ফারুক আহমেদ রনি

বাংলা কবিতার সমকালীন পরিসরে কবি দিলারা হাফিজ এমন এক নাম, যার কবিতা পাঠককে টানে ভাষার উদ্যম, স্মৃতি, ইতিহাসবোধ, অতীন্দ্রিয় অনুভূতি এবং গভীর মানবিকতায়। তার কবিতায় প্রেম যেমন আছে, তেমনি আছে দেশ-সময়-যুদ্ধ-রাজনীতি, আরো আছে নারীর জীবনের গভীর বেদনা, শরীরবোধ, অস্তিত্বের নিঃসঙ্গতা ও তীব্র সংবেদনশীলতা।

কবি দিলারা হাফিজ. আমার দীর্ঘ পরিচয়ের এক প্রিয় মানুষ ও কবি । আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় কবির কবিতা, প্রথম কাব্যগ্রন্থ ভালোবাসার কবিতা। আমার যৌবনের অনেকটা শুরুর দিকে সবে লেখালেখিতে হাতে খড়ি। অনেকটা আপেক্ষিক কাব্যপ্রেম। তবে তাঁর সাথে সরাসরি প্রথম সাক্ষাৎ ২৭ বছর পর। ঢাকায়, ২০০৯ সালে, সংহতি আয়োজিত প্রয়াত আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে। সেই প্রথম দেখায়ই তার আন্তরিকতা, নিরহংকার আচরণ এবং মমতাসিক্ত ব্যক্তিত্ব আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল।

আমার সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়ে ওঠে এক স্মরণীয় দিনের সূত্র ধরে, ২০০৮ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত সংহতি কবিতা উৎসবে তাঁর স্বামী প্রখ্যাত কবি রফিক আজাদের উপস্থিতিতে। রফিক ভাই আমার বাড়িতে আসতেই জানতে পারলেন আমার স্ত্রী ফারিদা ইয়াসমিন জেসি টাঙ্গাইলের- ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে পুরো ঘরের কবি-লেখকদের মাঝ দিয়ে তিনি সোজা চলে গেলেন রান্নাঘরে, যেখানে জেসি খাবার প্রস্তুত করছিল। তাঁর সেই অমায়িকতা, আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা এবং স্নেহে ভরা আচরণ আজও আমার মনে অমলিন। রান্নাঘরের সেই ছোট্ট মুহূর্তেই তিনি কত গল্প করলেন, কত কথা ভাগ করে নিলেন, আর বারবারই ফিরে যাচ্ছিলেন তাঁর প্রাণের মানুষ, কবি দিলারা হাফিজের প্রসঙ্গে। তখনই বুঝেছিলাম- এই দু’জন মানুষ শুধু দাম্পত্যে নয়, সৃষ্টির জগতেও একে অন্যের অবিচ্ছেদ্য শক্তি।
সেই থেকেই তিনি একজন আপনজনের মতো আমার পরিবারের অংশ হয়ে ওঠেন। তাঁর সঙ্গে অনেকবার কথা হয়েছে, মতবিনিময় হয়েছে; এমনকি শিকড়ের অনলাইন কবিতা পাঠ অনুষ্ঠানে তিনি অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। তার কণ্ঠে, তার উচ্চারণে, তার কবিতায় যে গভীরতা, বেদনা, দৃঢ়তা ও মানবিক প্রেম- তা আমাকে মোহিত করে। আমি সত্যিই তাঁর কবিতার একজন আন্তরিক পাঠক ও অনুরাগী।

আজ কবির জন্মদিন। যদিও কবিকে নিয়ে বা তাঁর কাব্যিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা আমার জন্য একটা শক্ত বিষয় এবং সময় সাপেক্ষ কাজ , তারপরও আমি স্বল্প পরিসরে চেষ্টা করছি তাঁর সার্বিক কাব্যিক অবস্থান সম্পর্কে শিকড়ের পাঠকদের কিঞ্চিৎ ধারনা দিতে। সাথে সাথে কবির একগুচ্ছ কবিতা সংযুক্ত করছি, যেগুলো কবির বিভিন্ন সময় এবং অবস্থানকে জানান দেবে এবং সেগুলো থেকে হালকা আলোচনা করবো।

বাংলাদেশের আধুনিক কবিতায় নারী-স্বাধীনতা, রাজনৈতিক সময়, স্মৃতি ও যন্ত্রণার বহুমাত্রিক চিত্র, ভাষার অন্তর্গত সঙ্গীত, ভাঙন ও পুনর্গঠনের আলাদা এক কাব্যভুবন নির্মাণ করেছেন কবি দিলারা হাফিজ। তিনি একইসঙ্গে সাহিত্যিক, গবেষক, শিক্ষক, প্রশাসক কিন্তু তার কবিসত্তার তীব্রতা ও স্বাতন্ত্র্য তাঁকে বাংলা কাব্যভাষায় শক্ত অবস্থান দিয়েছে। তার কাব্যজীবন একটিমাত্র ধারায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং সময়, অভিজ্ঞতা, প্রেম, ভাঙন, দেশ, ইতিহাস, যন্ত্রণা, নারীর আত্ম-আবিষ্কার এবং পরাবাস্তব মনস্তত্ত্ব মিলেমিশে তৈরি করেছে এক বহুরৈখিক গন্তব্য।

