কবি বেগম সুফিয়া কামালের জন্মদিন শ্রদ্ধার্ঘ্য
–ফারুক আহমেদ রনি
আমাদের যুগে আমরা যখন খেলেছি পুতুল খেলা
তোমরা এ যুগে সেই বয়সেই লেখাপড়া কর মেলা।
আমরা যখন আকাশের তলে উড়ায়েছি শুধু ঘুড়ি
তোমরা এখন কলের জাহাজ চালাও গগন জুড়ি।
উত্তর মেরু, দক্ষিণ মেরু সব তোমাদের জানা
আমরা শুনেছি সেখানে রয়েছে জিন ,পরী, দেও, দানা।
পাতালপুরীর অজানা কাহিনী তোমরা শোনাও সবে
মেরুতে মেরুতে জানা পরিচয় কেমন করিয়া হবে।
তোমাদের ঘরে আলোর অভাব কভূ নাহি হবে আর
আকাশ-আলোক বাঁধি আনি দূর করিবে অন্ধকার।
শস্য-শ্যামলা এই মাটি মা’র অঙ্গ পুষ্ট করে
আনিবে অটুট স্বাস্থ্য, সবল দেহ-মন ঘরে ঘরে।
তোমাদের গানে, কল-কলতানে উছসি উঠিবে নদী-
সরস করিয়া তৃণ ও তরুরে বহিবে সে নিরবধি
তোমরা আনিবে ফুল ও ফসল পাখি-ডাকা রাঙা ভোর
জগৎ করিবে মধুময়, প্রাণে প্রাণে বাঁধি প্রীতিডোর।
আজিকার শিশু- কবি সুফিয়া কামাল

কবি বেগম সুফিয়া কামালের আজিকার শিশু কবিতাটি পড়েননি এমন খুব কম বাংলাভাষী আছেন, বিশেষ করে কবিতার জন্ম ও আমাদের সময়ের শিশু কিশোররা সবাই পড়েছি এমনকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন- আজকের শিশুরাই আগামী দিনে পৃথিবীর অন্ধকার দূর করবে, আকাশ-আলোককে নিজের ঘরে এনে জ্ঞান ও অগ্রগতির নতুন যুগ সৃষ্টি করবে। তারা দেশের শস্য-শ্যামলা মাটিকে সমৃদ্ধ করবে, শক্ত-সমর্থ জাতি গড়বে এবং প্রকৃতিকে সজীব করে তুলবে। তাদের গান, হাসি, কর্মউদ্যম নদী-নালা, বৃক্ষলতা সবকিছুকে প্রফুল্ল করে তুলবে।
অতীত ও বর্তমান যুগের শিশুদের জীবন, শিক্ষা ও সম্ভাবনার এক সুন্দর তুলনা তুলে ধরে। কবি নিজের শৈশবের কথা উল্লেখ করে বলেন- তাদের সময় ছিল ঘুড়ি ও পুতুল খেলার সীমাবদ্ধ জগৎ। তখনো শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিস্তার ছিল অল্প। কিন্তু আজকের শিশুদের সামনে রয়েছে বিশাল শিক্ষার ক্ষেত্র, আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অসীম দিগন্ত। তারা কলের জাহাজ চালাতে পারে, মেরু অঞ্চলের মতো দূরবর্তী স্থানের জ্ঞান অর্জন করতে পারে, পৃথিবীর নানা রহস্য সম্পর্কে সহজেই জানতে পারে।
শেষে কবি অত্যন্ত ভালোবাসা নিয়ে জানান, আজকের শিশুরাই ভবিষ্যতের আলোকবাহক; তারা ফুল, ফসল ও নতুন ভোর নিয়ে আসবে, জগৎকে করবে আরও সুন্দর ও মধুময়। এই কবিতায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি কবির স্বপ্ন, ভালোবাসা এবং অকৃত্রিম বিশ্বাস হৃদয়স্পর্শীভাবে ফুটে উঠেছে।
আজ বেগম সুফিয়া কামালের জন্মদিন। বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও নারী অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম। তাঁর জন্মদিনে আমরা শুধু একজন কবিকে নয়, বরং এক পথপ্রদর্শককে স্মরণ করি, যিনি কলমের শক্তিতে সমাজের বদলে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন।
সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম হলেও সুফিয়া কামালের শৈশব ছিল সামাজিক রীতিনীতির কঠোর সীমাবদ্ধতায় ভরা। তবুও ছোটবেলা থেকেই তিনি পৃথিবীকে জানার আকাঙ্ক্ষা, ভাষার সৌন্দর্য অনুভব করার ক্ষমতা এবং সাহিত্যচর্চার প্রতি গভীর টান লুকিয়ে রেখেছিলেন। সামাজিক বাধা তাঁর পথ আটকাতে পারেনি; বরং সেই বাধাই তাকে আরও দৃঢ় করেছে।
বেগম সুফিয়া কামালের কবিতায় প্রথমে প্রকৃতি, মানবতার প্রতি টান আর কোমল অনুভবের সুর ছিল। সময়ের সাথে সাথে তাঁর লেখা হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা, অন্যায়, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দৃপ্ত উচ্চারণ। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা নারীমুক্তির সংগ্রাম, প্রতিটি আন্দোলনে তাঁর উপস্থিতি ছিল সাহসিকতা ও নৈতিকতার প্রতীক।
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি নারী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত হিসেবে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সমাজে নারীর স্বাধীনতা, শিক্ষার অধিকার ও সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি আজীবন কাজ করেছেন। তাঁর ঘর ছিল মুক্তিযোদ্ধা, শিল্পী, লেখক ও সমাজকর্মীদের মিলনস্থল—স্বাধীনতার স্বপ্ন যারা লালন করতেন, তাদের সবারই আশ্রয়স্থল।
বেগম সুফিয়া কামাল আমাদের শিখিয়ে গেছেন- কবিতা শুধু অনুভূতির প্রকাশ নয়; এটি পরিবর্তনের সোপান, মানবতার পক্ষে সংগ্রামের অস্ত্র। তাঁর জীবন ও সাহিত্য আজও আমাদের পথ দেখায়, সাহস দেয়, মানবতার পক্ষে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করে।
আজ তাঁর জন্মদিনে আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি সেই মহীয়সী নারীকে, যিনি নিজের আলোয় আলোকিত করেছেন সমগ্র জাতিকে।
বেগম সুফিয়া কামাল (১৯১১–১৯৯৯) ছিলেন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একজন অবিস্মরণীয় কবি, সমাজচিন্তক ও মানবতার পথপ্রদর্শক। তাঁর জীবনকে একক কোনো পরিচয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন, কারণ তিনি ছিলেন কবি, সংগঠক, নারী অধিকার কর্মী, ভাষা সংগ্রামী ও মুক্তিযুদ্ধের সহযোদ্ধা- সব মিলিয়ে এক মহিমান্বিত মানবিক শক্তি।
বেগম সুফিয়া কামালের জন্ম ব্রিটিশ ভারতের বরিশালে, একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। যদিও পরিবার ছিল মর্যাদাবান, কিন্তু সেই সময়ের সামাজিক রীতি অনুযায়ী নারীর জন্য শিক্ষার সুযোগ ছিল খুব সীমিত। আনুষ্ঠানিক স্কুলে পড়ার সুযোগ না থাকলেও তিনি বাড়িতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাংলা, আরবি, উর্দু ও ইংরেজি শিখেছিলেন।
শৈশবেই বই পড়ার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ গড়ে ওঠে। তিনি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র ও অন্যান্য সাহিত্যিকদের রচনা পড়ে লেখার জগতে প্রবেশ করেন। এভাবে সামাজিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তিনি নিজের মেধা ও আগ্রহকে বিকশিত করতে পেরেছিলেন।
মাত্র ১৮ বছর বয়সে তাঁর প্রথম কবিতাগুলো বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হতে শুরু করে। ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ “সাঁঝের মায়া” সাহিত্যজগতে প্রশংসা অর্জন করে। পরে তাঁর কবিতাগুলো মানবিকতা, দেশপ্রেম, নারীজাগরণ ও স্বাধীনতার চেতনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে।
তাঁর লেখায় প্রকৃতির মাধুর্য যেমন ছিল, তেমনি ছিল শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা। তাঁর কবিতার ভাষা ছিল সরল, হৃদয়ছোঁয়া, আবার একই সঙ্গে সংগ্রামী।
বেগম সুফিয়া কামাল শুধু লেখক নন, তিনি ছিলেন সক্রিয় আন্দোলনকারী। ভাষা আন্দোলনে তিনি সাহসের সঙ্গে অংশ নেন এবং বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ৬৯-এর গণসংগ্রাম, স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলন, সবক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেন, গৃহহীন নারী ও শিশুদের আশ্রয় দেন। তাঁর বাড়ি তখন হয়ে ওঠে মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল।
তিনি ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, যা বাংলাদেশের নারী অধিকার আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সংগঠনগুলোর একটি।
নারীর শিক্ষার অধিকার, সমমর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা- এসব বিষয়ে আজ যে সচেতনতা দেখা যায়, তার পথ রচনা করেছেন সুফিয়া কামাল ও তাঁর সহযোদ্ধারা।
তিনি বিশ্বাস করতেন- একটি জাতিকে উন্নত হতে হলে তার নারীদের মর্যাদা, শিক্ষা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।
বেগম সুফিয়া কামাল ছিলেন ছায়ানটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। পাকিস্তানি শাসনামলে বাংলা সংস্কৃতি দমনের চেষ্টা যখন চলছিল, তখন ছায়ানটের মাধ্যমে তিনি বাংলার কৃষ্টি ও শিল্পকে রক্ষা করেন।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে রমনা বটমূলে ছায়ানটের পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান ছিল প্রতিরোধ ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রতীক।
সুফিয়া কামাল একজন অত্যন্ত সহজ-সরল, মানবিক ও করুণাময় মানুষ ছিলেন। তিনি সবসময় দরিদ্র, নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের পাশে থেকেছেন।
তাঁর সন্তানদের মধ্যেও তিনি মানবিক মূল্যবোধ শিক্ষা দিয়েছিলেন। তাঁর মেয়ে সুলতানা কামালসহ পরিবারটি জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রথম নারী হিসেবে তাঁকে জানাজা দেওয়া হয়, যা তাঁর প্রতি জাতির সর্বোচ্চ শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ।
আজও তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি এবং নারীমুক্তির সংগ্রামের অগ্রদূত হিসেবে অনন্য মর্যাদা নিয়ে বেঁচে আছেন।
তাঁর লেখা, সংগ্রাম ও জীবনগাথা আমাদের শেখায়।
মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোই হলো প্রকৃত সাহস, আর সাহিত্য হলো সেই সাহসের দীপ্ত ভাষা।
শিকড়ের পক্ষ থেকে কবির জন্ম দিনে শ্রদ্ধা ও সাথে সাথে কবির বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।
ফারুক আহমেদ রনি
সম্পাদক, শিকড়






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান