অনন্ত ছুটি
-আহনাফ আবদুল্লাহ
কালো মেঘের সাথে এমন এক ঘোরতর কোন্দলে জড়িয়ে গিয়েছিল সেদিনের সন্ধ্যা। আমি সেদিন ডরমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। আজও দাঁড়িয়ে আছি আশ্চর্য আলোর এক হোটেলে। ঝলমলে। শহরের দামি হোটেল। গতপরশু উঠেছি। ইউনিভার্সিটিতে কিছু কাজ ছিল, কিছু নথিপত্র তোলার। পরিচিত কাউকে বললেই কুরিয়ার করে পাঠিয়ে দিতে পারতো কিন্তু আমার ইচ্ছে হলো আমার প্রাণের স্পন্দন যে শহরে মিশে আছে তাতে একবার শ্বাস নিতে। অফিসের কাজ ইস্তফা দিয়ে, সপ্তাহান্তের দিনগুলো বেছে নিয়ে ট্রেন চেপে এসে হাজির। গতকালই এসেছি। নথিপত্র আগে থেকেই রেডি করে রেখেছিল ডিপার্টমেন্টের জুনিয়র, ও এখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছে। বেগ পেতে হলো না।
আজ মনটা বড়ো স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছে। এই ফিকে শহর, বিরক্তিকর লোকজনের ভেতর আমার জীবনে আশা জাগানিয়া হয়ে এসেছিল লাবণ্য। গ্রাজুয়েশনের বাকীসময়গুলো কেটেছে সুদিনের মতো।তবুও এই শহরের ধূসররঙের সব লাল-নীল স্বপ্ন আমাকে থোড়াই কেয়ার করেছে।এখনও আমি শাব্দিক আনন্দের বাইরে।গতানুগতিক পুরুষদের যে দায়িত্ব-জীবন থাকে সেই হলো আমার। নিজস্ব ভাবনা আর বিমর্ষ দার্শনিকের জন্মের সাথে সাক্ষাৎ করে বেঁচে আছি এক ভূমিপুত্রের মতন।
সন্ধ্যার ম্লান শরীর ক্রমেই গাঢ়তর হচ্ছে।আমি বের হলাম বর্ণালীর মোড়ে চা খেতে।রেললাইনের ধারে। চায়ের আড্ডা চলে,ইশকুল-কলেজের ছেলেমেয়েদের সংখ্যা বেশি।সহাস্য ভঙ্গিতে কথা বলছে একেকজন। চায়ের দোকানের ছেলেটা চা দিচ্ছে, শেষ হয়ে যাওয়া কাপগুলো নিয়ে গরম পানিতে যারপরনাই অলসতার সাথে ধুয়ে আবার চা পরিবেশন করছে।মোটে তিনজন এই কাজে নিয়োজিত। কম্যুটার ট্রেনে করে ফেরা লোকজন সানন্দে তাকিয়ে আছে জানলা দিয়ে। আমি বসলাম এককোণে, টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে এসেছি। বেকার যুবকের মতো লাগছে অথচ বেকারত্ব ঘুচেছে সেই কবেই।
চা খেতে-খেতে মনে হলো এই চায়ের সঙ্গে আমাদের সহস্রাধিক বারের আলাপের কথা। এরকম সব…
আমি ডরমে থাকি। নির্জীব জীবন আমার। দৈনিক জীবনের রুটিন ছিল ক্লাস থেকে ডরম, ডরম থেকে টিউশন এরপর আবার ডরমে ফেরা। বাইশ বছরের আমি।মাথা ভর্তি চুল, এলোমেলো ভাব, উদাসীনতায় ছেঁয়ে আছে সমস্ত দেহমন।
ক্যাম্পাসে কোনো বন্ধু নেই। কারোর সাথে মিশতে পারিনি। আসলে কারুর সঙ্গে আমার যাচ্ছিল না। মননে, রুচিতে, কর্মে একেবারে নিরেটভাবে আলাদা। দুয়েকজনের সঙ্গে মিশি শুধু ক্লাসের প্রজেক্টের ব্যাপারে।
কবিতা লিখি, গদ্যে হাত দিইনি তখনো। পুরোনো বই কিনে পড়ার বাতিক তখন, যদিও অর্থের স্বল্পতায় এটা করা।
একদিন বৃহস্পতিবার বিকেলে বইয়ের দোকান থেকে ‘সতীনাথ ভাদুড়ি সমগ্র’ কিনে বের হচ্ছি। কয়েক কদম পর একটা স্টেশনারি। সেখান থেকে একটা হ্যান্ডনোট রকমের কিছু কিনব।ভিড়ের মধ্যে খেয়াল করলাম পাশেই এক কোমলপ্রাণ, অলকানন্দা ফুলের মতন গড়নের মেয়ে। অনন্ত এলোমেলো মেয়েটির কথা অতি আশ্চর্য রকমের। কলেজপড়ুয়া মেয়েটি।কলেজ ড্রেস পরা। আশ্চর্য সুন্দরের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ দেখে আমি খানিকটা নিস্তব্ধ হলাম।
উপরওয়ালা চাইলেন আমাদের সাক্ষাৎ হোক।ডরমে ফিরে রাতের খাবার শেষ করে আমি একটা ল্যাব-প্রজেক্টের কাজ দেখছি। ফোন বেজে উঠল, রিসিভ করে সালাম বিনিময়ে করতেই একজন মাঝবয়সী পুরুষের কণ্ঠে বলল, আপনি কী উচ্চতর গণিত পড়াবেন?
ও হ্যাঁ আমি লিফলেট লাগিয়েছিলাম। সেখান থেকে কল দিয়েছে। নতুন টিউশন। অগাস্টের দুই তারিখ থেকে যেতে হবে। সম্মানী মোটামুটি ভালো।
সিটি কলেজ সংলগ্ন এক ফ্ল্যাটে, সপ্তাহে তিনদিন। রীতিমত সময় ঘনিয়ে আসলে আমি চললাম পড়াতে। গার্ডিয়ানের সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে স্টুডেন্টের সঙ্গে আলাপ হবে। তাকাতেই দেখি সেদিনের সেই কলেজ গার্ল। ও আমাকে খেয়াল করেনি সেদিন, আমি শুধু মনোযোগী হয়ে খেয়াল করেছি।
যে অধ্যায়গুলো দুর্বোধ্য সেগুলো চিহ্নিত করে। পরদিন থেকে নিয়মিত পড়ানো শুরু করলাম। পড়াশোনার বাইরে অতিরিক্ত কথা খরচ আমি কোনোক্রমে করি না। এটা শুধু মেয়ে স্টুডেন্টদের জন্য। এখানেও তাই বজায় রাখি।
কেটে গেলো দু’মাস। আমি তখন দৈনিক কাগজে সাহিত্য পাতায় কবিতা পাঠাই। পত্রিকার লোকেরা ছাপে। সমকালীন ওই সময়ে উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা সোশাল মিডিয়ায় সরব। কবিতা দুর্বোধ্য লাগে এদের কাছে। মিউজিক, ফিল্ম আর ফেসবুকিং তখন এদের প্রধান কাজ। আমিও এর বাইরে নয় তবে আমি সাহিত্যের সঙ্গে যে যোগসূত্র রেখেছি তা ভাববার বিষয়। এখানেই আমি আমার বয়সী গতানুগতিক ছেলেদের থেকে আলাদা।
ওর নাম লাবণ্য। গতকাল ওর একটা উপনাম দিয়েছি আমি, ছুটি বলে ডাকি।ক্যালকুলাস পড়াচ্ছিলাম। বুঝতে অসুবিধা হবে তাই কয়েকবার সামারি করছি। সহাস্য ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে আমার বোঝানোর দিকে।
একটুও মন নেই পড়ায়। সবেমাত্র কুড়ি মিনিট পড়িয়েছি আরও আধাঘন্টা পড়াবো অথচ সে আমাকে, বললো ভাইয়া একটু গল্প করি চলেন। আমি বিপাকে পড়লাম। তবুও কী প্রসঙ্গে কথা বলা যায় সেটা ভাবছিলাম? বললাম তুমি কবিতা বা গল্প পড়ো? জবাবে মাথা নাড়িয়ে বললে, না আমি গল্প শুনতে পছন্দ করি। বিভূতিভূষণের গল্পগুলো শোনে জানালো আমায়। এরপর কথার ছন্দপতনে বুঝলাম সে কী কী পছন্দ করে… ইত্যাদি?
আমি সুন্দর ভঙ্গিতে বাঙলা বলি, এটা ওর পছন্দ। গতকাল সমকাল পত্রিকায় যে কবিতাটা ছেপেছে আমার সেটা নিয়ে আলাপ করতেই ছুটি বললো,আমি ধারণা করেছিলাম আপনি কবিতা লিখেন। বেশ। বিস্তর আলাপ হলো।সদ্য প্রকাশিত কবিতায় উপমিত নারীর যে নাম দিয়েছি তা ‘ছুটি’। লাবণ্যকে বললাম, তোমাকে ছুটি বলে ডাকি? সানন্দে একগাল হেসে বললো, ঠিক আছে বলুন।
এরপর, ছুটিকে ছুটি দিয়ে ডরমে ফিরে এলাম।
মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ জাগ্রত প্রেম নিয়ে আমাকে তাড়া করতে থাকলো। আমি কী স্টুডেন্টের প্রেমে পড়ব? লেইম লাগতে থাকল। নিজেকে সংযত করে হাতে পাবলো নেরুদার কবিতা নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখছিলাম, এমন সময়ে ফোন বেজে উঠলো। ওপাশ থেকে লাবণ্যের কণ্ঠস্বর। বললো, আমি ছুটি।
টানা সতেরো মিনিট কথা শেষে রেখে দিল কল। চক্ষু বুজে আমি জেগেই স্বপ্নের গুহায় আটকে গেলাম। সেই যে আটকে গেলাম আর বের হতে পারিনি।
বরং আমি লেইম কাজটাই করতে থাকলাম। সুমতি ও কুমতি ভাবাতে থাকলো, ডরমের দেয়ালে আমাকে নিয়ে ক্যারিকেচার আঁকলো আর হাসাহাসি করলো। সেই হাসির শব্দের প্রতিধ্বনি আমাকে আরও জোরদার প্রেমিক বানিয়ে তুললো। তুমুল প্রেম করছি তখন। শহরের ধূসররঙের সব স্বপ্ন আমার কাছে সহসাই রঙিন হয়ে গেলো। সপ্তাহে তিনদিন পড়ানোর রুটিন আমার কাছে প্রিয় হয়ে উঠলো। অষ্টাদশী প্রেমিকা আর আমি বাইশ বছরের যুবক। শহরের পথগুলোয় আমাদের পদচিহ্ন আঁকা হলো। শুক্রবার করে বের হই। ভয়ে ভয়ে থাকি।যদি ছুটির পরিবারের কেউ দ্যাখে? সন্মান আর টিউশন দুটোই যাবে।
অনন্ত মেঘ হয়ে জমতে শুরু করলো প্রেম আর বৃষ্টি হয়ে বিজিত কথা বের হতে থাকলো দিনরাত্রি। ফেলে আসা যাক ছ’মাসের উপাখ্যান । ছুটি তখন উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে।
বরেন্দ্রভূমির এক আদিবাসী পাড়ায় আমরা ঘুরতে যাবো। ছুটি পরেছে লাল রঙের শার্টের সঙ্গে ধূসররঙের প্যান্ট। রীতিমতো দুপুর গড়িয়ে গেলে নগরীর উদ্দাম যৌবনের কাঠখড়ি যেখানে পুড়তে শুরু করেছে সেখানটায় আমরা মিলিত হলাম। মানে শহরের শেষে, মফস্বলের কাছাকাছি। কেননা ছুটি সেদিন বাবার কড়া নজরদারিতে। তবুও শুভঙ্করের ফাঁকি দিয়ে ছুটি এসেছে। উদয়পুর গ্রামটার নাম। মেঠোপথের দুপাশে কেবল সারি সারি পাইন গাছ, নিস্তব্ধ নিভৃত জায়গা। এর আগে এই মালোদের জীবনযাত্রা নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি বানাতে এসেছিলাম আমার ফিল্ম সোসাইটির লোকেদের সাথে। জায়গাটা বড় ভালো লেগেছিল। তাই ছুটিকে এর সুন্দরের সংজ্ঞা দিতেই ওর আগ্রহ বেড়ে গেলো। ঘন্টাখানেক লাগল। বাসস্টপ থেকে নেমে ভ্যানে করে আরও মিনিট ত্রিশের পথ।এরপর হাঁটতে হয়।
