নবান্ন

তোমার হাতে তুলে দেবো সোনার কাস্তে, সোনার লাঙল-ফলা,
তুমি মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে বলবে তোমার ইস্পাত-ই চাই,
ধান কাটতে কাটতে দেখবে সোনার কাস্তে ভোঁতা,
তখনও হয়তো কাটাই হয়নি সিংহভাগ ধান– তোমার সোনার ধান!
তুমি বলবে– ’এ কেবল ধান নয়– এ হলো আমাদের জীবন!’
আমি অবাক হয়ে দেখবো ইস্পাতের কাছে সোনার পরাজয়!
দেখবো ধানের বিজ্ঞাপন আমাদের দিন-রাতের জীবন।
ধান কাটা সারা হলে নতুন ধানের গন্ধে ম-ম করে আমাদের সরল উঠোন;
তুমি গেয়ে ওঠো নবান্নের গান,
জগতজোড়া পাঠশালায় আমি সংখ্যাতত্ত্ব ভুলে
শুধু শস্যবীজের স্মারক সাজাই আমাদের নিত্য সহবাসের,
অভ্যাস এড়িয়ে নতুন আবিষ্কারের নেশায় নাবিক মন
খুঁজে ফেরে তোমাকে নতুন করে পাওয়ার আশায়,
শ্রী, তুমি বলেছিলে জটিল সব অঙ্ক সরল হতে হতে শূণ্যপানে ধায়,
আমি আজ সত্যচোখে দেখলাম ইস্পাতের কাছে সোনার পরাজয়।


তোমাকে ছোঁবো না আর

পুড়ে যাও তুমি আমার ছোঁয়ায়,
তোমাকে ছোঁবো না আর,
দ্যাখো, প্রতিজ্ঞা করছি বুড়োশিবের থানে
বটের ঝুড়ি ছুঁয়ে।

জলপরী হতে চাইতে;
চলো, রেখে আসি জলের গভীরে,
যেখানে আমার হাত পৌঁছায় না,
মন ডুবুরীর বেশে খবর আনবে,
তাকে তুমি দিও একটি করে রক্তপ্রবাল;–
যা হবে জীবনের সঞ্চয়।

অনন্ত ধারা হয়ে ভরে দাও ইচ্ছাপাত্র;
থেমে যাক্‌ অনেক দিনের
না পাওয়ার কল্‌কলানি।

তুমি তো মেঘ হতে চাও;
ঐ নীলে উড়ে যাও,
হাত যেখানে পৌঁছায় না,
মন ঘুড়ি হয়ে উড়বে তোমার পাশে,
মাখবে তোমায় সারা গায়ে,
চেনাবে তুমি পাহাড়; নদীর চলা,
সব সীমানা পেরিয়ে সাগরের মিলন—
ভালোবাসার ঘর,
বিভেদের বেড়া ডিঙিয়ে দেখাবে
তোমার উড়ে যাওয়ার কোনও সীমা নেই!
সেখানেই গোত্তা খেয়ে কাঁটাতারে আছড়ে পড়বো আমি।

তোমার আকাশ নীলে আমি দেখি শুধুই নীল,
তুমি দ্যাখো বর্ণহীন অসীমতা,
সবকিছুই সত্য তোমার,
তাইতো পুড়ে যাও আমার ছোঁয়ায়!
প্রতিজ্ঞা করছি ছোঁবো না তোমাকে আর
এই অসত্য হাতে।


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

“জয় গঙ্গোপাধ্যায়” তে 2 টি মতামত

  1. “নবান্ন” কবিতার মূল বক্তব্য–বিকল্পহীন পরিশ্রম, বাস্তবতা আর বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি। সোনা মূল্যবান হলেও কৃষিকাজের জন্য তা অকেজো—সোনার কাস্তে ভোঁতা হয়ে যায়, সোনার লাঙলের ফলা দিয়ে জমি চাষ হয় না। কিন্তু ইস্পাত—যা হয়তো সোনার মতো মূল্যবান নয়, সেটিই কৃষকের প্রকৃত হাতিয়ার, জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বাস্তব সত্য।

    “আমি অবাক হয়ে দেখবো ইস্পাতের কাছে সোনার পরাজয়!”

    এখানে মূলত এক দর্শন ফুটে উঠেছে—যেখানে প্রকৃত কার্যকারিতা ও বাস্তবতা, মিথ ও দুনিয়াদারি, আকাঙ্ক্ষার ওপরে বিজয়ী হয়। বিজ্ঞাপন দিয়ে সমাজের জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হলেও, কৃষকের কাছে ধান শুধু বাজারের বিষয় নয়—এটাই তার জীবন।

    শেষে “জটিল সব অঙ্ক সরল হতে হতে শূণ্যপানে ধায়”—এটি কি তাহলে এই বোধের ইঙ্গিত যে, জীবনের সত্য আসলে সরল, কিন্তু আমরা জটিলতা তৈরি করি? অথবা, কবি কি বোঝাতে চেয়েছেন যে, শেষ পর্যন্ত বাস্তবতা ও প্রয়োজনীয়তাই টিকে থাকে, দুনিয়াদারি নয়।

    কবিকে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই 🙏💐

  2. কবিতাটি যেন প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, দূরত্ব ও আত্মনিয়ন্ত্রণের এক অন্তর্গত দ্বন্দ্ব তুলে ধরেছে। এখানে ছোঁয়ার মধ্যে আছে—পুড়ে যাওয়ার প্রতীকী ব্যঞ্জনা, যা হয়তো ভালোবাসার তীব্রতা, আত্মবিসর্জন, সম্পর্কের বাস্তবতাকে বোঝায়।

    “তুমি তো মেঘ হতে চাও;
    ঐ নীলে উড়ে যাও,
    হাত যেখানে পৌঁছায় না,
    মন ঘুড়ি হয়ে উড়বে তোমার পাশে,”

    এখানে দূরত্বের এক অদ্ভুত আকর্ষণ রয়েছে—একজন বাস্তবতার শেকলে বাঁধা, অন্যজন মুক্ত, সীমাহীন। প্রেম এখানে যেন এক অনন্ত অন্বেষণ, যেখানে স্পর্শ এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতাকে অসত্য বলা হয়েছে, তবু মন পিছু ছাড়তে পারে না।

    শেষে “প্রতিজ্ঞা করছি ছোঁবো না তোমাকে আর
    এই অসত্য হাতে।”

    এ যেন আত্মত্যাগ। প্রেমের এমন এক স্তর, যেখানে সত্য-মিথ্যার ভেদরেখা মুছে গিয়ে কেবল অনুভূতির অস্তিত্ব থাকে।

    এখানে বেদনার সঙ্গে মুক্তির কথা আছে, ভালোবাসার আকর্ষণ আর ত্যাগের মধ্যে গভীর দ্বন্দ্ব আছে।

    এত সুন্দর একটি প্রেমের কবিতা মোহিত করলো। কবিকে শ্রদ্ধা। 🙏🙏🙏

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Trending