কবি দিলারা হাফিজের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ভালোবাসার কবিতা (১৯৮২) মাধ্যমে তিনি আবির্ভূত হন প্রেম, মানবিকতা ও দুঃখের নির্মল সংবেদ নিয়ে। পরবর্তী তিন দশকে তিনি ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়েছেন- ভাষায়, চিন্তায়, গঠনে, চিত্রকল্পে। তার সাম্প্রতিক কবিতাগুলো পরিণত হয়েছে আরো জটিল, দার্শনিক, বহুমাত্রিক ও রাজনৈতিক; যেখানে ব্যক্তি অভিজ্ঞতা ছাপিয়ে উঠে আসে সময়ের বৃহত্তর ইতিহাস।
দিলারা হাফিজের কাব্যভাষা কখনো খুবই সরল, আবার কখনো রহস্যময় ও পরাবাস্তব। তিনি সমকালীন নারীজাগরণ, রাষ্ট্রের নৈতিক পতন, মানুষের ভীরুতা, স্মৃতি ও দহন, সবকিছুই কবিতায় দাগ কেটে দেন, কিন্তু তা করেন কোমল অথচ শক্তিশালী ছন্দে। তার কবিতায় দেখা যায় উত্তরাধুনিক বিমূর্ততা, রাজনৈতিক বাস্তবতা, দার্শনিক মগ্নতা, মিথ ও স্মৃতির পুনর্নির্মাণ, এবং অভ্যন্তরীণ মনস্তত্ত্বের গূঢ় রূপ।

দিলারা হাফিজের কাব্যজীবন বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য অধ্যায়। তিনি এমন এক কবিসত্তা, যিনি- ব্যক্তিগত বেদনার সঙ্গে, রাষ্ট্রের ইতিহাস, স্বদেশের রক্তাক্ত স্মৃতি, নারীর দেহচেতনা, মানসিক ভাঙন, পরাবাস্তব ইমেজারি, দার্শনিক অন্বেষা, সব মিলিয়ে নির্মাণ করেছেন তার কাব্যের জগত। তাঁর কবিতা জীবনের অন্তঃস্থল থেকে উঠে আসে রাজনীতি, সময়ের ক্ষত, ব্যক্তিগত অভিমান, নারী-দেহ, মানবসত্তার দ্বৈততা, প্রকৃতির চরিত্র, পরাবাস্তব স্বপ্ন, স্মৃতি, মিথোলজি- এই সবের এক সম্মিলিত আধুনিক-উত্তরাধুনিক ভুবন গড়ে ওঠে।
তিনি যেমন একজন রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক কবি, তেমনি একই সঙ্গে দার্শনিক, অনুষঙ্গসচেতন, আত্মচেতনার কবি, আবার অতল নারীবাদী কবিকণ্ঠ। তিনি সময়কে প্রশ্ন করেন, নিজেকেও প্রশ্ন করেন, এবং তার বাংলা কবিতাকে নিয়ে যান এক বহুমাত্রিক নন্দনে। তিনি সত্যিকারের একজন সমকাল, দেশ, জীবন ও মহাজগতের কবি।

আশির দশেকে প্রকাশিত কবির প্রথম দুটি গ্রন্থ- ভালোবাসার কবিতা (১৯৮২) এবং পাশাপাশি পিতা কিংবা পুত্র অথবা প্রেমিক (১৯৮৩) গ্রন্থগুলোর মাধ্যমে তাঁর কাব্যজীবনের বহুল পরিচিতি এনে দেয় এবং আমি শুরুতেই আমার নিজের সাথে তার কাব্যজীবনের সম্পর্কের কথা বলেছি। আমরা যারা কবির কাব্যানুসন্ধান করি বা যারা তাঁর সাহিত্য নিয়ে কাজ করছেন তারা নিঃসন্ধেহে স্বীকার করবেন যে কবির সূচনালগ্নে আমরা তাকে দেখেছি প্রেম ও অভিমান, সম্পর্কের ভাঙন, মানবিক উৎসব, মৃদু বিষাদ অর্থৎ সময়ের ভাষায় তিনি রোমান্টিকতার এক স্বচ্ছ পরিমণ্ডল রচনা করতে। তাঁর কাব্যে নারীর ভেতরের গোপন তীব্রতা, অস্ফুট ব্যথা ও চিরন্তন স্পর্শধর্মিতা ক্রমে দৃশ্যমান হতে দেখা যায়।
সেই সময়ের তাঁর একটি পঙ্‌ক্তি অত্যন্ত লক্ষণীয়, যেমন;
তোমার দেয়া দুঃখ সরিয়ে রাখি দুহাতে/
কিছুই আমাকে আর দিশেহারা করে না/


আরেকটি পংক্তিতে দেখতে পাই;
যদিও ভেঙেছো বর্ণের বিশ্বাস/
উনিশ শো বাহান্নর মহরত…(তোমার দেয়া দুঃখ)
এখানে ব্যথা কেবল প্রেমিকের বিশ্বাসভঙ্গ নয়, এ একটি দেশের চেতনার ক্ষরণ, ভাষার মর্যাদাহানির রূপক, এবং তা আজকের সময়ে মানুষের ভেতরে জন্মানো অ্যান্তি-হিউম্যানিস্ট রাজনীতির দিকে আঙুল তোলে।
দিলারা হাফিজ তাঁর সমকালীন সমাজের মুখোশ, দুর্বৃত্তায়ন, ক্ষমতাকেন্দ্রিকতা এবং মানুষের অবহেলা, সব বিষয়ের বিরুদ্ধে দাঁড় করান এক কঠিন কাব্যস্বর- নির্বাক হাওয়া করজোড়ে বয়ে যায়/ক্ষমার অযোগ্য এইসব ক্লান্ত মবের রাজনীতি ।
এভাবে তাঁর কাব্যের দ্বিতীয় পর্ব সামাজিক সত্য–কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে।

প্রথম দিকের কবিতায় যেমন কোমলতা আছে, তেমনি রয়েছে কষ্টকে ধারণ করার ধৈর্য। আবার
প্রয়াত কবি রফিক আজাদ ছিলেন তাঁর জীবনসঙ্গী ও সৃজনযাত্রার সহযাত্রী। তাঁর মৃত্যুর পর কবিতা নতুন গভীরতা অর্জন করে—স্মরণ, শোক, আলোয় ফিরে দেখা, প্রেমের শাশ্বততা। তুমি আছো, তাই- কবিতায় তিনি লিখেছেন;
তুমি আছো বলে আমি আজো দুচোখে কাজল পরি…
এখানে প্রেম কেবল ব্যক্তিস্বত্তার নয়—এটি একটি দীর্ঘ আত্মিক সম্পর্কের নৈর্ব্যক্তিক প্রতিফলন। তাঁর কবিতা পড়ে মনে হয়; ভাষা যেন শরীর; শব্দ যেন নাভী থেকে উঠে আসা কোনো প্রকৃত ব্যথা।

কবির কাব্যজগতের সময়টাকে যদি দেখি- যেমন ৯০ এর দশক বা তার পরের সময়ে, তাহলে দেখবো সময়ের কঠোর মুখোমুখি তিনি: ইতিহাস, দেশ, যুদ্ধ ও বোধের সংঘাতে পরবেষ্টিত। ১৯৯০-এর পর থেকে তিনি কবিতায় আরও গভীরভাবে প্রবেশ করেন দেশের ইতিহাস, রাষ্ট্র, মুক্তিযুদ্ধ, নাগরিকতার সংকট ও যন্ত্রণা-দর্শনে। কে নেবে দায় (২০০১) বা খুঁজে ফিরি ভিক্ষালব্ধ জ্ঞান (২০১২) এসব গ্রন্থে দেখা যায়: রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, রাষ্ট্রহীন মানুষের বেদনা, স্বাধীনতার অপূর্ণতা, ১৯৫২, ১৯৭১-এর ইতিহাস, সাম্প্রতিক দুর্বৃত্তায়ন।
যেমন, তোমার দেয়া দুঃখ কবিতায় তিনি লিখছেন;
দেশের নির্লিপ্ত জাগরণে/
তাই হতভম্ব হই না আর/
একাত্তরের অবারিত বাতাস/
যদি পথ হারায় সমুখ পথে/কি থাকে আমার?/
ঝুরো কিছু ধূলোবালি ছাড়া…।

এখানে তার আমি’ ব্যক্তিজ নয়; এটি স্বদেশের আহত-সত্তা।
কবিতাটি আধুনিক নাগরিক বেদনার সঙ্গে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের ইতিহাসকে যুক্ত করে। এই সময়টিতে তার ভাষা আরও দৃঢ়, রাজনৈতিক এবং তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। তিনি কবিতায় সত্য বলতে ভয় পান না। সামাজিক ভণ্ডামি, রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিভীষিকা ও ইতিহাসের ভুল স্বীকার করতে তিনি কবিতাকে ব্যবহার করেন।উত্তর-আধুনিক উত্থান এবং আত্ম-দ্বন্দ্ব, ভাঙন ও পরাবাস্তব চিত্রকল্প নিয়ে যখন হাজির হোন তখন তাঁর কাব্যশৈলীতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে- আত্ম–দ্বিত্বম মানসিক ভৈলী, অস্তিত্বদর্শন, পরাবাস্তবতা, নারী-অস্তিত্বের জৈব-বাস্তবতা, স্মৃতি ও সময়ের গোলকধাঁধা- যেমন ছেড়ে যাই, ফিরে আসি কবিতায় তিনি লিখেছেন
সময়ের কিবা দোষ/
আমি হয়তো নিজেই বেখাপ্পা রকম!/
মানতে পারিনি আজো রিসেট বাটন!

এখানে তার ভাষা মোবাইল স্ক্রিনের কথা কেবল নয়, একটা কঠিন সময়ের কথা বলছেন সেটা যুক্ত করেছে একটি উত্তরাধুনিক চেতনারই লক্ষণ হিসাবে। যে চেতনা আমাদের সময়ের সাথে সম্পৃক্ত, অবস্থান ও চলমান অবস্থার সাথে সাথে ভাষা-শব্দ ব্যবহারে কবিকে একজন সচেতন ও সার্থক কবি হিসাবে উপস্থাপন করে। যেখানে স্মৃতি, সময়, ক্রান্তিকাল ও আত্মপরিবর্তনের ধারণা নিখুঁতভাবে ফুটে ওঠে।
কবির নারীবাদ এবং জৈবিক শরীর থেকে দার্শনিক সত্তার একটা নিগূঢ় সম্পর্ক নিয়ে বিস্তৃত কাব্যশিল্প। তাঁর নারীবাদ একমুখী নয়; এটি অভিজ্ঞতার, জৈবিকতার, দেহ-ভাষার এবং চেতনাগত স্বাধীনতার সমন্বয়। হরমনের খেলা ও একা নারীর লড়াই কবিতায় তিনি নারীর জৈবিক জীবন, হরমোনাল ওঠানামা, একা থাকার লড়াই, এগুলোকে কবিতার বিষয় বানিয়েছেন, যা বাংলা কবিতায় বিরল। হরমনের খেলা ও একা নারীর লড়াই নারীর ভিতরের বিজ্ঞান, শরীর ও আত্মবিশ্বাস এই কবিতায় নারীর দেহ বিগলিত নয় শক্তি, বিজ্ঞান, চেতনার ধারায় ব্যাখ্যা করা। নারীর দেহ–হরমোন–মনস্তত্ত্ব এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ: তিনি biological reality- কে কাব্যে রূপ দেন। তিনি লিখছেন;
দেহের মধ্যে বাস করে সে দেহের বন্ধু/
নিত্য আপনজন!

এটি নারীর দেহসত্তাকে নতুন মর্যাদা দেয়। নারীর জৈবিক অভিজ্ঞতা, যা সাধারণত সাহিত্য এড়িয়ে চলে, তিনি সেটিকে দৃশ্যমান, সুস্পষ্ট ও কাব্যিক করেছেন। দার্শনিক গভীরতা ও চিরন্তনতার অনুভব থেকে দিলারা হাফিজের সাম্প্রতিক লেখাগুলোতে রয়েছে- আত্মার অস্তিত্ব, জীবন–মৃত্যুর দার্শনিক তত্ত্ব, একাকিত্ব, অনন্ততা, সৃষ্টিশীল আত্মের গোমুখ, পরম সত্যের সন্ধান।
তার একটি দীর্ঘ গদ্য-কবিতায় তিনি লিখছেন;
একজন মানুষের সাধনা করে আমি ঈশ্বরের দেখা পেয়েছি/
তার জ্যোতির্ময় দ্যুতি আমার চোখ মুখে।

এটি কেবল আত্মজৈবন নয়; এটি মরমি অস্তিত্বদর্শন। তার ভাষায়- সংযম, ছন্দ ও অন্তর্গত ব্যঞ্জন পাঠককে প্রলুব্ধ করে, আরো কাছে টানে। দিলারা হাফিজের কবিতা—ছন্দে আবদ্ধ নয়; কিন্তু আছে অভ্যন্তরীণ সঙ্গীত, বাক্য ছোট, সংক্ষেপিত, শব্দের পুনরাবৃত্তি দক্ষতার সাথে দৃশ্যচিত্রকে খুব তীক্ষ্ণভাবে উপস্থাপিত করেন। রূপক ব্যবহারে তিনি আধুনিক, প্রতীকের ব্যবহারে তিনি সাহসী যেমন তোমাকে দেখি না-হে সুন্দর কবিতায় লিখেছেন;
রক্তলালে হোলিখেলা দেখি দ্বিগবিজয়ী ক্ষমতাধরে/
সাধারণ মানুষের ভালো বা মন্দ থাকার মধ্যেও/
জেগে থাকে বিপন্ন-বেদনার বিষণ্ণ নামাবলি…।

এখানে শব্দের তীব্রতা ভাষাকে ভাঙে, আবার নতুন অর্থও তৈরি করে। চন্দ্র-শৈশব কবিতায় তিনি পরাবাস্তবতার শৈলী ব্যবহার করেছেন;
আকাশ থেকে ঝরে পড়া সোনালি তরলে/
ডুবে যাচ্ছিলো আমার দুহাত/ পা
য়ের পাতা-নগ্ন নাভি/ শরীরের সাধ!

এই ইমেজারি শুধু দৃশ্য নয়- এটি স্মৃতি, দেহ-অনুভূতি এবং শৈশবের এক পরাবাস্তব অনুধাবন।
সাথে সাথে তিনি ইতিহাস সচেতন, তাঁর রাজনৈতিক ও ইতিহাসচেতনায় রক্ত, যন্ত্রণা, যুদ্ধ, রাষ্ট্র সব একাকার, তিনি সৃজন করছেন সময়কে বেঁধে কাব্যিক ইতিহাস। যে ইতিহাসকে কেবল পুনরাবৃত্তি করেন না; বরং ইতিহাসকে তার নিজের দৃষ্টিকোণ দিয়ে পুনর্নির্মাণ করেন। ১৯৫২, ১৯৭১, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, দুর্বৃত্তায়ন, সবই তার কবিতায় বার বার ফিরে আসে।
যেমন;
সময় মোটে নয় একাগ্র ও একনিষ্ঠ/
দুচোখে সর্বদা ভীতি আর ত্রাস/
দুর্বৃত্তায়নের শতপথে সহস্র অধ্যাস…

এখানে নাগরিক জীবনের ভয়, রাষ্ট্রের ক্রুরতা এবং মানসিক অবরোধের চিত্র অঙ্কিত। কবিতায় পরাবাস্তবতা ও মনস্তত্ত্বতার চমৎকার উপস্থিতি রয়েছে। আমরা তার অনেক কিছু দেখি কবিতাটি পড়লে বুঝতে পারবো তিনি নিজেকে- এক অদেখা মিশরের মমি হিসেবে দেখেন। এটি তার কবিতার বৈশিষ্ট্য- মৃত্যু, স্মৃতি, সময় সব মিলেমিশে তৈরি করে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ভুবন।

তিনি অসংখ্য হাইকু লিখেছেন, যেগুলো সংক্ষিপ্ত কবিতা ও শব্দ-অর্থের চিত্রকল্প, শব্দের সংযম, সংক্ষেপণ তাকে একটি বিশেষ নান্দনিকতার দিকে আকৃষ্ট করে। তিন লাইনের মধ্যেই সময় ও অস্তিত্ব, প্রাকৃতিক প্রতীক, মুহূর্তের দার্শনিক উপলব্ধি। তাঁর কাব্য-সংগ্রহ শতেক হাইকু এবং একগুচ্ছ দিলারা হাফিজ- এগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

দিলারা হাফিজের কাব্যজীবনের পরিণতি প্রেম থেকে অনন্ত, ব্যক্তিক থেকে মহাজাগতিক। সাম্প্রতিক লেখা তাঁর একটা কবিতায় আমরা দেখি; অস্তিত্বের মহাকাব্যিক চিত্র- আমায় একটু ধরো, জীবন কবিতায় তিনি বলেন; আমার পোড়া শরীর ও মনভাঙা আদল/আত্মার জলে ডুবে যেতে যেতে/শুধু তোমার দিকেই হাতটি তুলে বলে/আমায় একটু ধরো, জীবন!
এটি জীবনকে কেন্দ্র করে তার শেষপর্যায়ের অনুভব বিষাদ, একাকিত্ব, কিন্তু তবু আলিঙ্গন। জীবনের প্রতি এক ব্যাপক ক্ষমা, অতল একাকিত্ব, প্রেমের গভীর দার্শনিকতা, মৃত্যু-পরবর্তী প্রজ্ঞা, স্মৃতি থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।

দিলারা হাফিজের কাব্যজীবনে রয়েছে এক ধারাবাহিক বিবর্তনের শক্ত পরিচয় যেমন পরাবাস্তব চিত্রকল্প, দেহ–সত্তার দার্শনিক বিশ্লেষণ, অনন্ততার অনুভব, সময়ের বিস্তৃত নদী, স্মৃতির ছায়াপথ, গদ্য-কবিতার উত্থান সব মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন পরিণত, বহুমাত্রিক ও বিশ্বমানের একজন কবি। ভাষা দৃঢ়, তীক্ষ্ণ, বহুস্তর। এখানে ইতিহাস-চেতনা, রাজনৈতিক প্রতিরোধ ও সামাজিক সত্যের মুখোমুখি হতে দেখা যায়।

দিলারা হাফিজের কাব্যজীবন বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য অধ্যায়। তিনি এমন এক কবিসত্তা, যিনি- সব মিলিয়ে নির্মাণ করেছেন বিরল এক কাব্যসম্ভার।

দিলারা হাফিজের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

কবি দিলারা হাফিজ ১৯৫৫ সালের ২০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন মানিকগঞ্জের গড়পাড়া গ্রামে। পিতা বখশী হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, মাতা রহিমা হাফিজ।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ অনার্স ও এমএ সম্পন্ন করার পর ১৯৮০ সালে ডিপ-ইন-এড পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণি অর্জন করেন।
১৯৯৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইউজিসি স্কলারশিপে পিএইচডি ডিগ্রি লাভের পর শুরু করেন দীর্ঘ ৩৭ বছরের অধ্যাপনা জীবন। কুমুদিনী কলেজ, ইডেন কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজ ও তিতুমীর কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে থেকে অবসর নেন।
শিক্ষা ও সমাজসেবার প্রতি তাঁর অসামান্য দায়বদ্ধতা তাকে নিয়ে গেছে আরও বড় একটি দায়িত্বের দিকে- বিটিভির জননন্দিত গণশিক্ষামূলক অনুষ্ঠান “সবার জন্যে শিক্ষা”–র গবেষণা, গ্রন্থনা ও উপস্থাপনায় টানা ২২ বছর কাজ করেছেন তিনি।
১৯৯৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন মানিকগঞ্জ শিশুফোরাম, শিশুদের প্রতিভা বিকাশ ও সামগ্রিক উন্নয়নে নিবেদিত এক অসাধারণ উদ্যোগ।
স্বামী কবি রফিক আজাদ প্রয়াত হওয়ার পর ২০১৭ সালে তিনি গঠন করেন “কবি রফিক আজাদ স্মৃতিপর্ষদ”। প্রতিবছর কবির জন্মদিনে সেমিনার, কবিতা পাঠ এবং ২০২১ সাল থেকে সাহিত্য–মুক্তিযুদ্ধ–সাংবাদিকতার যে কোনো একটি শাখায় স্মারক পুরস্কার প্রদান করে আসছে এই সংগঠন।
প্রকাশিত গ্রন্থ
কবি দিলারা হাফিজের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থসমূহ যেমন; ভালোবাসার কবিতা (১৯৮২), পিতা কিংবা পুত্র অথবা প্রেমিক (১৯৮৩), প্রেমের কবিতা (১৯৯৮), কে নেবে দায় (২০০১),খুঁজে ফিরি ভিক্ষালব্ধ জ্ঞান (২০১২), নির্বাচিত কবিতা (প্রথম প্রকাশ ২০০৬, ৫ম সংস্করণ ২০১১), অবিনশ্বর আয়না (২০১৮), নারী সংহিতা (২০১৯), কবিতা সমগ্র (২০২১), স্তনের অহংকার (২০২২), মনোকষ্ট হচ্ছে, স্নান করো (প্রকাশিতব্য), এই আমি নই সেই বিহ্বল আমি (২০২৪), Know Why I Should Unlock Inner Pride of Myself (ইংরেজি অনুবাদ; অনুবাদক—হামিদ রায়হান),শতেক হাইকু, একগুচ্ছ দিলারা হাফিজ। প্রকাশিত অন্যান্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সুষমার গল্প (শিশুতোষ, ২০১৯), গবেষণা গ্রন্থ: বাংলাদেশের কবিতায় ব্যক্তি ও সমাজ (১৯৪৭–৭১, বাংলা একাডেমি, ২০০৪), বাংলা কবিতার উপায় ও উপকরণ (২০২৪), আনন্দ বেদনা যজ্ঞে রফিক আজাদ (২০১৮), কে প্রথম কাছে এসেছি (২০২০) ইত্যাদি।

সম্পাদনা করেছেন; মুখোমুখি রফিক আজাদ (২০১৮),গদ্যের গহন অরণ্যে (২০১৯), রফিক আজাদের নির্বাচিত ৫০টি প্রেমের কবিতা (২০২২),কবি রফিক আজাদ রচনাবলি (২০২৩)
তাঁর কবিতা অনুবাদ করেছেন মার্কিন কবি ক্যারোলাইন রাইট ও ভারতের পণ্ডিত শ্যাম সিং শশী।
তিনি এই পর্যন্ত অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন, তারমধ্যে অন্যতম- লা ফর্তিনা সম্মাননা (১৯৮৩), মানিকগঞ্জ সাহিত্য ও সংস্কৃতিক পরিষদ সম্মাননা (২০১১), প্রদান করেন নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন, বাংলাদেশ–নেপাল ফ্রেন্ডশিপ সম্মাননা (২০১২, ২০২২), প্রথম আলো (কলকাতা) কবিতা সম্মাননা (২০১৯), লেখিকা সংঘ সাহিত্য পুরস্কার (২০২৪)

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি প্র্য়াত কবি রফিক আজাদের স্ত্রী এবং মর্ম–সহচরী। দুই পুত্র-অভিন্ন আজাদ ও অব্যয় আজাদ, দু’জনই টরন্টো প্রবাসী। দুই ছেলেকে নিয়ে তিনি ভ্রমণ করেছেন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপ ও এশিয়ার বহু দেশে।

কবির জন্মদিনে শিকড়ের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও শুভ কামনা। কবি দীর্ঘজীবি হোন।



কবি দিলারা হাফিজ-এর কবিতা

তোমার দেয়া দুঃখ

তোমার দেয়া দুঃখ
সরিয়ে রাখি দুহাতে
কিছুই আমাকে আর
দিশেহারা করে না—
এমন ক্রান্তিকালে
হারিয়ে ফেলি মুখের ভাষা!

যদিও ভেঙেছো বর্ণের বিশ্বাস,
উনিশ শো বাহান্নর মহরত…
জানি,অনাহারী কষ্টের চেয়ে
তবু বেশি নয়…সেসব দাহ!
বিশ্ব যখন রক্তপাতের মোহে
লড়ছে ভীষণ অহোরাত্র!

দেশের নির্লিপ্ত জাগরণে
তাই হতভম্ব হই না আর
একাত্তরের অবারিত বাতাস
যদি পথ হারায় সমুখ পথে-
কি থাকে আমার?
ঝুরো কিছু ধূলোবালি ছাড়া!

নির্বাক হাওয়া করজোড়ে বয়ে যায়
গোধূলির নগ্ননৃত্যে
পথের কার্নিশে ঝুলে থাকে
ক্ষমার অযোগ্য এইসব
ক্লান্ত মবের রাজনীতি…

সময় মোটে নয় একাগ্র ও একনিষ্ঠ
দুচোখে সর্বদা ভীতি আর ত্রাস
দুর্বৃত্তায়নের শতপথে সহস্র অধ্যাস…

ভাবি,দেশপ্রেমেও কত ফাঁক আর ফাঁকি,
পরিশেষে তোমাকেও মারণাস্ত্রময় করে
তোলে এইসব রীতি ও অপযশ…প্রীতি!


ছেড়ে যাই,ফিরে আসি


তাকে ছেড়ে যাই বার বার
চাই না সে আসুক আবার—-
ছেড়ে যেতে চাই স্থবির বলিরেখাময় এই কুঞ্চিত সময়!

সময়ের কিবা দোষ,আমি হয়তো নিজেই বেখাপ্পা রকম!
মানতে পারিনি আজো রিসেট বাটন!

যত চাই পরিত্যাগ করি ছন্নছাড়া এই একতারা বাউল
ততটাই কাছে টানে একাত্তরের অদৃশ্য বন্ধন!

মর্মে দুইহাত রেখে বলে—ফিরে এসো হে, বাঞ্ছিত
আশা নামের এক রথের প্রজাপতি- উড়ছে পথে পথে!


বিশ্ব হৃদয়দিবসের কবিতা

১.
ভালোবাসা যেমন অতর্কিতে ভাসিয়ে নিয়ে যায় গন্তব্যহীন:
বিদ্রোহ বিপ্লবের আদিম স্বভাবও তেমনি—
সে আসে ভেঙেচুরে, গৃহস্থের দোর্দাণ্ড প্রতাপ নিয়ে
ফিরে যায় মেলা ভাঙা ক্লান্ত বৈষ্ণবীর মতো—-
২.
জাংলায় ফুটেছে শশাফুল!
হলুদও ব্যাকুল
তাকিয়েছো কার দিকে, দিগ্বসন?
নিকানো উঠানের মতো কার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছো তুমি?

দেউড়ির ডালিম ফুলের প্রজাপতি বসেছে তোমার ঠোঁটে
ইতিহাস আজ হাঁটছে উল্টোপথে…
তুমি কি দেখছো না?
নবীনা!
৩.
মন যখন খুব তেঁতোপোড়া জ্বলন্ত আগুন,
ইচ্ছে করে কারো সঙ্গে অহেতুক ঝগড়া বাঁধাই!
বাউলের বিষাদ সংসারে সকলেই বোঝে না—
শূন্যতা ছাড়া শূন্যতার মানে বোঝা—বৃথাই!


তোমাকে দেখি না—হে সুন্দর!

এই রূপ-রূপান্তরে সামগ্রিক মানুষের অভিযাত্রা দেখি…
তোমাকে দেখি না—হে সুন্দর!

ঈশ্বরের ছায়ার নামে কতিপয় দুর্বৃত্তের দুঃশাসন দেখি
যুদ্ধের নামে শিশু ও নারী প্রাণের অপচয় দেখি…

রক্তলালে হোলিখেলা দেখি দ্বিগবিজয়ী ক্ষমতাধরে—
সাধারণ মানুষের ভালো বা মন্দ থাকার মধ্যেও জেগে
থাকে বিপন্ন-বেদনার বিষণ্ণ নামাবলি…
চিরন্তন কষ্টের মৃণালে ফুটে থাকে অসংখ্য শোক-দুঃখ
শাপলা-শালুকের মতোই যেমন প্রাকৃতিক…

তোমাদের অস্ত্র বিকিকিনির মধ্যসত্ত্বভোগীদের
অপছায়া মিশে থাকে রৌদ্রকরোজ্জ্বল বাতাসেও
বর্ষায় নতুন পানির মাছ হয়ে লাফায়—অতঃপর

নিরন্ন ও নির্বাক জন্মেছি আমরা যারা মুখোশ মানুষ—
নিশ্চিত জানি,অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অপমৃত্যু কাঁধে নিয়ে…
আমরা ফিরে যাবো এই পৃথিবী শস্যশূন্য করে।



চন্দ্র-শৈশব

জ্যোৎস্না অধ্যুষিত এক রাতে আমার অবুঝ শৈশব পাগলের মতো
হেঁটেছিলো রাধাচন্দ্রের টোপর মাথায় বেঁধে-
আকাশ থেকে ঝরে পড়া সোনালি তরলে ডুবে যাচ্ছিলো
আমার দুহাত,পায়ের পাতা- নগ্ন নাভি,শরীরের সাধ!

নিজে আমি ডুমো ডুমো করে কাটছিলাম আমার অদৃশ্য চৈতন্যলোক,
ইতিহাসের ঝুলন্ত সিঁড়িতে যেন আমি এক নিঃশব্দের সন্তান,
ভালোবাসার স্নিগ্ধতায় মুক ও বধির!

চোখ দুটি বন্ধ করে অন্ধ সেজে খড়ি হাতে হাঁটছিলাম
পেছনে প্রৌঢ় খালা খালু—তাদের বাসায় অতিথি আমি,

মির্জাপুর শহর, নিভন্ত শুনশান রাস্তা-
দুপাশে বাতাসের তরঙ্গতোলা গন্ধ ও গতি,
আমার চরণ ছুঁয়ে গাইছিলো গান অচেনা দুর্বাঘাস-
মিটিমিটি তারাদের অনুভবে
ছড়িয়ে দিয়েছিলাম সেদিন স্বর্গমর্ত্যজুড়ে এক উষ্ণচিহ্ন!

-এই মেয়ে,পড়ে যাবি তো! বলে ধমকে উঠলেন খালু
অপরিনামদর্শী বোনঝির দুঃসাহসে বেগবান তিনিও।

দুচোখ খুলেই বলি, আলোর পৃথিবীতে নির্জন অন্ধেরা
কিভাবে পথ চলে সেই কষ্ট পরখ করে দেখছিলাম মাত্র।
ভুল তো কিছু করিনি—সেই থেকে কষ্টের পাখি পুষি আমি…

জীবন অনিঃশেষ

অপরিমেয় ভালেবাসার আধার
আজ একটা অদ্ভুত সকাল রচিত হলো এই আমার নিঃসঙ্গ জীবনের বাতাবরণে। নিগূঢ় অস্তিত্বের জানালা খুলে গেলো হাট করে।
দেখলাম, আমার “আমির” মধ্যে কত বিচিত্র সংরাগে বাস করে অপরাপর “আমি”।এতোদিন তাদের আমি দেখতেই পাইনি। অথচ আমারই মাধুরী রসে একদা সৃষ্টি হয়েছিলো কিংবদন্তীতুল্য প্রেমের গভীরতা, ভালোবাসার মোহনীয় ভাস্কর্য। এই অসীম, অনিকেত এক আরাদ্ধ সময়ে বাস করেছি বলে অন্য কোনো ক্ষুদ্রতা, তুচ্ছতা এমন কী কোনো ঈর্ষা আমাকে ছুঁতে পারেনি।
সৃষ্টিশীল মানুষের সংস্পর্শের আলো আমাকে পথ দেখিয়েছে সামাজিক সংস্কারের বিরুদ্ধে। তাই হত দরিদ্র এক কবির সংসারকে বিশ্বাসের চাদরে জড়িয়ে রেখেছিলাম আপন ওমে। সুদূর আলোকবর্ষ পেরিয়ে সৃষ্টিকর্তার সঙ্গেই যেন জোড় বেঁধেছিলাম অচেনা এক গ্রহে। আত্মার দ্বিত্ব সৃষ্টির মহিমায় স্পর্শ করেছিলাম আকাশ ছোঁয়া বৈভব।

সময়ের সঙ্গোপনে বাস করে ঘরবাড়ি, আপন সংসার, সম্পর্ক, অতপর জননী সমাচার। তবু সংসার কখনো কী আপন ক্ষেত্র?
অনন্ত সময়?
কেউ নয়, নিঃসঙ্গ একাকী মানুষের জন্যে কিছুই অবশিষ্ট থাকে না আর!!

সকল কোলাহল, কলরব থেকে বেরিয়ে এসে দেখতে পাই আপন সত্যকে। অপার সত্যালোক থেকে বিচলিত হতে শিখিনি কখনো। গ্রন্থিমোচনের সকল দায়ভার কাঁধে নিয়েও আজ তাই আত্মজের কাছে সেই পরম সত্য এবং অনিন্দ্য সুন্দরকে আমি প্রকাশ করতে পেরেছি অপকটে। হৃদয়ের সত্যের চেয়ে বড় কোনো সত্যকে আমি দেখিনি এভাবে হাসতে হাসতে প্রাণ দিতে।
সত্যের আদি ও অন্তহীন দুরন্ত শিরা উপশিরায় তবু বাজে ভৈরবী গানের সুর।মাঙ্গলিক আরাধনায় স্বপ্নের রসুই ঘর ভেসে যায় ওস্তাদ আমজাদ আলী খানের সরোদের ঝরণা তলায়।

তাঁর মৃত্তিকাবাস কোনো সহজিয়া সড়ক নয় শেষ গন্তব্যের ধারাবাহিকতায়—তবু জীবন মরণের অসীমে কে কখন পৌঁছবে সেখানে, ভাগ্যিস জানা থাকে না কারু। এই অজানাই তাড়িয়ে নিয়ে যায় জানার উপকূলে। কালজয়ী চিরকালের পংক্তিমালায় বেঁচে থাকে কবি ও কবিতা।
তবু ও জানাজানি শেষ হলে পারে আসে নবীন মাঝি, নতুন মুখ।
পৃথিবী প্রাচীন হতে থাকে গাছের বাকলের মতো।
কিছুকালের সংসার আর অরণ্যস্নানের সুধা কী দিতে পারে একাকী মানুষকে?
পারে কী?
পরম্পরায় সময়ের সঙ্গে সময়ের পরম সাধনা মেলাতে?
প্রকৃতি মাঝে মাঝে প্রাণ সখার মতো পাশে এসে দাঁডায় অগোচরে। মনের যতো ক্লেদ ধুয়ে নিয়ে যায় দুদিনের বৃষ্টিতে।সঙ্গে অতিরিক্ত বাড়ন্ত দু/ চারটি গাছের শেকড় উপরে ফেলে দিয়ে সে হাসায় আমাকে।
যতো ক্ষুরধার হোক না কেন হাতিয়ার পরিচালনাই তার দক্ষতার মাপকাঠি। একথা জানে সকল কবি ও অকবি।
“অমৃত”তো শব্দেই বন্দী। কে কবে দেখেছে তাকে অলি গলি ছেড়ে রাজপথে হেঁটে যেতে?
একজন মানুষের সাধনা করে আমি ঈশ্বরের দেখা পেয়েছি, তার বিচ্ছুরিত জ্যোতির্ময় দ্যুতি, বিভূতি আমার চোখ মুখে।সকল ক্ষুদ্রতার সলম ঝরে পড়েছে সেই কোনকালে, শৈশবের খেলাচ্ছলে।
সেই তখনই খুঁজে পেয়েছিলাম নতুন পৃথিবীর ঠি কানা।
এই ঠিকানাটি আমি তবু চিরকুটে লিখে রেখে যেতে চাই পৃথিবীর অনাগত শস্যদানায়।


তুমি আছো,তাই

তুমি আছো বলে আমি আজো দুচোখে কাজল পরি…
বিষন্নতা ঢেকে-ঢুকে রাখি,নজর না লাগে পাছে!

স্মৃতির খসড়া পড়ে থাকে মরমের গঞ্জনাতে
মানবতা ভাগ করি দুজনার পাতে, দুধেভাতে

কিছু প্রেম,অভিমান অনুরাগ যুক্তি ও দর্শন
আত্মার গভীরে খুব ফেলে যায় ছায়া অমলিন

তোমার কবিতা প্রেম থেকে পারিনি ফেরাতে চোখ
থেকেও না থাকা প্রাণ,না থেকেও আছো সর্বভুক॥


আমায় একটু ধরো,জীবন!

দুচোখের জলে ভেসে ভেসে এমন সমারোহে আসো তুমি—
শুধু মুখখানা জেগে থাকে—কুয়াশা ছড়িয়ে…
বরফমাখা চোখে আজো আমি ধরে রেখেছি সে বিসর্জনের ছবি,
অন্য কিছু দেখি না যে নতুনতর!

ভুলে যাই, রৌদ্রক্লান্ত ছায়াপথ খুঁজে আর কতদূর যেতে হবে আমাকে—
আর কতদূর হাঁটলে পাবো চাঁদের মাটি!

হাতের তালুতে তুলে নিই দুরাশা,অগ্নিময় তৎক্ষণিক
বিরহভারে অবনত হতে হতে ভেঙেছে পাঁজরের হাড়!

আমার পোড়া শরীর ও মনভাঙা আদল আত্মার জলে
ডুবে যেতে যেতে শুধু তোমার দিকেই হাতটি তুলে বলে:
আমায় একটু ধরো,জীবন!


অনেক কিছু দেখি

আজকাল অনেক কিছু দেখি—অদেখা মনে করে!
তোমার না থাকাও দেখতে পাই—
এতকাল না থেকেও পাশে ছিলে যেমন উনবর্ণে সপ্তরঙ
গন্ধে-স্পর্শে-স্মৃতি-পিঁপড়েদের দংশনেও তো ছিলে
কী যে হলো—জলজ্যান্ত দুঃখের দুইখানা কবিতায়
হাতে রেখেও মনে হয় কত সহস্র বছর পূর্বে
কেউ ফেলে গেছে এসব—-যেমন অভিশপ্ত
ও অস্থির কোনো লুপ্ত সভ্যতার গল্প শুনে—-
ভগ্নবুক হাহাকারে লম্বমান আমি ঘুম যাই
প্রাচীন এক অদেখা মিশরের মমি!


খুব সাধারণ কবিতা

কারু হাসি শুনে একতারা বেজে ওঠে-
দুয়ার যে খুলে যায় গানে!

কারু কান্নার দমকে
নিরবতা তড়পায়…প্রভু কাঁদে

কারু রেখে যাওয়া অপমানে
পায়ের পাতা সচল হয় উলুবনে…

কারুবা বিরাগে- খুব
বিবমিষা- জাগে ওয়াক-থু

কারু ছুঁড়ে দেয়া দুঃখে
আমার পুষ্পিত প্রাণ ওড়ে…

হৃদয়ও খুলে যায় হাট করে!


হরমনের খেলা ও একা নারীর লড়াই

ওভুলেশন, পিরিয়ড, হরমোনাল ফ্ল্যাকচুয়েশনের ক্রান্তিকালেও
একজন নারী যখন একলা ও অতল
প্রকৃতির মমতায় বাড়ে তার শরীরের বহু অঙ্গাণু কোষ
প্রাণপন মায়াবতীর গন্ধে ভেসে যায় প্রণয়ের একশেষ!

কে বলে সে একলা?
নিজেই প্রাণের বন্ধু—চকিতে—যেনবা দ্বৈত আত্মার স্বজন এক—
এই গ্লোবাল ভিলেজেও নিত্য একেশ্বর!

দেহের মধ্যে বাস করে সে দেহের বন্ধু—নিত্য আপনজন!
আট কুঠুরি নয় দরোজায় সেজন—- খিল এঁটে দেয় সর্বক্ষণ!

কে বলে সে একলা?

নিজেকে নিজের মতো করে ভালোবেসে সে হতে পারে দেহাতীত—
যেতে পারে তরুবর পাঞ্চবি ডালের নীড়ে!

তখন তার মলিনতা বদলে যায়, কান্তিময় রসবোধ
উদ্ভাসিত হতে থাকে যেমন সকালের প্রথম রোদ…

কে বলে সে একলা?

ফিরে আসে দুচোখে আত্মবিশ্বাস,দেহের শিরায় ফানা
জাগে অ-মরি লাবণ্যের ধারা…যেন বর্ষার কচুরীপানা!

মুখ তার পদ্মা-মেঘনার ঢেউ—এই পথে—পথের বাঁক,
একা নয় কেউ,দেখায় একার মতো—যেমন রাতের অর্ধেক…

কে বলে—একলা সে?


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Trending