হাঁটতে হাঁটতে আমরা চলে আসলাম একটা মাঠের কাছে।এই মাঠ পেরোলেই মালোপাড়া।
মাঠের কাছে, পথমধ্যে ঘাসফুল জন্মেছে। ছুটি ঘাসফুল চেনে না। ওর হাতে দিতেই আনন্দে, হাসিতে ভুবন ভরে দিল।আমি চেয়ে রয়েছি একদৃষ্টে।
আবারও হাঁটতে থাকলাম। মাঠের শেষে ঘর বিশেক মালোর বাস এখানে। জনজীবন এখানে করুণ সুন্দর। সুন্দরের যাতনা এখানে ঢের।আমাদের দেখে মালোপাড়ার এক বউ জিজ্ঞেস করলো আমরা মিডিয়ার লোকজন কী না? কিংবা ভিডিয়ো করি না? কেননা এরা প্রায়ই এসব দেখে থাকে। না সূচক মাথা নাড়লাম।
পাড়ায় একটা চায়ের দোকানে আমরা বসলাম। মালোদের ছেলেমেয়েরা ইদানীং পড়াশোনা করে।কোন মালোর ছেলে নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে এবার।
তবে পূর্বপুরুষদের দেখানো পেশাতেই এরা নিয়োজিত।
আমরা চায়ের অর্ডার দিলাম। কিছুক্ষণ গালগল্প সেরে ঘুরেঘুরে এদের জীবনযাপনের প্লট দেখতে থাকলাম।
আমাদের ঘিরে রেখেছে মালো শিশুরা। ছুটি পকেট থেকে খুচরো টাকাগুলো সব ওদের দিয়ে দিল।কী ভীষণ খুশি ওরা।
ততক্ষণে দু’ঘন্টা কেটে গেছে। ফিরতে হবে আমাদের। ছুটির ভ্রুক্ষেপ নেই সেদিকে। একপ্রকার জোর করে নিয়ে আসলাম। ওর মন খারাপ।
সেই মাঠের মধ্যে আমরা হাঁটছি। বাঙলার পাঁচের মতো করে মুখটা রেখেছে। আমি বললাম, ছুটি এখানে কিন্তু সন্ধ্যা হলে ফেরার রাস্তায় ভ্যান পাবো না। শশব্যস্ত হয়ে উঠলো ছুটি।
মাঠ পেরোতেই জনমানবহীন এক রাস্তা, প্রায় কুড়ি মিনিট হাঁটতে হবে। পথমধ্যে ছুটি বলল, ওর চোখে কী যেন পোকার মতো গেছে, সন্ধ্যায় এই গ্রামীণ রাস্তায় স্বাভাবিক এটা।আমি দাঁড়িয়ে ওর চোখ থেকে পোকা বের করে আনলাম ফোনের আলো জ্বেলে।
সন্ধ্যার আঁধার এখুনি ছেঁয়ে যাবে পৃথিবীতে। চারিদিকে ঝিঁঝি পোকার ডাক, পাখিদের নীড়ে ফেরা আর পথের সন্ধান আমাকে ছুটির শরীরের উত্তাপ জানান দিচ্ছিল। ছুটিকে বুকের মধ্যে, বাহুবন্ধনে জড়িয়ে নিলাম। ছুটির শরীর কাঁপছে, আমিও নার্ভাস।
সম্ভবত তৃতীয় পৃথিবীতে ওটাই শতাব্দীর সেরা চুম্বন দৃশ্য ছিল।
প্রথম চুমু। লিলির মতো ছোটো শরীর। কবিতার কাপলেট জড়িয়ে ঠোঁটে কয়েক মিনিট পর দৃশ্যের মৃত্যু হলো।
হাঁটতে শুরু করছি। ভ্যান যেখানে দাঁড়িয়ে সেই মোড় গিয়ে, বাস ধরে, ছুটিকে ওদের বাসার কাছে রেখে আমি ডরমে ফিরে এলাম।
বাবা বকা দেয়নি ছুটিকে কেননা এই জেনারেশনের মেয়েদের বান্ধবীগুলোও উপকারী বটে।
আমি সেদিন ডরমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বিস্তর সুখানুভব করছিলাম।
চুমুতে বুঝি এত স্নিগ্ধতা জমানো?
পরদিন ছুটিকে পড়াতে গেলাম। ওর সলজ্জ ভাব খানিকটা বেড়ে গেছে ।
আমার চোখে আদিম অসুখ।
সম্ভবত আমরা দুজনেই দিন গুনছিলাম। মনেমনে নিভৃতে কিন্তু কেউ কাউকে বলতে পারিনি।
এরপর ঈদের ছুটি।আমি ডরমিটরি ছেড়ে বাড়ি যাবো।ছুটি ডরমের পাশে প্রধান রাস্তায় এসে হাজির। আমাকে পনের দিনের জন্য বিদায় জানাতে এসেছে।
রীতিমতো আবার ডরমে এলাম। ছুটিকে এতদিন এতটা মিস করেছি যে ছুটিকে নিয়ে দীর্ঘ গল্প লিখছি। এসে সেগুলো দিলাম।
খুশিতে আমাকে জড়িয়ে ধরলো দু’হাত প্রসারিত করে। দীর্ঘ জীবনের আয়োজনে আমাকে মনে হচ্ছে একটি নদী ডাকছে তাতে ডুবজল দিতে। আমি সে আলিঙ্গনে সাড়া দিয়ে অনন্ত এলোমেলো মেয়েটিকে বাহুলগ্না করলাম। দরজা ভেজানো।
তবে যে কেউ এসে যেতে পারে। সেদিকে আমাদের ভ্রূক্ষেপ নেই। অতঃপর চুমু…
আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে ফ্রেঞ্চ শিখতে গিয়ে আমার বন্ধু যে ফ্রেঞ্চ চুমু শিখে এসেছিল। আমাকে সব বলেছিল।সেই রকম চুমু।তারথেকে গাঢ়তর। পৃথিবীর কোন কোন মেটাফোর এনে তাতে মিশিয়ে দিলে ভালো হবে সেই চুমুর শাব্দিক আনন্দের খেলা তা পরে কখনো ভাবা যাবে।
হোটেল ছেড়ে দিবো আগামীকাল। ছুটির বাড়ির সেই প্রধান রাস্তায় যে বিরাট দেবদারু গাছটা ছিল, সেখানে গিয়ে বসলাম। আগের থেকে বসার স্থানটা সাজানো।দেয়ালে আলপনা। স্থানু সেই কোনোকিছুই টিকে নেই শুধু এই দেবদারু গাছটা ছাড়া। এরপর, এরপর?
এরপর চললাম ডরমের দিকে। গার্ডদের পরিচিত মুখগুলোর সঙ্গে কথা হলো।ওরা আমাকে কী যত্নে মনে রেখেছে, কত খোঁজখবর নিচ্ছে আমার কিন্তু ছুটি আমাকে এভাবে অনন্ত ছুটি দিয়ে চলে গেলো?
এরপর তো পেরিয়ে গেছে সাত বছর। ছুটি এখন এই শহরে থাকে না।যে সন্ধ্যায় আমি ডরমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বিস্তর অভিযোগ করছিলাম সেইদিন ছুটি শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল।
আমি ঢাকার জনজীবনে খাপ খাইয়ে নিয়েছি এখন।
বেকার জীবনের দুই বছরের ইতি টেনে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটা প্রথম সারির জব করছি। মাইনে ভালো। অর্থের স্বল্পতায় আমি পুরোনো বইয়ের যে দোকানে যাতায়াত করতাম সেখানে আর যাই না। অর্বাচীনতা ঢেলে আমাকে যে ছুটির টিউটর হতে হয়েছিল সেই জীবনকেও আমি অনুভব করতে পারি না আর। আমি খালি এখন অনিকেত মানুষের জীবনের আয়োজন লিখি কিন্তু নিজে এলিটদের ভঙ্গিতে চলি।আমার আর কোনো অর্থের দরকার নেই। শুধু একটুখানি ছুটির দরকার। একরত্তি মেয়ে, কত্ত ফিলিংস, মালোপাড়ার সেই মাঠের রাস্তায় প্রথম চুমু, এইসব শুধু দরকার। ভীষণ দরকার।
এসব ভাবতে ভাবতে রেলের চাকা ঘুরতে থাকলো। হাতে রাইনের মারিয়া রিলকের কবিতা সংগ্রহ। ভাবলাম সোনার কাঠি, রূপোর কাঠি অদল-বদল না করলে হয়তো আমার ছুটির কাছাকাছি আর যাওয়া যাবে না। ততক্ষণে প্লাটফর্ম ছেড়ে কিছুদূরের পথ।
আবার কখনো অনিকেত মানুষের গল্প লিখলে তখন কোনোদিন ভাববো ছুটির কথা। নিত্যদিন কিংবা কখনোই ভাববো না?
যদি ভাবনা আসে, ভাববো, আমার অনন্ত ছুটি চাই।






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান