পিয়াল রায়

ঠিক মাঝরাতে ফোন। তা-ও আবার খাস বিলেত থেকে! শামীম আজাদ। নামের মতোই মিষ্টি সুবাসযুক্ত মৃদু একঝলক বাতাসই বুঝি ভেসে এল ফোনের ভিতর দিয়ে। আচ্ছা, প্রথম বাক্যালাপেই যিনি মন জিতে নেন তাকে কী বলা যায়? কোন সম্বোধনে তাঁকে বলা যায় ” এসো, এসো, আমার ঘরে এসো, আমার ঘরে”। যেমন সুমিষ্ট কণ্ঠস্বর তেমনই তাঁর সুচারু বাচনভঙ্গি। মনে হচ্ছিল দিদি শুধু বলেই যান আর আমি শুধু শুনতেই থাকি। কিন্তু তা হওয়ার নয়। আলাপচারিতার ধর্মানুযায়ী উভয়ত বাক্যালাপ চলে। ছোট ছোট ভাষাচিত্র জুড়ে জুড়ে তৈরী হতে থাকে বিরাট এক জীবনালেখ্য। শামীম তরফদার থেকে শামীম আজাদ। বাংলাদেশ থেকে বিলেত। তিন তিনবার নতুন করে জন্ম নেওয়া মিষ্টি এক সোনালী ফিনিক্স।
যে নারী একই জীবনে তিনবার জন্ম নেন তিনি কোনো সামান্যা নারী নন। প্রথম জন্মে তিনি পিতার আদরের কন্যা শামীম তরফদার। তাঁর কলমের জোরে সাহিত্য জগৎ তাঁকে চিনল এই নামে। ধীরে ধীরে এই নাম খোদিত হল পাঠক হৃদয়ে। বিবাহের পর শুরু হল লড়াই আজাদকে নিজ পরিচয়ে পরিচিতি দেওয়ার। বিবাহ পশ্চাৎ তরফদারের পিছুটান আর রাখা চলবে না। স্বামীর তরফ থেকে বাধা না থাকলেও সমাজের বাধা অস্বীকার করা তখন চলল না। ফলত শামীম তরফদারই যে শামীম আজাদ সেটা বুঝতে অনেক সময় লাগল পাঠকের। ততদিন লেখিকার চলল লেখার সঙ্গে বোঝাপড়া। আবার ধীরে ধীরে পাঠকের হৃদয়ে জায়গা করে নিলেন তিনি। বুঝি এখানেই শেষ হল পরিচিতি প্রতিষ্ঠার লড়াই? না, তা মোটেও নয়।
কর্ম প্রয়োজনে সিলেটের মেয়েটিকে উড়ে যেতে হল প্রবাসী বিলেতে। সেখানে মাটি খুঁজে পুঁতে দিতে হয় বীজ। যে বীজ একদিন ফুলে-ফলে-শাখাপ্রশাখায় একদিন হয়ে উঠবে আন্তর্জাতিক। এক লহমায় পড়তে যতটা সহজ মনে হল কর্মে ততটা আদৌ সহজ নয়। বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিতেও শুরু হল প্রান্তর প্রসারিত করার লক্ষ্য স্থাপন। তাঁকে দুটি ভাষারই হাল ধরতে হবে যে। আগামী প্রজন্মের কাছে রেখে যেতে হবে ভাবের, ভাষার, সময়ের, সংস্কৃতির উত্তরাধিকার। এমন করিৎকর্ম, এমন পটুত্ব অনেক পুরুষের মধ্যেও দেখা যায় না। একটা বয়সের পর যখন আলস্য গ্রাস করে সাধারণ মানুষকে ঠিক সেই বয়সটাতেই তিনি উঠেপড়ে লেগেছেন জীবনের সামনে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে। কে জেতে কে হারে দেখাই যাক না। আজ তাঁর চুয়াত্তরতম জন্মদিবসে দাঁড়িয়ে যখন পিছন পানে তাকাচ্ছি আমরা দেখতে পাচ্ছি দিদির সাথে সাথে তাঁর জীবনটাও যেন কখন বিশালত্ব প্রাপ্ত হয়েছে। তাঁর লেখনীর মতোই মায়াবী স্মৃতি মেদুরতায় আচ্ছন্ন করে ফেলছে।
আমার সঙ্গে এই মহীয়সী নারীর যোগাযোগ নেহাতই কাকতালীয়। রনিদা একদিন বললেন এ বছর শিকড় এবং গ্লোবাল পোয়েট অ্যান্ড পোয়েট্রির তরফ থেকে শামীমদির জন্মদিন পালন করা হবে। ওঁর সম্পর্কে কিঞ্চিৎ পড়াশোনা শুরু করলাম। ঠিক করলাম একটা সাক্ষাৎকার নেব। অনুমতি চেয়ে হোয়াটসঅ্যাপে একটা ছোট্ট বার্তা দিলাম। ভাবতে পারিনি ওদিক থেকে ফোন আসবে। আমার মতো সামান্য অর্বাচীন লেখাপ্রয়াসীকে যে তিনি এতটা গুরুত্ব দেবেন এ ছিল কল্পনার অতীত। অসম্ভব স্নেহময়ী মহিলা। প্রথম আলাপেই আপন করে নিতে জানেন। আজকাল এমন মানুষ ক্রমবিরল হয়ে উঠছে। আমি রাত জেগে কাজ করি শুনে ভীষণ খুশি। হবেন না-ই বা কেন? তিনিও যে সে পথেই হেঁটেছেন চিরকাল। সারাদিন সংসার, সংগঠন, কর্মস্থান সামলানোর পর রাতই হত তাঁর একান্ত আপন। নিজেকে উজার করে দেওয়ার একেবারে নিজস্ব এক ঠাঁই। এ আমি নিজেকে দিয়ে বুঝি। আরেকটা ব্যাপারেও মিল আছে আমাদের, তা হল দুজনেই কাজ করি গান শুনতে শুনতে। গানের প্রতি আমার দুর্বলতার পরোক্ষ সমর্থনে যারপরনাই তাঁকে যেন লহমায় আপন করে নিল আমার মন। কথায় কথায় রাত বাড়ে তবু কত কথা যেন বলা বাকি রয়ে যায়। যখন তাঁকে অনুযোগ করে বলি, জানি না আমি কী করছি, সত্যিই জানি না নিজের জন্য আদৌ কিছু করতে পারছি কিনা অথবা ভবিষ্যতের কাছে সত্যিই কি কিছু রেখে যাওয়ার ক্ষমতা আমার কোনোদিন হবে? প্রশ্ন শুনে স্নেহের মূরতি শামীমদি বলেন, “যতদিন তুমি সেটা টের না পাবে ততদিনই তোমার জন্য রাস্তা খোলা থাকবে পথ চলার”। বুঝলাম জেনেশুনে গোলামী করা চলে কিন্তু সৃষ্টিশীলতার পথ চির অজানা। আশীর্বাদ করো দিদি আমি যেন সে পথে সমস্ত প্রলোভন জয় করে এগিয়ে যেতে পারি। হাজারো পাঁক পাশ কাটিয়ে দিনের শেষে আমার মাথাটাও যেন তোমারই মতো জিয়ল আলোয় সমুন্নত হয়ে ওঠে।
জন্মের এই দিনটি বারবার ফিরে আসুক তোমার জীবনে। আমরাও বারবার প্রাণিত হই লক্ষ্যে অবিচল থাকার স্থির প্রতিজ্ঞায়।
পিয়াল রায়
সহ সম্পাদক (ভারত)
শিকড়






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান