শুভ জন্মদিন

বাংলা সাহিত্য ভুবনে এমন অনেক নাম আছে, যারা নীরবে, নিরলসভাবে, অটুট এক নিষ্ঠায় নিজেদের সাহিত্যসাধনা চালিয়ে যান। তারা আলোয় কম থাকেন, কিন্তু আলোর উৎস হয়ে ওঠেন অনেকের জন্য। সাইফ উদ্দিন আহমেদ বাবর সেই ধরনেরই এক সাহিত্যমানস, যিনি অভিবাসী জীবনের হাজার ব্যস্ততার মাঝেও শব্দকে নিজের চিরসঙ্গী করে রেখেছেন, আর শব্দের মধ্য দিয়েই নির্মাণ করে চলেছেন এক সুদীর্ঘ সৃষ্টির পথ।

১৯৬৯ সালে তাঁর জন্ম সিলেট জেলার ওসমানী নগর উপজেলার নিজ মান্দারুকা গ্রামে। বাংলাদেশের প্রান্তিক গ্রামীণ জীবনের যে প্রকৃতি-ঘনিষ্ঠ পরিবেশ, তার মধ্যে বড় হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই তিনি মানুষের হাসি-কান্না, জীবনযাত্রার অনাবিল স্বাদ, প্রকৃতির নীরব ভাষা এবং জনপদের চিরচেনা গল্পগুলো গভীরভাবে অনুভব করার সুযোগ পেয়েছেন। সেই অভিজ্ঞতাগুলো পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যকর্মকে করেছে সমৃদ্ধ, করেছে সজীব। কৈশোরের শেষ প্রান্তে, ১৯৮৫ সালে, যখন তিনি বিলেতে পাড়ি জমান, তখন জীবনের নতুন অধ্যায় তাঁর সামনে উন্মুক্ত হয়। অপরিচিত শহর, ভিন্ন ভাষা, নতুন সমাজ, সব মিলিয়ে প্রবাসজীবন তাঁকে শিখিয়েছে ভিন্ন ধাঁচের জীবনবোধ। এই অভিজ্ঞতা তাঁর লেখাকে দিয়েছে নতুন রূপ, নতুন মাত্রা, আর তাঁর সাহিত্যচিন্তাকে দিয়েছে আরও বিস্তৃত পরিসর।

আশির দশকের শেষ দিকে কবিতা ও গল্পের মাধ্যমে তাঁর সাহিত্যজীবনের সূচনা। প্রবাসে থেকেও বাংলা সাহিত্যচর্চা বন্ধ হয়ে যায়নি; বরং আরও গভীর হয়েছে। সৃজনশীলতার অনিবার্য টানে তিনি লিখে গেছেন কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, মানুষের জীবনের নানা দিক, সম্পর্কের ওঠা-নামা, একাকিত্ব, অভিবাসনজনিত ভাঙন, স্মৃতির স্নিগ্ধতা, কিংবা অস্তিত্বের মূল প্রশ্নগুলো ধরা পড়ে তাঁর লেখায় সূক্ষ্ম বুননে। তাঁর কবিতায় আছে মানুষের অন্তর্জগতের নিঃসঙ্গ সুর, আছে বেদনার নরম বৃষ্টি, আছে সময়ের ক্ষরণশীলতার আর্তনাদ। অন্যদিকে তাঁর গল্পে রয়েছে বাস্তবতার মাটি, মানুষের মনস্তত্ত্বের রঙ, সম্পর্কের জটিলতা, সমাজ-সংস্কৃতির বহুমাত্রিক টানাপোড়েন যেন জীবনের বহুস্তরীয় প্রতিচ্ছবি।

প্রবাসী বাংলা সাহিত্যাঙ্গনের সংগঠনগুলোর সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা তাঁকে দিয়েছে আরও এক বিশেষ পরিচয়। তিনি শিকড় প্রকাশনা পরিষদের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই যুক্ত; শিকড় ও গ্লোবাল উদ্যোগের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ দিনের নিবিড় সম্পর্ক। শুধু যুক্ত নন, তিনি এসবের বর্ধনপথে একজন সক্রিয় অংশীদার, প্রেরণাদাতা এবং কর্মী। এছাড়াও তিনি সংহতি সাহিত্য পরিষদের নির্বাহী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বহু বছর ধরে। এই সংগঠনগুলোতে তাঁর অবদান শুধুমাত্র সাংগঠনিক নয়, তিনি নতুন লেখকদের জন্য বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর ভূমিকা নিছক একজন লেখকের ভূমিকা নয়; তিনি একজন সাংস্কৃতিক কর্মী, একজন নিবেদিত প্রবাসী সাহিত্য-ভূমিকর্মী।

সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে তাঁর প্রকাশিত বইয়ের তালিকাও উল্লেখযোগ্য। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ হৃদয় কথা কয় পাঠকের মনোজগতে জায়গা করে নেয় তার কোমল ভাষা, হৃদয়ের সহজ সরল মায়া আর অনুভূতির গভীরতায়। অদৃশ্য বৃত্তের ভেতরে গ্রন্থে তিনি মানুষের অন্তরজগতের সেই সব অনুভূতি তুলে ধরেছেন, যা দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায় তীব্রভাবে। গল্পের বই দু’পারে দু’ হৃদয় মানবসম্পর্কের ভাঙাগড়া, সময়ের ব্যবধান, ও মানুষের আবেগের নদী দুই পারে দাঁড়িয়ে থাকা দু’টি হৃদয়ের গল্পকে নানা আঙ্গিকে প্রকাশ করেছে। তাঁর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ গল্পগ্রন্থ লোকটার কেউ নেই এবং অবিশ্বাস্য, যেখানে বাস্তবতা ও মানবজীবনের বহুবর্ণ ছায়া-আলো ফুটে ওঠে জীবন্ত শৈলীতে। কুয়াশা ঢাকা জীবনের অধ্যায় বইটিতে তিনি তুলে এনেছেন জীবনদর্শনের নানা স্তর, স্মৃতি, সংগ্রাম ও উপলব্ধির মেঠো মেঘ।
সাহিত্যজীবনে দীর্ঘদিন ধরে অবিচল থেকেছেন তিনি। তাঁর লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল পরিমিত ভাষার সৌন্দর্য, গভীর ভাবনার স্বচ্ছতা এবং আবেগের এক মৃদু, মানবিক স্পর্শ। তিনি কণ্ঠ উঁচু করেন না; তাঁর লেখা ফিসফিস করে, কখনো পথ দেখায়, কখনো প্রশ্ন করে, কখনো সান্ত্বনা দেয়। তাঁর সাহিত্যচর্চার মধ্যে আছে জীবনের প্রতি অন্তর্গত ভালোবাসা, আছে মানুষের প্রতি করুণা, আর আছে সময়কে ধরে রাখার এক অক্লান্ত প্রচেষ্টা।

প্রবাসে থেকেও তিনি বাংলা সাহিত্যকে বুকে আগলে রাখেন। নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি এক অনুপ্রেরণা, যে দেখায়, ভৌগোলিক দূরত্ব ভাষাকে মুছে দিতে পারে না; বরং আরও দৃঢ় করে তোলে। বাংলা সাহিত্য তাঁর কাছে শুধু একটি সৃষ্টিশীল অনুরাগ নয়, বরং একটি দায়িত্ব। এই দায়িত্ববোধই তাঁকে দীর্ঘদিন ধরে সাহিত্যকর্ম, সাংস্কৃতিক সংগঠন পরিচালনা এবং সৃজনশীলতার ধারাবাহিকতায় অবিচল রেখেছে।

সাইফ উদ্দিন আহমেদ বাবর আজ প্রবাসী বাংলা সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। তিনি তাঁর লেখায়, কর্মকাণ্ডে এবং মননে একধরনের নীরব কিন্তু প্রবল আলো ছড়িয়ে চলেছেন, যে আলো পাঠকের, লেখকের, সংগঠকের এবং প্রবাসী জীবনের প্রতিটি মানুষের জন্য সমানভাবে উজ্জ্বল।

আজ কবি সাইফ উদ্দিন আহমেদ বাবরের জন্মদিন। শিকড়ের দীর্ঘ যাত্রাপথে তিনি আমাদের সঙ্গে ছিলেন, আছেন এবং আগামীতেও থাকবেন, এই বিশ্বাস আমাদের অটুট। শিকড় পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর সৃজনশীল কর্ম ও সাহিত্যসাধনার প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা, অভিনন্দন এবং শুভ জন্মদিনের আন্তরিক শুভেচ্ছা। সুপ্রিয় কবি সাইফ উদ্দিন আহমেদ বাবর, আপনার জীবন হোক আরও আলোয়, কবিতায় ও প্রেরণায় ভরপুর।


ফারুক আহমেদ রনি
সম্পাদক


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Trending