম তা পড়ি আর মরি। তখন কি হয় জানেন? আর তো এগুতে পারি না। ছোটবেলা বিদ্যালয়ে পাটিগণিতের ক্লাসে করা মানসাঙ্কের বাঁদরের দশা আরকি। গদ্যের গাছ হয়ে ওঠে এক পিচ্ছিল বাঁশ। তিন পা এগিয়ে পিছলে পড়ি দু’পা। যা লিখেছি তা মগজের মোচড় থেকে পাঠকের জন্য কম্প্যুটারের পর্দায় নিয়ে এসেছি কি আসে নাই তার উপলব্ধি হয় নাই। লেখার পর পিছিয়ে গিয়ে তা জানার জন্যই এ পড়া। কিন্তু প্রায়ই- পড়ে দেখি হায় হায় এখানে শব্দ গুঁজতে পারিনি- তাই ওদিক থেকে শব্দ বা বানী তা ফোস্কার মত ফুলে উঠেছে। কোন স্থানে মনে হয় ভাষা ভিন্ন হওয়া উচিত। তাই এক্ষুনি তা বদলে মুখের ভাষা করতে হবে। যেখানে নতুন অনুচ্ছেদ শুরু করেছি তার নিয়েও নিজেকে নিজে জবাবদিহি করে হয়রান হয়ে যেতে থাকি। আর কালের কলাকৌশলের কথাতো আছেই। তারপর কখনো কখনো পুরো রচনাই পাল্টে দিচ্ছি – বিষয় বস্তু একই আছে কিন্তু তা হয়ে গেছে ভিন্ন। এদিকে বার বার লিখতে লিখতে কখন হারিয়ে ফেলেছি ‘ডেডলাইন‘! ঘুম থেকে উঠে শেষ রাতে যে নুসরাত ফতেহ আলী শুনে শুনে লিখছিলাম তা বন্ধ হয়ে গেছে কখন! তার বদলে লিফ্ট এর যান্ত্রিক শব্দ (আমার লেখার ঘরের দরোজার পরেই সবার ফ্ল্যাট প্রবেশের পথ) ও কর্মজীবি মানুষের বাইরে বেরুবার শব্দ শোনা যাচ্ছে। দরোজার ফাঁক দিয়ে সূক্ষ্ম বাতাসে ভেতরে নাকে এসে লাগছে আফটার শেভ, কলোন আর কড়া পারফিউমের গন্ধ। ঘরের বাতি ও বাইরের সূর্য দুটোই জ্বলছে।এসব চিন্তাধারার জন্য একটি ‘টিক‘ বাক্স আছে। ১.কি লিখছি ২.কার জন্য লিখছি ৩.সম্ভাব্য পাঠক কে ৪. আমি আসলে কাদের পড়াতে আগ্রহী ৬.কোন কাগজে লিখছি ৭.তাদের গাইড লাইন কি ৮. পাঠকগন বিনিময় মূল্যে পড়বেন না বিনা মূল্যে ৯. আমাকে এ ভাষায় চেনা যাচ্ছেতো ১০. আমি আমার নিজস্বতায় স্থিত আছিতো ১১. আমি যে ভাষা ও শব্দ ব্যবহার করছি তাতে আমার লক্ষ্যমত পাঠক হাসাতে, কাঁদাতে বা ভাবাতে পারছিতো ১২. আমার ‘কথা’ থেকে আমার ‘চিন্তা’ অথবা আমার ‘দুশ্চিন্তা’কে পৃথক পালঙ্কে বসাতে পারছিতো ১৩. আমার চরিত্র এক অর্থে দুই কথা বলছে কি/ বলতে পারছে কি ১৪. গল্পে গল্পে যা বলছি তার অনুবাদ কি এক ও অনন্য (কারণ একই ভাষায় থেকেও তার ভিন্ন অনুবাদের অনুরনন কানে আসাটাও একটি স্বাভাবিক ব্যাপার)…নাহ্ আর দীর্ঘ করবোনা। করতেই পারি। আপনার বেলা আপনি পারবেন কারণ চাওয়ার কাজটি সোজা। ‘পাঠক’ এবং ‘লেখক’ মাত্রই পারবেন। আবার হয়তো এখানে বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু ফেলেও গেছি- যা আপনার(পাঠক) মনে এসেছে কিন্তু- আমার(লেখক) মনে আসেনি। হতেই পারে, হতেই পারে। তা হলে তা-ও যোগ করে নিন। অথবা বিয়োগ। তবে কথা সেটা না। কথা হল এত কিছু কি কোন লেখক তার লেখার সময় ভাবেন? নাকি লিখিয়া লিখিয়া ভাবেন? নাকি ভাবিয়া লেখেন? জানি অনেক নামী লেখকের কাছে এবিদ্যা অনায়াস। কিন্তু আমার জন্য না। আজও আমার বকুল যখন ফোটে তখন কবিতায়ই ফোটে। কিন্তু আমার গদ্যের গাছ কিম্বা গাভী আমাকে যথেষ্ট নাকানি চুবানি দিয়া তবে ফুল ফোটায় অথবা সুমিষ্ট দুগ্ধে তৃষ্ণা মেটায়, আমার এবং আমার প্রিয় পাঠকগনের। এ অনেকটা যুদ্ধের মতই। আমি পড়ি আর যুদ্ধ করি। মরি আর পিছাই এবং আবার আগাই। তখন ঘরের ভেতরে বাতি- বাইরে বরফ আর সূর্য এক সাথে জ্বলে ওঠে। মনে হয় যেন জানালায় লাফিয়ে পড়েছে বরফের বাঘ। তবে এভাবে রজনী প্রভাত হলে বড় ভালো লাগে। লেখায় আসে পড়ে শীতালং শাহ্ ও একদিন এভাবেই আর জুলিয়া ক্যামেরুন এখনো .. .। কিন্তু এইযে নিজের ভেতরে ভাষা সৃষ্টির একটা লড়াই সেটা তাৎক্ষণিক ও স্থানিক হলেও এভাবেই যখন নিরন্তর চেষ্টায় একটি চরিত্র ফুটে ওঠে তখনই আমার লেখায়ই এসময়ের ভাষার চালচিত্রে একটি লেখক চরিত্র চিহ্নিত হয়। তাকে শনাক্ত করা যায়। আর সময় অতিক্রান্ত হলে পরে তা দিয়ে দেখা যায়; সে সময়ের জলবায়ু, জীবন র্চচা। সেখানে কিছু সময়ের জন্য দম নিচ্ছে ভাষা আর যেন জগতব্যবস্থাও থিতু হয়ে গেছে। সময়কে বাটখাড়া বা বোঁচকায় তুলতে হলে লেখক তার গদ্যে মুখের ভাষার কাছাকাছি ভাষা ব্যবহারেই বেশী মনোযোগী হোন। ভাষা যেহেতু চলমান- এই চলমান বর্তমানকে মূর্ত করতে লেখকদের ভাষাফুলবনে যার কাছে যাওয়া সহজ হয় তারেই লাগে ভালো। সে পছন্দ বনপথে সরীসৃপের মত এটা ওটা পেরিয়ে এঁকে বেঁকে দ্রুত এগিয়ে যাবার সময় পথে নিজে টিকে থাকার জন্য যা পায়- অথবা যা সুস্বাদু ঠেকে তাই আত্মস্মাৎ করে। বিশ্ববাগানে টিকে থাকার কথা ভেবে আঞ্চলিক, লোকজ, মুঠোফোন, অনাবাসী, বিদেশী ডায়াস্পোরার যাই হোক এমন কি তা মানুষের মুখ থেকে কেড়ে আত্মসাৎ করে। বঙ্কিম চন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের কথা মত ‘ভাষা প্রাঞ্জল করে তুলতে’ চায়। কিন্তু সকল কোলেষ্টরল সুস্বাদু হলেও তার সকলই পাতে টেনে নিলে সে ভাষাদেহের শিরা উপশিরা অতিরিক্ত চর্বির কারণে বন্ধ হয়ে যাবার আশংকা থাকে। গদ্যের গাছটি আর স্লিম থাকেনা। মেদহীন দেহ টেকে বেশিদিন। যদিও দেখতে একটু কাটখোট্টা দেখায়। তবে মেদময় দেহের কারণে সে গাছের অবয়ব আপাত মনোহর বোধ হয়। এবং এই আপাত আর্কষক গদ্যের জন্য ও এক ধরণের একটা আকাঙ্খা থাকতে পারে। তাতে লেখক একটু ‘টক অব দ্যা আজিজ মার্কেট’ হয়ে যেতে পারেন। আবার তা লটারির টিকিটের মত ‘লাগলেও লাইগ্যা যাইতে পারে’ এমন একটা সম্ভাবনাও থাকে। যেমন হয়েছে আমাদের দেশের টিভি নাটকে এবং কিছু কিছু পুস্তক শিরোনামে ও লেখায়। এ টিভি নাটকগুলোর গল্প তো প্রথমত লিখিতই। বেশ কিছু ছাপাও হয়েছে। তবে এখন অনেক নাটক দেখে শুনে মনে হয় তা ইম্প্রোভাইজেশনেই চলছে। এদের এ গদ্যের ভাষা কি? এ গদ্যের ভাষাকে আমি বলি, এ রাজধানীর ভাষা। যে ভাষার প্রদায়ক ভাষমান জনসাধারন। পৃথিবীর নানান দেশের রাজধানীর বড় বড় শহরে যুগে যুগে সারাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ আসে – থাকে। এমনকি বিদেশীরাও আসে, থাকে, চলে যায়। কেউ কেউ বাসাও বাঁধে। এই সকলের কথা থেকেই তৈরী হয় একটি ভাষা। যা মান ভাষা নয়, আঞ্চলিক ভাষা নয়, বিদেশী ভাষা নয় আবার লোকভাষাও নয়। কিন্তু এর সবই সে দেশের ভাষা-ফেব্রিকের ফাইবার, ভাষা-পোশাকের নানান আঁশ। আর এ থাকে বলেই সারা বিশ্বেই রাজধানীগুলোর ভাষার ধরণ এক। একধরনের ভাষা। মান নয়- নয় অসম্মান- আঞ্চলিক- আন্তর্জাতিক। আর তা প্রতিনিয়ত বোনা হচ্ছে- সেলাইবিহীন। ফিরে আসি আমার ব্যক্তিগত গদ্য ভাষার কথায় – আমি বাংলাদেশে থাকিনা, থাকি বিলেতে। ঢাকা ও সিলেটে যাই, থাকি। তখন রাজধানীর ভাষা শুনি এবং টিকে থাকার জন্য স্বজ্ঞানে তা সাজাই ও ব্যবহার করি। কিন্তু আমার এই প্রবাস যাত্রায় অনাবাসী বাংলাদেশী হয়ে যাবার পরে একটা বিষয় যা দেশে বাস করার কালে উপলব্ধি করিনি তা হল ভাষার বেড়ে ওঠা কোন ভৌগলিক সীমার ওপর নির্ভর করেনা। এ একান্তই র্নিভর করে সে ভাষার মানুষগুলো যেখানে আছে, যাচ্ছে, তা তাদের মত করে টিকিয়ে রাখছে তার ওপর। সেখানে এ ডায়াস্পোরার ভাষার বিস্তার যেভাবে হচ্ছে, যে প্রয়োজনে হচ্ছে তাতেই তার এবং সামগ্রিক ভাবে ঐ ভাষার বিস্তার। অনাবাসী বাংলাদেশীদের নিজস্ব সংস্কৃতি জীবিত রাখার তাগিদ থেকেই বাংলা ভাষা টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা চলে আর আমার গদ্য ভুবনের বাস্তব মানুষ তাঁরাই। যারা বাংলাকে যে শুধু টিকিয়ে রাখছেন তা নয় বরং ছড়িয়ে দিচ্ছেন সবখানে। আমার গদ্য ভাষায় উহাদের স্থান নেই যারা বাংলাদেশের এক বুদবুদ প্রজাতি। যারা প্রতিনিয়ত বাংলা ভোলার চেষ্টা করছে। বাংলা ধংস করছে। তবে তাদের ভাষাও আসছে- কোটেশন চিহ্নে, আমার ভাষা হিসেবে নয়। আমার লেখা অর্ন্তজালে ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্ব বাঙালির কাছে। আমি নিয়ে আসছি ডায়াস্পোরার ভাষা ও ভাবনা। এ কাজটি দেশে বসবাসকারী- এমনকি ভ্রাম্যমান বড় মাপের লেখকের জন্যও কঠিন। যেমন আমার জন্য এখন যে গল্প লিখছি তাতে কঠিন হয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘তুই তোকারি করে’ প্রেম করা যুগলের মুখে বাক্যদান! আমাদের গদ্য ভাষা গৌড়ীয় প্রাকৃত ভাষা থেকে বাঙ্গালা এবং তা থেকে বাংলা হয়েছে। আর আমরা যে ভাষা নিয়ে চল্লিশ বছর আগে চলতে শুরু করেছিলাম, তা ছিল পশ্চিম বঙ্গের বাঙলা ভাষা। তাকেই মান ভাষা বলে ধরেই আমার লেখালেখির শুরু। তাদের বাংলা এখন হয়ে গেছে মহা রক্ষনশীল ও গোড়া। ওপার বাংলার বাংলা ম্যাগাজিন আমরা না কিনলে তা-ও লাটে উঠতো। থাক সে ব্যাপারটি। ও নিয়ে আমার লেখক বন্ধুরা জ্ঞাত। প্রাণান্ত হয়ে লড়াই করছেন একটি প্রাদেশিক ও প্রাচীন ভাষা টিকিয়ে রাখার জন্য। আমরা বেঁচে গেছি বায়ান্নর কারণে। পাকিস্তান থেকে আমাদের নিজেদের দেশটা আলাদা হয়েছে তো ভাষার লড়াই কেন্দ্র করেই। র্ধমতত্ব দিয়ে পাকিস্তান হয়েছিলো বাংলাদেশ নয়। তাই এর একটা আলাদা মাজেজা আছে। আমরা এব্যপারে এমনই মুক্তমনা যে আমরা দেশ বিদেশ থেকে যা পাচ্ছি তাই পরখ করার সুযোগ পাচ্ছি। এবং আমাদের বিশেষজ্ঞগনও সে সম্পর্কে যথেষ্ট আবগত ও ওয়াকেবহাল। আমরা আপন মনে চলি আর মনে মনে বলি ভাষাই শক্তি ভাষাই বল। আমার গদ্যের গাছে বেগুন ফাগুন পরীগুন জয়তুন – লেগুনে যা পারি ধরাতে চাই। ফললেই খুশি। আমি আর বন্ধ্যা হই না।
লেখক: কবি, গল্পকার, সাংবাদিকলন্ডন ফেব্রুয়ারী ২০২৪শামীম আজাদগদ্যের গাছআমার কাছে ‘ভাষা’কে লাগে পোশাকের মত, জামার মত, কিছুর ভেতরে আরামে থাকার মত। অনেকটা চেহারার মত মানুষ যা দিয়ে যাচাই করে। মানুষ সনাক্ত করার জন্য ভাষাই আসলে শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞান। যে অভিজ্ঞান বুকে নিয়ে মানুষ হাঁটে। মানুষকে হাঁটতে হয়। মাইলকে মাইল- বাস্তব অথবা পরাবাস্তব দূরত্ব অবধি। ভাষার বৈঠায়ই বারি দিয়ে দিয়ে মানুষকে পাড়ি দিতে হয় দুস্তর পারাবার অথবা খন্ডন করতে হয় তার দূরত্ব। ভাষা দিয়েই প্রয়োজনে ব্যবধান বাড়িয়ে রাখতে হয়। ভাষায় হয় সকল অবসাদ অবসান, আচানক আহল্লাদ।তাই এ ভাষাজামার পকেটে, বেল্টে, ব্যাগে, কোমরে, ফোকড়ে অকাতরে কতগুলো সুন্দর ও চকচকে পাথর ভরে দিলেই হয়না। তার ওজন সঠিক হতে হবে না হলে সে ব্যক্তি আর হাঁটতে পারবেনা। অনতি বিলম্বে দাঁড়িয়ে পড়বে অথবা চলবে টেনে টেনে, চলার গতি তার সুন্দর হবে না। সে যতটুকু ভার নিতে পারবে তাকে অতটুকুই দিতে হবে। সে বিলাবে, মাখবে ও মাখাবে। তখন তার ভাষা সুন্দর সুগন্ধি হয়ে আসে পাশের সবাইকে জড়িয়ে ধরবে।তবে গন্তব্য বুঝে মাঝে সাঝে হালকা পাতলা পাতলুনের বদলে অমন কিছু দামী পাথর ও পোশাকে বসিয়ে দেয়া যায়। যদি জানা যায় যে আপনি যেখানে যাচ্ছেন সেখানে লোকজন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে, টিকিট কিনে কেবল আপনার অপেক্ষায় বসে আছেন। সেখানে আপনি যা পরে মঞ্চে দাঁড়াবেন- তাহাই পোশাক। যাহা খাইবেন- তাহাই খাদ্য। যাহা বলিবেন- তাহাই বাক্য!অনুরূপভাবে, আপনি লেখক হলে, আপনার গদ্যের ব্যাপারে তাহাই প্রযোজ্য। আপনার পাঠকদের আপনি তৈরী করেছেন। এখন আপনি ও আপনার পাঠক মজার এক মাদকতায় ডুব দেবেন। এ অলৌকিক অবস্থায় এমনকি ‘নিজস্ব নানান রীতি‘, গদ্য-স্টাইল ও স্ট্যান্ট সবই চলতে পারে।কিন্তু আমার অবস্থা ভিন্ন। লিখতে শুরু করে শ‘ পাঁচেক শব্দ টাইপ করার পর, কি লিখলাম তা পড়ি আর মরি।তখন কি হয় জানেন? আর তো এগুতে পারি না। ছোটবেলা বিদ্যালয়ে পাটিগণিতের ক্লাসে করা মানসাঙ্কের বাঁদরের দশা আরকি। গদ্যের গাছ হয়ে ওঠে এক পিচ্ছিল বাঁশ। তিন পা এগিয়ে পিছলে পড়ি দু‘পা। যা লিখেছি তা মগজের মোচড় থেকে পাঠকের জন্য কম্প্যূটারের পর্দায় নিয়ে এসেছি কি আসে নাই তার উপলব্ধি হয় নাই। লেখার পর পিছিয়ে গিয়ে তা জানার জন্যই এ পড়া। কিন্তু প্রায়ই- পড়ে দেখি হায় হায় এখানে শব্দ গুঁজতে পারিনি- তাই ওদিক থেকে শব্দ বা বানী তা ফোঁস্কার মত ফুলে উঠেছে। কোন স্থানে মনে হয় ভাষ ভিন্ন হওয়া উচিত।তাই এক্ষুনি তা বদলে মুখের ভাষা করতে হবে। যেখানে নতুন অনুচ্ছেদ শুরু করেছি তার নিয়েও নিজেকে নিজে জবাব দিহি করে হয়রান হয়ে যেতে থাকি। আর কালের কলাকৌশলের কথাতো আছেই। তারপর কখনো কখনো পুরো রচনাই পাল্টে দিচিছ- বিষয় বস্তু একই আছে কিন্তু তা হয়ে গেছে ভিন্ন।এদিকে বার বার লিখতে লিখতে কখন হারিয়ে ফেলেছি ‘ডেডলাইন‘! ঘুম থেকে উঠে শেষ রাতে যে নুসরাত ফতেহ আলী শুনে শুনে লিখছিলাম তা বন্ধ হয়ে গেছে কখন! তার বদলে লিফ্ট এর যান্ত্রিক শব্দ (আমার লেখার ঘরের দরোজার পরেই সবার ফ্ল্যাট প্রবেশের পথ) ও কর্মজীবি মানুষের বাইরে বেরুবার শব্দ শোনা যাচ্ছে। দরোজার ফাঁক দিয়ে সূক্ষ বাতাসে ভেতরে নাকে এসে লাগছে আফ্টার শেভ, কলোন আর কড়া পারফিউমের গন্ধ। ঘরের বাতি ও বাইরের সূর্য দুটোই জ্বলছে।এসব চিন্তাধারার জন্য একটি ‘টিক‘ বাক্স আছে।১.কি লিখছি২.কার জন্য লিখছি৩.সম্ভাব্য পাঠক কে৪. আমি আসলে কাদের পড়াতে আগ্রহী৬.কোন কাগজে লিখছি৭.তাদের গাইড লাইন কি৮. পাঠকগন বিনিময় মূল্যে পড়বেন না বিনা মূল্যে৯. আমাকে এ ভাষায় চেনা যাচ্ছেতো১০. আমি আমার নিজস্বতায় স্থিত আছিতো১১. আমি যে ভাষা ও শব্দ ব্যবহার করছি তাতে আমার লক্ষ্যমত পাঠক হাসাতে, কাঁদাতে বা ভাবাতে পারছিতো১২. আমার ‘কথা‘ থেকে আমার ‘চিন্তা‘ অথবা আমার ‘দূ:শিচন্তা‘কে পৃথক পালঙ্কে বসাতে পারছিতো১৩. আমার চরিত্র এক অর্থে দুই কথা বলছে কি/ বলতে পারছে কি১৪. গল্পে গল্পে যা বলছি তার অনুবাদ কি এক ও অনন্য (কারণ একই ভাষায় থেকেও তার ভিন্ন অনুবাদের অনুরনন কানে আসাটাও একটি স্বাভাবিক ব্যাপার)…নাহ্ আর দীর্ঘ করবোনা।করতেই পারি। আপনার বেলা আপনি পারবেন কারণ চাওয়ার কাজটি সোজা। ‘পাঠক‘ এবং ‘লেখক‘ মাত্রই পারবেন। আবার হয়তো এখানে বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু ফেলেও গেছি- যা আপনার(পাঠক) মনে এসেছে কিন্তু- আমার(লেখক) মনে আসেনি। হতেই পারে, হতেই পারে। তা হলে তা ও যোগ করে নিন। অথবা বিয়োগ।তবে কথা সেটা না। কথা হল এত কিছুকি কোন লেখক তার লেখার সময় ভাবেন?নাকি লিখিয়া লিখিয়া ভাবেন? নাকি ভাবিয়া লেখেন? জানি অনেক নামী লেখকের কাছে এবিদ্যা অনায়াস। কিন্তু আমার জন্য না। আজও আমার বকুল যখন ফোটে তখন কবিতায়ই ফোটে। কিন্তু আমার গদ্যের গাছ কিম্বা গাভী আমাকে যথেষ্ট নাকানি চুবানি দিয়া তবে ফুল ফোটায় অথবা সুমিষ্ট দুগ্ধে তৃষ্ণা মেটায়, আমার এবং আমার প্রিয় পাঠকগনের। এ অনেকটা যুদ্ধের মতই। আমি পড়ি আর যুদ্ধ করি। মরি আর পিছাই এবং আবার আগাই। তখন ঘরের ভেতরে বাতি- বাইরে বরফ আর সূর্য এক সাথে জ্বলে ওঠে। মনে হয় যেন জানালায় লাফিয়ে পড়েছে বরফের বাঘ। তবে এভাবে রজনী প্রভাত হলে বড় ভালো লাগে। লেখায় আসে পড়ে শীতালং শাহ্ ও একদিন এভাবেই আর জুলিয়া ক্যামেরুন এখনো .. .। কিন্তু এইযে নিজের ভেতরে ভাষা সৃষ্টির একটা লড়াই সেটা তাৎক্ষণিক ও স্থানিক হলেও এভাবেই যখন নিরন্তর চেষ্টায় একটি চরিত্র ফুটে ওঠে তখনই আমায়ে লেখায়ই এসময়ের ভাষার চালচিত্রে একটি লেখক চরিত্র চিহ্নিত হয়। তাকে সনাক্ত করা যায়। আর সময় অতিক্রান্ত হলে পরে তা দিয়ে দেখা যায়; সে সময়ের জলবায়ু, জীবন র্চচা। সেখানে কিছু সময়ের জন্য দম নিচ্ছে ভাষা আর যেন জগতব্যবস্থাও থিতু হয়ে গেছে।সময়কে বাটখাড়া বা বোচকায় তুলতে হলে লেখক তার গদ্যে মুখেরভাষার কাছাকাছি ভাষা ব্যবহারেই বেশী মনোযোগী হোন। ভাষা যেহেতু চলমান- এই চলমান বর্তমানকে মূর্ত করতে লেখকদের ভাষাফুলবনে যার কাছে যাওয়া সহজ হয় তারেই লাগে ভালো। সে পছন্দ বনপথে সরীসৃপের মত এটা ওটা পেরিয়ে এঁকে বেঁকে দ্রুত এগিয়ে যাবার সময় পথে নিজে টিকে থাকার জন্য যা পায়- অথবা যা সুস্বাদু ঠেকে তাই আত্মস্ম্যাৎ করে। বিশ্ববাগানে টিকে থাকার কথা ভেবে আঞ্চলিক, লোকজ, মুঠোফোন, অনাবাসী, বিদেশী ডায়স্পরার যাই হোক এমন কি তা মানুষের মুখ থেকে কেড়ে আত্মস্যাৎ করে। বঙ্কিম চন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের কথা মত ‘ভাষা প্রাঞ্জল করে তুলতে‘ চায়। কিন্তু সকল কোলেষ্টরল সুস্বাদু হলেও তার সকলই পাতে টেনে নিলে সে ভাষাদেহের শিরা উপশিরা অতিরিক্ত চর্বির কারণে বন্ধ হয়ে যাবার আশংকা থাকে। গদ্যের গাছটি আর স্লিম থাকেনা।মেদহীন দেহ টেকে বেশিদিন। যদিও দেখতে একটু কাটখোট্টা দেখায়। তবে মেদময় দেহের কারণে সে গাছের অবয়ব আপাত মনোহর বোধ হয়। এবং এই আপাত আর্কষক গদ্যের জন্য ও এক ধরণের একটা আকাঙ্খা থাকতে পারে। তাতে লেখক একটু ‘টক অব দ্যা আজিজ মার্কেট‘ হয়ে যেতে পারেন। আবার তা লটারির টিকিটের মত ‘লাগলেও লাইগ্যা যাইতে পারে‘ এমন একটা সম্ভাবনাও থাকে। যেমন হয়েছে আমাদের দেশের টিভি নাটকে এবং কিছু কিছু পুস্তক শিরোনামে ও লেখায়।এ টিভি নাটকগুলোর গল্পতো প্রথমত লিখিতই। বেশ কিছু ছাপাও হয়েছে। তবে এখন অনেক নাটক দেখে শুনে মনে হয় তা ইম্প্রোভাইজেশনেই চলছে। এদের এ গদ্যের ভাষা কি? এ গদ্যের ভাষাকে আমি বলি, এ রাজধানীর ভাষা। যে ভাষার প্রদায়ক ভাষমান জনসাধারন। পৃথিবীর নানান দেশের রাজধানীর বড় বড় শহরে যুগে যুগে সারাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ আসে – থাকে। এমনকি বিদেশীরাও আসে থাকে চলে যায়। কেউ কেউ বাসা ও বাঁধে। এই সকলের কথা থেকেই তৈরী হয় একটি ভাষা। যা মান ভাষা নয়, আঞ্চলিক ভাষা নয়, বিদেশী ভাষা নয় আবার লোকভাষাও নয়। কিন্তু এর সবই সে দেশের ভাষা-ফেব্রিকের ফাইবার, ভাষা-পোশাকের নানান আঁশ। আর এ থাকে বলেই সারা বিশ্বেই রাজধানীগুলোর ভাষার ধরণ এক। একধরনের ভাষা। মান নয়- নয় অসম্মান- আঞ্চলিক- আন্তর্জাতিক। আর তা প্রতিনিয়ত তা বোনা হচ্






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান